এইসব অলস দুপুর আর ক্লান্ত বিকেলগুলোতে বড্ড মন কেমন করে। লাঞ্চের পরের এই সময়টাতে অফিসে কাজকর্ম তেমন একটা থাকে না। একটা গ্রুপ অব কোম্পানিতে রিসিপশনিস্ট হিসেবে কাজ করে সে। কাজকর্ম এমনিতেই কম, কিন্তু লাঞ্চের পরের এই সময়টা যেন আর কাটতেই চায় না মিথিলার। অবসর মানেই তো সেই পুরনো বস্তাপচা স্মৃতির জাবর কাটা। সে চায় টানা ব্যস্ততা। কোনো ভাবালুতায় আচ্ছন্ন হতে আর চায় না সে। এক জীবনে অনেক ভাবালুতা, অনেক ভুলের মাশুল সে গুনেছে, প্রতিনিয়ত গুনছে। তাই আর কোনো ভুল, আর কোনো ভ্রান্তিতে পা পিছলাতে চায় না সে। নিজেকে নিজেই ভয় পায় এখন মিথিলা। নিজেকেই করে সবচে বেশি অবিশ্বাস। নইলে আর দশটা সহজ স্বাভাবিক মেয়ের মতই বেশ সুখী একটা সংসার হতে পারত তার। এত চড়াই উৎরাই, এত যুদ্ধ সব কেন তার জীবনেই ভর করল? নিজেই এর জন্য দায়ী সে, মনে মনে রায় দেয় মিথিলা।

লাঞ্চের পর বড্ড ঘুম-ঘুম পায় তার। লক্ষ্মীছাড়া মনটাও, কেন কে জানে উদাস হয়ে ওঠে ভীষণ। পুরনো স্মৃতিরা যেন ঝাঁপি খুলে বসতে চায় এসে। মনে পড়ে, তাদের গ্রামে, এখন, এই ভর দুপুরে ছড়িয়ে পড়েছে খাঁ খাঁ শূন্যতা। রৌদ্রের তীব্র তেজে পুড়ছে সারা গ্রাম। তার মেয়েটা, তার আট বছরের দুঃখী, পাগলী মেয়েটা, হয়তো তারই ছোটবেলার প্রতিচ্ছবি হয়ে একা একা, আনমনে ঘুরে মরছে এপাড়া থেকে ও পাড়া। কথা বলছে একা একাই—হাসছে, খেলছে। কিংবা হয়তো মন খারাপ করে বসে আছে তারই ফেলে আসা সেই ছোট্ট খুপড়ি ঘরটাতে। হতে পারে। কত কিছুই তো হতে পারে। আহা! দুঃখী পরির মত ছোট্ট মেয়েটা তার! কে জানে কী করছে সে এখন!

মনে পড়ে, ঠিক এমনি ঝিম ধরা দুপুরে, এমনি ধা ধা রোদ্দুরে সে নিজে আস্তে আস্তে, পা টিপে টিপে, চুপিচুপি বেরিয়ে পড়ত বাড়ি থেকে। উদ্দেশ্যহীন ঘুরত এপাড়া থেকে ওপাড়া। কারও গাছের আম, কারও গাছের পেয়ারা, কারও গাছের ডালিম অথবা এসব কিছুই নয়—সময় কাটানোর জন্যই সে ছেঁড়া হাফপ্যান্ট পরে, খালি গায়ে ঘুরে ফিরত এপাড়া ওপাড়া। তারপর, একটু যখন বড় হল মিথিলা, যখন তার উপর জারি হল একশ চুয়াল্লিশ ধারা, নিষিদ্ধ হল অহেতুক ঘোরাঘুরি—তখন কী ভীষণ দমবন্ধ হয়ে আসতো তার! জীবনটাকে তখন মনে হতো ঠিক যেন কৌটোর মধ্যে আটকে রাখা রূপকথার সেই ভ্রমরটা—যাকে কোনো একদিন, এক অচেনা রাজকুমার এসে সংহার করবে অথবা মুক্তি দেবে! বস্তুত, সংহার অথবা মুক্তি—কোনো অর্থই তার কাছে ঠিক পরিষ্কার ছিল না তখন। সে শুধু চাইত একটু প্রাণ ভরে শ্বাস নেয়, একটু মন খুলে কথা কয়। ভীষণ উচ্ছলতায় মেতে ওঠে কারো সাথে—যাকে নিশ্চিন্তে বিশ্বাস করা যায়, যার সাথে আনন্দের বিকিকিনিতে দুঃখ জমা পড়ে না ভাগে।

কিন্তু কোথায় কী! তার কিশোরী মন, তার লাগামহীন কল্পনা, কোনো থৈ পেত না ভেবে। ভীষণ অস্থির, ভীষণ অশান্ত হয়ে উঠত আরও। পারিপার্শ্বিক স্থূলতা ও সংকীর্ণতা, জীর্ণতা ও পঙ্কিলতা তাকে আরও বিষাদগ্রস্ত ও হতাশ করে তুলত, জীবন হয়ে উঠত অসহ্য রকমের নিথর ও বৈচিত্র্যহীন। যেন শ্যাওলা পড়া এঁদো ডোবা, যেখানে না কোনো ঢেউ উঠত, না কোনো ¯্রােত বইত। সকাল থেকে সন্ধ্যে অব্দি সেই স্কুল থেকে বাড়ি, বাড়ি থেকে স্কুল! সেই হাতে গোনা, চেনা কয়েকটি মুখ। অচেনা, অজানা, অপরিচিতের খোঁজে তার কিশোরী মন তখন উন্মুখ, উচাটন!

কিন্তু চেনা গণ্ডি পেরোনো ছিল নিষেধ! তাকে পইপই করে বলা হয়েছিল- তার চারপাশের মানুষগুলোর বেশির ভাগই ধান্দাবাজ আর অসৎ। পরিবারের বাইরের জগৎটা নিয়ে তাই তার মধ্যে একই সাথে ছিল ভয় ও সংশয়, কৌতুহল ও বিস্ময়। নিজের পরস্পরবিরোধী এই মনোভাবে সে নিজেই দিশেহারা বোধ করত তখন। নিজেকেই মনে হতো সবচেয়ে বেশি অবোধ্য। এই বত্রিশ বছরে এসেও নিজের সেই মনোভাব কি বদলেছে, একটুও? নিজেই কি নিজেকে চিনেছে সে? উত্তরটা নিজেরই অজানা মিথিলার। জীবন এখনও তার কাছে তেমনই ধোঁয়াশায় মোড়া, তেমনই রহস্যে ভরপুর। আর সে, নিজের কাছে তেমনই দুর্বোধ্য আর অচেনা।

কিশোরী বয়সের সেই যন্ত্রণাময় দিনগুলোর কোনো এক দারুণ রোমাঞ্চকর ক্ষণে, হঠাৎই মিথিলার পৃথিবীটা দারুণ স্বপ্নময় হয়ে উঠল! চিরচেনা পৃথিবীটা যেন বিবর্ণতার খোলস ছেড়ে দারুণ আলো ঝলমলে হয়ে উঠল হঠাৎ তার চোখে। যেন বা স্বপ্নের দরজাটা হাট করে খুলে গেল, একটানে তাকে টেনে নিল নিজের অদ্ভুত, মায়াবী ভুবনে। মিথিলার জীবনটা যেন পাল্টে গেল সেই থেকে। সেই কি ছিল তার সর্বনাশের শুরু? মিথিলা ভাবে এখন। এখন তার মনে হয় সেই জগৎটা অচেনা থাকলেই বরং ভালো হতো। সেই ভীষণ অন্ধকার, ঢেউহীন জীবনটাই যদি শেষ পর্যন্ত নিয়তি হতো তার, তাহলে এত অতৃপ্তি, এত অপূর্ণ আকাক্সক্ষা সকাল-দুপুর-রাত খুঁচিয়ে মারত না তাকে। ছিঁড়েখুঁড়ে দিতে চাইত না তার জীবনের সহজ, স্বাভাবিক ছন্দ— যদি তাকে আদৌ সহজ আর স্বাভাবিক ধরা যায়! বস্তুত, নিজের ভেতরকার এই অতৃপ্তিটাকেই এখন নিজের শত্রু বলে মনে হয় তার, যা তাকে ক্রমেই ঠেলে দেয় আরও বেশি অনিশ্চয়তার আর অন্ধকারের দিকে।

এতসব হাবিজাবি ভাবতে ভাবতে একসময় বিরক্ত হয়ে উঠে পড়ে মিথিলা। বসকে বলে বের হয়ে আসে অফিস থেকে। দারুণ অস্থিরতা ছেঁকে ধরে তাকে। ছোট্ট বেলার সেই দমবন্ধ অনুভূতিটা যেন ফিরে আসতে চায় আবার, কেমন পাগল করে দিতে চায় তাকে। যার কোনো ব্যাখ্যা খুঁজে পায় না মিথিলা, আর তাই আরও দিশেহারা, আরও অশান্ত হয়ে ওঠে মন।

উদ্দেশ্যহীন হাঁটে মিথিলা, অফিস থেকে বের হয়ে। ফুটপাত ধরে এগোয়। যেন নিজেই বুঝে ওঠে না আদতে কেন সে হাঁটছে আর যাবেই বা কোথায়। রাস্তায় চলমান গাড়ি, লোকজন, খেয়াল করে, কিংবা খেয়াল করে না কিছুই। জীবনটাকে ভারি অর্থহীন, ছন্নছাড়া লাগে তার- মাথার মধ্যে ঘুরপাক খায় রাতের সেই অদ্ভুত অনুভূতিটা। কী যেন এক কষ্ট, যন্ত্রণা ছড়িয়ে পড়ে শরীরে, মনে। আট বছরের মৃত্তিকার মুখটা মাথার মধ্যে পাক খেয়ে যায়, আর তখনই কে যেন মনের মধ্যে সতর্ক ঘণ্টা বাজিয়ে দেয় হঠাৎ। তখনই আবার মনে পড়ে যায় তার, না, মরে যাওয়া চলবে না তার। তাকে বাঁচতে হবে, ভীষণভাবে বেঁচে থাকতে হবে তাকে। তার জন্য, শুধু তারই জন্য উন্মুখ, অধীর হয়ে আছে সুন্দর, কচি একটি মুখ। যে তার শরীরে এসেছিল কোনো একদিন, তারই শরীরের রক্ত শুষে নিয়ে বেড়ে উঠেছিল তিলতিল করে, তারই শরীরের নরম, নিভৃত কোণে। তারপর, একদিন টুপ করে আলাদা হয়েছিল তার থেকে। আলাদা এক সত্ত্বা হিসেবে সে দাবি করেছিল পৃথিবীর আলো হাওয়া, ভীষণ দৃপ্ত, জোরালো চিৎকারে। ভাবতেই, মনে পড়তেই, আবার ভালো লাগে পৃথিবীটা। আবার আকাক্সক্ষা জাগে বাঁচার। সেই সাথে নাম না-জানা এক বোধ, অভিমানই হয়তো, গ্রাস করে তাকে। কেন, কার ওপর, জানে না মিথিলা। যেন নিজেরই ওপর, কিংবা চেনা মানুষগুলোর ওপর, কিংবা পুরো পৃথিবীটারই ওপর অভিমান জমে বুকে। পাক খায়, দলা পাকায়, এলোমেলো করে দিতে চায় তাকে। কেবলই মনে হয়, তার অনেক কিছু পাওয়ার ছিল এই বত্রিশ বছরের জীবনটাতে, পাওয়া হয়নি; দেওয়ার ছিল বিস্তর, দেওয়া হয়নি না; করারও ছিল অনেক, হয়নি, সেসব কিছুই হল না জীবনে! এইসব অতৃপ্তি আর অপ্রাপ্তির যন্ত্রণা আরও বেশি বিষণœ, আরও বেশি বেদনার্ত করে তোলে তাকে।

দুপুরের রোদ মরে আসে ক্রমে, কপালে ঘাম জমে তার। ঘেমো শরীর থেকে ঘাম আর সকালে ব্যবহৃত পারফিউমের মিলিত উৎকট গন্ধে নিজেরই গা গুলোয়।

হঠাৎ চোখ আটকে যায় মিথিলার। ফুটপাতে শুয়ে থাকা লোকটার দিকে একনজর তাকিয়ে চোখ ফেরাতে পারে না কিছুতেই। ময়লা, তেল চিটচিটে জিন্স, প্রায় হাঁটু পর্যন্ত গোটোনো, আলকাতরার কাছাকাছি গায়ের রং। মনে হয় বহুদিনের অস্নাত, নোংরা শরীর, সারা মুখে দাড়ি গোঁফের জঙ্গল নিয়ে লোকটা সটান শুয়ে আছে ফুটপাতের এক কোণে। বুকের ওঠানামায় বোঝা যায় বেঁচে আছে। ঘুমন্ত। পাগল। বিস্ময় নিয়ে দেখে মিথিলা। হাত, পা, হাত-পায়ের সবকটি আঙুল—কিছুই খালি নেই। প্লাস্টিক, মেটাল, লোহার বালা আর আংটিতে একাকার। বিস্ময়ে হা হয়ে তাকিয়ে ছিল সে। ঘোর কাটে, যখন বোঝে, আশেপাশে কৌতুহলী লোকের ভিড়; এবং এই ভিড় ঐ আজব শরীরটাকে দেখে নয়। বরং ঐ শরীরটার দিকে ভীষণ আগ্রহে বত্রিশ বছরের ছন্দগন্ধময় একটি নারী শরীরের নির্বাক চেয়ে থাকায়! লজ্জায় কিংবা অস্বস্তিতে সে আবার সামনে পা বাড়ায়। মনের মধ্যে সটান শুয়ে থাকা লোকটাকে বয়ে নিয়ে যায়। মনে মনে ভাবে, আহা! কে লোকটা? খুব কি দুঃখী? তার চেয়েও? আহা!