ছোটগল্প কথাসাহিত্যের একটি বিশেষ রূপবন্ধ যা কাহিনীভিত্তিক এবং দৈর্ঘ্যে হ্রস্ব, তবে ছোটগল্পের আকার কি হবে সে সম্পর্কে কোন সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত নেই। সব ছোটগল্পই গল্প বটে কিন্তু সব গল্পই ছোট গল্প নই। একটি কাহিনী বা গল্পকে ছোটগল্পে উত্তীর্ণ হওয়ার জন্য কিছু নান্দনিক ও শিল্পশর্ত পূরণ করতে হয়। ছোটগল্পের সংজ্ঞার্থ কী সে নিয়ে সাহিত্যিক বিতর্ক ব্যাপক। এককথায় বলা যায়-যা আকারে ছোট, প্রকারে গল্প তাকে ছোট গল্প বলে। যে গল্প অর্ধ হতে এক বা দুই ঘন্টার মধ্যে এক নিঃশ্বাসে পড়ে শেষ করা যায় তাকে ছোটগল্প বলে।
ছোটগল্প সম্পর্কে এডগার অ্যালান পো (১৮০৯-১৮৪৯) বলেন-সমগ্র ছোটগল্পে এমন কোন শব্দ লিখিত হবে না, যার প্রবণতা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে পূর্ব প্রতিষ্ঠিত কোনো একটি কাঠামোর দিকে না যায়।
ছোটগল্পের স্বরূপ নির্দেশ করতে গিয়ে ব্রান্ডার ম্যাথিউস (১৮৫২-১৯২৯) বলেন-একটি মূলচরিত্র, একটিমাত্র ঘটনা, একক আবেগ অথবা একটি পরিস্থিতিবোধক কিছু ভাবাবেগ নিয়ে যৌক্তিক পরিণতির দিকে আবর্তিত করাই ছোটগল্প।
প্রখ্যাত ছোটগল্প গবেষক নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় ছোটগল্পের সংজ্ঞা দিয়েছেন এভাবে-ছোটগল্প হচ্ছে প্রতীতি জাত একটি সংক্ষিপ্ত গদ্য কাহিনী, যার একতম বক্তব্য কোনো ঘটনা বা কোনো পরিবেশ বা কোনো মানসিকতা অবলম্বন করে ঐক্য-সংকটের মধ্য দিয়ে সমগ্রতা লাভ করে।

বাংলা ছোটগল্প ব্যাখ্যা করতে গিয়ে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘সোনারতরী’ কাব্যের যে ‘বর্ষাযাপন’ কবিতাটি প্রায়শই উদ্ধৃত হয়ে থাকে-

ছোটো প্রাণ, ছোটো ব্যথা, ছোটো ছোটো দুঃখকথা
নিতান্ত সহজ সরল,
সহস্র বিস্মৃতিরাশি প্রত্যহ যেতেছে ভাসি
তারি দু-চারটি অশ্রু জল।
নাহি বর্ণনার ছটা ঘটনার ঘনঘটা,
নাহি তত্ত্ব নাহি উপদেশ।
অন্তরে অতৃপ্তি রবে সাঙ্গ করি মনে হবে

শেষ হয়ে হইল না শেষ।

রবীন্দ্রনাথের কবিতাখন্ডে ছোটগল্পের যে সকল গুণাগুণ বর্ণনা করা হয়েছে তা বহু ছোটগল্পের ক্ষেত্রেই প্রাসঙ্গিক কিন্তু এখানেই শেষ নয়। এ সকল গুণাগুণের অতিরিক্ত বৈশিষ্ট্য সমন্বিত ছোটগল্প লিখিত হয়ে থাকে।
তবে ছোটগল্পের শুরুটা হবে একটি আকস্মিক ঘটনা বা ঘটনার কথা দিয়ে যাতে পাঠক সহজেই পরবর্তী লেখাগুলোয় আকর্ষিত হতে পারেন। এটি যে শুধু ঘটনার কথা হতে হবে এমন কথা নেই, সেটি চরিত্র বর্ণনা, কাহিনীর পরিস্থিতি, সংঘাতময় কোন কথা, সামগ্রীক কাহিনীর সেটিং অথবা গল্পের থীমের বক্তব্য দিয়েও শুরু করা যেতে পারে যেখানে তা পাঠকের কাছে আকস্মিক বিস্ফোরণের মতো মনে হতে পারে এবং তিনি আগ্রহের সঙ্গে গল্প বা কাহিনীর পরবর্তী অংশে সহজে প্রবেশ করতে পারেন। একটি বিষয় বিশেষভাবে খেয়াল রাখতে হবে-গল্প বা ছোটগল্প যেন কোনভাবেই প্রতিবেদন বা রিপোর্ট না হয়ে যায় । গল্পের ভেতর যেন গল্প খোঁজে পাওয়া যায়। ছোটগল্পের শরীরে আখ্যান বা কাহিনী কিংবা বিষয় কতখানি জড়ানো হবে সেটা বড় নয়, তার বাইরে একটা গল্পকে সময়ের দাবির কাছে পৌঁছে দেয়া, চরিত্রের আপাদমস্তক খুঁটিয়ে বিশ্লেষণ করাও হবে ছোটগল্প লেখকের একটি বিশেষ কৌশল।
তাছাড়া গল্পে ঘটনা অবশ্যই অতীব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। পাঠক যেন পাঠের সঙ্গে সঙ্গে ঘটনার মধ্যে সংশ্লিষ্ট হয়ে যান। এ ঘটনাগুলো হতে হয় আকর্ষণীয়, প্রয়োজানানুগ, বাহুল্যমুক্ত, কাহিনীর সাথে সংশ্লিষ্ট বা সামঞ্জস্যপূর্ণ। এসব ঘটনা ধারাবাহিকভাবে ঘটতে ঘটতে একটি পরিণতির দিকে অগ্রসরমান হতে থাকবে। মোটকথা ছোট গল্প হবে-‘ছোটপ্রাণ ছোটব্যথা ছোট ছোট দুঃখ কথা’ নিয়ে তৈরি। এর আকার হবে ছোট যাতে করে অল্প সময়ের মধ্যে পড়ে শেষ করা যায়। এতে পূর্ণাবয়ব জীবনের প্রকাশ থাকবে না, থাকবে খন্ডাংশের অসাধারণ মহিমা। অনাবশ্যক ভাষা, চরিত্র এবং ঘটনা বর্ণিত হবে না, হবে নাটকীয় গুণসম্পন্ন গতিময় ও ইঙ্গিতধর্মী। তত্ত্ব-উপদেশকে এড়িয়ে লেখকের অনুভূতি ও বিশেষ প্রতীতির প্রতিফলন ঘটিয়ে শেষ হবে আকস্মিক।

এখন আসা যাক এ ছোটগল্পের উদ্ভব ও ক্রমবিকাশের কথায়। প্রকৃত অর্থে মানুষের আদিম বৃত্তির অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল গল্প বলা বা গল্প শোনা। গল্প বলা বা গল্প শোনার প্রবণতা মানুষের মধ্যে প্রাচীনকাল থেকে বিদ্যমান থাকলেও এর সাহিত্যরূপ পেতে বেশ সময় অতিবাহিত হয়েছে। কবিতা, নাটক, উপন্যাস এমনকি প্রবন্ধেরও পরে ছোট গল্পের সৃষ্টি। মোটকথা কথাসাহিত্য সাহিত্যের একটি সুপ্রাচীন শাখা। আর কথাসাহিত্যের আরেকটি উল্লেখযোগ্য শাখা গল্পসাহিত্য। সেটা মধ্যযুগের ব্যাপার। মাত্র কয়েকশো বছর আগের কথা। ছোটগল্প একান্তভাবেই আধুনিক সাহিত্য-প্রকরণ। মূলত ছোটগল্পের আদি উৎস ভূমি ইউরোপ। রেনেসাঁস পরবর্তীকালে পূঁজিবাদ যখন ক্রমান্বয়ে মাথাচড়া দিয়ে উঠতে থাকে-ঠিক তখনই ছোটগল্প নামক শিল্প আঙ্গিকটির বিকাশ ঘটেছে। এবং এর ঢেউ তরঙ্গায়ীত হতে থাকে দেশ থেকে দেশান্তরে। ক্ষাণিকটা দেরী হলেও তা থেকে বঞ্চিত হয়নি ভারতবর্ষও। শুরুতে আমেরিকা, ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সে সাহিত্যের এই মাধ্যমটি শেকড় মেলতে শুরু করেছিল। বোকাশিও, সার্ভেন্তেস, হেপ্তামেরন, চসার। এঁদের হাত ধরেই বিশ্বসাহিত্যে ছোটগল্প সাহিত্য উদ্বগীত হয়েছে। অষ্টাদশ শতাব্দির দ্বিতীয়াংশে প্রকৃত গল্পসাহিত্যের সূচনা। জার্মান সাহিত্যে হোফ্মান ও ফন ক্লিস্ট; মার্কিন সাহিত্যে ন্যাথনিয়েল হথর্ন; রুশ সাহিত্যে আলেকজান্ডার পুশকিন; ফরাসি সাহিত্যে প্রসপার মেরিমে, বাল্জাক ও গোতিয়ে; আইরিশ সাহত্যে মূর ও জেমস জয়েস-এঁরাই বিভিন্ন দেশে গল্পসাহিত্যের অগ্রসূরী। নিউজিল্যান্ড, স্পেন, ইতালি প্রভৃতি দেশেও গল্পসাহিত্য বিকশিত-বিবর্তিত হয়েছে।
বাংলা সাহিত্যে গল্পসাহিত্য মাত্র শতবর্ষ অতিক্রম করেছে। ঊনবিংশ শতাব্দির নব্বইয়ের দশকের পূর্ব পর্যন্ত গল্প রচিত হয়নি। যদিও বঙ্কিম, সঞ্জীব, নগেদ্রনাথ গুপ্ত, স্বর্ণ কুমারী দেবী প্রমুখ সাহিত্যিকরা গল্প লেখতে চেষ্টা করেছিলেন। তথাপি গল্পসাহিত্য বিশেষ করে ছোটগল্প উৎসারিত হয়েছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের হাত ধরে। যদিও মধ্যযুগেও কাহিনীকাব্য ছিল। আমাদের দেশে পুরাণের গল্প, রূপকথার গল্প, ঈশপের গল্প ইত্যাদি নানা ধরনের কাহিনীর মধ্যেই ছোটগল্পের বীজের সন্ধান করা হয়েছে। তবে রবীন্দ্রনাথ্ই একে পূর্ণরূপে অধিষ্ঠিত করেন। ১৮৭৭ খ্রিস্টাব্দে (বাংলা ১২৪০ সাল) ‘ভারতি’র শ্রাবণ-ভাদ্র সংখ্যায় ‘ভিখারিণী’ গল্প প্রকাশের মাধ্যমে বাংলা ছোটগল্প অঙ্গনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রথম পদার্পণ ঘটে। ‘ভিখারিণী’র সাত বছর পর ১৮৯১ সনে লিখলেন ‘ঘাটের কথা’ ও ‘রাজপথের কথা’ তবে তাঁর প্রথম পরিণত ছোটগল্প ‘দেনা পাওনা’ প্রকাশিত হয় ১৯৯৮ সনে হিতবাদী পত্রিকায়। ‘হিতবাদী’ ও ‘সাধনা’ পত্রিকার চাহিদা পূরণের জন্য তিনি ছোট গল্প লিখতে শুরু করেন। এবং জীবনের প্রায় শেষ পর্যন্ত তিনি ছোটগল্পের চর্চা অব্যাহত রেখেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর সাহিত্য-সাধনায় পূর্ববাংলা তথা বাংলাদেশের পল্লি-প্রকৃতি এবং বাংলার প্রধান নদী পদ্মার অনিবার্য শিল্প-প্রেরণা লাভ করেছিলেন। তিনি তাঁর জমিদারী কর্ম উপলক্ষে ১৮৯২ থেকে ১৯০৪ সাল পর্যন্ত সময়কাল কুঠিবাড়ি কিংবা নৌকায় অবস্থান করেছিলেন পতিসর, শিলাইদহ এবং সাজাদপুরে। এ সময়ে নদীমাতৃক পল্লিবাংলার বিস্তীর্ণ জনপদ ও জীবনযাত্রার স্বরূপ তিনি উপলদ্ধি করেছিলেন তাঁর কবিমানসে। এ সময়ে তিনি কাব্যগ্রন্থ সোনারতরী (১৮৯৪) ও চিত্রা (১৮৯৬), ছিন্নপত্রের চিঠিপত্রসহ অনেক ছোটগল্প। একারণে পদ্মাতীরবর্তী পল্লিবাংলা তাঁর বেশিরভাগ ছোটগল্পের পটভূমি হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। তাঁর ছোটগল্পে নাগরিক জীবনভাষ্যও সমানভাবে গুরুত্ব পেয়েছে। এ দুইয়ের সম্মিলনে তিনি সমগ্র বাঙালি জীবনকে তাঁর গল্পে তুলে ধরেছেন। বিশে^র গল্পসাহিত্যে তখন দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন-অ্যালান পো, মোঁপাসা, সমারসেট মম, চেখভ প্রমুখ সাহিত্যিকরা। এদের সঙ্গে প্রাণের মহাসামুদ্র কল্লোল নিয়ে যোগ দিলেন রবীন্দ্রনাথ। এর আগেও বেশ কিছু প্রতিভাবান লেখক সাহিত্যের এ মাধ্যমটিকে বরণ করে নিয়েছেন। এঁদের মধ্যে তারকনাথ গঙ্গোপাধ্যায় (১৮৪৩-১৮৯১), ত্রৈলোক্যনাথ পুখোপাধ্যায় (১৮৪৭-১৯১৯), ইন্দ্রনাথ বন্দোপাধ্যায় (১৮৪৯-১৯১১), জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৪৯-১৯২৫), স্বর্ণকুমারী দেবী (১৮৫৬-১৯৩২) নগেন্দ্রনাথ গুপ্ত (১৮৬১-১৯৪০) প্রমুখ উল্লেখযোগ্য। আর এর পরে ঢের প্রতিভাবান লেখক সাহিত্যের এ মাধ্যমটিকে বরণ করে এগিয়ে নিয়েছেন সাফল্যের তটরেখা ধরে। উপন্যাসে যে-সাফল্য বাঙালির অনর্জিত, গল্পে যেন অনায়াস সলীল সাবলীলভাবে বয়ে চলল। উনিশ শতাব্দির সর্বশেষ দশেকে বাংলা গল্পসাহিত্য সৃজিত হয়েছিল। বিংশ শতাব্দির প্রথম পঞ্চাশ বছর এক সংরক্ত আবেগে আলোড়িত ছিল দেশ। তার টুকরো টুকরো জুড়ে গল্পসাহিত্য অগণন লেখকের হাতে যেন একটি চলচ্চিত্রে পরিণত হলো, যেখান থেকে ছেঁকে নেওয়া যাবে আমাদের দেশের জীবনেতিহাস।
রবীন্দ্রনাথ, প্রমথ চৌধুরী ও শরৎচন্দ্রের যথাক্রমে কাব্যময়তা, বাগবৈদগ্ধ্যতা ও সমাজমনস্কতা এই ত্রয়ী বৈশিষ্ট্যের পথ ধরে ছোটগল্পচর্চার ক্ষেত্রে নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়। এ সময়ে চারু বন্দোপাধ্যায় (১৮৭৭-১৯৩৮), সুরেন্দ্রনাথ মজুমদার ((১৮৩৮-১৮৭৮), জলধর সেন (১৮৬০-১৯৩৯), হেমেন্দ্রকুমার রায় (১৮৮৮-১৯৬৩), ইন্দিরা দেবী (১৮৭৩-১৯৬০), অনুরূপা দেবী (১৮৮২-১৯৫৮), নিরূপমা দেবী (১৮৮৩-১৯৫১), সীতা (১৮৯৫-১৯৭৪), সৌরেন্দ্রমোহন মখোপাধ্যায়, প্রেমাঙ্কুর আতর্থী, মণীলাল গঙ্গোপাধ্যায়, উপেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়, শরৎকুমারী চৌধুরানী, রবীন্দ্রকন্যা মাধুরীলতা, শৈরবালা ঘোষজায়া, শ্রীশচন্দ্র সেন, আবদুল ওদুদ, শৈলেশচন্দ্র মজুমদার, সুরেশচন্দ্র সমাজপতি, সুধীন্দ্রনাথ ঠাকুর, হেমেন্দ্র প্রসাদ, ভুবনচন্দ্র মুখোপাধ্যায়, প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়, দীনেন্দ্রনাথ রায়, পাঁচকড়ি দে, হরিসাধন মুখোপাধ্যায়, সুরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য, দীনেশচন্দ্র সেন (১৮৬৬-১৯৩৯), হেমেন্দ্রপ্রসাদ ঘোষ (১৮৭৬-১৯৬২), বিজয়চন্দ্র মজুমদার (১৮৬১-১৯৪২), নরেশচন্দ্র সেনগুপ্ত (১৮৮২-১৯৬৪), জগদীশচন্দ্র গুপ্ত (১৮৮৬-১৯৫৭), বিভ’তিভূষণ বন্দোপাধ্যায় (১৮৯৪-১৯৫০), মণীন্দ্রলাল বসু ((১৮৯৭-১৯৮৬), তারাশঙ্কর বন্দোপাধ্যায় (১৮৯৮-১৯৭১), কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯-১৯৭৬), শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায় (১৯০০-১৯৬৭), মানিক বন্দোপাধ্যায় (১৯০৮-১৯৫৬), দীনেশরঞ্জন দাস (১৮৮৮-১৯৪১), গোকুলচন্দ্র নাগ ( ১৮৯৪-১৯২৫), মনীশ ঘটক (১৯০১-১৯৮০), প্রেমেন্দ্র মিত্র (১৯০৪-১৯৮৭), প্রবাধকুমার সান্যাল (১৯০৫-১৯৮৩), বুদ্ধদেব বসু (১৯০৮-১৯৭৪), অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত (১৯০৩-১৯৭৬), সুধীন্দ্রনাথ ঠাকুর, হরিসাধন মুখোপাধ্যায়, নিখিলনাথ, প্রমুখ ছোটগল্পে বিশেষ কৃতিত্ব দেখিয়েছেন।

বাংলা গল্পসাহিত্যের ধারায় প্রবল একটি ধাক্কা দিল ৪৭-এর দেশবিভাগ। কলকাতা সাহিত্যের একচ্ছত্র রাজধানী ছিল। দেশবিভাগের পর ঢাকাও সাহিত্যের আরেকটি কেন্দ্র হয়ে উঠতে লাগল। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, বাঙালির মর্মতলে অপরাজেয় একটি শিখা জে¦লে দিল। এবং পঞ্চাশের দশকেই গল্পসাহিত্যের একটি ভিত্তিভূমি তৈরী হয়ে গেল। আর ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীন সার্বভৌম বাংদেশের জন্ম তার পাটাতন আরো শক্ত করে দিল। আজ অসংখ্য প্রতিভাবান সাহিত্যকের হাতে হাত রেখে গল্পসাহিত্যের বৃক্ষটি পত্র-পল্লবে সুসুভিত হয়ে ফুলে-ফলে মঞ্জুরিত-বিকশিত।
সেই ফল্গুধারাটি বাঙালির গৌরবময় ঐতিহ্যের পথ ধরে রবীন্দ্রনাথ থেকে শুরু করে বর্তমান পর্যন্ত তরুণতম লেখকটি পর্যন্ত-প্রায় শতাধিক বছরের কালখন্ডে-বিচিত্র পথে, চৈতন্যের কত নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়ে সৃষ্টির উজ্জ্বল ফসলগুলি ছড়িয়ে আছে। কত ভিন্নভিন্ন মাত্রায় ব্যক্তি, সমাজ ও জীবনকে প্রভাব বিস্তারকারি লেখকরা, বাঁক বদলের কারিগররা দেখাতে চেয়েছেন! মাত্র একশ বছরের মধ্যে বাংলা গল্প যে সমৃদ্ধি অর্জন করেছে তা সত্যিই বিস্ময়কর।
রাষ্ট্রযন্ত্রের নানাবিধ পরিবর্তনের পরিপ্রেক্ষিতে আধুনিক সমাজব্যস্থায়ও এসেছে বহুমাত্রিক পরিবর্তন-পরিবর্তন। ঘটেছে নানা রূপান্তর। তাই ব্যক্তির সমস্য আর এখন একরৈখিক নয়। নানা রকম অসংগতি ও অব্যবস্থাপনা যেমন তার উপর চেপে বসেছে, তেমনি সে নিজেও ছড়িয়ে পড়েছে ক্ষুদ্র গন্ডি থেকে বিস্তৃত ভূগোলে। ফলে ব্যক্তির কোনো একটি বিশেষ সমস্যার সঙ্গে আধুনিক গল্পকে ধারণ করতে হচ্ছে তার একাধিক সমস্যা-সংকট। ব্যক্তিকে বৃহত্তর সামাজিক-রাষ্ট্রিক-সাংস্কৃতিক পরিপ্রেক্ষিতে ধারণ করতে গিয়ে ছোটগল্পের বিষয় যেমন হয়ে পড়ছে বিস্তৃত, তেমনি আঙ্গিক-ভাষাও হয়ে উঠেছে জটিলতর। এ কারণে বাংলা ছোটগল্প তার সৃজনকালের বৈশিষ্ট্য থেকে অনেক দূরে সরে এসে ক্রমে নতুন বৈশিষ্ট্য ধারণ করে নতুন নতুন পথে অভিক্ষেপ করে চলছে। এ জন্য বহু চড়াই-উতরাই পেরিয়ে বিষয়-আঙ্গিকের বৈচিত্রে, বহুমাত্রিক জীবনবোধের অন্বেষণে, শিল্পোৎকর্ষে বাংলা ছোটগল্প আজ মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত।
তবে গল্প সাহিত্য মাথা উঁচু করে, বিশাল পতাকা উড়িয়ে রাজপথে হেঁটেছে যেমন, তেমনই বাধা পথ থেকে নেমে এসে ঢুকেছে জনজীবনের নির্মম বাস্তবের সমস্ত কুঠুরিতে-সেজন্য তৈরী করে নিয়েছে নতুন পথ, সরল, সিধে, আঁকাবাঁকা বা স্বপ্নিল সব পথ। আবছা গলিঘঁজি বা দীপ্তিমান তীর্যক সড়ক। প্রবাহমান সময়-সমাজ-জীবন ও জীবনের নানা অনুষঙ্গ নিয়ে মোকাবেল করেছেনে হাজারো প্রতিবন্ধকতা। ছোটগল্পকে দিয়েছেন প্রাণশক্তি, এনেছেন বিষয়ের বৈচিত্র-চরিত্রের ভিন্নতা-বর্ণনায় অভিনবত্ব। চিন্তার গহনে জাগিয়ে তুলেছেন উৎকর্ষতা। তাই ভাষার শৈলীতে নির্মাণ কৌশলে বাংলার ছোটগল্প তুলনারহিত কিংবা বলা যায় পৃথিবীর যেকোন ভাষার সাফল্য উজ্জ্বল গল্পের সঙ্গে তুলনীয়।

বাংলা ছোটগল্পকারের তালিকাও বেশ দীর্ঘই বলা যায়- তারাশঙ্কর বন্দোপাধ্যায়, বিভুতিভূষণ বন্দোপাধ্যায়, আবুল ফজল, আবু ইসহাক, সৈয়দ ওয়ালীওল্লাহ, বন্দে আলী মিয়া, আবুল কালাম সামসুদ্দীন, জহির রায়হান, প্রেমেন্দ্র মিত্র, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়, সৈয়দ মুজতবা আলী, সঞ্জয় ভট্টাচার্য, জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী, কাজী আব্দুল ঔদুদ, সমরেশ বসু, আবুল মনসুর আহমেদ, অদ্বৈত মল্লবর্মণ, অমরেন্দ্র ঘোষ, সোমেন চন্দ্র, শওকত ওসমান, রাবেয়া খাতুন, মিন্নাত আলী, রাহাত খান, শওকত আলী, রশীদ হায়দার, আল মাহমুদ, সৈয়দ শামসুল হক, হাসান আজিজুল হক, আনোয়ারা সৈয়দ হক, পূরবী বসু, সেলিনা হোসেন, হুমায়ূন আহমেদ, আবু রুশদ, রিজিয়া রহমান, শওকত ওসমান, সরদার জয়েনউদ্দীন, শাহেদ আলী, সুচরিত চৌধুরী, বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, বশির আলহেলাল, মাহমুদুল হক, রাহাত খান, বুলবুল চৌধুরী, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, শহীদুর রহমান, কায়েস আহমেদ, সাইয়িদ আতীকুল্লাহ, সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, মঞ্জু সরকার, জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত, ইমদাদুল হক মিলন, আব্দুল মান্নান সৈয়দ, শহীদুল জহির, মঈনুল আহসান সাবের, মোহিত কামাল, আনিসুল হক, হাসনাত আবদুল হাই, হরিশংকর জলদাস, আবুল বাসার, মনোরঞ্জন বেপারী, শুকান্ত চট্টোপাধ্যায়, নাসরিন জাহান, জাকির তালুকদার, আনিসুল হক, হরিপদ দত্ত, রফিকুর রশিদ, এমনকি ইদানিংকার তরুনদের দ্বারাও বেশ মানসম্মত গল্প লেখা হচ্ছে। যেমন নূরুদ্দিন জাহাঙ্গীর, মণিশ রায়, নাজিব ওদুদ, কামরুজ্জাম জাহাঙ্গীর, রায়হান রাইন, মশিউল আলম, সাদ কামালী, রবিউল হুসাইন, বদরুন নাহার, দিলারা হাশেম, মঞ্জু সরকার, জুবইদা গুলশান আরা, শাহনাজ মুন্নী, রাজিব নূর, মনি হায়দার, রাফিক হারিরি, রুমানা বৈশাখ, আহমেদ মোস্তফা কামাল, অদিতি ফাল্গুনি, স্বকৃত নোমান, আমির হোসেন, শাদমান শাহিদ, আশরাফ জুয়েল, ইসরাত তানিয়া, মাসউদ আহমাদ, শামীম আহমেদ, ফজলুল কবিরী, মুনতাসীর মারুফ,হাসান মাহবুব, রাশেদ রহমান, কাজল শাহনেওয়াজ, জাফর তালুকদার, নূর কামরুননাহার, মনিরা কায়েস, তানভির মাহমুদ, মহি মুহাম্মদ, চন্দন আনোয়ার, মাতিউর রহমান, আহমেদ খান হীরক, সাঈদ আজাদ, খালিদ মারুফ, নাজমা পারভিন, আশান উজ জামান, মোজাফ্ফর হোসেন, রেজওয়ান তানিম, রাসেল রায়হান, সাব্বির জাদিদ, সুহান রিজওয়ান, হাবিবুল্লাহ ফাহাদ, হামিম কামাল, মাহবুব ময়ূখ রিশাদ, মেহেদী ধ্রুব, কে এম রাকিব, হুমায়ূন শফিক, সুবন্ত যায়েদ, ইশিতা জেরীন, এনামুল রেজা, আবু উবায়দাহ তামিম, হাসান শিবলী, কায়েস সামী প্রমুখ।