উহ্! এত অসহ্য গরম আজ! অফিস থেকে ফিরে অব্দি বিদ্যুৎ নেই। নেই তো নেই! কাঁহাতক আর ভালো লাগে। বারান্দায় বসে মিথিলা। বাতাস নেই একটুও। গুমোট গরম। জাহিদ এইমাত্র ফিরেছে, গোসল করছে। বুয়া কাজ সেরে দিয়ে চলে গেছে একটু আগেই। মিথিলা সারাদিন বাসায় থাকে না, তাই বুয়া আসে সন্ধ্যার পর। সব কাজ গুছিয়ে দিয়ে চলে যায়। ছুটির দিনে আসে দুপুরে। সেদিন কাচা-ধোয়া করে দেয়। বন্দোবস্তটা বেশ ভালো লাগে মিথিলার।

বাথরুম থেকে বের হয়েই চা চায় জাহিদ। এই গরমে চা বানাতে ইচ্ছে করে না মিথিলার। বাইরে আকাশের দিকে তাকায়। হঠাৎ কালচে কমলা রঙা চাঁদটা যেন লাফ দিয়ে উঠে মুখ বের করে দেয়। ভীষণ নিঃসঙ্গভাবে ঝুলে থাকে আকাশের এককোণে। মিথিলা অবাক চোখে তাকিয়ে থাকে। চাঁদটাকে আজ অন্যরকম লাগছে কেন? আজ কি পূর্ণিমা? বিদ্যুৎ না থাকায় চাঁদের আধফোটা জ্যোৎস্নায় মিথিলার মনে হয় কয়েক মুহূর্তের জন্য যেন স্তব্ধ হয়ে যায় পৃথিবী। থেমে যায় চরাচর। অসহ্য এই সৌন্দর্যে অবাক বিস্ময়ে অভিভূত হয় সে। আবিষ্ট, মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকে। চমক ভাঙে ডাকে।

জাহিদ গোসল সেরে কখন পাশে এসে দাঁড়িয়েছে খেয়াল করেনি সে। জাহিদের ডাকে চমকে উঠে বলে, কিছু বললে?

বললাম, চলো বাইরে যাই।

কোথায়?

এমনিই নিচে যাই, হেঁটে আসি চলো, বিদ্যুৎ নাই, শুধু শুধু বাসায় বসে কী করব?

ভালো লাগে মিথিলার। সদ্যস্নান সেরে আসা জাহিদের শরীর থেকে সুগন্ধী সাবান আর তার শরীরের গন্ধ মিলে তৈরি হওয়া মিষ্টি একটা সুবাস ঝাপ্টা মাওে নাকে। নাক কুঁচকে গন্ধটা টেনে নেয় মিথিলা। দুহাতে জাহিদকে জাপটে ধরে নিজের দিকে টানে, আলতো গাল ছোঁয়ায় তার বুকে। ভালো লাগে তার, মন ভরে ওঠে অদ্ভুত আবেশে। জাহিদ হাসে। সেও আঁকড়ে ধরে মিথিলাকে। বলে, কী হল?

না, কিছু না।—মিথিলা অস্ফুট জবাব দেয়। তারপর আস্তে ছেড়ে দেয় জাহিদকে। বলে, এখন যাবে?

কেন, তোমার ইচ্ছে করছে না?

হুম! চলো যাই।

নিজেকে একটু ঠিকঠাক করে নিয়ে বেরোয় মিথিলা। একটু একটু করে জ্যোৎস্না ফুটছে। চাঁদটাও সোনা-রঙা হয়ে উঠছে আস্তে আস্তে। এই রাত, এই চাঁদ, এই জ্যোৎস্না খুব ভালো লাগে তার। পরমুহূর্তেই গভীর যন্ত্রণা আর দুঃখবোধ ছেয়ে ফেলে তাকে। সে জাহিদের সাথে জীবন উপভোগ করছে। সুখের সাগরে ভাসছে। অথচ তার একরত্তি, দুঃখী মেয়েটা! কোথায়, কোন অজ পাড়াগাঁয়ে পড়ে আছে একা! গভীর অপরাধবোধে ছেয়ে যায় তার মন, প্রবল মাতৃত্ববোধে তার দুচোখ বেয়ে জল গড়ায়। তক্ষুনি সাবধানে চোখ মুছে ফেলে সে। পাছে তা দেখে ফেলে জাহিদ বা আর কেউ। মনে হয়, কেউ যেন তার সত্ত্বাটা ধারালো ছুরি দিয়ে কেটে দুভাগ করে দিয়েছে হঠাৎ। যার এক টুকরো স্বামী, সংসার নিয়ে সুখের জাবর কাটছে অন্য টুকরো যন্ত্রণায় ছটফট করছে, দগ্ধে মরছে। এক টুকরো সুখ চায়, সঙ্গম চায়, সংসার চায়। অন্য টুকরো সন্তানকে পরম মমতায় আগলে রাখতে চায়, তাকে মাতৃস্নেহে লালন করতে চায়। কিন্তু মিথিলা তো সচেতনভাবে বিভক্ত হতে চায়নি এভাবে! সে একই সাথে স্বামী, সন্তান, সংসার, সকল প্রাত্যহিকতায় প্রোথিত হতে চেয়েছে। চেয়েছে সকল স্বপ্ন, সাধ, আকাক্সক্ষা জলাঞ্জলি দিয়ে নিতান্তই আটপৌড়ে, সাধারণ জীবনে সেঁধোতে। তবু হল না! হল না কিছুই। এখন তাই যন্ত্রণায় পিষ্ট হওয়া। একই সাথে সুখের পরশ আর সে পরশের সাথে সাথে হৃদয়চেরা দীর্ঘশ্বাস।

অপরাধবোধে ছেয়ে যায় মন। উদ্দেশ্যহীন, ধীর লয়ে একে অন্যের লাগোয়া হয়ে হাঁটে তারা। রাস্তায় চলমান মানুষের ব্যস্ততা, রিক্সার টুংটাং, গাড়ির হর্নের শব্দে সজাগ, সচকিত উভয়েই। মোড়ের চায়ের দোকানটায় গিয়ে বসে তারা। বিদ্যুৎ নেই, দোকানের টিমটিমে চার্জার লাইটের আলোয় দোকানের সামনের বেঞ্চটাতে বসে চা খায় মিথিলা। জাহিদ মাঝে মাঝে চায়ে চুমুক দেয়, একহাতে সিগারেট অন্যহাতে চায়ের কাপ তার। কী বিশ্রি অভ্যাস থাকে এক একজন মানুষের! জাহিদ একবার চায়ে চুমুক দেয়, একবার সিগারেটে টান দেয়।

আচমকা অনেকদিন আগের একটা দৃশ্য চোখে ভাসে মিথিলার। নিজেই নিজের ওপর বিরক্ত হয়ে ওঠে শেষে। জাহিদ যদি ঘুণাক্ষরেও টের পায় তার পাশে বসে অন্য পুরুষের কথা ভাবছে মিথিলা—তাহলে, কেমন লাগবে তার? শুধুই খারাপ লাগবে, না-কি কষ্ট পাবে সে? কষ্ট? না, ভাবনাটাকে সরিয়ে দেয় মিথিলা মন থেকে। আদতে পুরুষেরা এত অল্পে কষ্ট পায় না। এত সামান্যে কাতরও হয় না তারা। জানে সে। কী অদ্ভুত! একই ঘটনা একজনকে তীব্র কষ্টে অসাড় করে দেয় অন্যজনের মনে সামান্যতম আঁচড়ও কাটে না। রহস্যটা আসলে কোথায়? মিথিলা ভাবে।