পুজোটা আসতে যতটা দেরি, তার থেকে বেশি নানান রকম কিছু কল্পনা- জল্পনা! কিন্তু এত শিগগির যে হাওয়ায় হারিয়ে গিয়ে সেই আনন্দটা মাটি হয়ে যাবে, ফুরিয়ে যাবে তার রেশ, এসব ভাবলেই মনটা কেমন যেন অস্থির হয়ে ওঠে! প্রত্যেক বছরই এমনটাই হয়ে আসছে, তবে এবারটা একটু সামান্য ব্যতিক্রম— কাগজে, টিভি-রেডিওতে ফলাও করে প্রচার মহাশূন্য থেকে ভূগোল বইতে পড়া নয়টা গ্রহের মধ্যে মঙ্গল অনেক কাছে চলে এসেছে! এই খবরটা- পাওয়া মাত্রই পৃথিবীবাসী ছাদে- মাঠে-বাড়ির বারান্দায় অনেক রাত পর্যন্ত মঙ্গলকে দেখার ইচ্ছায় আকাশের দিকে তাকিয়ে ওরা নির্ঘুম রয়েছে! পুজোর ছুটি ব’লতে কালীপুজো এবং ভাইফোঁটার পর-পরই এই ছুটির অবসান। বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গাপূজা, এসব কাটার পর মনটা উদাস হয়ে ছিল, বাবা তো কতবার যে ধমক দিয়েছেন, ওরে অনেক আনন্দ করেছিস এবার বই-পত্র নিয়ে বোস! “বাবার ধমক কান অব্দি পৌঁছালেও মনটা ব্যাজার করে বৈঠকখানা ঘরে বসে কতসব সাত-পাঁচ চিন্তা করছি । আমার ছোট ভাই বুম্বা টেবিল-চেয়ারে আমার পাশে বসে স্কুলের হোম টাক্স ইংরেজি এসে লিখছে আর আমি অঙ্ক কষার খাতায় হিজিবিজি কাটছি। আমাদের এই একতলার উঠোনে বড়দি-মেজদি-ছোড়দি গোল করে একটা— জায়গায় বসে গানের লড়াই খেলছে। মাঝে মধ্যে ছোট আমাদের ছোট জেঠামশাই মন্টু নিজের ঘর থেকে তারস্বরে চিৎকার করে ওদেরকে বলেছেন, তোরা এবার থামবি গোটা ঝিলবাগানটা তোদের চিৎকারে— কি ভাবছে পাড়াপ্রতিবেশী! থাম এখুনি, তা-না হলে! মন্টুজেঠুর দাবড়ানিতে বড়দি-মেজদি-ছোড়দি উঠোন থেকে এক দৌড়ে সোজা নিজেদের ঘরে মা-জেঠিমার পাশে বসে লক্ষ্মীপূজোর নারকেল নাড়ু পাকাতে লাগলো। সবাই এই নাড়ু করার সময় কোনো সারাশব্দ ও কথা বলে না। এটাই তো এই বাড়ির ট্রাডিশন!

তখন সন্ধ্যা সাতটা হবে। হঠাৎ সদর দরজায় কলিং বেলটা বেজে উঠতেই খাতাপত্র ফেলে এক ছুটে দরজাটা খুলে দিয়েই দেখি কি, কানুমামা দাঁত বের করে আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে! আমি তো বললাম, কী ব্যাপার মামু হঠাৎ কী মনে করে ? কানুমামা তাঁর সৌজন্য মাখা হাসি নিয়ে বাড়িতে ঢুকল। মামার ঠিক পেছনে পা ফেলে-ফেলে এসে হাজির হলাম আমাদের ঘরে। মামাকে দেখে মা-তো কেঁদে-কেটে একসা! কতদিন পর এলিরে কানু, এতদিনে বুঝি গরিব দিদিকে তোর মনে পড়ল? মামা নিরুত্তর, কিন্তু লেগে রয়েছে এক টুকরো মৃদু হাসি ওর ঠোটে। আমি বললাম, এবার— কিন্তু তোমায় ছাড়ছি না মামু। গতবার এসে গল্প না বলে ফাঁকি দিয়ে পালিয়েছো। এবার পালাও কি করে দেখব। আমার পাশে বুম্বাও যে কখন নিঃশব্দে এসে দাঁড়িয়েছে, সেটা একেবারেই টের পাইনি আমি! পূর্ণিমার চাঁদের আলোয় ঝিলবাগানের আমাদের কুসুমকুঞ্জের পেল্লাই বাড়িটা ঝলমল করছে। আমারা সবাই যে- যার রাতের খাবার খেয়ে বিছানায় শুয়ে পড়েছি। অনেক বায়না-আবদারের পর বুম্বা আর আমি মামার পাশে শোয়ার জায়গাটা পেলাম। কিন্তু শুলে কী হবে, ঘুম মোটেই আসছে না! ফিস্ ফিস্ করে মামাকে বললাম, মামু তুমিতো জঙ্গলে-জঙ্গলে ঘুরে ঘুরে বেড়াও, দেখি একটা জঙ্গলের গল্প বল তো কানু মামাতো পাশ কাটাতে পারলে বেঁচে যায়, কিন্তু আমাদের মতো দুটো বিচ্চু ভাগ্নের বায়নায় শেষ পর্যন্ত নিম-রাজি হয়ে বলল, ঠিক আছে দাঁড়া বলছি, তবে একটার বেশি কিন্তু নয়। আমি বললাম, ঠিক আছে একটাই হবে। গত বছর আমার পোস্টিং ছিল বিষ্ণুপুর— ফরেস্টে। ওখানে ফরেস্টের কোয়ার্টারে আমার থাকার ব্যবস্থা হয়েছিল। কিছুদিন ধরে একপাল হাতির তান্ডবে ওই অঞ্চলের লোকজন অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছিল! কলাবাগান, ধানক্ষেত সবকিছু ওই হাতি গুলো নষ্ট করতে লাগল! আমাদের অফিসে সেই তাজা খবর গিয়ে পৌঁছালো। ভাবলাম, হাতিগুলো খেত-খামার নষ্ট করতে গিয়ে যদি মানুষ মারতে শুরু করে। কিম্বা ঘর বাড়ি ভেঙে তছনছ করে! তা-ই আগে ভাগেই কাজে নেমে পড়লাম। একদিন ফরেস্টে অফিসিয়ালি কাজ মিটিয়ে আমার কোয়ার্টারে ফিরছি! তখন নটা কি দশটা হবে। একটু অন্যমনস্ক ছিলাম। হাই রোড দিয়ে বাইক চালিয়ে ফুল স্প্রিডে আসছি। হঠাৎ লোডশেডিং।

চারপাশ ঘুটঘুটে অন্ধকার। নিঝুম নিরুত্তর পরিবেশ। দু’পাশের গাছ-পাতাগুলোও বাতাসহীন নীরব স্তব্ধ হয়ে থম মেরে আছে! হঠাৎ একটা ট্রাক এসে সজোরে আমার মটর বাইকটাকে মারল এক ধাক্কা! আমি এবং আমার বাইকটা দশ ফুট হাত দূরে রাস্তার পাশে জঙ্গলে ছিটকে গিয়ে পড়লাম। আমার সেই সময় জ্ঞানটুকু ছিল না! পরের দিন সকালে আমার জ্ঞান ফিরল। চোখ মেলে— তাকিয়ে দেখি, আমি হসপিটালের বেডে শুয়ে আছি! ফরেস্টের উচ্চপদস্থ কর্মি বলে বেশ খাতির – যত্ন হচ্ছে। ডাক্তার-নার্স সব সময় যেন এঁটুলি পোঁকার মতো লেগে আছে আমার বিছানার সাথে! জ্ঞান ফিরতে ডাক্তার বাবুকে জিজ্ঞাসা করলাম, আমি— এখানে কীভাবে এলাম? আমি আর বুম্বা কানিমামার গল্প শুনতে শুনতে এক সাথে দুজনে বলে উঠলাম, —ডাক্তার কী বললেন? মামা বলল, ডাক্তার বাবু বললেন, আপনার যখন এ্যাক্সিডেন্ট হয় জ্ঞান হারিয়ে অচৈতন্য অবস্থায় আপনি রাস্তার পাশের জঙ্গলে পড়েছিলেন। ঠিক ওই সময় একটা দাঁড়ালো হাতি আপনাকে দেখতে পায়! ওই হাতিটা আপনাকে শুঁড়ে পেঁচিয়ে দু’কিলোমিটার হেঁটে রাত দেড়টা নাগাদ এই হসপিটালে দিয়ে যায়! আমরা সবাই অবাক! আপনার পকেট হাতড়ে আপনার পরিচয়পত্র জানতে পেরে আপনাকে সঙ্গে করে এ্যাডমিট করে নিয়েছি। হাতিটা সারা রাত হসপিটালের গ্রাউন্ডেই ছিল। সকাল হতেই দেখি হাতিটা— আমাদের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে ! আমি ওকে বললাম, তুমি যাকে কাল রাতে এনেছো তিনি ভালো আছেন। আমার কথা শুনে হাতিটা নীরবে শুঁড় দুলিয়ে-দুলিয়ে মাথা-কান নাড়িয়ে চলে গেল। এরপর থেকে আমি ছুটি পাওয়ার পর দিন পর্যন্ত ওই দাঁড়ালো হাতিটা প্রতিদিন সকাল-বিকেল আমাকে হসপিটালে দেখতে আসতো!

কানুমামার মুখে এই ধরনের একটা গল্প শুনে আমি আর বুম্বা তো অবাক! মামা বলল, এই রাণা-বুম্বা এবার তোরা শুয়ে পড়, আর গল্প নয়, কাল অনেক সকালে আমাকে উঠতে হবে। মামার কথায় বুম্বা বাধ্য ছেলের মতো পাশ ফিরে শুয়ে পড়ল। আমি আমাদের ঘরের খোলা জানলা দিয়ে জ্যোৎস্না মাখা আকাশটাকে তাকিয়ে দেখতে লাগলাম। চাঁদের আলো মাখা আকাশটায় সাদা কালো বড়ো বড়ো মেঘ তখন উড়ে যাচ্ছে! ওই মেঘদল যখন এক একটা হাতি ওদের মধ্যে একটা হাতিকে আমি তখন আকাশপথে খুঁজে চলেছি!