ক’দিন পরই পয়লা বৈশাখ। নববর্ষ। মিথিলার মনেই ছিল না। জাহিদই মনে করিয়ে দিল। সে বলল, চল, এই ছুটিতে তোমাদের গ্রাম থেকে ঘুরে আসি, মৃত্তিকাকেও সাথে করে নিয়ে আসি আমাদের কাছে।

শুনে গম্ভীর হয়ে গেল মিথিলা। কঠিন গলায় বলল, আমাদের গ্রামে দেখার মত তেমন কিছু নেই জাহিদ। আর মৃত্তিকা ওখানেই ভালো আছে, তাকে এখানে আনার কোনো প্রয়োজন নাই!

শুনে দমে গেল জাহিদ। মিথিলার এই ব্যাপারটা কিছুতেই বোঝে না সে! নিজের মেয়েকে কেন সে দূরে সরিয়ে রাখতে চায়? কী ব্যাখ্যা আছে এর? সে তো জানে, প্রতিটি ক্ষণে মেয়েটার জন্য কষ্ট পাচ্ছে মিথিলা, ছটফট করছে যন্ত্রণায়। তবে? মাঝে মাঝে এই মেয়েটাকে একেবারেই বোঝে না সে। অথচ মেয়েটা যে কতটা ভালো সেটা তো তারচে ভালো আর কেউ জানে না! জাহিদ পয়লা বৈশাখ উপলক্ষে কেনাকাটা করল মিথিলা আর মৃত্তিকার জন্য। মিথিলার ভালো লাগল, খুশি হল। কিন্তু জাহিদ নিজের জন্য কেনেনি কিছুই। মিথিলা বলল, তোমার জন্য কিনলে না কিছু?

জাহিদ হাসল। বলল, দূর! আমার জন্য আবার কী কিনব!

আর তোমার মা আর রিতার জন্য?

এই তো সেদিন কিনলে তুমি, দিয়ে এলাম। আবার যখন বাড়ি যাব, তখন কিনব। গ্রামে কেউ অত ঘটা করে পয়লা বৈশাখ পালন করে না। আর মা তো নতুন শাড়ি পরেনই না প্রায়। রিতার পরা আর না পরা দুইই তো সমান!

মিথিলা চুপ করে গেল। রিতাকে নিয়ে জাহিদের মনে অনেক কষ্ট আছে, জানে মিথিলা। একমাত্র বোনটা তার! জন্ম থেকেই সে হাবাগোবা, কানেও শোনে না, কথাও বলতে পারে না। আহা! মানুষের কত কষ্টই না থাকে, কত বিচিত্র রকম কষ্ট!

ইদানীং একটা কথা মিথিলার খুব জানতে ইচ্ছে করে। জাহিদের বউ, প্রথম বউ, যাকে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোর করে বিয়ে দেওয়া হয়েছিল জাহিদের সাথে, আর তারপর বিয়ের দুবছরের মাথায় যে একদিন চুপিসারে পালিয়েছিল তার পুরাতন প্রেমিকের হাত ধরে, কেমন আছে সে এখন? ভালো আছে তো? নাকি স্বপ্নভঙ্গের বেদনা আর যন্ত্রণায়, কল্পনা আর বাস্তবের আকাশপাতাল ব্যবধানে বিষণœতা আর হতাশার সায়রে খাবি খাচ্ছে সে-ও? আহা! তেমন যেন না হয়! সে যেন ভালো থাকে! সবাই যেন ভালো থাকে, ঈশ্বর! সবাইকে ভালো রাখ!

পয়লা বৈশাখের আগের দিন অফিস থেকে ফেরার পথে জাহিদের জন্য একটা পাঞ্জাবি কিনল মিথিলা। সাদা রঙের সুতি পাঞ্জাবি, তার ওপরে সাদা সুতার কাজ। খুব পছন্দ করে কিনল সে। এবং এইই প্রথম জাহিদের জন্য কিছু কেনা তার। একটু উদ্বিগ্নও হল, জাহিদের পছন্দ হবে তো শেষে?

অফিস থেকে ফিরে প্রতিদিনের মতই চা আর সিগারেট নিয়ে বারান্দায় বসল জাহিদ। মিথিলা এত নিষেধ করে, এত রাগ করে, চা আর সিগারেট এক সাথে দেখলেই তার ঐ জানোয়ার শফিকের কথা মনে পড়ে যায়। এই একই স্বভাব ছিল তারও, মাথার মধ্যে আগুন ধরে যায় মুহূর্তেই। কিন্তু জাহিদ শোনে না। তাকে তো বুঝিয়ে বলতেও পারে না মিথিলা কেন সে এত রেগে যায়, কেন এত উত্তেজিত হয়!

মিথিলা গোঁজ হয়ে ড্রইংরুমে বসে রইল। রাতের খাওয়া শেষে ঘুমোতে যাবে যখন, তখন সে পাঞ্জাবিটা জাহিদকে দিল। বলল, দেখ তো, সাইজটা ঠিক আছে কিনা?

জাহিদ বিস্মিত। কী এটা? —বলেই বুঝল। হাসিতে উজ্জ্বল হল মুখ। কী সুখ! জাহিদের সব অপরাধ ক্ষমা করা যায় এখন! মিথিলা হাসল, সুখের হাসি, তৃপ্তির হাসি। বলল, তোমার জন্য কিনেছি!

ততক্ষণে পাঞ্জাবিটা গায়ে জড়িয়ে আয়নার সামনে নিজেকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখছে জাহিদ। খুব মানিয়েছে তাকে। সে খুশি খুশি গলায় বলল, খুব সুন্দর হয়েছে। কত দিয়ে কিনেছ?

আড়াই হাজার।

ইস! এতগুলো টাকা নষ্ট করলে শুধু শুধু!

সত্যি, মানুষ কত অল্পেই খুশি হয়ে ওঠে। এই জাহিদ, নিজে মোটা বেতনে চাকরি করে, কত টাকা সে নষ্ট করে, কত টাকা সে ব্যয় করে অন্যের পেছনে। তবু তারই স্ত্রী, তার জন্য সামান্য একটা উপহার কিনেছে বলে বাচ্চা ছেলের মত খুশি ছলকায় তার মুখে। ঝরে আনন্দ। আহা! জীবনের সবটুকুই তো খারাপ নয়!