ধরণী দ্বিধা হয়নি সেদিন। সেই পড়ন্ত বিকেলে, পৃথিবী যেন কোনো ধূসর বিষণœতায়, কোনো এক সীমাহীন শূন্যতায় ছেয়ে গেল। অসহ্য যন্ত্রণায়, কষ্টে, নিজের ওপর সীমাহীন ঘৃণায় আর ধিক্কারে ভরে গেল মিথিলার মন। সেদিনই প্রথম মিথিলার মনে প্রবল আফসোস জাগল, কেন মৃত্তিকাকে মেয়ে করে পাঠালেন ঈশ্বর! আহা! এই অপমান, এই যন্ত্রণা, এই হৃদয় ছিঁড়েখুঁড়ে দেয়া বেদনা, এই তীব্র, তীক্ষè আঘাতের স্মৃতি কোনোদিন কি ভুলতে পারবে তার মেয়েটা ? ক্ষমা কি করবে সে কোনোদিন মিথিলাকে? আহা! কেন মেয়ে হয়ে এলি তুই? কেন? এই সমাজ, সভ্যতার মুখোশধারী জানোয়ারগুলো, এই মনুষ্য নামধারী পশুগুলো ছিঁড়েখুঁড়ে খাবে তোকে। জর্জরিত করবে তোকে আঘাতে, অপমানে। প্রতিবাদে টুঁ শব্দটিও করতে পারবি না তুই! প্রতিবাদ করলেই তুই খারাপ, নষ্টা, ভ্রষ্টা, পতিতা!

কী করে মিথিলা আগলে রাখবে তার মেয়েকে? শফিকের কথা মনে হতেই তীব্র ঘৃণায় রিরি করে উঠল শরীর, মন। অন্ধ, অক্ষম আক্রোশে, ক্রোধে, থরথর কাঁপল সে।

সেই বিকেলেই কাউকে কিছু না বলে, না জানিয়ে, নিজের জিনিসপত্র গুছিয়ে নিল মিথিলা। মৃত্তিকাকে নিয়ে সবসহ হাজির হল এক গাইনি ডাক্তারের চেম্বারে। ডাক্তার সব শুনলেন, মিথিলাকে জিজ্ঞেস করলেন সে আইনের আশ্রয় নিতে চায় কিনা। মাথা নেড়ে না জানাল মিথিলা। ডাক্তার আর কিছু বললেন না। গম্ভীর, বিষণœমুখে ঔষধপত্র লিখে দিলেন। বাড়িতে চলে এল মিথিলা। কারও কোনো প্রশ্নের উত্তর দিল না, ঘরে খিল এঁটে মেয়েকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বসে রইল চুপচাপ। চোখের জলও শুকিয়ে গেল তার।

আইন! আইনের আশ্রয়! সে কী অভিযোগ করবে? ধর্ষিত হয়েছে তার পাঁচ বছরের বাচ্চা মেয়েটা তারই সহকর্মীর দ্বারা, যাকে সে এমনকি বিয়ে করবে বলেও সিদ্ধান্ত নিয়েছিল? আর তারপর? তারপর আরও কয়েক দফা যখন তাকে ধর্ষণ করবে এই সমাজ প্রশ্নে প্রশ্নে! প্রশ্নের নানাবিধ মারপ্যাঁচে যখন অস্থির, দিশেহারা করে তুলবে তাকে, তখন? তার ধাক্কা কি সামলাতে পারবে ঐ একরত্তি মেয়েটা? শাস্তি! অবশ্যই শফিকের শাস্তি সে চায়—কিন্তু তা তার ঐ একরত্তি মেয়েটার মানসিক বিপর্যয়কে বাড়িয়ে তুলে নয়!

মিথিলা মৃত্তিকাকে খুব আগলে রাখল ক’দিন। খুব উদ্বিগ্ন হল সে, মেয়েটা এই নোংরা স্মৃতি ভুলে স্বাভাবিক আচরণ করবে তো আবার! কিন্তু, মৃত্তিকাও মেয়েই শেষ পর্যন্ত! আর ঈশ্বর, দয়াময় ঈশ্বর, অশেষ সহ্যক্ষমতা দিয়ে পাঠিয়েছেন মেয়েদের, এবং ভাগ্যিস সেটা দিয়েছেন! তাই শেষ পর্যন্ত স্বাভাবিক হল মৃত্তিকাও, আবার হাসল, আবার খেলল! তবু লক্ষ করল মিথিলা, মাঝে মাঝেই, কেমন আনমনা, উদাস হয়ে যায় মেয়েটা। চোখ ছলছল করে তার।

কাটিয়ে উঠবে, নিশ্চয়ই কাটিয়ে উঠবে! নিজেকে সান্ত¡না দেয় মিথিলা। অফিস থেকে অনেকেই ফোন দিল। ফোন দিল সহকর্মী, বন্ধু, যাদের সাথে ছিল এতদিন, তারাও। জানতে চাইল কেন সে চলে এল হঠাৎ, কেন কাউকে কিছু না জানিয়ে হুট করে এমন সিদ্ধান্ত নিল সে! কী জবাব দেবে মিথিলা? কী উত্তর আছে তার?

মিথ্যেই বলতে হল তাকে! বলল, মৃত্তিকার শরীরটা খারাপ করেছিল, তারও ভালো লাগছিল না আর, তাই সব ছেড়েছুড়ে চলেই এল সে। চাকরিটাও করবে না আর, জানিয়ে দিল।

শুধু একজন ফোন দিল না, খবরও নিল না। সে শফিক। মিথিলাও জানত, ফোন করবে না সে। কোন মুখে, কোন সাহসে সে আর ফোন করবে মিথিলাকে!

এরপর থেকে মাঝে মাঝেই মিথিলাকে ফোনে ক্ষুদেবার্তা পাঠায় সে! কখনও রবীন্দ্রনাথের কোনো গানের কলি, কখনও বা কোনো কবিতার একটি বা দু’টি লাইন! শুয়োরের বাচ্চা! মনে মনেই আওড়ায় মিথিলা, দাঁতে দাঁত পেষে! বস্তুত, এরচেয়ে মোক্ষম, এরচেয়ে যুতসই কোনো গালি তার জানা নাই আর।

কিন্তু, পুরনো সমস্যাটা মাথা চাড়া দিল আবার। টাকা! কীভাবে চলবে তার আর মৃত্তিকার? এভাবে হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকলে তো সে আরও অসুস্থ হয়ে মানসিক রোগীতে পরিণত হবে এক সময়! আর তাছাড়া অর্থ কষ্টটাও তো অগ্রাহ্য করার মত নয়! আবার শুরু হল চাকরির সন্ধান। আবার এখানে ওখানে ধর্না দেওয়ার সেই পুরোনো রুটিন। আবার সেই খাবি খাওয়া অপমানের গহ্বরে!

এমন সময় মিথিলা সিদ্ধান্ত নিল ঢাকা যাবে সে। কিছুদিন তার বোনের বাসায় থেকে সন্ধান করবে চাকরির। কিন্তু বোনের বাসা খুব একটা বড় তো নয়। তার নিজেরই তিন তিনটে বাচ্চা। সেখানে মৃত্তিকাকে নিয়ে যাওয়া, তাকে নিয়ে থাকা প্রায় অসম্ভব। অতএব, সিদ্ধান্ত নিল মিথিলা, মৃত্তিকাকে আগের মতই রেহানার কাছে রেখে যাবে, পরে কিছু একটা চাকরি জোটাতে পারলে সে ছোট্ট একটা বাসা ভাড়া করে মৃত্তিকাকে নিয়ে থাকবে।