চৌদ্দো বছরের মিথিলা প্রেমে পড়ল। জগৎটা তার কাছে তখন দারুণ রঙিন আর স্বপ্নময়। ছোটবেলা থেকেই শুধু বাবা, ভাই, আত্মীয় ছাড়া অন্য কোনো পুরুষের সাথে কথা বলার বা মেশার সুযোগ ছিল না তার। বইপত্রে পুরুষের যে রূপ সে পেয়েছে, তা হয় নায়কের, নয়ত খলনায়কের। মাঝামাঝি কিছু ছিল না। কিংবা, থাকলেও, তার মনে তা দাগ কাটেনি। ফলে আশপাশের পুরুষ চরিত্রগুলোর তার ভাবনায় ঠাঁই পাওয়ার তেমন জোরালো কোনো কারণ ছিল না। আর পেলেও এইবেলা যদিবা কাউকে নায়ক বলে রায় দিত তার মন, তো ওবেলায়ই আবার তার ভাগ্যে জুটত খলনায়ক খেতাব।

আর বই পড়ে পড়ে সেই বয়সে তার মনে প্রেম সম্পর্কে যে ধারণা জন্মেছিল তা ছিল অত্যন্ত পবিত্র ও মধুর। গভীর ও সরল। তার কোমল নরম হৃদয়টাতে এমন বোধ, এমন সংস্কার প্রোথিত হয়েছিল যে, প্রায় ধর্মবিশ্বাসের মতোই সে বিশ্বাস করত, একজীবনে শুধু একজনকেই ভালোবাসা যায়। একজনেই সমর্পিত হওয়া যায়। ‘শরীর’ নামক বস্তুটা সেখানে অত্যন্ত গৌণ। একই সাথে তা রীতিমত অশ্লীল ও পাপ।

তার বেশ ক’ক্লাশ ওপরে পড়া স্বপন যখন একদিন মওকা পেয়ে প্রেম নিবেদন করে বসল তাকে, তার বইয়ের ভাঁজে গুঁজে দিল চার লাইনের একটি কবিতা, তখন বুকের মধ্যে যেন গুড়ুগুড়ু মেঘ ডাকল তার। কল্পনার পেখম তুলে নেচে উঠল মন আর সারা শরীরে সে অনুভব করল অবশ, ঝিমধরা এক অনুভূতি। চোখ কান দিয়ে যেন ধোঁয়া বের হল তার। যেন আগুনের হলকা লাগল গায়ে আর পৃথিবীটা মনে হল যেন দুলছে হঠাৎ।

না, সেটাই প্রথম প্রেমপত্র ছিল না তার। সেই বয়সেও বেশ ক’খানা প্রেমপত্রের গর্বিত মালিক ছিল সে। এবং তার অকালপক্ক মন ‘খলনায়ক’ বলে সেগুলোকে নাকচও করে দিয়েছিল মুহূর্তেই। তবে? স্বপনের চার লাইনের কবিতায় তবে এমন দুলল কেন তার মন? ভুলল কেন হৃদয়? কে জানে! বিস্ময়। অপার বিস্ময়!

হ্যাঁ, স্বপন সুন্দর ছিল নিঃসন্দেহে। যদিও ‘শরীর’ বস্তটা নিতান্তই অপরিচিত ছিল মিথিলার কাছে, তবু অন্ধ তো ছিল না সে। তাই স্বপনের গৌরবর্ণ, নধরকান্তি শরীর আর অদ্ভুত সুন্দর দুটি চোখ তার ভালো লেগেছিল বৈকি। কিন্ত সেসব নয়, মিথিলা জানে, সেসব নয়। স্বপনের যে গুণে মন মজেছিল মিথিলার, সে তার লেখা চার লাইনের ঐ কবিতা। কবিতা লিখত সে। খুব উঁচুদরের কিছু যে ছিল না তা, সেটা মিথিলা ঐ বয়সেই বুঝত। কিন্ত আবেগের কোনো ঘাটতি যে তাতে ছিল না, সেটাও বুঝত সে। মিথিলার স্বপ্নচারী, কল্পবিলাসী মন তাকে জানিয়েছিল ঐ স্বপনই তার স্বপ্নের রাজপুত্তুর, যে তাকে ভাসাবে সুখের ভেলায়, ডোবাবে ভালোবাসার বন্যায়। ফলে তার মন চঞ্চল হল, অশান্ত হল এবং প্রেমে পড়ল।

মিথিলা তার সবচেয়ে সুকোমল বোধ, সবচেয়ে মূল্যবান অনুভূতি উজাড় করল স্বপনের পায়ে। আহ! কী সুখী, কী ভাগ্যবান মনে হতো তখন নিজেকে! মনে হতো ঐ একজন ছাড়া অর্থহীন তার জীবন, মুল্যহীন তার বেঁচে থাকা। তার জীবনের মহত্তম, বৃহত্তম এবং গূঢ়তম লক্ষ্য হয়ে উঠল তখন স্বপন। স্বপনের প্রেমে সে তখন বাঁচে, স্বপনের প্রেমে সে মরে। প্রতিদিন দেখা হয়, তবু রাত জেগে চিঠি লেখে। এত অসংখ্যবার দেখা হয় তবু কী অদ্ভুত কষ্ট জমা হয় বুকে। ক্ষণিকের অদর্শনে অস্থির হয়ে ওঠে মন। একদিন স্বপনের চিঠি না পেলে সে কেঁদে দুচোখ ভাসায়। সেই সাথে রাত জেগে চলে বই পড়া। পাঠ্যবইয়ের পার্ট প্রায় চুকেই গিয়েছে ততদিনে। এরই মধ্যে স্বপনের এস.এস.সি. পরীক্ষার রেজাল্ট হলো এবং অত্যন্ত কৃতিত্বের সাথে ফেল করল সে।

মিথিলা মোটেই অবাক হয়নি। স্বপনের জ্ঞানের বহর সম্পর্কে কোনো ধোঁয়াশা ছিল না তার মনে। তার বই পড়া বিদ্যেয় সে শীঘ্রই ধরতে পেরেছিল স্বপনের বোকামি ও নির্বুদ্ধিতা। কিন্ত তবু সে গভীরভাবেই ভালোবেসেছিল স্বপনকে। কোনো খাদ, কোনো ভাণ ছিল না তাতে। তার স্বপ্নচারী মন, তার বইপড়া বিদ্যে তাকে এই পরামর্শ দিয়েছিল যে, যদি উচ্চশিক্ষিত একটি পুরুষ পারে প্রায় অশিক্ষিত একটি মেয়েকে বিয়ে করতে, তবে একটি মেয়েরই বা তা করতে বাধা কোথায়? সেই বয়সেই, যখন সে জীবনের বোঝে না কিছুই, তখনই চলমান প্রথা ভাঙতে চেয়েছিল সে। আর তার ছিল প্রচ- জেদ ও সাহস যা তার এই বোধের পালে হাওয়া লাগিয়েছিল জোর।

তাই, স্বপনের সব অক্ষমতা, অজ্ঞতা চোখ বুঁজে ক্ষমা করতে প্রস্তুত ছিল সে। সে রাজি ছিল স্বপনের সব অযোগ্যতা সত্ত্বেও তাকে গ্রহণ করতে। কারণ, সেই বয়সে ভালোবাসার চেয়ে দামি, প্রেমের চেয়ে মুল্যবান তার কাছে আর ছিল না কিছুই।

বোকা মেয়েটা! নিজেকেই নিজে করুণা করতে ইচ্ছে হয় এখন মিথিলার। নিজেকে মিথ্যে অপচয় করল শুধুই। নষ্ট করল জীবনটা। কী লাভ হল ? নাহ্, কিচ্ছুটি না, শুধু মৃত্তিকা এল। বড় কষ্ট তার মেয়েটার! বড় কষ্ট!