ঢাকায় এসে চাকরির সন্ধানে বের হল মিথিলা। বুঝল জীবন কতটা কঠিন! একমাস, দু’মাস করে সময় গড়ায়, চাকরি হয় না মিথিলার। আর তাছাড়া, এমন কিছু আহামরি যোগ্যতাও তো ধরে না সে! জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে মফস্বলের এক অখ্যাত কলেজ থেকে সমাজবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর। তার জন্য চাকরি নিয়ে কি আর বসে আছে রাজধানী শহর ঢাকা! বোনেরও মুখ শুকোয় ক্রমে। ডিভোর্সি বোনকে নিয়ে আশপাশের মানুষের অতিরিক্ত কৌতূহলে বিরক্ত সে-ও। কী করবে মিথিলা? কতদিন সে অন্যের গলগ্রহ হয়ে দিন কাটাবে এভাবে? এমনি সময়ে নিতান্তই কাকতালীয়ভাবে জাহিদের সাথে ফোনে যোগাযোগ হল তার।

ফোনে জাহিদের দুঃখ প্রকাশ শেষ হতে না হতেই ফোন রেখে দিল মিথিলা। একে একে জীবন থেকে, মানুষ থেকে এমনকি ঈশ্বর থেকেও তখন বিশ্বাস চলে গেছে তার। প্রয়োজন ছাড়া এমনিতেই কথা বলে না সে, আরও যেন কমিয়ে দিল সেটা হঠাৎ। চুপচাপ নিজের মনে থাকে সে, বোনের কাজে সাধ্যমত সাহায্য করে, তারপর নিজের মনেই নিজের দুঃখময়, অভিশপ্ত জীবনটার কথা ভাবে। নোংরা মানুষগুলোই যেন তার চারপাশে এসে জোটে শুধু, বিষিয়ে দেয় তার জীবনটাকে! কত তো ভালো মানুষও আছে, দেখেছে মিথিলা; কেন, তাদের কারও সাথে কি জানাশোনা হতে পারত না তার? কী এক অভিমানে বুক ভরে ওঠে তার, কষ্ট জমা হয় বুকে, সে অভিমান ঠিক কার ওপর জানে না মিথিলা, হয়ত তা তার নিজেরই ওপর কিংবা তার ভাগ্যের ওপর! ভাগ্য? না, সবকিছুর জন্য, মিথিলা ভাবে, সে নিজেই দায়ী। নইলে সে কেন পছন্দ করেছিল স্বপনকে? কী যোগ্যতা ছিল স্বপনের? ছিল না, কোনো দিক থেকেই সে যোগ্য ছিল না মিথিলার, তবু মিথিলা পছন্দ করেছিল তাকেই! কেন সে শফিকের সাথে পাঠিয়েছিল মৃত্তিকাকে? কেন সে বিশ্বাস করেছিল ঐ শকুনটাকে? অতএব, সে এবং একমাত্র সে-ই দায়ী!

দু’দিন পর আবার ফোন এল সেই নম্বরটা থেকে। বিরক্ত মিথিলা দু-একটা কথা বলে রেখে দিল। এরপর প্রায়ই ফোন আসতে থাকল। বেশির ভাগ সময়ই ফোন ধরে না মিথিলা। কিন্তু ও-প্রান্তের ধৈর্য যেন অসীম। বিরক্ত হয়ে মিথিলা ফোন ধরে খুব কড়া ভাষায় জানতে চাইল কেন তাকে বারবার ফোন দিয়ে বিরক্ত করছে লোকটা, কী চায় সে। উত্তরে তাকে বলা হল, কিছুই নয়, শুধু বন্ধুভাবে মাঝে মাঝে কথা বলতে চায় লোকটা। মিথিলার বিরক্তি চরমে পৌঁছাল যেন। সে বলল, চিনি না, জানি না, আমি কেন বন্ধু ভাবতে যাব আপনাকে? আপনি আর ফোন করবেন না আমাকে।

কিন্তু লোকটা দমার পাত্র নয়। উত্তরে বলল, আপনি যদি সত্যিই বিরক্ত হন, তাহলে আমি আর ফোন করব না আপনাকে। আমি খুব নিঃসঙ্গ একজন মানুষ, তাই মাঝে মাঝে ফোন করি, কথা বলতে ভালো লাগে, অন্য কিছু নয়।

মিথিলা রেগে গিয়ে বলল, আমি যদি সত্যিই বিরক্ত হই মানে কী? আমার বিরক্তি নিয়ে কি আপনার কোনো সন্দেহ আছে? আর তাছাড়া, আপনার নিঃসঙ্গতা দূর করার জন্যও তো বসে নেই আমি, তাই না?

আমার যতদূর ধারণা, আপনিও খুব নিঃসঙ্গ একজন মানুষ!

বাহ! আপনি তো দেখছি বেশ ভালো মনস্তাত্ত্বিক!

এভাবেই কথা গড়াতে থাকে অতঃপর। খুবই সাধারণ কথা। লোকটা তার নিজের কথাই বলে বেশি। মিথিলাও বলে তার কথা। তার মেয়ের কথা, তার দুঃখময় অতীতের কথা, যতটা বলা যায়, সামান্য চেনা কাউকে! লোকটা একদিন মিথিলার কাছে জানতে চাইল কোথায় থাকে মিথিলা। উত্তরে মিথিলা জানাল সে থাকে তার বোনের বাসায়, চাকরির সন্ধানে ঢাকায় এসেছিল সে এবং খুব সম্প্রতি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে খুব সামান্য একটা চাকরিও সে পেয়েছে। শীঘ্রই হয়ত সে আলাদা বাসা নেবে তার মেয়েকে নিয়ে।

ততদিনে মিথিলার পরিবার সম্পর্কে অনেক কথাই জানা হয়েছে জাহিদের। সে একদিন মিথিলাকে সরাসরি বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে বসল। ভীষণ রেগে মিথিলা বলল, সে আর কথা বলতে চায় না। তাকে যেন আর ফোন না করে জাহিদ।

মিথিলা তার সামান্য সাধ্যানুযায়ী, তার বোনের বাসার পাশেই সাবলেটে একটা বাসা নিল। বাসা বলতে ছোট্ট একটা রুম, এটাচড বাথ আর লাগোয়া ছোট্ট একটা বারান্দা। মৃত্তিকাকে নিয়ে এল সে। কিন্তু সমস্যা পিছু ছাড়ে না যেন!

মিথিলা অফিসে গেলে মৃত্তিকা একা সারাদিন কীভাবে থাকবে? প্রথম কয়েকদিন বোনের বাসায় রাখল সে। কিন্তু ঝঞ্ঝাট পোহাতে ভালোবাসে না কেউই। আর তাছাড়া, বোনের নিজেরই তিনটে ছোট ছোট ছেলেমেয়ে। নিজেরগুলো নিয়েই অস্থির, অতিষ্ঠ সে। তাহলে? এদিকে বড়ও হয়ে উঠছে মৃত্তিকা, সাতে পড়েছে, স্কুলও তো আছে তার। স্কুলে নিয়ে যাওয়া, নিয়ে আসা, কে করবে সেসব? কাজের মানুষ রাখবে মিথিলা? সামর্থ্য কোথায়?

অতঃপর চোখের জল মুছে, কষ্টগুলোকে গলাটিপে মেরে, মৃত্তিকাকে আবার ছেড়ে আসা হল রেহানার জিম্মায়। আশ্চর্য, মৃত্তিকা এতটুকুও আপত্তি করল না, চোখের জলও ফেলল না। সে যেন ধরেই নিয়েছে তাকে কচুরিপানার মতোই ভাসতে হবে আজীবন। কষ্টে বুক ফেটে যেতে চায় মিথিলার, ইচ্ছে হয় চিৎকার করে সে কাঁদে, অভিসম্পাত দেয় নিজের নারীজন্মকে, সমাজকে। কিন্তু, বাস্তবে কিছুই করা হয়ে ওঠে না তার। সে ভদ্র, সভ্য মেয়ের মতো অফিস করে, বাসায় আসে, মেনে নেয়। তাই সে সভ্য, ভদ্র। কিন্তু সে নারী এবং একা। আর তাই তার শুভানুধ্যায়ী হতে চায় সবাই। গায়ে পড়ে আলাপ জমাতে চায়। সেই চেনা সংকট, পরিচিত সমস্যা। হাঁপিয়ে উঠল মিথিলা, ক্লান্তি জমল মনে।

জাহিদ এই ফাঁকে কোনোভাবে মিথিলার বোনের নম্বরটা যোগাড় করে নিল। হয়ত কোনোদিন মিথিলাকে ফোন করেছিল সে, মিথিলা ছিল না তখন আশেপাশে, তখনই হয়তো মিথিলার বোনের সাথে কথা হয়েছিল তার। সে মিথিলার বোনকে বলেছিল তার কথা, জানিয়েছিল, সে বিয়ে করতে চায় মিথিলাকে।

মিথিলার বোন, তাদের অন্যান্য ভাইবোনদের সাথে কথা বলে, আলোচনা করে, জাহিদের সম্পর্কে খোঁজখবর নিয়ে, তাকে অপছন্দ করার কোনো কারণ খুঁজে পেল না আর। তারা সব ভাই-বোন এক জোট হয়ে, বাবা-মাকে জানিয়ে এবং অবশ্যই জাহিদের মাকেও উপস্থিত করে, খুবই অনাড়ম্বর ও অনানুষ্ঠানিকভাবে রেজিস্ট্রি করে বিয়ে দিয়ে দিল মিথিলা এবং জাহিদের। বিয়ের আগে কেউ কাউকে দেখলও না তারা।

মিথিলার আপত্তিতে কান দেয়নি কেউ। এবং মিথিলার ওপর ভরসাও আর ছিল না তাদের। ফলে মিথিলার আপত্তিটাকে আমলেই নেয়নি কেউ। আর তাছাড়া, জাহিদ যখন সব জেনে শুনে, এমনকি মৃত্তিকাসহই গ্রহণ করতে প্রস্তুত মিথিলাকে, তখন মিথিলারই বা আপত্তি কেন? যুক্তি দিল তারা।

অতঃপর, তাদের যুক্তি মেনে নিল মিথিলা। বাধ্য হয়েই মেনে নিল। কিন্তু সে মৃত্তিকাকে কিছুতেই আনতে রাজি হল না জাহিদের বাসায়। আর কোনো ভুল সে করবে না। মেয়েটাকে নতুন কোনো বিপদে আর ফেলতে চায় না সে।