ছোটগল্পের অতীত খুব দীর্ঘ না হলেও সাহিত্যের এ শাখার ব্যাপ্তি কিছুতেই কম নয়। পৃথিবীর কালজয়ী ছোটগল্পকারদের গল্প দ্রুত জয় করে নিয়েছে পাঠক হৃদয়। বাংলা ছোটগল্পের ক্ষেত্রেও তার ব্যত্যয় ঘটেনি। কিন্তু তারপরও কোথায় যেন ছোটগল্পের চারিত্র্যে অপরিণিতির লেবেল আঁটা, অন্তত সমকালীন প্রবণতায় তেমনটিই মনে হয়। ছোটগল্প সম্পর্কে এমন রূঢ় বক্তব্যের সপক্ষে আমাদের সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হকের গদ্যের শরণাপন্ন হচ্ছি-

‘…আমাদের কথাসাহিত্যে তাহলে ছোটগল্পেরই ফলন বেশি। এর একটা কারণ কিংবা উৎসাহ বোধহয় এই- ছোটগল্প না হলে সাহিত্য সাময়িকী অচল, মাসিকপত্র অচল, ছোটকাগজেরও তথা বাস্তবতা। অতএব নিরন্ত চাহিদা আছে ছোটগল্পের, নতুন লেখকেরা শুরু করছেন ছোটগল্প দিয়েই। ছোটগল্পের জন্য সম্পাদক পথ চেয়ে আছেন, বেশ ব্যাকুলভাবেই; লেখা ছাপা হওয়ার সম্ভাবনাও সেই কারণে অনেক বেশি। লেখক লিখেই চলেছেন, সম্পাদকও ছেপে দিচ্ছেন লেখাটা চলনসই হলেই- পত্র-পত্রিকায় নিরন্তর যে গল্পগুলো বেরোচ্ছে তা অভিজ্ঞ চোখে পাঠ করলেই ধরা পড়বে, এর অধিকাংশই অনেকটা কাঁচা, প্রায় শিক্ষানবিশের রচনা। তবু, পাঠযোগ্য কিছু গল্প তো আমরা পাচ্ছিই। কিন্তু সেই ছোটগল্প নিয়ে লেখক যখন বই করতে চান, নতুন লেখক হলে প্রকাশক মুখ ফিরিয়ে নেবেন;’ (ছোটগল্প : কথা কতিপয় ॥ সৈয়দ শামসুল হক ॥ কালি ও কলম-ভাদ্র ১৪১৯ ॥ ছোটগল্প সংখ্যা ২০১২)

সৈয়দ হকের এই পর্যবেক্ষণকে খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিভূতিভুষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রেমেন্দ্র মিত্রসহ অসংখ্য গল্পকারের ছোটগল্প থেকে আমরা সফল চলচ্চিত্র দেখেছি, এঁদের কারও কারও ছোটগল্প পড়ে বাঙালি পাঠক নিভৃতে চোখের জল ফেলেছে, তারপরও প্রকাশনা ক্ষেত্রে ছোটগল্পের প্রতি এ অনিহা কেন? কেন পাঠক গল্পগ্রন্থের প্রতি অনাগ্রহী সেটিও খুঁজে দেখা আবশ্যক। আবশ্যিক এ কাজটি করবেন কে? গল্পকারতো বটেই, তার চেয়েও অধিক দায় বোধকরি প্রকাশকের। কিন্তু আমাদের প্রকাশকদের সিংহভাগতো কোনো ধরনের দায় কাঁধে নিতে রাজি নন; ছোটগল্পের বিপুল সম্ভাবনার দুয়ারটি তাই বন্ধ হয়ে যাচ্ছে আমাদের চোখের উপর। যে ছোটগল্পের এতটাই সম্ভাবনার দিক বিভিন্ন মিডিয়ায়, সে কেন প্রকাশকের দুয়ারে মুখ থুবড়ে পড়বে! তাহলে কি ধরে নেব, পত্র-পত্রিকা, সাময়িকী বা লিটল ম্যাগাজিনের সম্পাদকরা আগ্রহ নিয়ে ছোটগল্প ছাপছেন পাতা ভরাটের জন্য, অথবা নিতান্তই একটা আইটেম বাড়াবার জন্য? এ কথা তো সত্যি দৈনিকে, সাময়িকীতে অথবা লিটল ম্যাগাজিনে গোটা একটা উপন্যাস ছাপানো সম্ভব নয়, ধারাবাহিক উপন্যাসও ছাপানো সহজ নয়, বিশেষত সব কাগজই যদি ধারাবাহিক উপন্যাস ছাপতে শুরু করে পাঠকের নিশ্চয়ই দুর্গতি হবে। তবে কি পাঠককে দুধের স্বাদ ঘোলে মিটাবার সুযোগ করে দিচ্ছে কাগজগুলো? এতটা সাদামাটাভাবে কথাগুলো মানতে আমি রাজি নই বলেই এ গদ্যের অবতারণা।

প্রকাশনা ক্ষেত্রে ছোটগল্পের এই সংকটের একটা ধনাত্মক দিকও আছে। ছোটগল্পকে সাহিত্যের বড় বাজার মোকাবেলা করতে হয় না। এখানে কবিতার সঙ্গে ছোটগল্পের মিল। আমাদের প্রকাশকরা কিন্তু কবিতার বইও সহজে কেউ প্রকাশ করতে চান না, আমাদের দৈনিকের সাহিত্যপাতা-সাময়িকী, লিটল ম্যাগাজিন অথবা যে কোনো মিডিয়া, সর্বত্র কবিতার জয়-জয়কার। সম্পাদকরা কবিতা এবং কবিতা বিষয়ক গদ্যের উপর অনেকটাই নির্ভরশীল, প্রতিদিন গড়ে বাংলাদেশে দু’চার-পাঁচশ’ কবিতা মুদ্রিত হচ্ছে, প্রকাশিত হচ্ছে; প্রকাশকের কাছে গেলেই ‘কবিতার পাঠক নেই- কাব্যগ্রন্থের বিক্রি নেই!’ সে বিবেচনায় কবিতা এখন স্বনির্ভর, অথবা বলা যায় বাজারমুখাপেক্ষি নয় কবিতা। ছোটগল্পের নিয়তি কি সেদিকেই যাচ্ছে? কবিতা এবং ছোটগল্প দু’য়েরই পাঠক আছে ম্যালাই কিন্তু বাজার নেই। ছোটগল্পকারদের অবশ্য একটা সম্ভাবনার দিক আছে, তারা দ্রুত উপন্যাসের দিকে ধাবিত হতে পারেন, হচ্ছেনও তাই। হাসান আজিজুল হকের মতো ছোটগল্প কামড়ে থাকা কথাশিল্পী বাংলাসাহিত্যে ক’জন আছেন খুঁজে দেখতে হবে। সম্ভাবনার দুয়ার যেখানে বন্ধ সেখানেই তো অচলায়তন ভাঙার লড়াই- যেখানে লড়াই-সংগ্রাম সেখানেই তো সাহসী মানুষের ভিড়। কবিতা আর ছোটগল্প তাই বাজার না পেলেও লেখা হচ্ছে দেদার। ছোটগল্প নিয়ে বড় আশাবাদের যায়গা এখানেই।

কথাসাহিত্যের যারা পাঠক তাদের বড় অংশ উপন্যাস পড়তে আগ্রহী সন্দেহ নেই, কিন্তু শর্ত হচ্ছে উপন্যাসে পর্যাপ্ত গল্প থাকা চাই, গল্পপ্রধান উপন্যাস যেন তাদের মুখোরোচক ভোগ্যপণ্য। ছোটগল্পের পাঠক কথাসাহিত্য-পাঠকশ্রেণীর মূল স্রোত না হলেও বিদগ্ধ অংশ; যারা ছোটগল্পের রসাস্বাদনে নিষ্ঠ-আন্তরিক। ছোটগল্পের কাছে তাদের প্রত্যাশা ছোট নয়; এবং তাদের প্রত্যাশা পূরণে গল্পকার নিজস্ব শিল্পভাবনার সর্বোচ্চ সন্নিবেশের সুযোগ পান তার গল্পে। বাজার নিয়ে যেহেতু গল্প লেখককে ভাবতে হয় না, সঙ্গত কারণেই তার স্বাধীন শিল্প ভাবনাগুলো স্বতঃস্ফূর্ততা পায়। গল্পকার সাহসী হলে তার গল্পের বিন্যাসে-বর্ণনে-বুননে-প্রকরণে-ভাষায়-বিষয়ে নবতর রূপারোপের স্পর্ধা দেখাতে পারেন। এভাবেই সাহসী ছোটগল্পকারদের স্পর্ধায় সাহিত্যের সীমাবদ্ধতা ডিঙিয়ে যাওয়ার অন্যতম সোপান তৈরি হতে পারে। ছোটগল্প নিয়ে বড় আশাবাদের এটিও এক অন্যতম অনুষঙ্গ বটে।

অভিযোগ ওঠে, ছোটগল্পের বিশাল ভাণ্ডার থাকলেও রবীন্দ্রনাথ তার নিজের ছোটগল্প নিয়ে উল্লেখযোগ্য কোনো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেননি, তারপরও রবীন্দ্রনাথই নিজের সময় থেকে আজ অবধি বাংলা ছোটগল্পের পুরোধা-পুরুষ। বিশেষত ছোটগল্পের প্রাথমিক পর্যায় থেকে আজ অবধি রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্প পাঠকের বিবেচনা পাচ্ছে এবং আজকের একজন পাঠক পর্যন্ত তার গল্প পড়ে আন্দোলিত হচ্ছেন এ কী কম কথা! ছোটগল্পের সংজ্ঞায়ন করতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ যে পদ্যটি রচনা করেছেন তার উল্লেখ না হয় নাইবা করলাম, সে পদ্যে তো এক অর্থে ছোটগল্পের বিপক্ষেই বলা হয়েছে;

‘নাহি তত্ত্ব নাহি উপদেশ অন্তরে অতৃপ্তি রবে সাঙ্গ করি মনে হবে শেষ হয়ে হইল না শেষ।’

যেখানে পাঠক জেনেই যাচ্ছেন গল্প পাঠে অতৃপ্তি, সেই অতৃপ্তির দিকে পাঠক যাবেন কেন? কিন্তু তাই কি শেষ কথা? না, কথা আরও আছে; মানুষের জন্য অতৃপ্তিই তো আকর্ষণ। যতক্ষণ অতৃপ্তি ততক্ষণই তো আকর্ষণ। পূর্ণ পরিতৃপ্তির পর কে মাড়ায় সে পথ? আর অতৃপ্তির পর পাঠক নিজে যখন পেয়ে যায় সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ, তখন সে অনেকটাই স্বাধীন নয়? আজকের এই তথ্যপ্রবাহঋদ্ধ বিশ্বে পাঠক যখন অবিরাম তথ্যের পেছনে ছুটছে, তখন সে সংক্ষিপ্ত সময়-পরিসরে অপূর্ণ আয়োজনেও পরিপূর্ণ তৃপ্তি পেতে পারে ছোটগল্প পাঠে। কোন্ মোহের হাতছানিতে ছোটগল্পকার ঔপন্যাসিক হয়ে উঠতে চান রাতারাতি। প্রকাশনা বাণিজ্যের বাটখাড়ায় ছোটগল্পের অন্য আর কী কী সংকট আছে সেগুলো চিহ্নিত হওয়া আবশ্যক। আর যদি অন্য কোনো ঘাটতি আবিষ্কৃত না হয়, তাহলে প্রকাশনা-সংশ্লিষ্ট সংকটটিকে দূর করে ছোটগল্পের প্রাপ্য সম্মান তাকে ফিরিয়ে দেয়া উচিত।

বাংলাসাহিত্যে ছোটগল্পের বিস্তার কত দ্রুত এবং কত ব্যাপ্ত হয়ে উঠেছে সব নিয়েই আশাবাদের কথা, সঙ্গে অতৃপ্তির অনুষঙ্গ তো আছেই, সব নিয়েই ছোটগল্প প্রসঙ্গে আশাবাদের গল্প।

বাংলাভাষায় ছোটগল্প চর্চা অনেক বিলম্বিত; বঙ্কিমচন্দ্রের সময়ে প্রথম বাংলায় ছোটগল্প রচনার প্রয়াস হলেও বাংলা ছোটগল্প পরিণতি পায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের হাতেই। উনিশ শতকের শেষদিকে বাংলায় ছোটগল্পের আঙ্গিক-বৈশিষ্ট্য ও চারিত্র্য নিয়ে আলোচনার সূত্রপাত। রবীন্দ্রনাথ তার স্বপ্নের যথার্থ ব্যবহার করেছেন ছোটগল্পে। যে স্বপ্ন বাঙালি পাঠকের অন্তর ছুঁয়ে যাওয়ার সামর্থ্য রাখে। রবীন্দ্রনাথের পর প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়, প্রেমেন্দ্র মিত্র, বিভূতিভুষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, বুদ্ধদেব বসু, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, তারাশংকর বন্দ্যোপাধ্যায়, অন্নদাশঙ্কর রায়, সুবোধ ঘোষ, বনফুল (বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়), অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত, পরশুরাম, আশাপূর্ণা দেবী, সমরেশ বসু, জ্যোতিরিন্দ নন্দী প্রমুখের পরম্পরা নিয়ে আবুল মনসুর আহমদ, মাহবুব-উল-আলম, আবুল ফজল, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, শওকত ওসমান, সরদার জয়েনউদদীন, আলাউদ্দিন আল আজাদ, আবু জাফর শামসুদ্দীন, মবিন উদ্দিন আহমদ, আবু রুশদ, শাহেদ আলী, সৈয়দ শামসুল হক, আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরী, শওকত আলী, হাসান আজিজুল হক, জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত, রাহাত খান, মিন্নাত আলী, শহীদুল্লাহ কায়সার, জহির রায়হান, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, রশীদ করিম, আবুবকর সিদ্দিক, কায়েস আহমদ, আবদুশ শাকুর, আনওয়ার আহমদ, রশীদ হায়দার, আবদুল মান্নান সৈয়দ, আশীষকুমার লৌহ, আহমেদ জামান চৌধুরী, আমজাদ হোসেন, নাজমুল আলম, হাসনাত আবদুল হাই, মাফরুহা চৌধুরী, খালেদা এদিব চৌধুরী, সেলিনা হোসেন, রিজিয়া রহমান, আবুল খায়ের মোসলেহ উদ্দিন, দিলারা হাশেম, হেলেনা খান, জুবাইদা গুলশান আরা, ঝর্ণাদাশ পুরকায়স্থ, আবুল কালাম মঞ্জুর মোর্শেদ, মাহমুদুল হক প্রমুখ স্বাধীনতাপূর্ব বাংলাদেশে ছোটগল্প রচনায় বিশেষ অবদান রেখেছেন। রবীন্দ্রনাথের জীবদ্দশাতেই বাংলা ছোটগল্পে নিন্মবর্গ এবং প্রান্তিক মানুষের জীবনযাত্রা বাঙ্গময় হয়ে উঠতে দেখেছি আমরা, চল্লিশের দশকে বাংলা ছোটগল্পে ফ্রয়েডীয় এবং মার্কসীয় দর্শন প্রবল হয়ে উঠতে দেখেছি; এ বিষয়গুলো বাংলাদেশের ছোটগল্পে এবং শিল্প-চৈতন্যে গুরুত্ববহ হয়ে ওঠে ষাটের দশকে। বাঙালির ইতিহাসে ষাটের দশককে বলা যায় জাগরণকাল, আর সত্তরকে বলা যায় লক্ষ্যভেদ পর্বকাল। পাকিস্তানি দুঃশাসনের তেইশ বছর ধরেই পূর্ববঙ্গের মানুষকে সংগ্রাম করতে হয়েছে। বাঙালির লড়াই-সংগ্রামের তেইশ বছরে বাঙালির জীবনে বহুমাত্রিক গল্পেরও জন্ম হয়েছে। আমাদের মুক্তিযুদ্ধ যে পরিমাণ গল্পের জন্ম দিয়েছে, তার সিকিভাগও কি ধারণ করেছে বাংলাদেশের ছোটগল্প? এ প্রশ্ন উচ্চারিত হয়েছে বহুবার। হয়তো তা ধারণ করেনি পূর্ণমাত্রায়, কিন্তু স্বাধীনতা-উত্তর ছোটগল্পের মেজাজে বহুমাত্রিকতা যুক্ত হয়েছে উল্লেখযোগ্য মাত্রায়ই। বহুমাত্রিকতায় যেমন আছে রাজনৈতিক অনুষঙ্গ, আছে সামাজিক-ঐতিহাসিক এবং পারিবারিক অনুষঙ্গও। ছোটগল্পের কাছে পাঠকের শিল্পপ্রত্যাশার দাবি তালিকাভুক্ত গল্পকারদের অধিকাংশই পূরণে ব্যর্থ হলেও কতিপয় গল্পকার সে দোষমুক্ত। অবশ্য সব সময়ই সংখ্যাগুরু গল্পকারের গল্পে তরল আবেগের বাড়াবাড়ি দেখা গেছে; কিন্তু যে ক’জন গল্পকারের গল্প পড়ে বিদগ্ধ পাঠক তৃপ্ত তারা পাঠক হিসেবে সংখ্যালঘু হলেও সুদূর প্রসারী।

বাংলাদেশের ছোটগল্পের পরম্পরার দিকে দৃষ্টি দিলে দেখা যায়, সত্তরের দশকে বেশ ক’জন নতুন গল্পকারের আগমন ঘটলেও সত্তর দশককে শাসন করেছেন পঞ্চাশ ও ষাটের গল্পকাররাই। সত্তরের প্রভাবশালী গল্পকাররা হলেন- আহমেদ হুমায়ূন, হুমায়ূন আহমেদ, শহীদ আখন্দ, মকবুলা মনজুর, মাহবুব তালুকদার, সুব্রত বড়–য়া, সুশান্ত মজুমদার, হরিপদ দত্ত, সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, আবু সাঈদ জুবেরী, আনোয়ারা সৈয়দ হক, মইনুল আহসান সাবের, ইমদাদুল হক মিলন, আতা সরকার, নিয়ামত হোসেন, জাফর তালুকদার, হারুন হাবীব, ঝর্ণাদাশ পুরকায়স্থ, হারুন অর রশীদ, মুহম্মদ জাফর ইকবাল, ফাইজুস সালেহীন প্রমুখ। অবশ্য এঁদের বেশ ক’জন গল্পে হাত পাকান স্বাধীনতা পূর্বকালেই। সত্তরে যারা অগ্রগামী ছিলেন তাদের অধিকাংশই আশিতেও তৎপর ছিলেন, এবং সঙ্গত কারণেই তারাই ছিলেন অগ্রবর্তী। আশিতে যুক্ত হয়েছেন- নাসরীন জাহান, ফরিদুর রেজা সাগর, শহীদুল জহির, হরিশংকর জলদাস, নয়ন রহমান, মোহম্মদ আবদুল মাননান, সালিম হাসান, ভাস্কর চৌধুরী, খালেদ হোসাইন, মোহম্মদ ইসমাইল, আলমগীর রেজা চৌধুরী, ফিউরি খোন্দকার, হুমায়ূন মালিক, আনিসুল হক, মশিউল আলম প্রমুখ; নব্বইয়ের চোখে পড়ার মতো গল্পকারদের মধ্যে- রফিকুর রশীদ, সাদ কামালী, আসিফ নজরুল, অরুণ চৌধুরী, মনি হায়দার, রাশেদ রহমান, আফরোজা পারভীন, মাহবুব রেজা, সুমন্ত আসলাম, আনোয়ারুল হক, আহমদ মোস্তফা কামাল, অদিতি ফাল্গুনী প্রমুখ; এবং নতুন শতাব্দীতে অসংখ্য সম্ভাবনা। দু’একটি নাম অবশ্যই বলা যায়; যারা হলেন- কনিকা রশীদ, সাইফুর রহমান, রোকেয়া ইসলাম, রুহুল আমিন বাচ্চু, মাহবুব রেজা প্রমুখ। নতুন শতাব্দীতে অনেক গল্পকারের নাম তালিকায় থাকলেও যাদের নাম উল্লেখ করা হল তাদের কোনো কোনো গল্প পাঠক হিসেবে বর্তমান নিবন্ধকারকে চমকে দিয়েছে। অবশ্য তারা যে আগামী দশকেও গল্পের সঙ্গে থাকবেন সে বিষয়ে নিবন্ধকারের যথেষ্ট সংশয় আছে। দশক বিভাজনে যাদের নাম উল্লেখ করা হল তারা সেই দশকের গণ্ডি পেরিয়ে পরবর্তী দশকেও ক্রিয়াশীল থেকেছেন। গল্পের পাঠক এবং গল্পগ্রন্থ প্রকাশনা বিষয়ক যে বৈষম্যের কথা আগেই বলা হয়েছে, আমাদের গল্পকাররা সবকিছুকে ডিঙিয়ে গল্পচর্চায় নিয়োজিত আছেন; যদিও প্রকাশনা বাণিজ্যের সঙ্গে অধিকাংশ গল্পকারই নিজেকে সমন্বয় করে নিয়েছেন; কিন্তু তারপরও যারা গল্পের সঙ্গে বসবাস করছেন তাদের সংখ্যাও যে নেহাত অল্প নয়, তাও ছোটগল্প নিয়ে বড় আশাবাদের আরেক অনুষঙ্গ।

ছোটগল্প নিয়ে বড় আশাবাদের শেষ অনুষঙ্গটি উল্লেখ করেই ইতি টানব। আগেই বলেছি ছোটগল্পের প্রতি বৈষম্যই যেমন ছোটগল্পকে সাহসী করেছে, তেমনি প্রতিবাদীও করেছে, করে তুলেছে স্বনির্ভর-স্বশাসিত। স্বনির্ভর হওয়ার সুবাদে ছোটগল্প নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষার অবকাশও তৈরি হয়েছে দেদার। এ ক্ষেত্রে সত্তর এবং পরবর্তী সময়ের গল্পকারদের গল্প প্রসঙ্গে সামান্য মন্তব্য উপস্থাপন করছি। এ মন্তব্য সমসাময়িক বেশ ক’জনার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে পারে। তাদের গল্প পড়ে পাঠক নিশ্চয়ই আবিষ্কার করবেন ছোটগল্পেই তাদের মুন্সিয়ানা স্ফূর্তি পেয়েছে। স্বাধীনতা পূর্বকালে আইয়ুবীয় স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে ছাত্র-যুবক থেকে সাধারণ প্রান্তিক মানুষ কিভাবে প্রতিবাদী-বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে সে চিত্র দেখতে পেয়েছি বেশ ক’জনের গল্পে। অন্য দিকে তাদের গল্পে দেখতে পাই স্বাধীনতা-উত্তর সময়ের স্বপ্নভঙ্গের চালচিত্র, যুথবদ্ধ এক জনগোষ্ঠীর বিচ্ছিন্ন হওয়ার বয়ান আছে সেই সব গল্পে। ১৯৭৫-এ বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর সামরিক কর্মকর্তাদের অন্তর্দ্বন্দ্ব আর উচ্চাভিলাস পড়ে নিতে পারি কারও কারও গল্পে। আবার সদ্য স্বাধীন দেশে একদিকে নকশালবাড়ি আন্দোলন অন্যদিকে হত্যা-গুম ইত্যাদি যখন নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে উঠছে, সে সময়ের এক মেধাবী চিত্রকল্প ফুটে উঠেছে কারও গল্পে। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে ’৭১-এ পরাজিত শত্রুদের ষড়যন্ত্র এবং তাদের হিংস্র থাবার ক্রমবিস্তারের দুঃসহ লজ্জা কিভাবে আমাদের বিবেককে গ্রাস করেছে সে চিত্রও আলোকিত হয়েছে এ সময়ের গল্পে। শ্রেণি-চৈতন্য আর সাম্য চিন্তার প্রতীকী উপস্থাপন করেছেন কেউ কেউ। গল্প বুননের পদ্ধতি একেবারে নতুন না হলেও বর্ণনারীতি বিশেষ বিবেচনার দাবি রাখে। কারও গল্পের শুরুতেই নাটকীয়তা পাঠককে টেনে নিয়ে যায় গল্পের গভীরে। বাংলাদেশের সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর অনিশ্চয়তাপূর্ণ জীবনের গল্প মানবিক গভীরতায় বুনন করেছেন তারা। কারও কারও উপস্থাপনায় যতটা নির্মোহ ও নিরপেক্ষ অবস্থান প্রত্যক্ষ করা যায়, তাও আমাদের ছোটগল্পের আশাবাদের একটা আশ্রয়। এভাবেই আমাদের গল্পকার এবং গল্প পূর্ণ হয়ে উঠেছে পাঠকের বিবেচনায়।

ষাটের দশকে বাংলাদেশের শিল্প-সাহিত্যে মার্কসীয় চিন্তা-চেতনার যে প্রবল প্রভাব-বলয় সৃষ্টি হয়েছিল স্বাধীনতা-উত্তরকালে প্রধানত সে ধারারই গল্প লিখেছেন ঋদ্ধ গল্পকাররা; এ সময়ের গল্পকারদের ঋদ্ধ যে কারও গল্প নিয়েই এ আলোচনা পল্লবিত হতে পারে, কিন্তু আপাতত সেদিকে যাচ্ছি না।

বাংলাদেশের ছোটগল্পের পরম্পরায় বাঁক পরিবর্তনের ঘটনা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং নতুন ধারার সংযোজনা কম হলেও একেবারে শূন্য নয়, তবে সম্ভাবনাময়দের পরিচর্যার প্রবণতা নিতান্তই কম; সে অপ্রতুলতা প্রকাশকদের পক্ষ থেকে যতটা, পাঠকগোষ্ঠীর পক্ষথেকেও ততটাই; তারপরও সত্তর-আশি-নব্বই দশক এবং একবিংশের প্রথম দশকের গল্পকাররা নিজেদের নিষ্ঠা-মনন-মনীষা দিয়ে বাংলা ছোটগল্পের অগ্রযাত্রার সংগ্রামকে নিত্য অব্যহত রেখেছেন সেটিও বাংলা ছোটগল্পের বড় সম্ভাবনার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।