জাহিদ ফিরতেই স্বস্তি। একদিন হাতে রেখেই ফিরল সে। ফিরল রাতে। মিথিলা তখন জাহিদ আসছে জেনে লিপাকে বিদায় করে, জাহিদের খাবার টেবিলে ঢাকা দিয়ে রেখে বিছানায় আধশোয়া হয়েছে। জয় গোস্বামীর কবিতা পড়ছে—তখনই ফিরল জাহিদ। এ ক’দিনেই তাকে কেমন অন্যরকম লাগছে। একটু যেন শুকনোও লাগছে তাকে। পথশ্রমে হয়ত, ভাবল মিথিলা। গোসল, খাওয়া সেরে বিছানায় এল জাহিদ, আলতো হাতে জড়িয়ে ধরল মিথিলাকে। ভালোলাগায় কেঁপে উঠল মিথিলা। সব আবেগ, সব মানবিক বোধ এখনও তবে ছেড়ে যায়নি তাকে! ভাবল সে।

জাহিদের সাথে তার পরিচয়টা একেবারেই আকস্মিক, কাকতালীয় বলা যায়। মিথিলা তার পরিচিত এক নম্বরে ফোন করেছিল, একটি ডিজিট ভুল হয়েছিল তার, খেয়াল করেনি সে। ফোন করে, নিতান্তই পরিচিতজন জেনে হড়বড় করে নিজের কথাগুলো বলে গেল, কোনো কিছু শোনার অপেক্ষা না করেই। ওপাশ থেকেও চুপচাপ শোনা হল তার কথা। তারপর গম্ভীর কণ্ঠে প্রশ্ন ভেসে এল, কাকে চাইছেন আপনি?

মিথিলা অপ্রস্তুত, বিব্রত। সে বুঝতে পারল এতক্ষণে, কোথাও ভুল হয়েছে তার। যাকে ফোন দিতে চেয়েছে সে, ওপাশের ব্যক্তিটি তিনি নন। সে মূলত ফোন দিয়েছিল একটি প্রতিষ্ঠানে। যেখান থেকে ইন্টারভিউয়ের জন্য ফোন করা হয়েছিল তাকে কয়েকদিন আগে। ফলাফলটা জানার জন্য ফোন দিয়েছিল সে।

অতঃপর, বিব্রত মিথিলা জিজ্ঞেস করেছিল এটা তার কাক্সিক্ষত প্রতিষ্ঠানটির নম্বর কিনা। উত্তরে না বলেই ওপাশ থেকে নিতান্তই অভদ্রের মত ফোনটা কেটে দিয়েছিল লোকটি।

মিথিলা বিরক্ত হল। নিজের অসাবধানতায় এবং ফোন ব্যবহারকারী ব্যক্তির অভদ্রতায়। ভুল তো হতেই পারে মানুষের! তাতে এত অভদ্রতা করার কী আছে! আর মিথিলা তো স্যরি বলার জন্য প্রস্তত ছিল, সুযোগটা কি দেয়া যেত না তাকে! খুবই অপমানিত বোধ করল সে। অপমানবোধ! এই একটা বস্তু, ছোটবেলা থেকেই একটু বেশি তার। যার মূল্য তাকে দিতে হয় চরমভাবেই।

সে নম্বরটা চেক করল। হ্যাঁ, একটা ডিজিট ভুল করেছে সে। চার এর জায়গায় পাঁচ বাটন চেপেছে। যার ফলে এই বিপত্তি! সে নম্বরটা ডিলিট করল তখনই। পাছে অসাবধানে আবার কল চলে যায়। তারপর তার কাক্সিক্ষত নম্বরে ফোন দিল। ভুল হল না এবার। মিথিলা প্রয়োজনীয় কথা সেরে ভুরু কুঁচকে বসে রইল অনেকক্ষণ। একটু আগের অপমানের কাঁটাটা যেন খচখচ করে বিঁধতে থাকল তাকে। তারপর, জোর করেই, দূর ছাই, বলে সরিয়ে দিয়ে উঠে পড়ল, ব্যস্ত হল কাজে।

সারা দিনে নানা কাজের ব্যস্ততায়, প্রায় ভুলেই গেছিল মিথিলা, মনে পড়ল সন্ধ্যায়, যখন আচমকা ফোন এল ঐ নম্বরটা থেকে। মিথিলা বিরক্তি নিয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকল মোবাইলের স্ক্রিনের দিকে। ফোন ধরবে কি ধরবে না, ভাবল, তারপর রিসিভ করে, কানের কাছে ফোনটা নিয়ে হ্যালো বলল, সালাম দিল।

স্যরি, আপনি সকালে ফোন দিয়েছিলেন, আমি খুব ব্যস্ত ছিলাম তো, তাই ফোনটা কেটে দিয়েছিলাম, কিছু মনে করবেন না।—ওপাশ থেকে বলল লোকটা।

আমি ভুল করে আপনার নম্বরে ফোন দিয়েছিলাম। আপনাকে বিরক্ত করেছি, স্যরি।—নিরুত্তাপ, নিরাবেগ কণ্ঠে বলল মিথিলা।

না, না, ভুল তো হতেই পারে। আসলে ভাই, ব্যাংকে চাকরি করি তো, খুব ব্যস্ত থাকতে হয়। তাই অভদ্রের মত ব্যবহার করেছি তখন, প্লিজ, কিছু মনে করবেন না।

আমি কিছুই মনে করিনি। অনেক ধন্যবাদ।—বলে ফোন রেখে দিয়েছিল মিথিলা। ঘরপোড়া গরু সে, অনর্থক ঝামেলা, অহেতুক ঝঞ্ঝাট, ভালো লাগে না একদম।

স্বপনের সাথে ডিভোর্সের পর অথৈ সমুদ্রে পড়ল মিথিলা। দুচোখে যেন অন্ধকার দেখল সে। চেনা পৃথিবীটা যেন বদলে যেতে থাকল দ্রুত। পরিচিত মানুষগুলো যেন কেমন চোখে তাকাত তার দিকে। পরিচিত পুরুষ বন্ধু, আধ-চেনা, সমবয়সী বা বয়সে ছোটরাও হঠাৎ ভাব জমাতে চেষ্টা করত খুব। যেন খুবই চিন্তিত তারা মিথিলাকে নিয়ে, খুবই উদ্বিগ্ন মিথিলার বিপর্যয়ে। বয়সী পুরুষগুলোর আচরণও বেশ রহস্যময় হয়ে উঠল যেন! ঈঙ্গিতময় কথা, অহেতুক গায়ে পড়ে আলাপ জমানোর চেষ্টা। জীবনটা অসহ্য হয়ে উঠল, দম বন্ধ লাগল মিথিলার। সে যেন ভীষণ সস্তা হয়ে উঠেছে হঠাৎ! হাত বাড়ালেই যাকে ছোঁয়া যায়, ইচ্ছে করলেই যাকে ভোগ করা যায়! কী নোংরা! কী জঘন্য নোংরা মানসিকতা! সে যে অভিভাবক ছাড়া এক অসহায় নারী, ভাবতে নিজেরই ঘেন্না হল তার। তবু তার সম্পর্কে এখন এমনই ভাবনা সবার। সে টের পায়, যেন সে বেড়া ছাড়া শস্যক্ষেত! ছিঃ! ঘেন্নায় রি রি করে ওঠে তার শরীর। আক্রোশে, অপমানে, ক্রোধে ভেতরে ভেতরে ফুলতে থাকে সে। ছটফট করে। কিন্তু করতে পারে না কিছুই! তবু, স্বীকার করে সে, ব্যতিক্রম ছিল দু-চারজন। কিন্তু সংখ্যায় তারা নগণ্য এবং তাদেরই সহায়তায়, চেষ্টায় সে মৃত্তিকাকে নিয়ে বাঁচার স্বপ্ন দেখল, যুদ্ধ চালিয়ে গেল। বছর ঘুরতে না ঘুরতেই স্বপনের পরিবার মহা ধুমধাম করে বিয়ে করিয়ে আনল স্বপনকে। এবং যেহেতু একই পাড়ায় বাড়ি তাদের, মিথিলা দেখল, নতুন সুন্দরী বউ নিয়ে স্বপন বেড়াতে বের হয়। তাকে দেখে মনে হয়, দারুণ খুশি সে, দারুণ সুখি।

মিথিলা দেখে, আড়ালে চোখের জলও মোছে না-কি! সে তো সত্যিই ভালোবেসেছিল স্বপনকেই! সে অবাক এবং বিরক্ত হয়ে অনুভব করে, নিজের কাছেই স্বীকার করে যে, ঐ লম্পট, নির্বোধটাকে সে এখনও…! আহ, ঈশ্বর! এত কষ্ট কেন পৃথিবীতে! কেন এত যন্ত্রণা!

বিপত্তি বাঁধল মৃত্তিকাকে নিয়ে। সামান্য ক’দিনেই সে তার বাবার ন্যাওটা হয়ে গেছিল ভীষণ! এখন সে ‘বাবা’, ‘বাবা’ করে কাঁদে, স্বপনকে দেখলেই ছুটে যায়। তার আড়াই বছরের টলোমলো পায়ে সে একাই হেঁটে চলে যেতে চায় তার জন্মদাতার ভিটা অভিমুখে! ভীষণ যন্ত্রণা বোধ করে মিথিলা। মেয়েটাকে সামলাতে হিমসিম খেয়ে যায় সে। স্বপন মৃত্তিকাকে দেখলে হাত বাড়ায়, ডাকে, মেয়েও ছুটে যায়—কিন্তু পৃথিবী অনেক বদলে গেছে ততদিনে। মাঝখানে দুর্ভেদ্য প্রাচীর। স্বপনের বউ চায় না মৃত্তিকাকে ডাকুক স্বপন, নতুন করে তৈরি হোক উটকো কোনো ঝামেলা। কোনো মেয়েই সেটা চায় না, জানে মিথিলা।

তাই, যা ছেড়ে এসেছে তার জন্য আর কোনো মায়া সে রাখে না মনে, পোষে না আর কোনো দুর্বলতা, আফসোস তো নয়ই। সে জানে সে যা করেছে ঠিক করেছে, কোনো ভুল ছিল না তার। তবু মেয়েটার জন্য দুঃখে চোখে জল জমে, ব্যথায় ভরে যায় মন। আহা! মেয়েটার তো দোষ নাই কোনো। বাচ্চা মেয়েটা তার। সে কেন তবে বঞ্চিত হবে বাবার আদর ভালোবাসা থেকে?

তবু, দায়ী না হলেও দায়ভার বহন করতে হয়। অপরাধ না করেও শাস্তি পেতে হয় পৃথিবীতে। তার অবুঝ, অবোধ মেয়েটাও কবে যেন বুঝে গেল সেটা। আর সে বাবার কাছে যাওয়ার বায়না করল না, কাঁদল না। মিথিলা খেয়াল করল, দূর থেকে সে অপলক তাকিয়ে থাকে স্বপনদের বাড়িটার দিকে। হঠাৎ স্বপনকে দেখলে ফ্যালফ্যাল তাকিয়ে থাকে, তারপর দৌড়ে পালায়। তার বয়সী কোনো বাচ্চাকে বাবা আদর করছে, কিনে দিচ্ছে কোনো খেলনা—দেখলে অভিমানে ঠোঁট কাঁপে তার, ছলছল করে চোখ। দেখেও দেখে না মিথিলা। গোপনে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে।