সেই শুরু। ভীষণ সংগোপনে, সবার চোখের আড়ালে সে গোগ্রাসে গিলতে থাকল একেকটি বই। কোনো বাছ-বিচার, কোনো রুচি-পছন্দের বালাই তার ছিল না, সেই বোধই তার হয়নি তখন। বইগুলো চুম্বকের মত টানত তাকে, আকর্ষণ করত, যেভাবে আগুন টেনে নেয় পতঙ্গকে। পড়াশোনায় ভালো ছিল সে। ভালো ছাত্রী বলে, লক্ষ্মীমেয়ে বলে সবার কাছেই প্রিয় ছিল খুব। স্কুলের পড়ার ফাঁকে সে নিবিষ্ট হতো তার এই সদ্য আবিষ্কৃত বইয়ের জগতে। ফলে ভাবে ও বোধে, মনে ও মননে সে বদলে গেল অনেকটাই। তার চারপাশের জগৎ তার কাছে লাগল বিশ্রীরকমের খাপছাড়া ও একঘেয়ে। তার বয়সী বা তার চেয়ে বয়সে বড় ছেলেমেয়েদেরও তার কাছে মনে হল খুবই ছেলেমানুষ ও অপরিণত! সে দেখল, তার মতো করে ভাবতে পারে না ওরা, যেন কোনো অন্ধকারে খাবি খাচ্ছে সবাই।

মনে মনে এমনটা ভেবে তাদের জন্য করুণার্দ্র হল মিথিলা। আহা! ওরাও যদি স্বাদ পেত এই অজানা ভুবনের! ভাবল সে।

কিন্তু, শীঘ্রই ধরা পড়ে গেল সে। তার পরিবারের সবাই আবিষ্কার করে ফেলল যে, সে পাঠ্যবই ছেড়ে গল্পের বই নিয়ে মেতেছে। নষ্ট করছে সময়। ফলে তাকে রাখা হল চোখে চোখে। কপালে জুটল অনেক লাঞ্ছনা ও অপমান। সেটা অবশ্য কারও কাছেই অপমান বলে মনে হল না তখন। অইটুকু একটা মেয়ে, তার আবার অপমান কী, ভাবল হয়ত। মিথিলাকে তাই নতুনতর পন্থা খুঁজে বের করতে হল। সে তখন সদ্য রক্তের স্বাদ পাওয়া বাঘছানা, তাকে তখন বই পড়তেই হবে! সম্ভাব্য সকল জায়গা তন্ন তন্ন করে খুঁজত সে। যদি পেয়ে যেত কোনো একটি বই, তাহলে সেটা নিয়ে ঢুকে যেত তাদের ঘরের প্রায়ান্ধকার মাচানের নিচে, যেখানে সোজা হয়ে বসা যেত না মোটেই। তাকে ঘাড় নিচু করে, প্রায় হামাগুড়ি দিয়ে ঢুকতে হত সেখানে। তারপর সেই আবছা, সামান্য আলোয় জন্তুর মত উপুড় হয়ে শুয়ে, চোখের খুব কাছে নিয়ে রুদ্ধশ্বাসে পড়তে থাকত। বই শেষ করে যখন বের হতো, চেনা যেত না তাকে। গরমে, ঘামে, ধূলো-ময়লা আর মাকড়সার জালের অদ্ভুত আঁকিবুঁকিতে নিজের চেহারা দেখে সে নিজেই হেসে গড়িয়ে পড়ত তখন।

তবু কী মিষ্টি ছিল সে দিনগুলো! আহা! কী অদ্ভুত আবেশে বুকটা ভরে থাকত তখন। এই বত্রিশে এসে, সে দিনগুলো যখন ভাবে মিথিলা, কী এক অব্যক্ত কষ্টে, যন্ত্রণায়, ব্যথায়, টনটন করে ওঠে বুক, মুচড়ে ওঠে যেন। মাদকতাময় এক পুরনো, পরিচিত গন্ধ নাকের কাছে লেগেই মিলিয়ে যায় শূন্যে, যতই চেষ্টা করে গন্ধটা আবার বুঝতে, ততই তা যেন সুদূরে মিলায়।

বড় ভাই-বোনেরা সবাই কেউ পড়াশোনা, কেউ বা চাকরি নিয়ে বাইরে তখন। বাবা সারাদিন নিজের ব্যবসা আর কৃষিকাজে ব্যস্ত। সৎ মা রেহানাও ব্যস্ত নিজের কাজে। তখন, মিথিলা হঠাৎ করেই ভীষণ রকম স্বাধীন হয়ে গেল যেন। সে নিজেই তখন তার ত্রাতা ও বিধাতা। কাজেই সে আরও বেশি করে ঝুঁকে পড়ল তার কল্পনার জগতে। বই তাকে অধিকার করে নিল পুরোপুরি।

স্কুলে সে ছিল ভীষণ শান্ত আর মনোযোগী। বন্ধুদের সাথে কথা বলাটা ভালো চোখে দেখত না কেউ তখন। আর মিথিলাও ছিল খুব মুখচোরা ও অন্তর্মুখী। সে কারণে সমবয়সী ছেলেমেয়েদের সাথে তার বন্ধুত্ব ছিল মাপা তারে বাঁধা। তবে তাকে এমনকি শিক্ষকেরাও পছন্দ করতেন। হয়ত সে ভালো ছাত্রী ছিল বলেই।

সেই বয়সে, স্বাধীনতার স্বাদ পেয়ে, মাথা বিগড়ে যায়নি। বরং বইয়ের জগতে যেন ডুবে গেল সে। কেউ বলার ছিল না এটা পড় কিংবা ওটা পড় না। ফলে অল্পবয়সেই এমন অনেক কিছু জানল সে, যা ঐ বয়সে মোটেই তার জানা উচিৎ নয়। তবে ভেতরে ভেতরে প্রচ- আত্মবিশ্বাসী আর উচ্চাকাক্সক্ষীও হয়ে উঠল সে। বড় বড় মনীষীদের জীবনযুদ্ধের কাহিনিগুলো তার স্বপ্নের পালে হাওয়া লাগাল আরো। বড় হওয়ার, পড়াশোনা করে অনেক উঁচুতে ওঠার স্বপ্নে রঙিন হয়ে উঠল তার দুচোখ। বই গ্রাস করল তাকে।

সে আরও একা আর নিঃসঙ্গ হয়ে গেল আদতে। সে নিজেও টের পেল না সেটা। অস্তিত্বহীন, কাল্পনিক এক মায়ার জগত তাকে মোহগ্রস্ত করে ফেলল, মাতাল করে দিল যেন। বোকা মেয়েটা টেরও পেল না, সে ডুবে যাচ্ছে এমন এক জগতে যেখানে শুধুই মায়া, মরীচিকা। যা ক্ষণকালের জন্য দেখা হয়ত যায়, কিন্তু ছোঁয়া যায় না কিছুতেই। ছুঁতে গেলে মুহূর্তেই তা শূন্যে মিলায়। এমনি টালমাটাল, অদ্ভুত সময়ে, যখন সবে চৌদ্দে পা দিয়েছে মাত্র, প্রেমে পড়ল মিথিলা! কিংবা প্রেমই এসে চড়াও হল তার ওপর!