স্নাতকোত্তর শেষ করল মিথিলা। মসৃণ ছিল না পথটা। টিউশনি শুরু করেছিল সে। স্বপনের কাছে কোনো ক্ষতিপূরণ চায়নি, দেয়নি স্বপনও। মৃত্তিকার খরচ, তার নিজের খরচ। কষ্ট। বাবার সংসারে সে বোঝা। বাবা বলেন না কিছুই, মাঝে মাঝে হাতখরচ বাবদ কিছু টাকা দেন বরং তাকে। মৃত্তিকাকে কিনে দেন এটা সেটা। ভাই-বোনেরাও দেয় মাঝে মাঝে—তবু আত্মসম্মানে ঘা লাগে তার। প্রাণপণ চেষ্টা, নিজে কিছু করার। নিজেকে, মেয়েকে অন্যের গলগ্রহ দেখতে ভালো লাগে না তার। দরখাস্ত করে বিভিন্ন জায়গায় চাকরির প্রত্যাশায়, কিন্তু চাকরি যেন সোনার হরিণ! পরিচিতি ছাড়া, তদ্বির ছাড়া, টাকা ছাড়া, ধরা দেয় না সে। মিথিলার তো কিছুই নেই সেসব। বরং ডিভোর্সির তকমা এঁটেছে গায়ে। ভাইভা বোর্ডে, ডিভোর্সি শুনলেই যেন নড়েচড়ে বসেন কর্তারা। অহেতুক আগ্রহ, কৌতূহলে চকচক করে চোখ। ত্যক্ত, বিরক্ত সে। এরই মধ্যে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে ডাক পেল সে। লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা দিয়ে চাকরিটা পেয়েও গেল। কিন্তু মৃত্তিকা? তাকে কোথায় রাখবে সে? মৃত্তিকা তখন পাঁচ বছরের। চাকরিটা করতে হলে মিথিলাকে শহরে যেতে হবে। অফিসে আরও যারা তার মতো নারী কর্মী আছে, তারা সবাই অফিস কোয়াটার্সে থাকে, নিরাপদ এবং নির্ঝঞ্ঝাট। কিন্তু মৃত্তিকাকে তো রাখা যাবে না সেখানে। তাহলে?

ত্রাণকর্ত্রীর ভূমিকা নিলেন রেহানাই। তিনি মিথিলাকে বোঝালেন মৃত্তিকাকে দেখে রাখবেন। মিথিলা বরং চাকরিটা করুক। সেই ছোট্টটি থেকে মিথিলাকে আদরে বা অনাদরে যেভাবেই হোক বড় করেছেন তিনি, মিথিলার এই ভাসন্ত অবস্থা তার কাছেও যন্ত্রণার। তিনিও চান, মিথিলা অন্তত কিছু একটা করুক। ব্যস্ত থাকুক, ভালো থাকুক।

রাজি হল মিথিলা, আর কোনো উপায়ও ছিল না তার। শুরু হল তার নতুন জীবন। সারাদিন টানা ব্যস্ততা, কাজে ডুবে থাকা, সন্ধ্যায় বাসায় ফিরে সহকর্মীদের সাথে আড্ডা, হৈ চৈ, খাওয়া দাওয়া, ঘুম। দিনগুলি ভালোই কাটছিল তার। প্রতি সপ্তায় ছুটিতেই বাড়ি যায় সে। মৃত্তিকার জন্য কিনে নিয়ে যায় এটা-ওটা, মৃত্তিকা কী যে খুশি হয় তাকে দেখে! মেয়েটাকে বুকে জড়িয়ে সব দুঃখ, সব কষ্ট ভুলে যায় মিথিলা। এরই মধ্যে পরিচয় হল শফিকের সাথে।

শফিক তারই সহকর্মী। দেখতে ভালো, ভদ্র, অবিবাহিত। একই সাথে চাকরির সুবাদে দেখা হয় প্রতিদিন, কথাও হয় কমবেশি। মিথিলার প্রতি শফিকের অতিরিক্ত আগ্রহ নজর এড়ায় না মিথিলার। না-বোঝার ভান করে, এড়িয়ে যায় সে।

মিথিলাকে অবশেষে সরাসরি ভালোলাগার কথা, ভালোবাসার কথা জানাল শফিক। মিথিলা তাকে খুব ভদ্র ভাষায়, খুব সহজভাবে বুঝিয়ে দিল তার অপারগতা। সে ডিভোর্সি, এক মেয়ের মা, জানাল সে।

শফিকের আগ্রহ কমল না তাতে। সে বরং দ্বিগুণ উৎসাহে তার ভালোলাগা ব্যক্ত করতে ব্রতী হল আরো। মিথিলা সুন্দরী, সবে ঊনত্রিশ চলছে তার। এই বয়সে প্রেমে পড়াটা গুরুতর কোনো অপরাধের পর্যায়ে পড়ে না। বরং সেটাই স্বাভাবিক। কেন মিথিলা নিজের জীবনটাকে নষ্ট করতে চাইছে তবে? যুক্তির পর যুক্তি সাজিয়ে মিথিলাকে কাবু করতে চায় শফিক। মিথিলা এড়াতে চায়। মিথিলা পালাতে চায়, তবু বারবার দুষ্টগ্রহের মত মিথিলার সামনে এসে দাঁড়ায় শফিক।

আর মিথিলাও, অতিমানবী তো নয়। তারও আছে ভালোবাসা পাওয়ার আকাক্সক্ষা। আছে কামবাসনা। যতই এক সন্তানের জননী হোক সে, বুকের মধ্যে যতই পুষে রাখুক স্বপনের জন্য উষ্ণতা, তবু শেষ পর্যন্ত সে রক্ত-মাংসে গড়া এক সাধারণ মানবী বৈ নয়!

শফিকের ভদ্র ব্যবহারে, তার ভালোবাসার মিষ্টি কথায় ভুলল মিথিলা। যখন সে নিশ্চিত হল যে, মৃত্তিকাকে সত্যি সত্যিই মেনে নিতে চায় শফিক, তখন শফিকের মহত্ত্বে, ঔদার্যে মুগ্ধ হল মিথিলা। দুর্বল হল সে-ও, শফিকের প্রতি। যদিও সে দুর্বলতায় সত্যিকারের ভালোবাসা আর কামাকাক্সক্ষার মধ্যে কোনটা প্রকট ছিল বেশি সে নিয়ে তার নিজের মধ্যেই সংশয় ছিল বিস্তর। কিন্তু শফিককে নিয়ে কোনো দ্বিধা ছিল না তার মনে শেষ পর্যন্ত আর। যেহেতু মৃত্তিকার ভবিষ্যৎ নিয়ে নিশ্চিন্ত, নির্ভরতার আশ্বাসে আশ্বস্ত করেছিল তাকে শফিক। কিন্তু মানুষের পশুত্ব, নীচতা, নোংরামী ও নিষ্ঠুরতা সম্পর্কে তখনও মূলত কোনো ধারণাই ছিল না মিথিলার।

কোনো এক সাপ্তাহিক ছুটিতে সে মৃত্তিকাকে নিয়ে এল তার কাছে। অনেকদিন থেকে বায়না করছিল মেয়েটা, চাইছিল খুব করে। মিথিলা দু দিনের ছুটি নিল অফিস থেকে। মৃত্তিকাকে নিয়ে ঘুরল অনেক। মৃত্তিকা অনেক খুশি, দারুণ উৎফুল্ল। দ্বিতীয় দিন মিথিলার শরীরটা খারাপ করল হঠাৎ। মৃত্তিকা ঘরে থাকতে রাজি নয়, সে ঘুরবে, বেড়াবে। আগের দিন শফিক অনেকটা সময় তাদের সাথে ছিল। মৃত্তিকা বেশ সহজ ছিল তার সাথে। দেখে মনে মনে ভীষণ খুশি হয়েছিল মিথিলা। মনের ভেতরে যে সামান্য শঙ্কাটুকু ছিল তার, নিমেষেই উধাও হয়েছিল যেন তা-ও। এবার বাড়ি গিয়ে সে শফিকের কথা সবাইকে জানাবে, ভেবেছিল সে। মিথিলার শরীর খারাপ শুনে শফিক প্রস্তাব করল সে-ই ঘুরিয়ে আনবে মৃত্তিকাকে। রাজি হয়ে গেল মিথিলা। মৃত্তিকাও খুশিতে লাফাতে লাফাতে চলে গেল শফিকের সাথে।

দুপুর গড়িয়ে প্রায় বিকেল তখন, মিথিলা অপেক্ষা করছিল কখন আসবে মৃত্তিকা, ফোন করছিল বারবার শফিককে, শফিক ফোনে বলল, আসছে তারা, চলে এসেছে প্রায়।

দু হাতে অনেক খেলনা নিয়ে মৃত্তিকা এল। শফিক মৃত্তিকাকে পৌঁছে দিয়েই চলে গেল। মৃত্তিকার মুখটা একটু শুকনো, একটু ম্লান দেখাল যেন। সারাদিনের ঘোরাঘুরির ক্লান্তিতে, ভাবল মিথিলা।

মৃত্তিকাকে গোসল করাতে নিল সে। আর তখনই ভূত দেখার মত চমকে উঠল মিথিলা। নাড়া খেল ভীষণ। তার আত্মজার, তার নাড়িছেঁড়া একরত্তি মেয়েটার অস্ফুট, অপরিণত, নরম, তুলতুলে ত্রিভূজে ক্ষীণ রক্তের দাগ! ভীষণ ফোলা!

মিথিলার বুকের মধ্যে যেন হাতুড়ির ঘা দিল কেউ, মাথার মধ্যে যেন আগুন জ্বলল হঠাৎ। মেয়েকে জড়িয়ে ভীষণ জোরে ঝাঁকি দিল সে। কী হয়েছে মৃত্তিকার? কেন রক্ত? কেন ফোলা? জানতে চাইল সে এক নিঃশ্বাসে।

ব্যথায় কঁকিয়ে উঠল মৃত্তিকা, কেঁদে ফেলল ঝরঝর। ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলল, ঐ আংকেল—

মিথিলা কেন বধির হল না! কেন অন্ধ হল না সে! মেয়েকে জড়িয়ে বুক ফাটা আর্তনাদ করে উঠল মিথিলা। তার একরত্তি মেয়েটা! আহা! তার কলিজার টুকরাটা। না, স্বপনের দেয়া আঘাতের সাথে এর যেন তুলনা চলে না কিছুতেই। এত যন্ত্রণাময় যেন ছিল না সেটা! তার মনে হল তার বুকের মধ্যে কেউ যেন ঢুকিয়ে দিল চকচকে ছুরির ফলা। প্রবল হাহাকারে ছেয়ে গেল তার মাতৃহৃদয়। অসহ্য কষ্টে দুমড়ে গেল, মুচড়ে গেল বুক। যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে সে প্রার্থনা করল, ধরণী, দ্বিধা হও!