“আব্বা তুমি কবে বাড়িতে আইবায়? সেই কোনদিন গেলায় আর তো আইলায় না? তো এইবার আওয়ার সময় আমার লাগি একটা ব্যাগ আর একটা সোয়েটার আইননো।”

প্রতিউত্তরে ফোনের ওপাশ থেকে ভেসে আসা দরিদ্র পিতার কন্ঠস্বর-
“আইচ্ছা মা নিয়ে আইমুনে আর তারাতারি আইমুনে।”

টাকার শহরে থেকেই টাকার সন্ধানে ছুটতে হয় মানুষকে। মাথার ঘাম পায়ে ফেলে উপার্জন করতে হয় সোনার হরিণ। ধনী-গরিবের সম্মিলিত প্রয়াসে চলছে এই অর্থের পিছনে ছুটে চলা। যার আছে সেও চাই যার নেই সেও চাই। তাই বলা চলে আমাদের জীবন আটকে আছে টাকার চক্রে। আর থাকবে নাইবা কেন? অর্থ আয় না করলে যে কেও মুখে অন্ন তুলে দেবে না!

পিতার ভাবনায় এখন একটাই চিন্তা মেয়ের আবদার পূরণ করা। গ্রাম ছেড়ে শহরে এসেছেন কাজ পাওয়ার আশায়। তবে কাজ চাইলেই তো আর পাওয়া যায় না। তাই কখনো তিনি কুলি আবার কখনো হকার। ভারী-ভারী বস্তা কাধে তুলে নিয়ে চলছেন মেয়ের আবদার পূরণ করার জন্য। সকাল সন্ধ্যা ছুটে চলা। পায়ের জুতো ক্ষয় হয়ে গেছে আর চলে না, তবে নিজেকে থামিয়ে দিলে যে চলবে না। দিনরাত অক্লান্ত পরিশ্রম করে যখন ক্লান্ত শরীর তখনও শরীরের রক্তবিন্দু যেন বলে উঠছে-
“টাকা চাই, টাকা চাই”

চক্ষুজোড়া যখন অন্ধকার রাজ্যে প্রবেশ করতে চাই তখন স্বপ্নদেবতা হাতছানি দেয়, যেন বলে উঠছে-
“কি হলো রমিজ মিয়া ঘুমিয়ে গেছো? টাকা কোথায় টাকা কোথায়?

ঘুম যেন তখন পালিয়ে যায়। আবার অপেক্ষা শুরু হয় সূর্যের ঘুম কখন ভাঙবে?

এভাবেই চলে কিছুদিন। ইতমধ্যে কন্যার ব্যাগ- সোয়েটার কেনা হয়ে গেছে। তবে ঘরে যে সহধর্মিণী আছে সেটা খেয়ালই ছিল না রমিজ মিয়ার। হঠাৎ মনে পড়লো আর মনে মনে বলে উঠলো-
“ইসসস জমিলার কথা ভুইলাই গেছিলাম। কতদিন তারে কিছু দেই নাই। বহুতদিন পর বাড়িতে যাইমু তার লাগি না নিলে কেমন হইয়া যায়”।

একটা বড় রকমের নিশ্বাস নিলেন রমিজ মিয়া। আবার ছুটে চললেন সোনার হরিণের খোঁজে।

পৃথিবীটা বড় কঠিন জায়গা। অনেক মানুষের ভিড় দেখা যায় তবে আসলেই কি সবাই মানুষ? সবাই আমরা মানুষ তবে আমাদের পরিচিতি দুই ধরনের।
যথা: ১.সাধারণ মানুষ এবং ২.মুখোশ পরিধানকারী মানুষ।
চোখের সামনে অনেক মানুষ রয়েছে তবে তাদের সবার ভাবনা পৃথক। নিজসার্থ নিয়ে চলছে সবাই,চলছি আমি আপনি।

আবার কিছুদিন অনেক কষ্ট করে রমিজ মিয়া তার সহধর্মিণীর জন্য একটি শাড়ি এবং একটি চাদর কিনতে সক্ষম হলেন। ঘাড়থেকে বিশাল বোঝা তার নেমে গেছে। কষ্টগুলো মুখের হাসিতে পরিণত হয়েছে। এবার বাড়ির পথে যাত্রা। ঠিক তখন পকেটে হাত দিয়ে দেখেন পকেট শূন্য। সোনার হরিণ যে আবার বনমুখী হয়েছে। তিনি মনে মনে ভাবলেন-
“যাওয়ার ভাড়াতো নাই।”

চোখের কোণে তখন অশ্রুকণা ভেসে উঠলো। চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছা করছিল রমিজ মিয়ার। এই পৃথিবী নামক সাম্রাজ্যে তিনি কত অসহায়। আবার ছুটতে হবে কাজের সন্ধানে ছুটতে হবে টাকার সন্ধানে। আচ্ছা রমিজ মিয়া কি তার গন্তব্যে পৌঁছাতে পারবেন? কন্যা যে বাবার ফেরার পথ চেয়ে বসে আছে।

বাস্তবতা বড় কঠিন। আমরা ছুটে চলছি তো চলছি। আমাদের গন্তব্য যে কোথায় গিয়ে শেষ হবে তা অজানা। হয়তো এই ছুটতে ছুটতে চিরদিনের মতোই ছুটে চলার অবসান ঘটবে। আর টাকা নামক অকৃতজ্ঞের কাছে একদিন আমাদের সবাইকে হার মানতে হয়। একদিন রমিজ মিয়ার মতো মানুষ টাকা নামক সোনার হরিণের পেছনে ছুটতে গিয়ে হাপিয়ে নিঃশেষ হয়ে যান।