অনেকক্ষণ থেকে ফোন বাজছে, বেজেই যাচ্ছে। কে আবার ফোন করল এখন? জাহিদই বা কী করছে? ফোনটা রিসিভ করলেই তো পারে! সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে হাতের কাজ ফেলেই বেডরুমে আসে মিথিলা। ফোনটা হাতে নিয়ে দেখে। মিতু ভাবী কলিং। কে মিতু ভাবী, কোন মিতু ভাবী স্থির করতে পারে না ভেবে। ফোন রিসিভ করে।

হ্যালো স্লাম্লায়কুম!—ওপাশ থেকে বলা হয়।

ওয়ালায়কুম সালাম!—বলে মিথিলা।

কেমন আছেন ভাবী?

জ্বী, ভালো আছি, আপনি কেমন আছেন?

এইসব অর্থহীন কথায় বড্ড হাঁপিয়ে যায় মিথিলা, অস্বস্তি হয় তার। সে প্রকৃতই বুঝতে পারে না কে এই মিতু ভাবী, কেনই বা ফোন করেছে তাকে। আর তার সেটে সেভ করাও আছে এই নামটা। আশ্চর্য! তবু, যেন কথা বলতে হবে তাই বলা, শুধুই নিয়ম রক্ষা করা, শুধুই ভদ্রতা করা। নইলে যেন ঠিক সভ্য হওয়া যায় না, জাতে ওঠা যায় না। জাতে ওঠা, হ্যাঁ, এই মুহূর্তে জাতে ওঠা শব্দটাই জুতসই মনে হয় মিথিলার। মাথার মধ্যে ভীষণ ফাঁকা ফাঁকা লাগে। তাই, কেমন আছেন, প্রশ্নটা ছুঁড়ে দিয়ে অপেক্ষা করে সে। আশা করে ওপাশে যিনি আছেন, মিতু ভাবী নামে মোবাইল সেটটা পরিচয় করাচ্ছে যাকে, তিনি নিজেই পরিষ্কার করবেন, কে তিনি। মিথিলাকে যেন প্রশ্ন না করতে হয়, মনে মনে এমনটাই প্রত্যাশা মিথিলার। কিন্তু না, মিতু ভাবী স্পষ্ট হন না, প্রকাশিত হন না, বরং ভীষণ আহ্লাদী কণ্ঠে তিনি বলেন,

ভালো আছি ভাবী। কোথায় আপনি, বাসায় ?

এইসব মেকি কথার ঢং, মেকি ভদ্রতা, লোক দেখানো সৌজন্য বড্ড অসহ্য লাগে মিথিলার। দিশেহারা বোধ করে। সে গ্রামের মেয়ে, গ্রামের ভীষণ রকম সহজ সরল আর প্রায় বুনো, জংলী পরিবেশে তার বেড়ে ওঠা। এইসব শহুরে কেতা, চটকদারিতা, আর নাগরিক ভব্যতা তার পোষায় না। ভীষণ অচেনা লাগে, হাঁসফাঁস করে সে। আলতো জবাব দেয়—

জ্বী, বাসায়।

ভাবী, কাল কি আপনার অফিস আছে?

এবার থমকায় মিথিলা। কাল না কোনো ছুটির দিন, না কোনো বিশেষ দিন। অফিস না থাকার কোনো কারণ তো নেই! তাহলে এমন অদ্ভুত, অর্থহীন প্রশ্নেরই বা কী অর্থ হতে পারে ? কিছুটা বিরক্ত হয়েই যেন উত্তর দেয় মিথিলা, হ্যাঁ, কেন?

ভাবী, কাল একটু ছুটি নিতে পারবেন না? ভীষণ দরকার ভাবী, কাল আপনাকে নিয়ে এক জায়গায় যাবো। ভাবী, প্লিজ, সম্ভব হলে কাল ছুটি নেন!

ভারি বিব্রত বোধ করে মিথিলা। কে এই মিতু ভাবী, কেনই বা তার মিথিলাকে দরকার। আর তার দরকার বলেই মিথিলাকেও কেন ছুটি নিতেই হবে! মিথিলা ছুটি চাইলেই অফিসই বা ছুটি দিতে কেন রাজি হবে, এসব প্রশ্ন মুহূর্তেই মাথার মধ্যে বুদবুদ তুলে, পাক খেয়ে, হারিয়ে যায়। সে ফোন কানে নিয়ে নির্বাক তাকিয়ে থাকে বাইরে। আলো ঝলমলে নগরী যেন ভেংচি কাটে তাকে, বিদ্রুপ করে যেন বা। রং বেরং এর আলোয় ঝলমলে নগরীকে তার মনে হয় রংচং মেখে রাস্তায় দাঁড়ানো খদ্দের প্রত্যাশী বেশ্যার মত। যার উপরটাই চকচকে শুধু, ভেতরে জমাট অন্ধকার ও ক্ষত। কষ্ট, যন্ত্রণা ও রোগশোক। যা সাময়িক মোহগ্রস্ত করলেও শেষ পর্যন্ত চোখ থেকে ঠুলি সরিয়ে দেয়। ভেতরে প্রবল ঘৃণার উদগীরণ তোলে।

জাহিদ স্নান সেরে এসে দেখে, ফোন কানে, নির্বাক দাঁড়িয়ে মিথিলা। অবাক হয়ে সে প্রশ্ন করে, কে?

জাহিদের অবাক ভাবেও বিরক্ত হয়ে ওঠে মিথিলা, ফোন কানে দাঁড়িয়ে থাকায় অবাক হওয়ার কী আছে ভেবে পায় না সে কিছুতেই। মিতু ভাবী তখনও লাইনে! প্রশ্ন করেই চলেছেন ছুটি নিতে পারবে কি-না সে।

আমি দেখছি চেষ্টা করে।—বলে অনেকটা অভদ্রের মতই ফোন রেখে দিল মিথিলা।

তারপর, ভাবতে বসল সে।

স্মৃতি হাতড়ায় মিথিলা। কে এই মিতু ভাবী? আচ্ছা, ফোন করে জিজ্ঞেস করলে কেমন হয়? যদি বলা হয় যে সে আসলে চিনতে পারছে না কে মিতু ভাবী, তাহলে, খুব কি অসভ্যতা হবে সেটা? অথবা মিতু নামের এই নারীটি খুব কি কষ্ট পাবেন তাতে? তেমন পরিচিত কেউ, চেনা কেউ হলে কি মনে থাকত না! মিথিলার স্মৃতি তো এতোটা খারাপ ছিল না কখনো! আচ্ছা, জাহিদকে জিজ্ঞেস করলে হয় না? অগত্যা কিছুক্ষণ ইতস্তত করে জাহিদকেই প্রশ্নটা করল সে।

আচ্ছা, জাহিদ, মিতু ভাবী নামে কাউকে চেনো তুমি ?

কী ভাবী? — বিস্মিত হয়ে প্রশ্ন করে জাহিদ।

মিতু ভাবী?—প্রশ্নটা আবার করে মিথিলা।

না তো! কেন? —পাল্টা প্রশ্ন জাহিদের।

আমাকে ফোন দিয়ে বললেন কাল ছুটি নিতে! খুব নাকি দরকার!

তুমি চেনো না, তাহলে ফোন করল কীভাবে?

জানি না। নম্বরটা এই নামেই সেভ করা আছে, কিন্তু কে, সেটা মনে করতে পারছি না!

দেখি, ফোনটা দাও তো!

ফোন এগিয়ে দিল মিথিলা। জাহিদ নম্বরটা নিজের মোবাইলে নিয়ে ফোন দিয়ে রিং হওয়ার আগেই কেটে দিল। তারপর স্বস্তির শ্বাস ছেড়ে বলল, এটা তো আনোয়ার ভাবীর নম্বর!

কার?

আনোয়ার ভাবীর। মনে নেই? আমার পুরনো সহকর্মী আনোয়ার ভাইয়ের বউ। সেই যে বাসায় এসেছিলেন একদিন!

মনে পড়ল মিথিলার। ভদ্রমহিলা একদিন বাসায় এসেছিলেন এবং যতটুকু সময় ছিলেন, কান রীতিমত ঝালাপালা করে দিয়েছিলেন মিথিলার! তার হঠাৎ কী দরকার পড়ল মিথিলাকে, কে জানে! ভারি অস্বস্তি বোধ করে সে। এতক্ষণ চিনতে পারছিল না, তাই ছুটি নেয়া বা না নেয়ার কোনো প্রশ্নই ছিল না। কিন্তু এখন কী করবে ভেবে পায় না সে। জাহিদ জানতে চায় মিথিলা ছুটি নেবে কিনা বা আদৌ ছুটি সে পাবে কিনা। ক্লান্ত গলায় মিথিলা বলে, দেখি, বুঝতে পারছি না।

তারপর, কী ভেবে সে অফিসে, তার বসকে ফোন দেয়। ছুটি চায় আগামীকাল। একে তো অফিস ছুটি হওয়ার আগেই চলে এসেছে সে, তায় আবার নতুন করে ছুটির বায়না। বিরক্ত, অসন্তুষ্ট হন ভদ্রলোক। তবু, মিথিলার প্রতি দয়াপরবশ হয়েই হয়ত, ছুটিও মঞ্জুর করেন।

সব কাজ গুছিয়ে, রান্না শেষে, খেতে বসে মিথিলা। ইচ্ছে করে না খেতে। খাবার নিয়ে অহেতুক নাড়াচাড়া করে কিছুক্ষণ। অভ্যাসবশত মুখেও দেয়, গলাধঃকরণও করে, তারপর, বিরক্ত হয়ে উঠে পড়ে খাওয়া সেরে। জাহিদ একমনে খায়। মিথিলা হাত ধুয়ে বারান্দায় গিয়ে বসে। গাড়ির শব্দ, কোলাহল ভালো লাগে না, উঠে আসে। ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়ায়, আয়নায় নিজেকে দেখে ক্ষণকাল, তারপর, চোখ পড়ে বইটার ওপর। হ্যাঁ, নামাজ শিক্ষার বইটা এনেছে জাহিদ। সে বইটা হাতে নিয়ে উপুড় হয় বিছানায়, পাতা উল্টায়।