দুপুর বারোটা নাগাদ ভীষণ শব্দ তুলে বেজে ওঠে ফোনটা, পুনরায়। কিংবা, শব্দটা মৃদুই ছিল হয়ত, মিথিলার কাছেই তা ভীষণ শোনায়। অফিসে যায়নি বলে, সকাল থেকেই আলসেমিতে পেয়েছিল তাকে। দারুণ আরাম আর স্বস্তি নিয়ে সে বুকশেলফ থেকে টেনে নামিয়েছিল বালজাকের ‘জনক’। তন্ময় হয়ে পড়ছিল। হঠাৎ ফোনের কর্কশ শব্দটা তাই খুব অভব্য আর অসহ্যবোধ হয়। তার চারপাশে তৈরি হওয়া দারুণ নৈঃশব্দ্যকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয়। মাথার মধ্যে যন্ত্রণা চাগিয়ে ওঠে। কপালে দপদপ করে ব্যথা চলকায়। ফোন ধরতেই মিতু ভাবী নামক নারীটি তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে নিচে নামার তাগাদা দেন মিথিলাকে। মিথিলা এতক্ষণ ভুলেই গেছিল তার আজকের ছুটি নেবার শানে নযূল। ভদ্রমহিলার ফোনে মনে পড়ল, মনে পড়তেই একরাশ বিরক্তি জাপটে ধরল তাকে।

অগত্যা উঠে পড়ে মিথিলা, অল্প সময়েই তৈরি হয়ে নিচে নামে। নেমেই দেখে মিতু ভাবী দাঁড়িয়ে আছেন। সারামুখে চুনকামের পারিপাট্যে ভারি অদ্ভুত দেখায় তাকে। মিথিলা দেখে। মুখে রং মাখার এই ব্যাপারটা তার কাছে আজও ভারি কিম্ভুত আর আশ্চর্য লাগে। অহেতুক শ্রম আর সময়ের অপচয় মনে হয়। অথচ, বোকা মেয়েগুলো ভাবে রূপের ভারি খোলতাই হয়েছে তাদের! অদ্ভুত!

রিক্সা একটা জায়গায় এসে থামে। বেশকিছু নারীর জটলা চোখে পড়ে। তাদের বেশবাস দেখে, কথা-বার্তা শুনে প্রায় আঁতকে ওঠে মিথিলা। অবাক হয়ে মিতু ভাবীকে প্রশ্ন করে,

ভাবী, এরা কারা?

ভদ্রমহিলার উত্তরে মনে মনে বিরক্ত হয়ে ওঠে মিথিলা। দমে যায় সে। এরা সবাই রাজনৈতিক কর্মী। শোক র্যালিতে অংশ নিতে যাচ্ছে, এবং ঘটনা বা দুর্ঘটনাক্রমে মিথিলাও এদেরই একজন! এদেরই একজন? নিজেকেই নিজে শুধোয় সে। মাথা নাড়ে, হতাশ হয়ে। অবাক চোখে সে দেখতে থাকে জড়ো হওয়া মানুষগুলো। এরা রাজনৈতিক কর্মী? হা ঈশ্বর! দেখেই বোঝা যায় এরা মানুষের বাসায় ঘর মুছে, বাসন মেজে, ঝি এর কাজ করে বেঁচে আছে। এদেরকে পঞ্চাশ, এক শ টাকার লোভ দেখিয়ে এখানে আনা হয়েছে। রুখুসুখু চেহারা, উষ্কখুষ্ক চুল, গায়ের কাপড়ের শতচ্ছিন্ন, মলিন দশা। আহা! এদের তো নিত্যদিনই শোক! প্রতিদিনই কান্না! এদেরকে দিয়ে শোক র্যালি ? তবু, এরাই তো দেশ, জনতা। এদেরই ভোটে নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতায় যায় রাজনৈতিক দলগুলো। তারপর ভুলে যায় এদের। ব্যস্ত হয় নিজেদের আখের গুছাতে। শুধু নির্বাচনের সময় কিংবা এমনি কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচিতে পঞ্চাশ টাকা-একশ টাকাতেই এরা খুশি। জানেও না আদতে তাদের কোনো প্রাপ্য আছে কি নেই। এদের মধ্যে দাঁড়িয়ে বিব্রত বোধ করে মিথিলা, দারুণ অস্বস্তিতে ভরে ওঠে মন। সে ভুলেও কোনোদিন রাজনীতির সাথে জড়ানোর কথা ভাবেনি। তার চতুর্দশ পুরুষ পর্যন্ত কেউ কখনো রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত ছিল বলে তার অন্তত জানা নেই। আর তার সবচেয়ে বেশি অসুবিধে এই যে, সে সহজে কারও সাথে মিশতে পারে না। মন খুলে কারও সাথে কথা বলতে তার ভীষণ বাধে। মুখচোরা আর অন্তর্মুখী মিথিলা তাই এই ভিড়ের অরণ্যে অসহায় বোধ করে, দম বন্ধ হয়ে আসতে চায় তার। একবার ভাবে ফিরে যাবে সে।

ঠিক তখনই, মিথিলা দেখে, এদের নেত্রী, সবার হাতে কালো রঙের গেঞ্জি তুলে দেন, তাতে শোকবার্তা লেখা, লেখা স্থানীয় এমপি সাহেবের নাম। নেত্রীকে দেখে চোখ কপালে উঠতে চায় মিথিলার। সারা মুখে মেছতার দাগ, কপালে ইয়া বড় কালো টিপ, চূড়ো করে বাঁধা চুল আর বড় বড় চোখের নেত্রীকে দেখে মিথিলার ছোটবেলায় দেখে ভয় পাওয়া কালী মূর্তিকে মনে পড়ে যায় হঠাৎ! হাসি পায় খুব। নেত্রী ততক্ষণে সবাইকে তাড়া লাগাচ্ছেন গেঞ্জিটা পড়ার জন্য। মিথিলাকেও ধমকে ওঠেন ভীষণ।

এ্যাই! পরোছ্ না ক্যা ? পর!

মিথিলা চমকায়। মিথিলা থমকায়। ওই অশিক্ষিত, অভব্য, সমাজের নিতান্তই নিচু তলা থেকে উঠে আসা একজন, যে হয়ত এমনকি স্কুলের গ-িটাও ডিঙোয়নি, নিতান্তই কারও দাক্ষিণ্যে হয়ত সে পেয়েছে খুবই গুরুত্বহীন, এলেবেলে এই পদ, রাজনীতির ‘র’ টা ও বোঝার ক্ষমতা যার নেই, সে মিথিলাকে ‘তুই’ করে বলতে পারে এটা বিশ্বাস করতে একটু কষ্টই হল তার। কিন্তু নেত্রী ভারি ব্যস্ত। কোনো দিকে তাকানোর ফুরসত তার নেই তখন। মিথিলার অবস্থা আঁচ করে মিতু ভাবী অস্বস্তিতে পড়েন, ক্ষমা চান। তিনিও বুঝতে পারেননি এমনটি হবে, বলেন তিনি। মিতু ভাবী এ লাইনে নতুন, বোঝে মিথিলা। তিনি মূলত তার জানাশোনাদের মধ্যে অনুরোধ করে, হাতে-পায়ে ধরে, মিথিলার মত জনাকয়েককে হাজির করেছেন। পক্ষান্তরে, নেত্রী কিছু টাকা খরচ করে বস্তি থেকে লোক জুটিয়েছেন বিস্তর। যাতে সম্ভবত দল থেকে বাড়তি কিছু সুবিধা বাগিয়ে নেয়া যাবে। মিতু ভাবী বারবার জানতে চান, ভাবী, ‘আনইজি’ লাগছে ?

মিথিলা আধফোটা হাসে। মিতু ভাবীকে অতপর আশ্বস্ত করে এই বলে যে, তার ‘আনইজি’ লাগছে না। কিন্তু বাস্তবে অস্বস্তি আর বিরক্তিতে তেতো হয়ে যায় তার মন।

একটা হোটেলে অপেক্ষা করে তারা, বাসের জন্য দেরি করে। বাস রিজার্ভ করা আছে, আসছে। ততক্ষণ সময়ের সদ্ব্যবহারে দারুণ ব্যস্ত হয়ে পড়ে সবাই। খাবারের ওপর একযোগে হামলে পড়ে সকলে। অনেক দিনের অর্ধভুক্ত মানুষগুলো, ঠান্ডা আর বাসি সমুচায় সস মাখিয়ে চিবোয়। হনুর হাড়গুলো সেই নিদারুণ পরিশ্রমে ভীষণভাবে আন্দোলিত হয় তাতে। ওঠানামা করে। মিথিলা চেয়ে চেয়ে দেখে। মিতু ভাবী তাকেও সমুচা খাওয়ার অনুরোধ করেন। জবাবে, প্রবলবেগে মাথা নেড়ে ‘না’ বলে মিথিলা।

বাস আসে। হুড়মুড় ছোটে সবাই বাসে ওঠার জন্য। মিথিলা অন্যমনস্কভাবে দাঁড়িয়ে ছিল। সম্বিৎ ফেরে নেত্রীর ধমকে।

এই, উঠচ না ক্যা, উঠ!

পাছে আরও কিছু বলে বসে, আরও কোনো অপ্রিয় বাক্য শুনতে হয় তাকে, এই ভয়ে ত্বরিতে বাসে উঠে পড়ে মিথিলা। নিজেকে ভারি অকিঞ্চিৎকর, তুচ্ছ লাগে। নিজের প্রতি করুণা জাগে! অপমানে মন জ্বলে। সে মিথিলা জোয়াদ্দার, প্রজাতন্ত্রের দেয়া সর্বোচ্চ ডিগ্রিটি তার ঝুলিতে আছে। তবু সামান্য, অশিক্ষিত, বর্বর, পাতির পাতি তস্য পাতি এক নেত্রীর অন্যায়টুকু ধরিয়ে দেবার সামান্যতম সাহসটুকুও তার নেই! ভেবে নিজেই মাথা নাড়ে মিথিলা। এটা কি সাহসের অভাব তার? না, তা নয়। বস্তুত তার শিক্ষা, তার অহং, তার রুচিবোধ, বাধা দেয় তাকে। তার মনে হয়, কী হবে অহেতুক কথা বাড়িয়ে! ভুলটা ধরিয়ে দিলে, যাকে তা ধরিয়ে দেয়া হল, তার সেটা বোঝার ক্ষমতাটুকুও তো থাকা দরকার!

বাস শম্বুক গতিতে চলে। রাস্তায় জ্যাম। ড্রাইভার আর হেল্পারের সাথে নেত্রীর কথোপকথনে আরও বেশি হতাশ আর বিরক্ত হয়ে পড়ে মিথিলা। যে ভাষায় তাদের ধমকায়, মিথিলার কান গরম হয়ে ওঠে, রক্ত জমে মুখে! কোনো নারীর মুখে এমন ভাষায় সে চমকায় ভীষণ। না, এই একটি ক্ষেত্রে নেত্রী অন্তত পুরুষদের থেকে পিছিয়ে নেই! সমানে সমান! মিতু ভাবী তাকে সান্ত¡না দেয়ার চেষ্টা করেন। বলেন, নেত্রী নাকি সবসময়, সবার সাথেই এভাবেই কথা বলেন!

বাস যাবে কাকরাইল। জ্যামে, ঘামে, গরমে অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে সবাই। নেত্রী কখনও ড্রাইভার বা হেল্পারের উপর হম্বিতম্বি করেন, কখনও বা বাসের দরজায় দাঁড়িয়ে হেঁড়ে গলায় ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেন। তার কণ্ঠের স্বকীয়তা আর ভাষার অনন্যতায় আশেপাশে অপেক্ষারত গাড়ির যাত্রীরা কৌতুহল আর কৌতুকে মুখ বের করে দেয়, খেয়াল করে মিথিলা।

একসময় বাস থামে বর্জ্যবাহী গাড়ির পাশে। থেমেই থাকে। মিথিলার পাশের সারিতে বসা, খুব শুকনো, প্রায় পাখির মতো শরীরের কালো, কুচ্ছিত বুড়ি, যাকে কালো শোকের গেঞ্জি ঢেকে দিয়েছে প্রায়, হঠাৎ জানালা দিয়ে মুখ বের করে হড়হড় বমি করে। চোখ সরিয়ে অন্যদিকে তাকায় মিথিলা। গন্ধে তারও বমি আসতে চায়। নাকে ওড়না চেপে বমি আটকায় সে।

বাস কাকরাইল নামিয়ে দেয়। তারপর দীর্ঘ পদযাত্রা। কাকরাইল থেকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, সেখান থেকে ধানমণ্ডি সাতাশ। উঁচু হিল পায়ে এই লম্বা পথ পাড়ি দিতে ভীষণ কষ্ট হয় মিথিলার। র্যালি এগিয়ে চলে, সে ইচ্ছে করে পেছনে পড়তে চায় আরও। চায় না পরিচিত কেউ চিনে ফেলে তাকে, দেখে ফেলে। র্যালিতে, মাঝে মাঝেই ভীষণ শব্দে শ্লোগান ওঠে, সবাই একসঙ্গে গর্জে ওঠে যেন। হাতের কালো পতাকা দুলে ওঠে, ঢেউ খেলে যায়। মিথিলা নির্বাক এগোয়। তার বোধ যেন লোপ পায়, ভুলে যায় অতীত ও ভবিষ্যৎ। শুধু বর্তমানটা ভীষণ ভাবে সত্যি হয়ে ওঠে। সে শুধু জানে তাকে এগোতে হবে সামনের দিকে, লাইন সোজা রেখে, লাইন না ভেঙে এগোতে হবে তাকে।

হঠাৎ কে জানে কী হয়! ছত্রভঙ্গ হয়ে যায় সব। পেছন থেকে, হুড়মুড় করে কয়েকটি মেয়ে দৌড়ে সামনের দিকে এগোতে থাকে। কী হল ? কৌতূহলী সবাই। জানা যায়, সামনে কোনো একটি টিভি চ্যানেলের ক্যামেরা চলে এসেছে, তাই তারা উদ্ভ্রান্তের মত ছুটছে। যদি টিভিতে দেখা যায় তাদের! অবাক মিথিলা সামনে তাকিয়ে থাকে। পা চালায় সমানতালে। ঠিক তখনই, সামনের একটি মেয়ের স্যা-েলে পা পড়ে যায় তার। মেয়েটার একপায়ের স্যা-েল খুলে যায়, পিছিয়ে পড়ে সে।

মিথিলা এগোতে থাকে। কতক্ষণ পর কে জানে, মিথিলা সামনের জনকে অনুসরণ করে এগিয়ে যাচ্ছে তখনো, মেয়েটা কোত্থেকে দৌড়ে আবার মিথিলার সামনে চলে আসে। তারপর মিথিলাকেই লক্ষ্য করে বলে, মেয়ে হয়ে আরেকটা মেয়েকে বিপদে ফেলতে একটুও কষ্ট লাগল না আপনার?

মিথিলা চমকে তাকায়। সিনেমার এই পরিচিত সংলাপে সে অবাক হয়ে প্রশ্ন করে, মানে?

মানে বুঝেন না? আমার স্যা-েল ধইরা টান দিলেন ক্যান আপনে? জানেন আমি কয়টা ছেলের লগে ধাক্কা খাইছি?
প্রায় ফুঁপিয়ে ওঠে মেয়েটা। মিথিলা এবার বুঝতে পারে তার ক্ষোভের কারণ। খারাপ লাগে তারও। কিন্তু সে তো আর ইচ্ছে করে স্যা-েলে টান দেয়নি, মেয়েটাই হঠাৎ চলে এসেছিল তার সামনে, সেও খেয়াল করেনি। সে বলে, আমি কি হাত দিয়ে টেনে খুলেছি আপনার স্যা-েল?

মেয়েটি জবাবে বলে, আপনি এত ‘ন্যারো মাই-েট’ ক্যান?

মিথিলা ভেবে পায় না সে হাসবে, না কাঁদবে। মেয়েটার পোশাক, চেহারা বলে সে বস্তিতে থাকে। অশিক্ষিত। তার মুখে এমনতর ইংরেজিতে চমক লাগে তার, রাগও হয়। বলে, স্টুপিডের মতো কথা বলেন কেন?

মেয়েটির বয়স বড়জোর পনেরো বা ষোলো। তবু মিথিলার তুমি বা তুই বলতে ভদ্রতায়, রুচিতে বাধে। কিন্তু আরও কিছু চমক বাকি ছিল মিথিলার। মেয়েটি জবাব দেয় এবার, আপনে ‘স্টুপিট’, আর আমি ‘স্টুপিটের’ মতো কথা বলি?

ধৈর্যের বাঁধ ভাঙে মিথিলার। সে ধমকে ওঠে এবার, এ্যাই স্টুপিড!

মেয়েটা এবার বলে ওঠে, আপনে একটা ‘ন্যারো মাই-েট পারছন!’

হঠাৎ খুব হাসি পায় মিথিলার। সে বুঝতে পারে, খুব যতেœ কিছু ইংরেজি শব্দ নিজের ঝুলিতে রেখেছে মেয়েটা। মওকা পেয়ে তার প্রায় সবগুলোই মিথিলার ওপর প্রয়োগ করতে পেরে আত্মতৃপ্তিতে ভরে উঠছে সে। এবার নির্দয় হয় মিথিলা, খর চোখে তাকিয়ে বলে, ইংরেজি শিখে তারপর বলবেন।

ফাটা বেলুনের মত চুপসে যায় মেয়েটা। জোঁকের মুখে নুন কিংবা নুনের মধ্যেই জোঁক পড়ে যেন। মেয়েটা হঠাৎ দৌড়ে সামনের দিকে চলে যায়। মিথিলা হাঁটতে থাকে। পথ যেন ফুরোয় না, ফুরোবে না আর—মনে হতে থাকে তার। পা ব্যথা করতে থাকে খুব।

এক সময় শেষ হয় র্যালি, ফুরোয় পথ। আবার বাসে উঠে বসে তারা। আবার সেই ক্লান্তিকর বাসযাত্রা। খুবই ক্লান্ত, অবসন্ন আর অপমানিত মন নিয়ে বাসায় ফেরে মিথিলা। বুঝিবা হাঁফ ছেড়ে বাঁচে।