কী নাম আপনার?

প্রশ্নটা যেন অথৈ সাগরে ফেলে দেয় তাকে। মুহূর্তেই, মাথাটা যেন হয়ে যায় ধূ ধূ তেপান্তরের মাঠ। সে স্মৃতি হাতড়ায়! তাই তো! কী যেন একটা নাম ছিল না তার? কী নাম? কী নাম? অসহায়, অধৈর্য বোধ করে সে। প্রশ্নকর্তা, উত্তরের আশায় জিজ্ঞাসু, কৌতূহলী মুখে তাকিয়ে থাকেন। তারপর, ধীরে ধীরে সেখানে যেন বা ফুটে ওঠে নিখাদ বিস্ময়। যখন উত্তরের আশা ত্যাগ করে, মুখ ঘুরিয়ে নেবেন ভাবছেন, তখন, হ্যাঁ, তখনই যেন হঠাৎ মনে পড়ে যাওয়ায়, উত্তর দেয় সে, মিথিলা জোয়াদ্দার।

ভদ্রলোক অবাক চোখে তাকান। চোখে যেন কৌতুক ঝিলিক দিয়ে ওঠে। যেন জিজ্ঞেস করতে চান উত্তরটা কেন এত দেরিতে পেলেন। কিন্তু শেষপর্যন্ত আর প্রশ্নটা করেন না তিনি, প্রসঙ্গ পাল্টান। মিথিলা হাঁফ ছেড়ে বাঁচে। ভদ্রলোক হালকা আলাপচারিতা চালাতে চান, বোঝে সে। সে টুকটাক কথা বলে, কিন্তু মনে মনে অন্য কিছু ভাবে মনে প্রশ্ন জাগে, সে কি তবে পাগল হয়ে যাচ্ছে? এগুলো কি পাগলামির লক্ষণ? নইলে নিজের নামটাও কী করে সে ভুলে যায়? আর তখনই দুম করে মনে পড়ে তার, মৃত্তিকার সাথে এখনও কথা বলা হয় নি আজ।

লাঞ্চের বিরতির এক ফাঁকে মৃত্তিকার সাথে কথা বলতে, সৎ মা রেহানাকে ফোন দেয় মিথিলা। নিজের মাকে মনে নেই তার, রেহানার কাছেই বেড়ে ওঠা। আদর, অনাদর যা কিছু প্রাপ্তি, সব রেহানারই কাছে। আর এখন, তার আত্মজাকেও রেহানার হাতেই ছেড়ে দিয়েছে সে। আহা! স্বস্তি কি মেলে? তবু, উপায়ই বা কী? নিজের এই ছন্নছাড়া, ভাসন্ত জীবনে কোথায়, কীভাবে সে রাখে মৃত্তিকাকে! রেহানাকে কখনও মা বলে ডাকা হয়নি তার। চেষ্টা করেছে, পারেনি, যেন কণ্ঠনালী চেপে ধরেছে কেউ! রেহানার মধ্যে এ নিয়ে কোনো অতৃপ্তি আছে কিনা, কখনও জানা হয়ে ওঠেনি তার। রেহানার সাথে সে কথা বলে, কোনো সম্বোধন ছাড়াই। ভীষণ অস্বস্তি তাতে, তবু, কী আর করা!

ফোন করতেই রেহানার গলা।

হ্যালো।

হ্যালো, কেমন আছেন?—বলে মিথিলা।

ভালো আছি, তুই কেমন আছিস ?

ভালো আছি, মৃত্তিকা কোথায়?

তোর মেয়ে কি আর বাড়ি থাকে এসময় ? টো টো করে ঘুরছে সারাদিন। রিতাদের বাড়িতে গিয়েছে হয়ত।

ওকে আর বেশি বাইরে যেতে দেবেন না এখন, বড় হচ্ছে তো। আব্বা কোথায়?

তোর আব্বা বাজারে গেল এই একটু আগে।

এই বয়সে প্রতিদিন বাজারে যাওয়ার কী দরকার! একটু বিশ্রাম নিলেই তো পারে!

কথা শুনলে তো! তাছাড়া, বয়স হচ্ছে, সারাদিন একা একা হাঁপিয়ে ওঠে। বাজারে যায়, লোকজনের সাথে দেখা সাক্ষাত হয়। মনটা ভালো থাকে। তাই এখন আর নিষেধও করি না তেমন। তুই ভালো আছিস তো? জাহিদ কেমন আছে?

আমি ভালো আছি, মৃত্তিকাকে চোখে চোখে রাখবেন। দেখবেন, যেন স্বপনদের বাড়ির দিকে না যায়। ও বাড়িতে এলে আমাকে একটা ফোন দিয়েন।—এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে যায় মিথিলা।

রেহানা হাসেন। বলেন, আচ্ছা, দেবো। তুই চিন্তা করিস না, মৃত্তিকা ভালো আছে।

মিথিলা ফোন রাখে। তাকে ভাবনায় পেয়ে বসে।

সেই যে, সেই কোনো এক ঘুঘু ডাকা নরম, শান্ত দুপুরে, পরাক্রান্ত সূর্য যখন তার সবটুকু উত্তাপ পৃথিবীকে ঢেলে দিয়ে খর চোখে তাকিয়েছিল পৃথিবীর দিকে, যেন বা পুড়িয়ে দিতে চেয়েছিল তার সব নষ্টামি আর পাপ, ভস্ম করতে চেয়েছিল তার সকল দুঃখ ও জরা, তখন তেরো বছরের কিশোরী মেয়েটি ত্যক্ত বিরক্ত হয়ে উঠেছিল প্রাত্যহিকতার একঘেয়েমিতে। হাঁপিয়ে উঠেছিল সমাজের দুর্ভেদ্য, অর্থহীন শাসনের যন্ত্রণায়। ঠিক তখন, অকস্মাৎ তার চোখে জ্বলে উঠেছিল পৃথিবীর উজ্জ্বলতম আলোর বাতিটি। সে আলোর হঠাৎ ঝলকানি ধাঁধিয়ে দিয়েছিল তার চোখ। ভাসিয়ে দিয়েছিল তাকে আলোর বন্যায়। মাগো! এত আলোও আছে পৃথিবীতে? আছে এত আনন্দ, এত সুখ, এত বৈচিত্র্য? জীবন তাহলে এমনও হয়, হতে পারে? জীবন তাহলে শুধুই স্কুল থেকে বাড়ি, বাড়ি থেকে স্কুল, পান থেকে চুন খসলেই সৎ মায়ের বকুনি, বড় ভাই-বোনদের কানমলা আর অষ্টপ্রহর বিষণœতার এঁদো ডোবায় খাবি খাওয়া নয়! এত রং, এত রূপ, এত বৈচিত্র্য তাতে? সবিস্ময়ে ভেবেছিল মিথিলা, মন্দ নয় এ জীবন! তবে তো তা গভীরতর অর্থবহ কিছু!

সেই প্রথম জীবনকে ভালোবাসতে শিখেছিল মিথিলা। আশপাশের জগৎটাকেও চিনতে শিখেছিল নতুন করে। ব্যাপারটা যেন দৈবক্রমেই ঘটে গেছিল।

গ্রীষ্মের প্রচ- গরমে তাদের মর্নিং স্কুল তখন। স্কুল থেকে ফেরার পর সেই দৈনন্দিন রুটিন কিছুতেই ভালো লাগত না তার। উন্মাতাল লাগত, বুকের মধ্যে কষ্ট ডানা ঝাপটাত। পড়ার টেবিলে মন বসত না। বাড়ির বাইরে যাওয়া ছিল মানা, এমন কেউ ছিল না যার সাথে কথা বলা যায়, করা যায় সামান্যতম সখ্যতা। দমবন্ধ, গুমোট সেই দুপুরে, এঘর ওঘর করছিল সে। ছটফট করছিল—কেন সে নিজেও জানত না তা। শুধু অনুভব করছিল দারুণ কষ্ট, অসহ্য কষ্ট। যার কোনো ব্যাখ্যা অজানা ছিল তার। সে সময়ের অনুভূতিগুলো ভীষণ অস্পষ্ট আর অদ্ভুত লাগত তার নিজেরই কাছে। সে দেখছিল তাদের বইয়ের তাকটা, যেটা দারুণ সতর্কতায় তালা দেওয়া থাকে সবসময়, সেটা ছিল খোলা সেদিন।

অনেক দিন সে দেখেছে ভেতরে থরে থরে সাজানো, দেশ-বিদেশের বিখ্যাত সব লেখকদের বই। তার খুব ইচ্ছে করত, কী লেখা আছে ওসব বইগুলোর মধ্যে তা জানতে, পড়তে। কিন্ত ওই পর্যন্তই! সম্ভাব্য সবরকম সতর্কতা রক্ষা করে, পরম যতেœ আগলে রাখা হত বইগুলো। শুধু তার বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া বড় ভাই-বোন বাড়িতে এলে, ছুটিছাটায়, খোলা হতো বইয়ের তাকের তালা, পড়তেন তারা। কিন্ত মিথিলা ছোট বলে, তার পড়াশোনার ক্ষতি হবে বলে, তার জন্য সেগুলো নিষিদ্ধ, নাগালের বাইরে ছিল।

সে শুধু নির্বাক তাকিয়ে দেখত, কাচের বাইরে থেকে তাকিয়ে থাকত। লোভে, আগ্রহে চকচকিয়ে উঠত তার চোখ। তৃষিত যেমন চেয়ে থাকে শীতল, টলটলে জলের দিকে, বুভুক্ষু যেমন তাকিয়ে থাকে সুস্বাদু খাবারের দিকে, যার গন্ধ নাকে ঝাপটা মারে কিন্তু আস্বাদ নেয়া যায় না কিছুতেই, তেমনি তৃষিতের মত তাকিয়ে থাকত সে। আহ! কী যন্ত্রণাময় দিন ছিল সব!

পাঠ্যবইয়ে কিছু কিছু কবি-লেখকদের লেখা সে পড়েছিল তখন। তাঁদের সম্পর্কে খুব অস্পষ্ট ধারণাও পেয়েছিল। ফলে আরও আরও জানার আগ্রহ ও ইচ্ছা, ইচ্ছা ও বাসনা তাড়া করে ফিরত তখন তাকে। সময় কাটানোর আর কোনো মাধ্যম ছিল না তার। ছিল না ভিন্ন কোনো আকর্ষণ, যা তার কল্পনাকে মুক্তি দেবে। রাঙিয়ে তুলবে তার মন। তাই সেদিন, যখন সে দেখল তার সামনে ঐ বিশাল—হ্যাঁ, তখন তার কাছে বিশালই লাগত বৈকি—সেই ভুবন, তার সমস্ত রহস্যময়তা উজাড় করে দিল ছোট্ট, কিশোরী মিথিলার কাছে। হঠাৎ উন্মুক্ত উদার পৃথিবীতে আমন্ত্রণ জানাল তাকে, তখন সে বুভুক্ষুর মতো ঝাঁপ দিল তাতে। সে আপ্লুত হল, উদ্বেলিত হল মুক্তির আনন্দে। সেই বিস্ময়কর, উদার জগৎ ত্বরিৎ গতিতে তাকে টেনে নিল নিজের রহস্যময় ভুবনে। এই ভুবনের আনন্দ ও বেদনা, সুখ ও দুঃখ, অভিভূত, শিহরিত করল তাকে। তার সামনে ভেসে উঠল এক অন্যরকম জীবনের ছবি, যা ছিল তার খুব প্রিয় ও অদ্ভুত রহস্যে মোড়া।