এই অবক্ষয়ী বহতাময় যুগে বিভিন্ন প্রতিকূলতার মধ্যে কেউ কেউ আমার চিন্তা-ভাবনার অদেখা শরীরে আঁচড় বসাতে পারেন। এটা শুধুমাত্র আমার ক্ষেত্রে যে একমাত্র ঘটে চলবে, তা-কিন্তু বলতে আমি চাইনি। এটা কুপ্রভাব সবার ভাগ্যে জুটতে পারে! এরথেকে রেহাই কি ভাবে পাব বা পাবেন, তার ঔষধী শক্তি আবিষ্কার এই মূহুর্তে হয়েছে বলে আমার ধারণা নেই। সত্যি অর্থে, আমি আমার কাব্যজীবনের চল্লিশটা বসন্ত দেখলাম। এটা কিন্তু কম কথা নয়, আর নয় বলেই-তো আমার মধ্যে একটা উদার কন্ফিডেন্সের রেস অহর্নিশ বহতাময়! এটা অনেকের কাছে বিস্ময়ের আবার এটাকে উল্টে দিলে কেউ-কেউ আমার কাব্য-প্রতিভাকে দেখে ঈর্ষা করেন, একেবারে মন থেকে বলছি, আত্মস্থ চেতনার নির্জলা তাগিদ ছাড়া আমার কাছে সময়ের অন্য কোনো প্রেরণার মূল্য নেই, এটা কিন্তু ১০০% সত্যিই। দু’ই বাংলার বিদগ্ধ পাঠক কবিতার সাথে সাথে আমাকে অন্তর দিয়ে চিনে ফেলেছেন। আমি মনে-প্রাণে বিশ্বাস করি— মহৎকবির লক্ষণই হল নিজের কবিতার আত্মস্থভাবের আবিষ্কার করা এবং তাতেই পূর্ণ অভিনিবিষ্ট হওয়া। এই প্রেরণা-ই আমাকে দিয়ে আগে ও বর্তমান সময়ের স্রোতে প্রচুর কবিতা লিখিয়েছে এবং লিখিয়ে নিয়ে চলেছে! তাই কোনো লোভের দিকে তাকাবার প্রয়োজন হয়নি। আরও পরিষ্কার করে যদি বলি, কোনো কাগজের চাহিদা মেটাতে বা এই যুগের আবহাওয়ায় নিজেকে বিলিয়ে দিতে, কিম্বা অর্থাজনের প্রেরণায় আমি কখনোই কার্য সাধনায় ব্রতী হইনি। আমি আমাকে সর্বক্ষণ নিঃসঙ্গ রেখে ধীরে ধীরে এগিয়েছি, কোনো চটুল প্রলোভনে কখনো আমার ধ্রুব বিশ্বাস থেকে সরে আসিনি, খ্যাতির জন্য কোনো কৌশলী প্রচেষ্টা চালাই-নি। তাই-তো কবিতাপ্রাণ পাঠক-সমাজের মুখে শুনতে পাই আমার কবিতার সেই বিখ্যাত পংক্তি, যে পৃথিবী ভেজার কথা সে পৃথিবী ভেজেনি “কথা না রাখার কথা” শীর্ষক কাব্যগ্রন্থের কবিতা থেকে এই উক্তি করলাম।
নরকের দরজা থেকে
স্বর্গ কী দূরে, বলতে-বলতে দেখি লম্পট নটরাজ
কি-এক গভীর বৃত্ত থেকে ছুঁড়ে দেয় জটার পাহাড়—
সাহসের ধুলো ঝেড়ে দুঃখে দৈন্যে থাকে
বহু কালের চোখ কান ঠোঁট
তখন স্মৃতির চিহ্নগুলো অভিশাপের স্পর্শ নিয়ে
আকাশময় ঘোরে; নিভৃতে কানে কানে কথা বলে।
প্রত্যন্তে প্রহর যেন ছায়া থেকে খুঁটে খায়
সুধা নতুবা গরল
সেদিকের চোখের মধ্যে একই সাথে নড়ে ওঠে
সত্যের পারিজাত, এরপর আরো কত কিছু
জীবলোক-অনন্ত অমৃতলোকে
গভীর যন্ত্রণায় জাগে জীবন্ত সকাল!!
(নির্বাচিত কবিতা “-নামক কাব্যগ্রন্থ থেকে বিদ্যুৎ ভৌমিকের কবিতা অমৃতলোক)

আমি দীর্ঘ ৩০ থেকে ৩৫ বছর একটানা কবিতার জমিতে অনন্ত ভাবনার ফসল ফলিয়ে চলেছি। বলা যায় এই ধরনের কঠিন ও কঠোর একটা বিশেষ শিল্পের জন্য জীবনের অনেকটা সময় এই আমি-ই খরচ করে ফেলেছি! এটা আমার কাছে সত্যি অর্থে এক ইন্টারেস্টিং চ্যালেঞ্জ বলা যায়। নিকটবর্তী একটা রেখা জনশূন্য চোখে অচিরেই ছবি হয়ে গেছে। নেশার একেবারে প্রত্যন্ত থেকে কবিতার নীল পাখি ভেতরে-গভীরে ডেকে ওঠে, এটা কি আপনার বাড়ি ? অতলের তলে স্মৃতির অমৃত থাকে অনন্ত নিঝুম। চাঁদ- জল তবু শান্ত কোলাহল খোঁপা বাঁধা ঘাসফুল মনমরা শেফালির রোদে। প্রেমের গভীরে থাকে প্রেম, অন্য কিছু নয়। উপলব্ধিটা একমাত্র আমার-ই। বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মতো কত-যে রাত্রি জাগরণ চলে, এই কবিতার মধ্যে শাখা প্রশাখার জট খুলতে খুলতে এই আমি কখনো মরি, আবার কখনো আগের দিনের মতো বেঁচে— উঠি বুক ভর্তি অক্সিজেন নিয়ে! কবিতা আমার একান্ত ব্যক্তিগত দুর্বলতা, এই দুর্বলতা আছে বলেই আমি অনেক প্রতিকূলতার মধ্যে থেকেও অনেকটাই ব্যতিক্রমী এবং অনেকর চেয়েও ভালো আছি।
মর্মে সে এতকাল ছিল বলে আমিও নীরব ইচ্ছা
নিয়ে তাকিয়ে ছিলাম আকাশের দিকে।
শেষ বেলায় কথাবাক্য থেমে গেছে; বেশ কিছু
নিছক স্বপ্নে—
প্রেমের কবিতা নিয়ে যতবার এসেছি কাছে
সে এক অন্যমূর্তি দেখায় ভাঙা দর্পণে!
ঘুরেছি স্মৃতিমন নিয়ে , চোখ বন্ধ আবেগ বন্যায়
তুই যেন আমার ঈশ্বরী বুকের ভেতর খুলে দেখি
অন্তর্জলী যাত্রা ভাসে সমস্ত ক্যানভাসে !
সেদিনের রোদ্দুরটুকু আমি যেন দাম দিয়ে
কিনেছি তোকে দেব; সেই সতত ইচ্ছায়—
ভুল উচ্চারণে লজ্জিত চোখ ভ্রাম্যমাণ একা
হয়েছে সেই থেকে কয়েকটা জনম। অথচ তুই—
(অপ্রকাশিত পান্ডুলিপি থেকে এই কবিতা ” —বিদ্যুৎ ভৌমিক )

ক-বি-তা— একসময় মহাকাব্যের আখ্যা পেয়েছিল! মনের কথা বলতে পারার একমাত্র সঠিক মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হয় এই কবিতা নামক বিষয়টাকে। কে কী ভাবে লিখছেন, সেই লেখা সঠিক বিন্যাসে নিপাট বিজ্ঞাপন হয়ে উঠবে কিনা, সেটা মহাকাল বিচার করবে। জীবনধর্মী চেতনার আর এক নাম কবিতা! আমার বেশ কিছু লেখা আজও অসম্পূর্ণ রয়েছে, কিছুতেই ওই লেখাগুলো শেষ করে উঠতে পারিনি! মাঝেসাঝে ইচ্ছা জাগে ওই সব অসম্পূর্ণ লেখাগুলো নিয়ে বসবো, সেগুলোর একটা নতুন নাম দিয়ে একটা কোলাজ কাব্যপট তৈরি করবো, আমার ভাবনাটা ভাবনাই রয়ে গেছে বহুদিন ধরে! কবিতা নামক যে মন, চোখ এবং সর্বোপরি এই জীবন আমি পেয়েছি, এটিই— তো আমার ভাগ্য বলতে পারি। একটা লেখা তৈরি করার সময় আমি একেবারে তার মধ্যে একেবারে ঢুকে যাই! ওখান থেকে বেরিয়ে আসতে অনেক অনেক সময় লাগে। যখন সম্বিত ফিরে পাই, তখন বাস্তবতা ও পরবাস্তবতা একেকার হয়ে যায়! কবিতা লেখা নাকি বিড়ম্বনা! এটা কলকাতার একটি বিশেষ পত্রিকায় কোনো এক বিশিষ্ট সাংবাদিক সম্প্রতি লিখেছেন! উনিকি এই সময়ের কবিতার প্রতি রাগ প্রকাশ করে এই উক্তি করেছেন, না ওনার অতীতের সব বিশেষ-বিশেষ কবিতা রচয়িতাদের কবিতা সম্পর্কিত কোনো ধারণাই নেই, যদি থাকতো তাহলে তিনি ওই উক্তি করতেন না, তাই না? কবিতাচর্চার এক বিশেষ অবস্থান আছে। এটা যুগ-যুগ ধরে চলে আসছে এই বহতাময় পথে কত দিন, কত যুগ, কত কত সময় ধরে কত কবি হেঁটে হেঁটে হেঁটে চলেছেন, তার হিসেবের অন্ত নেই বলা যায়! জীবন-বোধ যাঁদের আদর্শের মূল সূত্র, সেইসব কবিদের সৃষ্টির সেরা ফসল আমরাই যত্ন করে ঘরে তুলি।
কথা ধরে টানাটানি করি; ওটা নষ্ট দর্পণ
প্রাচীন ও সাধারণ অলৌকিক গদ্যময়!
কথারা নীরব ছিল আবহমানকাল অতলান্তে
ভালোবাসা ছদ্মবেশে খুলে দেখে;
কালের কেলেন্ডার সেই যে ধুলোর
ঝড় অশরীর গোলমেলে কবিতা সাক্ষী হয়ে
আছে জটিল প্রার্থনায়— অভিন্ন নির্ঘুম।
কথা ভাসে স্ট্রটোস্ফিয়ারের মধ্যে নির্বাচিত
স্মৃতিচোখ মেলে
শেষবার শব্দগুলো ঈর্ষায় জ্বলে; যেভাবে
সারিবদ্ধ কাব্যবাক্য গুলো ঝনঝন করে
ভেঙে পড়ে শোকে ও প্রতিটি দুঃখের সাথে।
(বিদ্যুৎ ভৌমিকের সম্প্রতি লেখা দীর্ঘ কবিতার পংক্তি থেকে)

আমার কবিতা, সে-টা কঠিন কিম্বা কঠোর! এই-সব কথাবার্তা এই মুহূর্তে না করাই ভালো, আর যদি করি তাহলে বলতেই হয়, কবিতা নামক বিষয়শ্রেণীতে অন্তর্ভুক্ত নিবন্ধসমূহের আদ্যোপান্ত ব্যপার গুলির দিকে যদি দৃষ্টি নিক্ষেপ করা যায়; তাহলে সবটাই দর্পণের প্রতিবিম্বের মত পরিস্কার ও স্পষ্ট হয়ে চোখের ও মনের মধ্যে এসে হাজির হবে! কবিতা বুঝি বা না বুঝি, এটা বড় কথা নয়। যেটা বলতে চাইছি, তার সত্যতা কতটা যুক্তিযুক্ত এবং ছবিটা কতটা যৌক্তিক, এটাই প্রকৃত সত্য বলা যায়। ইদানিং কবিতা নিয়ে মানুষের আগ্রহ বেড়েছে। একটা সময় কবিতা শব্দটার ও কবি নামক শব্দটার প্রতি সাধারণ মানুষের মধ্যে ঘৃণা এবং এক বিশেষ অবহেলা স্বাভাবিক ভাবেই দেখা দিত! যেটা থেকে এই সময়কার কবিরা অনেকটাই পথ ভেঙে ভেঙে এখন একটা নতুন পরিস্কার পরিচ্ছন্ন জায়গা পেয়েছেন! এটা কম সুখের, তাই-না? আমি-তো নিয়মের চেয়ে বেশি অনিয়মে মধ্যে বাস করে থাকি। এটা আমার অভ্যাসের মধ্যে থেকে গেছে! খুব পরিচিত এবং প্রিয়জন না হলে আমি কোথাও আমার কবিতা ছাপতে দেই না। এটা নাকি আমার আত্মগত অভিমান, কিম্বা অপরিণত চিন্তার রূপরেখা! রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা আমাকে প্রতিদিন একই ভাবে আন্দোলিত করে। আমাকে ভেতরে ভেতরে একটা নতুন মানুষ করে তোলে! আমি মনে-প্রাণে বিশ্বাস করি একটা কবিতা ভগবৎ গীতা কিম্বা পবিত্র কোরআন শরীফের মত ইউনিভারস্যাল যা দিয়ে বিশ্বের চেহারাটা-কে পাপ পুণ্যের বালাই থেকে এক নতুন পথের ঠিকানা দিতে পারে! যাই হোক, আমার কাব্য-ভাবনা নিয়ে আবার কখনো সময় পেলে লিখবো, যদি এই হৃদয়তান্ত্রিক লেখা পড়ে আপনাদের ভালো লাগে তাহলে আমি মনে করবো আমার লেখা সার্থক। সবাই ভালো থাকুন এবং কবিতার সঙ্গে থাকুন।