খুব ভোরে উঠল মিথিলা। জাহিদ তখনও ঘুমে। আজ তারা খুব ঘুরবে দুজন। বেড়াবে অনেক, বলেছে জাহিদ। তাকে ডাকল না মিথিলা। চুপিচুপি রান্না ঘরে গিয়ে চা বসাতে গিয়েই বিরক্ত হল সে। যা বাবা! চা পাতা নেই তো! কী করবে এখন? জাহিদকে ডাকতে মায়া লাগল খুব। থাক, বেচারা আরেকটু ঘুমোক! ভাবল সে। বাইরে থেকে দরজা লক করে নিচে নামল। একটু দূরেই মুদি দোকান, সেখান থেকে চা পাতা কিনবে। এত ভোরে খুলেছে কিনা, কে জানে!

মিথিলা হাঁটছিল, সকালের ঝিরঝিরে হাওয়াটা মিষ্টি লাগছিল খুব। সে হাঁটছিল ফুটপাত ঘেঁষে, ড্রেনের ঢাকনা না থাকায় দুর্গন্ধ লাগছিল নাকে। হঠাৎ সে থমকে দাঁড়াল। কেমন অদ্ভুত একটা শব্দ হচ্ছে না? অনেকটা যেন কুকুরের বাচ্চার আওয়াজের মত! খুব ব্যথা পেলে, খুব যন্ত্রণায় কুকুর যেমন খুব আস্তে আস্তে কুঁই কুঁই করে শব্দ করে অনেকটা সেরকম যেন! কিন্তু তবু, শব্দটা ঠিক কুকুরেরও নয় যেন। অদূরের ঢাকনাহীন ড্রেন থেকে আওয়াজটা আসছে।

শব্দ লক্ষ্য করে এগোল মিথিলা। যেন কোনো অদৃশ্য শক্তি টানল তাকে সেদিকে। আর গিয়েই ভয়ে, বিস্ময়ে যেন জমে গেল মিথিলা। একটা শিশু! সদ্যভূমিষ্ট শিশু! কাঁদার শক্তিটুকুও নিঃশেষ। অদ্ভুত শব্দ করছে মাঝে মাঝে, যা শুনে আকৃষ্ট হয়েছে মিথিলা! শিশুটা তখনও বেঁচে—হাত মুখে দিয়ে চুষছে বুভুক্ষুর মত! তার চারপাশে, মিথিলা খেয়াল করল, লাল পিঁপড়া মহানন্দে সারি বেঁধে এগোচ্ছে, কোনো মহোৎসবের ডাক এসেছে যেন।

একছুটে বাসায় এল মিথিলা। জাহিদকে টেনে তুলল এক ধাক্কায়। তারপর হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, শিগগির এসো, শিগগির আমার সাথে এসো।—বলে ড্রয়ার খুলে একটানে একটা শাড়ি বের করে কোনো কথা না বলে ছুটে বের হয়ে গেল আবার, দরজা খোলা রইল হাট করে।

হকচকিত জাহিদ সদ্য ঘুম ভেঙে কী হয়েছে না জেনেই, লুঙ্গি পরা অবস্থাতেই অনুসরণ করল মিথিলাকে। পাতলা একটা গেঞ্জি গায়ে জড়িয়ে দরজাটা কোনোমত লাগিয়ে সে-ও ছুটল মিথিলার পেছনে।

শিশুটাকে কাপড়ে জড়িয়ে বাসায় এনে মিথিলা ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলল, জাহিদ, এই বাচ্চাটা এখন আমার। আমি একে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাব, তুমি কি আমার সাথে যাবে?

কোনো কথা বলল না জাহিদ। চুপচাপ তৈরি হয়ে নিল সে। মিথিলাকে বলল, চল, দেরি হয়ে যাচ্ছে!

রিক্সায় বসে আছে মিথিলা। দুচোখে জল গড়াচ্ছে। লিপাকে সব বাসার কাজ ছেড়ে তার দুই বাচ্চাকে দেখাশোনা করতে বলবে এবার। ভাবছে নিজের মনেই। মৃত্তিকাকে নিয়ে আসবে এবার। বাচ্চাটা কী নিশ্চিন্তে তার বুকের ওম পেয়ে ঘুমুচ্ছে! কী নির্মল পবিত্র হাসি তার মুখে! যেন পৃথিবীতে আর কোনো জরা নেই, কোনো অনাচার নেই, নেই কোনো অশুভের স্পর্শ!