মিষ্টি সুরে কুরআন তেলাওয়াতের ছন্দে কিছুক্ষণের জন্য বিভ্রান্তিতে পড়ে মিথিলা। মনে হতে থাকে, সে শুয়ে আছে গ্রামের বাড়ির টিনের ঘরের খুপড়ি রুমটাতে। যেখানে আলো-হাওয়া প্রায় নাই-ই বলতে গেলে, ছোট্ট একটি জানালা, তা-ও আবার রাত্তিরে বন্ধ রাখতে হয়। জানালা-পাশে একটি শিউলী গাছ, যেটিতে প্রায় সারা বছরই ফুল ফোটে। শিউলির মিষ্টি গন্ধ লাগে নাকে। জানালা খোলা থাকলে ঝিরঝিরে হাওয়া আসে। বাড়িতে তো বিদ্যুৎ নাই। কিন্তু ঘুমের মধ্যেও মিথিলা বুঝতে পারে, তার মোটেই গরম লাগছে না। তাহলে কি জানালা খোলা রেখে ঘুমিয়েছিল সে? সর্বনাশ! ধড়মড়িয়ে উঠে বসেই পুরোপুরি হকচকিয়ে যায় মিথিলা। এ কোথায় শুয়ে আছে সে? পাশে লোকটা… সম্বিত ফেরে হঠাৎ, ধড়ে প্রাণ ফিরে পায় সে। না, সে আছে তার পনের শ স্কয়ার ফিটের ভাড়া বাসায়, পাশে দ্বিতীয় স্বামী জাহিদ। ঘুমুচ্ছে। এখনও পুরোপুরি সকাল হয়নি। বাইরে আবছা অন্ধকার। বাড়িওয়ালা হাবিলদার শফিউদ্দিন সাহেব মিষ্টি সুরে কুরআন তেলাওয়াত করছেন। বাড়িতে থাকতে প্রতিদিনই বাবার কুরআন তেলাওয়াতের মিষ্টি সুরে ঘুম ভাঙত। বিভ্রমের কারণটা এতক্ষণে স্পষ্ট হয় তার কাছে।

আস্তে বিছানা ছাড়ে মিথিলা। আড়মোড়া ভেঙে বারান্দায় রাখা চেয়ারটাতে গিয়ে বসে। প্রায় জনশূন্য রাস্তাঘাট। তেমন লোক চলাচল শুরু হয়নি এখনও। শান্ত, পবিত্র একটি সকাল। বাতাসে শিউলির মিষ্টি গন্ধ ভাসছে। বাড়ির লাগোয়া গেটটাতে শিউলি গাছ, তারই গন্ধ। ফুলের এই গন্ধটা ভারি ভালো লাগে তার। জাহিদ তখনও ঘুমে। মিথিলা হাই তোলে, আড়মোড়া ভাঙে। ভেতরে এসে হাত মুখ ধোয়, ব্রাশ করে, পোশাক পাল্টায়। শুচিবায়ু রোগ আছে তার। সকালে পোশাক না পাল্টালে মনে হয় পোশাক থেকে ঘামের বিকট গন্ধ আসছে, গা ঘিনঘিন করে। কিচেনে ঢুকে নাস্তা বানাতে বানাতে গত রাতের কথা ভাবে সে। আসলে কী হয়েছিল তার? সে কি স্বপ্ন দেখেছিল কোনো? নাহ! মিথিলার স্পষ্ট মনে আছে, কোনো স্বপ্ন দেখেনি সে। শুধু মনে হচ্ছিল, কেউ যেন তার বুকের মধ্যে সজোরে ড্রাম পেটাচ্ছিল। অচেনা একটা কষ্ট তার দম বন্ধ করে দিচ্ছিল, কানের কাছের অদ্ভুত শাঁ শাঁ আওয়াজটা কেমন ঠান্ডা আর নিস্তেজ করে দিচ্ছিল তার পুরো শরীর। আর অদম্য ওই শক্তিটা ঠিক কী ছিল—যেটা তাকে টানছিল সজোরে নিজের দিকে ? সেই মুহূর্তে মনে হচ্ছিল অমোঘ ওই আকর্ষণ উপেক্ষা করার শক্তি তার নাই। কী ভয়ংকর ছিল অনুভূতিটা! শিউরে ওঠে মিথিলা।

নাস্তা রেডি করে টেবিলে দিয়ে ঘড়ি দেখে মিথিলা। সাড়ে ছ’টা। জাহিদ বাসা থেকে প্রতিদিন বের হয় সাতটায়। তার ওঠার সময় হল। বেচারা! কাল রাতে মিথিলার যন্ত্রণায় ঠিকমত ঘুমুতে পারেনি। জাহিদের প্রতি প্রবল মমতা জাগে। দ্বিধায় ভোগে। ডাকবে? দ্বিধা কাটিয়ে টোকা দেয় গায়ে। ডাকে।

এই, উঠবে না? অফিসের সময় হয়ে যাচ্ছে তো!

চোখ খোলে জাহিদ। ঘুম-ঘুম গলায় জানতে চায় ক’টা বাজে।

সাড়ে ছ’টা।

শুনে একটু এপাশ ওপাশ করে, আড়মোড়া ভাঙে, তারপর উঠে পড়ে জাহিদ। ওয়াশরুমে যায়। মিথিলা ততক্ষণে ডাইনিং টেবিলে গিয়ে বসে। অপেক্ষা করে। টি পট থেকে চা ঢেলে চায়ে চুমুক দেয়। জাহিদ এসেই নাস্তায় মন দেয়। তারপর যেন হঠাৎ মনে পড়ল এমনভাবে বলে—

রাতে কী হয়েছিল মিথি?

জানি না, বলেছি তো, ভয় পেয়েছিলাম।—মিথিলার নির্বিকার উত্তর।

ভয়টা কেন পেলে সেটা বলো।

মনে হচ্ছিল মারা যাচ্ছি।

মরার ভয় তো খারাপ না।

তুমি কি আমার সাথে ঠাট্টা করার চেষ্টা করছ? —মিথিলার কণ্ঠ তীক্ষè শোনায়।

না মিথি, আমি বলতে চাচ্ছি মৃত্যুর কথা মনে থাকলে মানুষ অন্যায় কম করে।

আমি এম্নিতেও অন্যায় কম করি।

আমি জানি।

তাহলে বললে কেন?

কথার কথা বলেছি। স্যরি।

মুখ ভোঁতা করে বসে থাকে মিথিলা। জাহিদ লক্ষ করে, কিছু বলে না। চা শেষে টেবিল থেকে উঠতে উঠতে বলে—

অফিসে যাচ্ছ তো?

হ্যাঁ, অফিসে না যাওয়ার মত কিছু তো হয়নি। মরার ভয় পেয়েছি, সত্যি সত্যি মরে তো যাইনি।

রেগে গেছে মিথিলা, বোঝে জাহিদ। এই এক স্বভাব মেয়েটার। শান্ত কিন্তু ভয়ংকর রাগি। না, সাত সকালে তাকে রাগানোটা ঠিক হয়নি। সে আর কিছু না বলে ঝটপট রেডি হতে থাকে। মিথিলার অফিস দশটায়। তাই অনেক সময় নিয়ে, ধীরে সুস্থে নাস্তা সারে সে, বিশ্রাম করে, লাঞ্চ রেডি করে, তারপর অফিসে যায়। জাহিদ অফিসেই লাঞ্চ করে। তার অফিসে লাঞ্চের ব্যবস্থা আছে। রেডি হয়ে বের হওয়ার মুখে মিথিলা বলে, আসার সময় একটা নামাজ শিক্ষার বই এনো তো।

প্রায় বলেই ফেলেছিল জাহিদ যে, মিথিলা নিজেই তো আনতে পারে। নিজেকে সামলাল সে। না, থাক। মিথিলা বড় আশ্চর্য মেয়ে। মুখে সারাক্ষণ নারী স্বাধীনতার খই ফোটাচ্ছে, আবার নিজেই অবলীলায় পরম নির্ভরতায় নিজেকে জাহিদের কাছে সঁপে দিচ্ছে! আজবকি বাত! এজন্যই কি বলে ‘স্ত্রীয়শ্চরিত্রম দেবা ন জানন্তি’? কোথায় আছে কথাটা, কে জানে!

মিথি, আসি।

হুম। এসো।—মিথিলা জাহিদের চলে যাওয়া দেখে চুপচাপ। সন্তর্পণে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। ততক্ষণে পেপারওয়ালা পেপার দিয়ে যায়। পেপারটা নিয়ে সোফায় আধশোয়া হয় মিথিলা, চোখ বুলোয় পেপারে। নতুন কিছু নেই। সেই রাজনৈতিক কোন্দল, খুন, ধর্ষণ—এগুলো সব এখন গা সওয়া হয়ে গেছে মানুষের, নাড়া দেয় না তেমন। মোবাইলে হঠাৎ মেসেজ টোন বাজে। কৌতূহলী হয়ে মেসেজটা পড়ে মিথিলা।

‘ভালোবেসে সখী নিভৃতে যতনে আমার নামটি লিখ—
তোমার মনের মন্দিরে—”

নাম্বারটা চেনা। ভারি কৌতুক বোধ করে মিথিলা। বেচারা রবীন্দ্রনাথ! কবিগুরুর জন্য করুণার্দ্র হয় তার মন! চোর ব্যাটাও এখন চুরির আগে বোধকরি মনে মনে আওড়ায়—

‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চল রে!”

কী আর করা! রবীন্দ্রনাথ তো কারও পৈতৃক সম্পত্তি নন, তিনি বিশ্বজনীন। সুতরাং সবারই অধিকার আছে রবীন্দ্রচর্চার! উঠে পড়ে মিথিলা। লাঞ্চ রেডি করতে হবে, অফিসের সময় হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু আজকের মতো মাথার মধ্যে রবিবাবু আসন গেড়েছেন। মিথিলা গুনগুন করে—

‘ভালোবেসে সখী নিভৃতে যতনে আমার নামটি লিখ তোমার মনের মন্দিরে…”