ঠিক কোন কোন কাজগুলি করলে কেউ একটি লেখা সম্পন্ন করতে পারেন তার সুনির্দিষ্ট কোনো রূপরেখা নেই। তারপরও দীর্ঘদিন ধরে লেখালেখির নিয়মকানুন আবিষ্কারের চেষ্টাটাও কমবেশি চলে আসছে।
সেই অনুযায়ী চলেছে নানা রকম অনুশীলনও।

লেখাও এক খেলা। যেমন মাঠে নামার আগে দিনভর অনুশীলন। সেটিও যে হুবহু কাজে লাগবে তা তো নয়। খেলা তো এক ধরনের যুদ্ধও। আমরা সবাই জানি যেকোনো যোদ্ধাকে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতে হয়। নিজের অস্ত্রটিকে নিয়মিত পরিষ্কার করতে হয়। তারপর প্রকৃত যুদ্ধের মাঠে প্রতিপক্ষের মার ও পাল্টা মার অনুযায়ী সাজাতে হয় রণকৌশল। পরিস্থিতির ফেরে রণকৌশলও বদলাতে হয়। সেই রণকৌশলটা সাজাতে অনুশীলনটা কাজে দেয়। কিন্তু তত্ত্ব মেনে, অনুশীলন করেও হুবহু সেই ছকে কোনো কিছুই করা যায় না। না লেখায়, না খেলায়, না যুদ্ধে, না জীবনে। কিন্তু লড়াইটা জারি রাখতে হয় সর্বত্র। অনুশীলনের লড়াই। কি লেখায়, কি খেলায়, কি যুদ্ধে, কি জীবনে।

তবে লেখার আরো বিপদ হল এর একেবারে ছক বাঁধাধরা কোনো পথ নেই। সংগীতের অনুশীলনে যেমন রাগরাগিনী আছে, যাবতীয় খেলার আছে নানান কৌশলগত নাম, লিখতে বসে তেমন কিছু কোনো অনুশীলনকারীর করার থাকে না। তাকে একেবারে নিজের মতো করে সে-ধারাটি তৈরি করতে হয়। কারণ প্রতিদিন কারো ‘লেখা’ আসে না। যেদিন ‘লেখা’টা আসে সেদিন ওই অনুশীলন তার কাজে দেয়। আবার প্রতিদিনই তিনি নতুন লেখা লিখবেন তাও তো নয়। তিনি আগের দিনের লেখাটিতে খেয়াল করলেন, তার ছন্দপতন বা বর্ণনার ভালো একটি দিক তিনি খুঁজে বের করলেন। একদিন চর্চা করলেন পরিবেশ পরিস্থিতি বর্ণনার, হতে পারে সেটি কোনো ঘরের, বা হতে পারে সেটি শহরের কিংবা গ্রামের, বা গ্রাম বা শহরের দৃশ্যাবলীকে বিহঙ্গ-দৃষ্টি (বার্ডস আই ভিউ) তে মনের পর্দায় ভাসিয়ে বর্ণনা করলেন। এক দিন লিখলেন কোনো একটি মানুষের অবয়ব, আরেক দিন লিখলেন একা একা করা তার একটি কাজের বর্ণনা, কোনো দিন তার সঙ্গে আরেকজনকে যোগ করে বর্ণনা, সেটি প্রেম কি শত্রুতার বর্ণনা হতে পারে, হতে পারে দু’জন লোকের স্রেফ সংলাপ বিনিময়। — এভাবে একেক দিন লেখার কাজটি চালু রাখাটা যে কত জরুরি বিষয়, আমাদের বোধ করি খুব কম লেখক সেসব মনে রাখেন।

সবচেয়ে বড় কথা, লেখালেখি যে-বিরাট একটা শৃঙ্খলা দাবি করে, সেই দাবিটি আমাদের এদেশের লেখকরা খুব কমই পূরণ করে থাকেন। আমরা এখানে মূলত গদ্যলেখকের কথাই বলছি। কবিতারও অনুশীলন হতে পারে। একটি শব্দ বা পঙ্ক্তিকে নানানভাবে প্রয়োগ করে কেউ দিনে কিছু সময় কাটালেন। তারপরও কবিদের কেউ কেউ মনেই করেন, লেখালেখি বলতে যা বুঝি তা আসলে গদ্য লেখা। কবিতা লেখাটা বাতিকের মতো। ওটা পেয়ে না বসলে হয় না। হাজার অনুশীলন করেও হয় না। কিন্তু অনুশীলন করার মাধ্যমে– চাওয়া মাত্র একটা ছোটগল্প লেখা– তাও কি সম্ভব হয়?

আমরা আগেই বলেছি, প্রতিদিন কাউকে একটা ‘লেখা’য় পেয়ে বসে না- যে তার ভেতরে প্রতিদিন একটা গল্পবীজ সুপ্ত হল আর তিনি সেটি লিখতে বসে গেলেন। যেদিন লেখার মুহূর্তটা আসে সেটিকে পরিপূর্ণভাবে ব্যবহার করতে পারলেই কিছু একটা হয় হয়তো, কিন্তু তাতেই কেউ কালোত্তীর্ণ, রসোত্তীর্ণ কিছু একটা নিত্য লিখতে পারবেন তা তো নয়। তবু লেখকের কাজ হল প্রচুর লেখা এবং নিয়মিত লেখা। অর্থাৎ প্রতিদিন কোনো লেখকই লেখার সেই প্রেরণা পান না যা থেকে তিনি একটি গল্প বা উপন্যাস সম্পন্ন করার দিকে যেতে পারেন।

মারিও ভার্গেস য়োসা সুন্দর করে বলেছেন, “প্রেরণা আসে নিয়মিত কর্ম-প্রচেষ্টা থেকে।” চেখভের লেখার পরিমাণ তলস্তয়ের চেয়ে কম, বিভূতিভূষণের চেয়ে রবীন্দ্রনাথের লেখার পরিমাণ প্রায় তিন গুণ। কিন্তু এরা প্রত্যেকেই লেখক। এবং লেখার জন্য যে আত্মনিবেদন এবং পরিশ্রম কারো চেয়ে কেউ কম করেননি। যার যার সামর্থ্য অনুযায়ী করেছেন, নিজেকে সর্বোচ্চ যতটা দেওয়া সম্ভব দিয়েছেন। একজন লেখকের কাজই তার নিজের সামর্থ্যের পুরোটুকু দিয়ে লেখা। তা অনুশীলনের সময় কি যখন তিনি একটি গল্প বা উপন্যাসের দেখা পেয়ে গেছেন, তখনও।

বলার দরকার নেই, তবুও বলতে হয়, অনেকেই নিজের সামর্থ্যের চেয়ে বেশি কিছু করতে গিয়ে হতাশ হয়েছেন। লেখা ছেড়ে দিয়েছেন। এর উল্টো দিকে আছে সমালোচক ও পাঠকের চাওয়া। তারাও কোনো কোনো ক্ষেত্রে কোনো লেখকের কাছ থেকে বেশি আশা করেন। ক্ষেত্রবিশেষে তাকে কটু-সমালোচনা করেন। তাতে ধার বেশি হলে লেখক আহত হন। হতোদ্যম হন কেউ কেউ। কিন্তু সত্যিকারের লেখক নিন্দা-প্রশংসার কোনোটাতেই দমে যান না বা অতি আনন্দিত হন না। তার কাজ লেখা। লেখা অভিমানের কোনো জায়গা নয়। কেউ কটু কথা বলল বলে, স্বীকৃতি খ্যাতি রাতারাতি জুটে গেল না বলে লেখা ছেড়ে দিলেন- তেমন লোকের না লেখাই ভালো। উপেক্ষা ও অপেক্ষাই এক্ষেত্রে এগিয়ে যাওয়ার একমাত্র পথ। স্বীকৃতির বিচারে নিজের লেখাকে বিচার করার কোনো মানে নেই। এমন কি পত্রপত্রিকার সম্পাদকরা তাকে কতটা পুছেন, কতটা তার কাছে লেখাপত্র চান, গুরুত্ব দিয়ে ছাপেন- এসবেরও কোনো বিবেচনা লেখকের থাকাও যার-পর-নাই ক্ষতিকর। হ্যাঁ, এসব কারণে তিনি যদি অপমান বোধ করেন, তাহলে এর জবাব দেওয়ার একটাই উপায় হল লেখার কাজে নিজেকে নিয়োজিত রাখা। লেখার ভেতরে থাকা। লেখা তার ভেতরে থাকুক বা না থাকুক।

গদ্য লেখকের জন্য লেখার ভেতরে নিজেকে রাখা ও লেখার ভেতরে থাকার সবচেয়ে ভালো উপায় হল ছোটগল্প চর্চা। কারণ প্রতিদিন একটি উপন্যাস পড়া সম্ভব হয়ে ওঠে না। কিন্তু প্রতিদিন একটি গল্প পড়া যেতেই পারে। দুঃখজনক হলেও সত্য, আমরা কজন প্রতিদিন একটি ছোটগল্প পড়ি? কারো না কারো ছোটগল্প পড়ে, এর ব্যর্থতা কি এর উজ্জ্বল দিকগুলো বা এর পূর্ণ সফলতা নিয়ে কিছুক্ষণ সময় কাটাই? আর সেই জায়গা থেকেই প্রতিদিন ছোটগল্পের জন্য কিছুক্ষণ ব্যয় করা, একদিন পরিবেশ-প্রতিবেশ বর্ণনার অনুশীলন, তো অন্যদিনে সংলাপ, তো কোনো দিন কর্মকাণ্ডের বর্ণনা, কোনোদিন একটি নারী বা পুরুষের অবয়ব বা স্বভাব বর্ণনা করতে নিজের ব্যবহৃত প্রতিটি শব্দকে দেখা, বোঝা এবং নিজের দুর্বলতা বা শক্তিকে চিনে নেওয়ার কাজটা করা যেতে পারে।

আর কোনো কিছু লিখতে ইচ্ছা না করলেও লিখতে বসা- বসে আছেন একটা বর্ণ বা শব্দ মাথায় আসছে না, তবুও বসে আছেন টেবিলে কলম নিয়ে, বা কি-বোর্ডে হাত রেখে কম্পিউটারের সমানে- এই যে না লিখতে পারার যন্ত্রণা- এটাও লেখার জন্য কত দরকারি অনুশীলন- লেখার জন্য সবচেয়ে বড় ধ্যান– আমরা কজন এসব মেনে চলি? তবে প্রতিদিন লিখতে বসলেই যে লেখা ভালো হবে, তারও তো কোনো নিশ্চয়তা নেই। কারণ লেখালেখির উৎকর্ষ কীভাবে দেখা দেয় সেটি রহস্যময়। তারপরও প্রতিদিন লিখতে বসার কাজটা একজন লেখকের নূন্যতম কাজ। সংগীতশিল্প, বাদ্যযন্ত্রী, খেলোয়াড়রা যদি নিত্য অনুশীলন করেন- সেখানে একজন লেখক নিত্য তার লেখার জন্য বসবেন না- এটা ভাবতে স্বস্তি হয় কার? যে-লেখক তার লেখার মুডের দিকে তাকিয়ে থাকেন- তার দ্বারা কত দূর যাওয়া সম্ভব তেমন দৃষ্টান্তও তো কম নেই। অন্যদিকে লেখার শৃঙ্খলা যিনি বা যে লেখক মানেন তার জীবনাকাঙ্ক্ষা ও উদ্দীপনা অনেক বেড়ে যায়- তা বলা বাহুল্য।

আমাদের দেশে লেখালেখিটা অল্প বয়সে যতটা জোরেশোরে আর আগ্রহ উৎসাহ নিয়ে থাকে, যতই বয়স বাড়ে ততই তার ধার কমে। মোটামুটি প্রচলিতই হয়ে গেছে যে, বাঙালি লেখকের রক্তে যতদিন জোর থাকে ততদিনই লিখতে পারে, বয়স বাড়লে তার লেখার ধার কমে, কারণ সে লেখালেখিকে যতটা আবেগ বা তাড়নার বিষয় হিসেবে দেখে, বুদ্ধিবৃত্তিক বিষয় হিসেবে ততটা দেখে না। এক রবীন্দ্রনাথ ছাড়া খুব কম ব্যক্তি বাঙালির ভেতরে পাওয়া যাবে যার যতই বয়স বেড়েছে ততই তিনি পরিণত থেকে পরিণততর হয়েছেন। পরের লেখকদের ভেতরে দীর্ঘজীবন পাওয়া অমিয়ভূষণ মজুমদারের মধ্যে আমরা দেখেছি লেখক হিসেবে নিজের পূর্বাপর সংগতি বজায় রাখতে।

বাঙালি লেখকদের স্বভাবকে একটি প্রবাদের সূত্রে বলা যায়- তারা প্রায় সবাই ‘কাঁচা বয়সে পাকা, পাকা বয়সে কাঁচা’ হয়ে যান। ছোটগল্প লেখার ক্ষেত্রে সেটি আরো বেশি প্রযোজ্য। কারণ ছোটগল্পটাই বলে অল্পবয়সের জিনিস। বয়স বাড়লে কথার যে সংযম ছোটগল্পে রাখতে হয়, বয়স্ক লেখকরা সেটি পারেনই না।

গল্প তো হরদমই লেখা হয়, কিন্তু ছোটগল্প? সেই প্রকৃত ছোটগল্পের দিকে আমাদের নজর নেই বলেই ছোটগল্পর মৃত্যুর মতো অমূলক চিন্তা করে বসি। বরং দশ দিকে ছড়িয়ে আছে ছোটগল্পের সম্ভার। কে কী বেছে নেবেন তার ওপর নির্ভর করছে এর হয়ে ওঠা। আয়ত্ত করবেন সেই গদ্যভাষাটি যেটি ছোটগল্পের গদ্যভাষা।

২.
কীভাবে লেখালেখির কাজটা সম্পন্ন করা হয় এ নিয়ে ‘প্যারিস রিভিয়ু’র সাক্ষাৎকারগুলো যে কোনো তরুণ লেখকের কাজে আসতে পারে। এর বেশ কিছু সাক্ষাৎকারের অনুবাদ নিয়ে বাংলা একাডেমী থেকে ‘লেখকের কথা’ নামে দুটো খণ্ড প্রকাশিত হয়েছে। প্রাতঃস্মরণীয় বেশ কিছু লেখকের রচনাপদ্ধতি ও জীবনরীতির দেখা মিলবে এই দুটো বইয়ে। (যাদের ইন্টারনেটে ঢোকার সুযোগ আছে তার গুগলে ‘আর্ট অব ফিকশন’ নামে সার্চ দিলে একের পর এক সাক্ষাৎকারের পিডিএফ কপি ডাউনলোড করতে পারবেন। ) খুব অল্প কথায় বলা যায়, এর চারটি পর্ব আছে। লেখার বীজ পাওয়া, কিছুদিন বীজ নিয়ে ভাবনা, প্রথম খসড়া এবং সংশোধন পরিমার্জনের ভেতর দিয়ে লিখনকর্মটি পাঠকের কাছে পেশ করা। কিন্তু এর কোনো কোনো পূর্বঘোষিত পরিস্থিতি নেই।

কীভাবে বীজটা পাওয়া যাবে- এটাই তো শুরুর প্রশ্ন। এই বীজ মনে লেখার জন্য মন-মস্তিস্কে কোনো একটা কিছু জেগে ওঠা- যাকে প্রেরণা নাম দেওয়া হয়। কিন্তু তাকে জাগিয়ে তোলার জন্য দিনের পর দিন যে অনুশীলন দরকার- আমরা শুরুতেই তা বলেছি। কিন্তু প্রেরণার সংগ্রহের অন্যতম বিষয় পঠন। (তবে যারা অভিজ্ঞতা দিয়ে সাহিত্য করতে চান তাদের জন্য ভ্রমণটাও সমান জরুরি। আর যেতে হবে মানবসঙ্গমে, মানবসন্ধানে; ফলে পঠন, ভ্রমণ এবং সঙ্গম- এটি কেবল দৈহিক বা জৈবিক-অর্থে নয়, ‘প্রেম বিনে জ্ঞান নাই’, বা ‘জ্ঞান বিনে প্রেম নাই’- এই কথার গভীর অর্থ যারা জানেন তারা জানের কোন সঙ্গম ও সম্ভোগের কথা এখানে বলা হচ্ছে।) সেদিক থেকে আমাদের ছোটগল্প লেখকের জন্য এমন এক সম্ভার আছে যা বিশ্বের খুব কম ভাষার ছোটগল্পকাররা পেয়ে থাকেন। সেই সম্ভারই আমাদের ‘প্রকৃত ছোটগল্প কী, কতটা এবং কীভাবে’-সহ তার যাবতীয় কৃতকৌশল নিয়ে সমৃদ্ধ। হ্যাঁ, আমরা রবীন্দ্রনাথের ‘গল্পগুচ্ছে’র কথা বলছি। প্রথমে ‘গল্পগুচ্ছ’ থেকে বড় গল্প এবং ছোটগল্পগুলো আলাদা করতে হবে। প্রথম বাক্য থেকে শেষবাক্য অবধি ‘গল্পগুচ্ছে’র কোন গল্পগুলো প্রকৃত ছোটগল্পগুলো- সেগুলো সনাক্ত করার মধ্যে দিয়ে এর নিবিড় পাঠ শুরু হতে পারে। বাংলা ছোটগল্প যারা লিখতে চান, ভবিষ্যতেও যারা লিখতে চাইবেন তাদের এই বইটির কাছে আসতেই হবে। অন্যভাষার লেখক চেখভ, মোপাসাঁ থেকে শুরু করে ফ্রাঞ্জ কাফকা, আর্নেস্ট হেমিংওয়ে, ভ্লাদিমির নবোকভ, হোর্হে লুই বোর্হেস কি গার্সিয়া মার্কেস এমন কি প্রেমচন্দ বা সাদাত হাসান মান্টোর লেখা থেকেও ছোটগল্প লেখার পাঠ নিতে পারেন, কিন্তু জোর দিয়ে বলতে পারি রবীন্দ্রনাথের ‘গল্পগুচ্ছ’ বার বার পড়ে এবং অন্যসব লেখকের গল্পের সঙ্গে ‘গল্পগুচ্ছে’র তুলনামূলক পাঠ যদি কেউ সেরে নিতে পারেন, তাহলে তারও মনে হবে- ছোটগল্পকার হিসেবে রবীন্দ্রনাথ কতটা শ্লাঘার বিষয় হতে পারে আমাদের জন্য।

বিশ্বের অন্য ভাষার ছোটগল্প কোনো তরুণ লেখকের জন্য নানান সূত্রের সন্ধান দিতে পারে, তার আলোকে তিনি এটা এদেশের সমাজ ও মানুষ ছেকে ছোটগল্প তৈরি করতেই পারেন কিন্তু তারচেয়ে অনেক সহজে বাঙালি জীবনের মৌলকাঠামোতে প্রবেশের জন্য ‘গল্পগুচ্ছে’র কোনো বিকল্প নেই। বলা বাহুল্য ‘গল্পগুচ্ছ’ বারবার পাঠ জরুরি। ‘গল্পগুচ্ছে’র অনেক অনালোচিত গল্পের ভেতরেও যে কত মূল্যবান বিষয়াদি ও ছোটগল্পের কৃতকৌশল বুঝে নেওয়ার উপাদান গুপ্ত আছে সেজন্য ‘গল্পগুচ্ছ’কে তন্ন তন্ন করে পাঠ না করে উপায় নেই। সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় বলেছিলেন, রবীন্দ্রনাথের ছবি বাদে আর কোনো কিছুতে আধুনিকতা খুঁজতে হলে তাকে গোয়েন্দা লাগাতে হবে, এর পেছনে যে ‘অক্ষমের ঈর্ষাপ্রসূত ক্রোধ’ নেই তাই বা কি করে বলি, তারপরও তিনি কথা বলার সাহস পান কারণ রবীন্দ্রনাথকে তারও ছিন্নভিন্ন করে, এফোঁড় ওফোঁড় করে পড়তে হয়েছে। সেটি তিনি পরে স্বীকার করুন আর নাই করুন। আমরা সন্দীপনের ছোট একটি নিবন্ধে দেখি তিনি রবীন্দ্ররচনাবলী অল্পবয়সেই হাতে পেয়েছিলেন।

‘গল্পগুচ্ছে’র আধুনিকতা কতটা গভীরে এর নিবিড় পাঠক মাত্রই জানেন। কি অদম্য প্রত্যয়, (“তুমি জান মোর মনের বাসনা,/ যত সাধ ছিল সাধ্য ছিল না,/ তবু বহিয়াছি কঠিন কামনা/ দিবানিশি”- ‘সাধনা’, চিত্রা) অবিরাম শ্রম (“তুমি জান ওগো করি নাই হেলা,/ পথে প্রান্তরে করি নাই খেলা,/ শুধু সাধিয়াছি বসি সারাবেলা/শতেক বার” -‘সাধনা’, চিত্রা) যে রবীন্দ্রনাথকে দিতে হয়েছে, সারা জীবন ব্যাপী তার সমস্ত লেখায়, তার ভেতরে গদ্যকর্ম হিসেবে ‘গল্পগুচ্ছ’ অনন্য। কবিতায় তিনি মিস্টিক, উপন্যাসে আদর্শবাদী কিন্তু গল্পগুচ্ছে তিনি রিয়ালিস্ট না হয়ে পারেননি। উপন্যাসের মতো ছোটগল্পে রিয়ালিজমই চূড়ান্ত, বাস্তববাদী ছোটগল্পই হল প্রকৃত ছোটগল্প। এর ‘রিয়াল’- ট্রুথ, ফ্যাক্ট, জেনুইন, অথেন্টিক, সাবস্টেনশিয়াল এবং কংক্রিট– এর বাস্তবতা সত্য, আসল, খাঁটি, বিশ্বস্ত, প্রকৃত, লৌকিক এবং পার্থিব।

বাঙালি জীবনের নানান অবস্থা ও পরিস্থিতি দ্যোতনায় পূর্ণ তাঁর গল্প। এখন তিনি অ্যালান পোর প্রভাবিত হয়ে কিছু অতিপ্রাকৃত গল্প লিখুন কি না লিখুন তাতে আমাদের তেমন কোনো ক্ষতি-বৃদ্ধি ঘটে না। এবার আমরা সেই গল্পে কাফকার প্রতীকী ব্যঞ্জনা, পুঁজিবাদী নাগরিক সভ্যতার গ্রাস, ব্যক্তির বিবিক্ত সত্তা পাবো কিনা এ প্রশ্ন যদি কেউ তোলেন তো এর জন্য তুলনামূলক পাঠ নিন, গল্পগুচ্ছ তার সঙ্গে পাল্লা দিতে পারে কিনা দেখে নিন। সাহিত্যে যদিও কে বড় লেখক, কে ছোট লেখক এসবকে অনেকে পাত্তা দিতে চান না, ধর্তব্যের মধ্যে আনেন না, কিন্তু হেয় প্রতিপন্ন করলে, মাপজোখে না গিয়ে উপায় কি?

‘গল্পগুচ্ছ’ ছোটগল্প লেখকের জন্য এক আশ্চর্য ও অফুরন্ত বই। এর পঁচানব্বই-ছিয়ানব্বইটি গল্পের জগতকে কেউ তার দশ আঙুলের মধ্যে আয়ত্তে আনতে পারলে ছোটগল্প লিখতে এসে তাকে ফিরে যেতে হবে না। তবে ছোটগল্প লেখার জন্য বিশেষ এক মানসিকতার দরকার হয়। সেই মানসিকতাটি একজন কতটা ধারণ করতে পারছেন, লালন করতে পারছেন- তার ওপরে কোনো লেখকের ছোটগল্পের পথে ক্রিয়াশীল থাকার বিষয়টি নির্ভর করে।

‘গল্পগুচ্ছ’ থেকে আরো দুটো পাঠ অত্যন্ত জরুরি। একটি হল জীবনের রহস্যময়তা এবং অন্যটি হল মানবপরিস্থিতির বিশ্বজনীনতা। কোনো গল্প লেখক ‘আমি এখন একটি বিশ্বজনীন গল্প লিখতে শুরু করব’ মনস্থ করে লিখতে বসেন না। কিন্তু লেখার পর তার গল্পে ওই দু`টি বিষয় নিশ্চয়ই যাচাই করতে পারেন। সমকালীন পরিপ্রেক্ষিত কি চিরকালীন মানুষের অনন্য পরিস্থিতি তার গল্পের ভেতর কতটুকু ধরা পড়েছে লেখার পর সেটি দেখে নেওয়া কঠিন কিছু নয়। কলকাতার জীবন থেকে গ্রামের জীবনে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ এক বিশেষ পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিলেন। আমরা একে ‘ধাক্কা খাওয়া’ বা ‘শক’ খাওয়া যাই বলি না কেন, তাঁর চেতনায় এক প্রবণতা বিদ্যুৎ প্রবাহের মতো ছড়িয়ে পড়েছিল। তিনি নিজেকে ও নিজের জীবনকে তো ভিন্নভাবে আবিষ্কার করলেনই, গোটা মানবজীবন তাঁর কাছে অনন্য এক সজীবতায় ও বিশুদ্ধতায় ধরা পড়ল। জীবনের দিকে আরো স্বচ্ছভাবে তিনি তাকাতে শুরু করলেন।

ছোটগল্প লেখকের জন্য ছোটগল্পের চর্চার পাশাপাশি কবিতা, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ থেকে তিনি রস পাবেন। এছাড়াও মানববিদ্যার অন্যসব দিকের অবগতি কম জরুরি নয়- রাজনীতি, দর্শন, ইতিহাস, অর্থনীতি থেকে শুরু করে জীবনের সঙ্গে জড়িত সমস্ত বিষয়ে তার বুনিয়াদি-জ্ঞান থাকাটা তার গল্পকে অনেক বেশি পরিমাণে সহায়তা দিতে পারে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বিচিত্র বিষয়ও তিনি যতটা ভালো করে জানবেন- সবই তার ছোটগল্পে কাজে দেবে, তা বলা বাহুল্য।

বিশ্বের সেরা গল্প লেখকদের লেখার পাশাপাশি বাংলা ছোটগল্পের বিশাল ভাণ্ডারের ভাণ্ডারীদের লেখা সম্পর্কে যতটা জানা বোঝা যাবে ততটাই নিজের লেখায় নতুন মাত্রা এনে দিতে তিনি সক্ষমতা অর্জন করবেন।

ছোটগল্প লেখক তো অনেক আছেন বাংলা ভাষায়, কিন্তু কারা ছোটগল্পের প্রকৃত শিল্পী- সেটি চিনে নিয়ে তাদের লেখা থেকে নিজের পাথেয় তিনি পেয়ে যাবেন। যতটা তিনি সংগ্রহ করতে পারবেন ছোটগল্পের পথে এগিয়ে যাওয়ার সাহস ততটাই তার বৃদ্ধি পাবে।

বিশ্ব-ছোটগল্পের ইতিহাস ও বিবর্তনের সঙ্গে বাংলা-ছোটগল্পের ইতিহাস ও বিবর্তনের পাঠ তো বিরাট সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। নিজের সমাজকে, দেশ ও দেশের মানুষকে আবিষ্কার, দেশের কল্যাণ দায়বদ্ধতা প্রভৃতি গুরুগম্ভীর বিষয়ের চেয়েও জরুরি এক বিষয় আছে, কারণ লেখাকে গুরুভাবে নিয়ে অনেক লঘু বিষয় সৃষ্টির কোনো মানে নেই, তারচেয়ে নিজের আনন্দের জন্য লেখাকে লঘুভাবে নিয়ে অনেকেই অনেক গুরু বিষয়ের জন্ম দিয়ে গেছেন। আর লেখাকে গুরু বিষয় হিসেবে নিয়ে গুরুতর কাজ যারা করেছেন তাদেরও আমরা চিনি জানি।

সমরেশ বসুকে অন্নদাশঙ্কর রায়ের স্ত্রী লীলা রায় জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘‘তুমি কেন লেখ?’’
তিনি জবাব দিয়েছিলেন, “জানবার জন্য লিখি।”
‘‘কী জানবার জন্য?’’
‘‘মানুষকে জানবার জন্য।’’
এবার লীলা রায় জিজ্ঞাসা করেন, ‘‘নিজেকে জানবার জন্য নয় কেন?”
অনেক পুরনো এই প্রশ্নে সমরেশ সচকিত হয়ে ওঠেন। তার সত্তার ভেতরে রবীন্দ্রনাথের ‘নিশীথে’ গল্পের অলৌকিক আর্ত জিজ্ঞাসা ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হয়ে ওঠে, ‘ও কে, ও কে, ও কে গো?’
নিজেকে নিজের লেখার ভেতর দিয়ে খোঁজা, নিজের নির্মিত চরিত্রদের মধ্য দিয়ে খোঁজা অনেক লেখকের প্রিয় এক রোমাঞ্চ। এতে তিনি বিশাল আনন্দ পেয়ে থাকেন। লেখালেখি মানে নিজের একটা রাজ্য তৈরি করা, নিজেকে স্রষ্টা হিসেবে বোধ করা, ইচ্ছামতো সেখানে আধিপত্য করতে করতেও লেখক কত না অসম্ভব সৃষ্টিকর্মের জন্ম দেন। ছোটগল্পকারের জন্য এসবও সত্যি। জর্জেস সিমেনঁর যে-বলেন, “I think that if a man has the urge to be an artist, it is because he needs to find himself. Every writer tries to find himself through his character, through all his writing.” [আমি মনে করি যদি কারো শিল্পী হওয়ার কোনো তাড়না-প্রেরণা থাকে, এর কারণ তিনি নিজেকে আবিষ্কার করার তাগাদা বোধ করেন। প্রত্যেক লেখক তার তৈরি চরিত্রাবলীর ভেতর দিয়ে এবং তার সমস্ত লিখনক্রিয়ার ভেতর দিয়ে নিজেকে চিনে নিতে চেষ্টা করেন।]- একথাটিও যেকোনো লেখকের জন্য কমবেশি সত্য।

আমরা যারা বর্তমানে বাংলায় লেখালেখি করি তাদের ব্যর্থতা অনেক। এর কারণও অনেক। সবচেয়ে বড় কারণ তো আমরা নিজেরা। কিন্তু আগামী দিনের লেখকরা অনেক বেশি সম্ভাবনাময়- এই বিশ্বাস কখনোই মন থেকে সরিয়ে দিতে পারি না। তাদের হাতে মহৎ কিছু না হোক বৃহৎ কিছু হবে, বা বৃহৎ কিছু না হোক মহৎ কিছু হবে, বা দু`টো মিলিয়েই কিছু না কিছু হবে- এই আশা থেকেই যায়। আগামীদিনের ছোটগল্পকারদের, এই সামান্য লেখা যদি এতটুকু কাজে আসে, তাতেই আমরা কৃতার্থ হব।