খুব অচেনা এক অনুভূতি নিয়ে ঘুম ভাঙল মিথিলার। সেই সাথে প্রচণ্ড শ্বাসকষ্ট টের পেল সে। মনে হল পৃথিবীটা খুব দ্রুত অক্সিজেনশূন্য হয়ে যাচ্ছে। কানের কাছে শাঁ শাঁ শব্দ হচ্ছে—যেন অনেক দূর থেকে কোনো অদৃশ্য শক্তি তাকে টানছে ক্রমশ। খুব ভয় লাগল তার। আমি কি মারা যাচ্ছি? -ভাবল নিজেই। প্রচণ্ড পিপাসা টের পেল সে। অন্ধকারে ঘুমন্ত জাহিদের দিকে তাকাল—অঘোরে ঘুমুচ্ছে। ভারি নিঃশ্বাসের শব্দ আসছে। খুব অস্থির লাগে মিথিলার, বুকের ভেতরটায় কেমন শূন্য শূন্য অনুভূতি জাগে। অন্ধকার হাতড়ে বিছানা থেকে নামে—ডাইনিং টেবিলের জগ থেকে গ্লাসে পানি ঢালতে গিয়ে আরও অস্থিরতা টের পায়। জগ শূন্য! সচরাচর এমন হয় না। জাহিদ প্রতিদিন ঘুমানোর আগে জগ ভরে রাখে। প্রচ- পিপাসা নিয়ে ফিল্টার থেকে পানি ভরতে যায় মিথিলা। প্রবল হতাশা নিয়ে আবিষ্কার করে, ফিল্টারেও পানি নেই! তার মনে হয়, দম বন্ধ হয়ে বুঝি এক্ষুনি মারা যাবে সে। কানের কাছের শাঁ শাঁ শব্দটা আরও বাড়ছে—বাড়ছে ঐ অদৃশ্য শক্তির টানটাও। মিথিলার মনে হয়, কেউ যেন তার সমস্ত চেতনাকে সজোরে নিজের দিকে টেনে নিতে চাইছে। উদ্ভ্রান্তের মত ফ্রিজ খোলে মিথিলা। ঠাণ্ডা পানির বোতল বের করে কাঁপা হাতে গ্লাসে ঢালে, ঢকঢক করে হিমশীতল পানি গিলে নেয়। না, অস্থিরতাটা কমে না। প্রচ- ভয় পায় সে। তাড়াতাড়ি বিছানার কাছে যায়, জাহিদকে ধাক্কা দিয়ে ডেকে তোলে। আচমকা ঘুম ভাঙানোয় বিরক্ত জাহিদ ঘুমজড়ানো গলায় জিগ্যেস করে—

কী হয়েছে?
একটু উঠবে?—কাঁদো কাঁদো গলায় বলে মিথিলা।
মিথিলার কণ্ঠের অস্বাভাবিকতায় ধড়মড় উঠে বসে জাহিদ। অন্ধকারে অদ্ভুত কণ্ঠে জানতে চায়—
কী হয়েছে? ডাকছ কেন?
মিথিলা থেমে থেমে বলে, আমার খুব খারাপ লাগছে।
খারাপ লাগছে মানে কী? কেমন খারাপ লাগছে?
কেমন লাগছে বোঝাতে পারব না, খুব কষ্ট হচ্ছে।
কোথায় কষ্ট হচ্ছে ?
জানি না। মনে হচ্ছে কোনো প্রচ- শক্তি আমাকে তার দিকে টানছে। জাহিদ, আমি মনে হয় মারা যাচ্ছি।

জাহিদ এবার বিছানা থেকে নামে। লাইট জ্বালে। সে টের পায় মিথিলার শ্বাসকষ্ট শুরু হয়েছে। ইনহেলারটা এগিয়ে দেয় তার দিকে। মিথিলা যন্ত্রচালিতের মত ইনহেলার ব্যবহার করে, কিছুক্ষণ দম বন্ধ রেখে ভুস করে ছাড়ে। কিন্তু ভয় কমে না। সে শক্ত করে জাহিদকে দু’হাতে জড়িয়ে ধরে, ফ্যাঁসফেঁসে গলায় বলে—

জাহিদ আমার খুব ভয় করছে। আমি মারা যাচ্ছি।

মাঝরাত্তিরের এই যন্ত্রণা জাহিদকে খানিকটা বিপর্যস্ত করে। মিথিলার মাথায় আলতো হাত রেখে বলে, কোথায় কষ্ট হচ্ছে? বুকে ব্যথা করছে?

জানি না। বোঝাতে পারছি না, খুব অশান্তি লাগছে। মনে হচ্ছে কেউ আমাকে প্রচ- শক্তিতে তার দিকে টানছে। তুমি শক্ত করে ধরে রাখো আমাকে। খুব ভয় লাগছে।

হঠাৎ জাহিদেরও ভয় ভয় লাগে। মিথিলা খুব শক্ত মেয়ে। সহজে ভয় পায় না। বরং জাহিদ কোনো ব্যাপারে দুশ্চিন্তা করলে, ভয় পেলে সে সান্ত¡না দেয়, সাহস জোগায়। মিথিলার এই ভয় পাওয়া দেখে সে ভাবে, আচ্ছা, স্ট্রোক-ফোক হবে না তো আবার? সে বার বার জানতে চায়, তোমার কি বুকে ব্যথা করছে? অবশ লাগছে কোথাও?

মিথিলা মাথা নাড়ে। বলে, না, দম বন্ধ লাগছে।

বড় করে শ্বাস নাও। পানি দিই, পানি খাও।

মিথিলা আবারও থেমে থেমে বলে, পানি খেয়েছি। কথা ব’লো না, আমাকে ধরে থাকো, বলে আরও শক্ত হাতে জড়িয়ে ধরে জাহিদকে।

ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে আসে মিথিলা। স্বাভাবিক হয়ে আসে তার শ্বাস-প্রশ্বাস। জাহিদকে ছেড়ে এলিয়ে পড়ে বিছানায়। অস্ফুটে বলে, খুব ভয় পেয়েছি।

জাহিদ অবাক গলায় বলে, কেন?

জানি না। মনে হচ্ছিল মারা যাচ্ছি।

এখন কেমন লাগছে?

ভালো। -মিথিলার কণ্ঠটা কেমন ক্লান্ত শোনায়।

চা খাবে, মিথি? চা করি?

ক’টা বাজে?

চট করে দেয়াল ঘড়িতে সময়টা দেখে নেয় জাহিদ। বলে, দেড়টা।

এত রাতে চা বানাবে?

বানাই, চা খেলে তোমার ভালো লাগবে।

আচ্ছা, বানাও—বলে চোখ বন্ধ করে মিথিলা। আলোটা চোখে লাগে খুব। জাহিদ কিচেনে যায়। শব্দ হয় খুটখাট। চা নিয়ে এসে সে দেখে মিথিলা ঘুমুচ্ছে। ডাকবে কি ডাকবে না ভাবতে ভাবতেই মিথিলা চোখ খুলে তাকায়। জাহিদের হাতে চায়ের কাপ দেখে আস্তে উঠে বসে। হাত বাড়িয়ে কাপটা নেয়। চুমুক দেয় ধীরে। জাহিদের দিকে তাকিয়ে মিনতির গলায় বলে, তোমাকে একটা কথা বলব, রাখবে?

কী কথা?

আমি মারা গেলে আমাকে আমার গ্রামের কবরস্থানে কবর দিও।

এবার হেসে ফেলে জাহিদ। বলে, হঠাৎ একথা কেন?

হঠাৎ নয়। একটু আগেই মনে হচ্ছিল আমি মারা যাচ্ছি। যে কোনো সময় তো মারা যেতেই পারি, তাই না?

হুম। ঠিকই তো। এখন চা খাও। কথা বলার দরকার নাই।

আমি কাল থেকে নামাজ পড়ব জাহিদ।

জাহিদ চমকায়। বড় একটা ধাক্কা খায় যেন। মিথিলা ঘোর নাস্তিক। যুক্তিতর্ক দিয়ে সে প্রাণান্ত চেষ্টা চালায় এটা প্রমাণ করতে যে, ঈশ্বর নেই। হঠাৎ তার এই নামাজি হওয়ার ঘোষণায় বিভ্রান্তি জাগে তার। কী বলবে ভেবে পায় না। বুঝতে পারে মিথিলার মনোজগতে খুব বড় রকমের ধাক্কা লেগেছে। ভয় পেয়েছে সে। কিন্তু কেন? না, এখন তাকে কিছু জিজ্ঞেস করাটা ঠিক হবে না। তার শরীরটা সত্যিই খারাপ মনে হচ্ছে, ভাবে জাহিদ। স্মিত হেসে বলে—

সে তো খুবই ভালো কথা, মিথি। বেশ তো, নামাজ পড়বে কাল থেকে।

ততক্ষণে মিথিলার চা শেষ। খালি কাপটা জাহিদের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলে—

আমি নামাজ পড়তে পারি না জাহিদ, তুমি শিখিয়ে দিও।—বলেই বিছানায় শুয়ে পড়ে মিথিলা। খালি কাপ নিয়ে কিচেনে যায় জাহিদ। কাপ পিরিচ ধুয়ে যথাস্থানে রেখে রুমে এসে দেখে মিথিলা ঘুমিয়ে পড়েছে। লাইট অফ করে সিগারেট আর লাইটার নিয়ে বারান্দায় গিয়ে বসে। সিগারেট ধরিয়ে আয়েশ করে টান দেয়, একমুখ ধোঁয়া ছাড়ে। আকাশে ফুটফুটে জ্যোৎস্না, হাজার তারার ঝিকিমিকি। কিন্তু মনের মধ্যে মিথিলার চিন্তা ডালপালা মেলে দেয়। কী হল মেয়েটার? কোনো স্বপ্ন দেখে ভয় পেল কি? কী এমন স্বপ্ন যা দেখে এত ভয় পেল সে? জাহিদের চোখ থেকে ঘুম উধাও হয়ে যায়। বারান্দা থেকে মিথিলার ঘুমন্ত শরীরটা অস্পষ্ট দেখা যায়। হঠাৎ বাতাসে পর্দাটা সরে যায়, চাঁদের আলো পড়ে মিথিলার মুখে। মিথিলার শ্যামলা, মিষ্টি মুখটা সে আলোয় কী অদ্ভুত মায়াময় দেখায়! ঘুমন্ত মেয়েটার মুখের দিকে তাকিয়ে এক অনির্বচনীয় প্রেম অনুভব করে জাহিদ, এক অন্যরকম কষ্ট জমা হয় বুকে।