চেনা পথটা এত অচেনা লাগছে কেন? স্কুল থেকে বাড়ির পথটা কী করে এতটা বদলে গেল? তবে কি নগরায়নের লম্বা হাতটা অবশেষে এই শান্ত নিঝুম পল্লীতেও পৌঁছে গেল! পল্লীর সহজ, স্বাভাবিক সৌন্দর্যেও কি লাগল আধুনিকতার অশুভ ছোঁয়া? কৃত্রিমতা কি গ্রাস করল সব? মিথিলার চোখ ফেটে কান্না আসতে চায়, বুকের মধ্যে গভীরতর কষ্ট জমা হয়। সে অবাক হয়ে, ফ্যালফ্যাল করে চারপাশে তাকিয়ে থাকে। বড্ড দিশেহারা লাগে, অস্থির লাগে তার।

স্কুলের অদূরে তার বন্ধু তোরাবদের বাড়ি ছিল না? সেই একচালা কুঁড়েঘরটাকে সরিয়ে সেখানে এমন উঁচু দালান উঠল কবে? তার একটু পরের মোড়টাতে এমন জাঁকজমকপূর্ণ তোরণ কিসের? গফুর ভাইদের বাড়িটাই বা এত্তবড় অট্টালিকা হয়ে উঠল কবে? কী বিশাল বাড়ি! মাগো! মিথিলার চোখ ভরে যায় জলে। গভীর দুঃখে, প্রবল বিস্ময়ে অভিভূত হয় সে। সাথে তার বড় দু’বোন, মিথিলার কষ্ট দেখে তারাও যেন সমানভাবে দুঃখ পায়, কষ্ট পায়। আহা! পথের দুপাশের সেই বুনো ঝোপগুলো! কোথায় উধাও হল তারা? পথের কোথাও, একটুও ময়লা নেই। একটাও আগাছা নেই কোথাও। সব সাজানো, পরিপাটি, যেন খুব হিসেব কষে, খুব যতেœ সাজিয়ে দিয়েছে কেউ! পথের দুপাশে সারি সারি ফুলের গাছ, সব গাছে হরেক রঙের থোকা থোকা ফুল। কিন্তু, কেন এত গোছানো সব, কেন এত সাজানো? ছেলেবেলার সেই বুনো আগাছা, সেই এলোমেলো ছন্নছাড়া মেঠোপথটার জন্য কী ভীষণ দুঃখ যে হয় মিথিলার! কষ্টে যেন ফেটে যেতে চায় বুক।

গফুর ভাই রাজনীতিতে নাম লিখিয়েছিলেন না? চেয়ারম্যান এখন? তা বলে এত্ত বড় বাড়ি এখন তাদের? আর বাড়ির সামনে কী রাজসিক পেল্লাই দরজা! মাগো! অবাক মানে মিথিলা। এই সেদিনও তো তাদের চুলায় হাঁড়ি চড়ত না, শুনত তারা! তাহলে? এত দ্রুত কীভাবে পাল্টে গেল সব? গফুর ভাইদের বিশাল বাড়িটি রাস্তায় দাঁড়িয়ে দেখে আর বিস্ময়ে থ হয়ে যায় মিথিলা। প্রত্যেকটি রুমের সাথে কী সুন্দর রেলিং ঘেরা বারান্দা! আর বাড়ির সাথেই কী সুন্দর, শান বাঁধানো সুবিশাল পুকুর! কী পরিষ্কার টলটলে জল তাতে!

কিন্তু পুরোনো সেই কুঁড়েঘর আর এঁদো ডোবাটির জন্যই বড্ড মন কেমন করে মিথিলার। চোখ ভরে ওঠে জলে। হু হু করে ওঠে বুক। আরও সামনে এগোয় সে। না, কোনো বাঁক, কোনো বাড়ি, কোনো পথই আর চেনা লাগে না তো তার! ভীষণ ভয়, আতংক যেন গ্রাস করে তাকে। সে হারিয়ে যাবে না তো আবার! আর সাথে যে বড় দু বোন ছিল, তারাই বা কোথায় হারালো হঠাৎ? খুব ফাঁকা হয়ে যায় চারপাশ। এই খুব সুন্দর, খুব অচেনা জায়গাটিতে তার সেই অগোছালো কিন্তু খুব চেনা, খুব প্রিয় জায়গাটির অনুপস্থিতি কিছুতেই শান্তি দেয় তাকে না। কিছুতেই স্বস্তি মেলে না যেন। খুব কান্না পায় তার, ফুঁপিয়ে কাঁদে মিথিলা।

আবার চেনা, পরিচিত লাগে সব! এই তো, সামনেই চুমকিদের বাড়ি, চুমকিদের বাড়ি ছাড়িয়ে একটু সামনে যে ব্রিজটা ছিল, সেটা কোথায় উধাও হল? কী ভীষণ সরু বাঁশের সাঁকো! কী করে এটা পার হবে মিথিলা? কিন্তু, তাকে তো পার হতেই হবে! এই সাঁকো পেরিয়ে বাম হাতে আরও অনেকটা পথ গেলে তবে তো তার সেই বাড়ি, যেখানে কেটেছে তার জীবনের ত্রিশটি বসন্ত! গোটা জীবনটিই প্রায়! চোখ বুঁজে, মনে মনে আল্লাহকে ডাকতে ডাকতে সাঁকোতে পা রাখে মিথিলা।

তারপর, অসাবধানে পা পিছলে যায় তার, নাকি সাঁকোর যে বাঁশটা ধরেছিল সেটাই নাগালের বাইরে চলে যায়, ঠিক বোঝে না সে। শূন্যে ভাসতে থাকে সে, ভাসতেই থাকে। যেন অনন্তকাল ধরে এমনই ভাসবে সে, এই-ই যেন নিয়তি! বুকের মধ্যে শূন্য শূন্য লাগে মিথিলার। মনে হয়, অনন্তকাল ধরে এমনই ভাসছে সে! প্রবল আতংক নিয়ে সে অপেক্ষা করছে আসন্ন পতনের। মিথিলা ভয়ে চিৎকার করে, হাহাকার করে। কেউ শোনে না সে চিৎকার, কোথাও পৌঁছায় না সে হাহাকার। বস্তত, মিথিলারই মতো, তা-ও শূন্যেই ঝুলে থাকে, প্রতিধ্বনি তুলে ইথারে মিলিয়ে যায়।

ছটফট করতে করতে, সারা শরীরে ঘাম নিয়ে ঘুম ভাঙে মিথিলার। বুকের মধ্যে যেন ভীষণ শব্দে ড্রাম পেটায় কেউ। উঠে বসে মিথিলা। ঘড়ি দেখে। রাত তিনটা বেজে দশ। নিজের এই মাত্র দেখা স্বপ্নে নিজেই অবাক হয় ভীষণ। সেই পুরোনো, পরিচিত জায়গাটার জন্য, মানুষগুলোর জন্য খুব মন কেমন করতে থাকে তার। ভাবে সৎ মা রেহানাকে ফোন দেবে একবার। মৃত্তিকার সাথে একটু কথা বলার জন্য মনটা কেঁদে ওঠে খুব। কিন্তু, ভাবনাটাকে সরিয়ে দেয় তখনই। মেয়েটা শান্তিতে ঘুমুচ্ছে এখন। আহা! ঘুমোক সে! অবোধ, অভাগা মেয়েটা তার! তাকে আর এতরাতে কেন মিছে বিরক্ত করা, মিছে জ্বালাতন! থাক, কাল বরং কথা বলা যাবে। আবার শুয়ে পড়ে। আকাশ পাতাল ভাবে। আজ রাতে আর ঘুম আসবে না, কেটে যাবে নির্ঘুম। জাহিদের মৃদু নাক ডাকার শব্দে বিরক্তি জন্মে মনে।