ডানসারির পাশের সীটে আসীন মেয়েটার চোখ আর ডান ভ্রুর নীচে স্পষ্ট তীল দেখে চমকে উঠল সাজিদ। তার অর্চি এতদিনে হয়ত ঠিক এতবড় হয়েছে জন্মতারিখ হিসেবে অর্চির এখন আট বছর। সাজিদ সাত বছর দেখেনি এই পৃথিবীতে তার একমাত্র বন্ধন, নিজের মেয়েকে। নিজের মেয়ে!মা একবছর হলো গত হয়েছেন। জন্মের পর বাবাকে কোনোদিন দেখা হয়নি। এখন হৃদয়ের কাছাকাছি শুধু একজনের বাস- অর্চি! অর্চির কথা মনে হওয়ামাত্র বুকের ভেতর কেমন মোচড় দিয়ে উঠল। কিন্তু সাজিদ ভেবে পেল না পাশের সীটে বসা মেয়েটিকে কেন তার শুধু অর্চি ভেবে ভুল হচ্ছে। সে নিশ্চিত সে তার আবেগকে যথাযথ নিয়ন্ত্রনে রেখেছে। তার আবেগের মাত্রা এখন এমন নয় যে অর্চির বয়সী সে যে কোনো শিশুকে সে অর্চি ভেবে ভুল করবে। হ্যা ভুল সে করেছিল। অপর্ণাকে পাগলের মতো ভালোবাসা ছিল তার জীবনের বড় একটা ভুল। ভালোবাসা শব্দকে যে নারী সত্যিকারার্থে ধারণ করতে পারে না, তাকে অন্ধের মতো ভালোবাসা ভুল বৈকি। কিন্তু আজকাল সে আর সবার কাছ থেকে সামান্যতম প্রত্যাশাটুকু করতে ভয় পায়। ভুলের মাত্রা তাই কম হয়। যদিও এই গত বছরেও রেস্তোরা, বিমান অথবা কোনো বিপনীবিতানে সে অর্চির বয়সী কোনো মেয়েকে দেখলেই ‘অর্চি’ ভেবে বিস্ময়ভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকত। এজন্য মাঝে মাঝেই তাকে বিব্রতকর পরিস্থিতিতেও কম পড়তে হয়নি। সাজিদ ঠিক ভেবে পাচ্ছে না তার সেই রোগটা আবার ফিরে এল কিনা! বাসের অডিও সিডিতে বেজেই চলছিল সাবিনার হৃদয় নিঃসৃত কন্ঠস্বর
‘যদি মরণের পরে কেউ প্রশ্ন করে কী দেখেছি?…’ সাজিদের ভেতরকে ভেজা ভেজা আবেগে ভরিয়ে তুলছিল। সে ডানপাশে ঝুকে শিশুটিকে আদর করে বলল
হেলো বেবি…
কোলের নরম তুলতুলে খরগোশ-পুতুলকে হঠাৎ বুকে আঁকড়ে ডাগর কোমল দুচোখ তুলে শিশুটি অবাক তাকাল সাজিদের চোখে। ছোট শিশুর এই একঝলক বিমূঢ় দৃষ্টি কেমন করে যেন সাজিদকে শৈশব হতে কৈশোরের চৈত্র বাতাসে উড়ে চলা শিমুল তুলার মতো স্বপ্নগুচ্ছের ভেতর তলিয়ে নিল। সাজিদের মনে হলো এই চাহনি তার অর্চি ছাড়া আর কারো নয়। নিষ্পাপ,কৌতুহলী আবার ছলছল এই দৃষ্টি সাজিদের অন্তর্বীণায় বাঁধা তিরতির জলের কম্পন হয়ে কাঁপতেই থাকল।
‘প্রশ্ন করে যদি
কী দেখেছি আমি সারাটি জীবন?
বলব নাও না পড়ে আমার এ মন…’
পেছনের সারীর অনেক মানুষের সামনে ঘোরের ভেতর আটকে থাকা এই দৃশ্য হতে মুক্তি পেতেই সাজিদের ঠোঁঠ হতে একটা বাক্য ফসকে গেল
তোমার নাম কী?
অর্পিতা। আমার নাম অর্পিতা।
অর্পিতা? অর্চি না?
‘অর্চি না’ প্রশ্নটা শুনে অর্পিতার পাশে বসা লোকটি সন্দেহের চোখে ভ্রু-কুঞ্চিত করে সাজিদকে দেখে নিল। সাজিদের চোখের ভেতর অর্পিতা কী দেখল তা তার ছোট্ট শিশুহৃদয় বুঝল না। অর্পিতার শুধু মনে হলো জন্মের পর হতে এই মানুষটা তার সাথেই আছে। যাত্রাপথে, স্কুলে যাতায়াতের সময় অচেনা কারো সাথে কথা বলা তার মায়ের বারণ। মায়ের বারণ ভুলে সাজিদকে সে উল্টা প্রশ্ন করল
২.
অর্চি? না তো। অর্চি কে?
অর্চি! আমার মেয়ের নাম অর্চি…
তোমার মেয়েকে তুমি সাথে আনো নি কেন? ঐ যে… অর্চিকে?
অর্পিতার পাশের লোকটি তখনো তার চোখের সন্দেহের ফলা নির্দিষ্ট করে রেখেছে সাজিদের দিকে। সাজিদ লোকটির দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে হাসল। সাজিদের অহংকারী মিষ্টি হাসিতে লোকটা যেন একটু গললো। পুরুষ মানুষও সুদর্শন পুরুষ মানুষকে আস্থায় নেয়। সাজিদ বুদ্ধি করে বলল
হ্যা, আমি তো অর্চির কাছেই যাচ্ছি।
অর্চির কাছে মানে?
মানে, এই শহরে আমার একটা অফিস আছে। আমার বাসা তো ঢাকায়। মায়ের সাথে অর্চি ঢাকাতেই আছে।
বস্তুত অর্পিতার পাশের লোককে শুনানোর জন্য সাজিদ এই মিথ্যাগুলো একটু জোড়েই উচ্চারণ করল। তার এই কথায় পাশের লোকটির মুখে কী কারণে যেন হাসি ফুটে উঠল। তার চোখে লুকিয়ে থাকা সন্দেহের তীক্ষ্ম ফলা একটু মোলায়েম হলো যেন। অর্পিতা মুখে অস্ফুট স্বরে শুধু ‘ওহ!’ শব্দ করে সাজিদের কথায় সায় দিল।তারপর খরগোশটাকে সে তার সীটের পাশে যত্ন করে রাখল। আগ্রহভরে সাজিদকে প্রশ্ন করল
অর্চিকে আমাদের বাসায় নিয়ে আসবে? আমি সারাদিন বাসায় একা থাকি।
সাজিদ প্রশ্ন করতে চাইল, ‘কেন তোমার বাবা-মা?’ -কিন্তু সে প্রশ্নটা এড়িয়ে গেল। পাশের লোকটা কখন যেন তার অন্তরাত্মায় সেন্সরশীপের ‘অটো-কর্তা’ হয়ে আসন গেড়েছে। সাজিদ বলল
তাহলে তো বাসা যাবার আগে আজ একবার তোমার বাসা চিনে যেতে হয়!খুশীতে ঝলমল করে উঠল অর্পিতার দুচোখ
সত্যি! প্লিজ চলো। আর শোনো,কালকে বিকেল থেকেই কিন্তু অর্পিতাকে আমাদের বাসায় আনবে। আমরা একসাথে খেলব। ঠিক আছে?
জানালার বাইরে জলমগ্ন এক প্রান্তর। ডুবে যাওয়া বিস্তৃত এক খাল মিলেছে সেই প্রান্তরে। সাজিদের ইচ্ছা করল এসি এই বাস থেকে নেমে অর্পিতাকে নিয়ে এই প্রান্তরের জেগে থাকা ঐ বটগাছ পেরিয়ে আরো দূরে কোথাও হারিয়ে যেতে। মাঠের মাঝখানে যে কুঁড়েঘর – বৃষ্টির ঝমঝম শব্দে মাতাল তার মেঘ-আঁধার উঠানে।
বাসটা একটা অভিজাত-রেস্তোরায় এসে থামল। দ্বিধা ছাড়াই অর্পিতা সাজিদের হাত ধরে বাস থেকে নামল। অর্পিতার পাশের লোকটি মনে হয় সাজিদকে নিয়ে এতক্ষণে দ্বিধাহীন। তাকে নিসংকোচে সে সাজিদের সাথে যেতে দিল। রেস্তোরার দোতলায় ঢোকার আগে ওয়াশ-রুম। অর্পিতা লেডিস-টয়লেটে ঢুকে ভেতর থেকে বলল
দরজাটা লাগিয়ে দিও না প্লিজ। তুমি ওখানেই একটু দাঁড়িয়ে থাকো।
বিয়ের পর এই টয়লেটেই একদিন অপর্ণা ঢুকেছিল। বিয়ে করা নতুন স্ত্রীকে সেদিন সারাপৃথিবীর সবকিছু হতে আগলে রেখে আঁড়াল করার সে কি প্রানান্ত আকুতি সাজিদের! এই টয়লেটের সামনে সে ঠাঁয় দাঁড়িয়েছিল। অপর্ণা বাইরে এসে ঠিক টয়লেটের দরজা আগলে ওমন করে সাজিদকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বিরক্ত হয়ে বলেছিল
ইসস! কি গেঁয়ো তুমি!
এলোমেলো করে পড়া জিন্সের প্যান্ট ঠিক করতে করতে অর্পিতা টয়লেট থেকে বের হয়ে এল। সাজিদ দেখল অর্পিতার ফ্রকের নীচের অংশ প্যান্টের ভেতর ঢুকে গেছে। ফ্রকটা ঠিক করে দিতে দিতে সে বলল
টয়লেটের দরজা বন্ধ করতে তুমি ভয় পাও?
হ্যা, দরজাটা যদি আর না খোলে!
ওহ, আচ্ছা। তাহলে তো দরজা বন্ধ না করাই ভালো। কিন্তু…
থেমে গেল সাজিদ। আনমনে বিড়বিড় করল ‘মেয়ে বড় হচ্ছে। অথচ তার ভয় পাওয়ার এই অভ্যাস না বদলালে…।’ রেস্তোরার এককোণে টবে লাগানো লম্বা গাছ। তারসাথে ছিমছাম একটা টেবিল। সাজিদ অর্পিতাকে নিয়ে ওখানেই বসল। জিজ্ঞাসা করল
কী খাবে?
কিছু না।
কিছু তোমাকে খেতেই হবে…
ওকে আমি স্যান্ডউইচ, তুমি? কিন্তু শোনো মা যেন কখনোই না জানে যে, আমি বাইরে কিছু খেয়েছি। তুমি তো আমার অচেনা নও, তাইনা?
না এ অর্চি ছাড়া কেউ নয়। সাজিদের মন নিশ্চিত তার সামনে এ তারই অর্চি! নিজের মনের সাথে সে বিড়বিড় করল ‘না হলে ওর আত্মিক সত্তাটুকু এত তাড়াতাড়ি আমাকে কেন চেনা-চেনা ভাবছে?’ সান্ডউইচ আর দুই কাপ কফির অর্ডার দিয়ে সাজিদ প্রশ্ন করল
তোমার সাথে লোকটা কে?
সুমন চাচু। আমাদের বাসার কেয়ারটেকার। মা-বাবা আমাকে সময় দিতে পারে না। রাতে মা এসে মাঝে মাঝে আমাকে শুধু ঘুমিয়ে দেওয়ার সময় পায়। আর এখন তো তারা দেশের বাইরে।
অর্পিতা একটু থামল। তারপর উদাস কন্ঠে বলল
সারাবছরই তাদের প্রোগ্রাম! তাই কেয়ারটেকার দিয়েই আমার টেক-কেয়ার, বুঝেছ?
কী করেন তোমার বাবা? ‘তোমার বাবা’ বলতে গিয়ে সাজিদের কন্ঠ কাঁপল। অর্পিতা বলল
দ্যট আই ডোন্ট নো। বাট ইউ নো, হী’জ আ বিগ ম্যান।
বিগ ম্যান? টলার দ্যান মী?
নট টলার বাট ফ্যাটার… হি… হি…হি…
শিশুসুলভ হাসিতে উচ্ছল হয়ে উঠল অর্পিতা। সাজিদের মন বলল, বাবা বলে চেনা লোকটা আসলে তার বাবা নয়। এ যে তারই অর্চি এ ব্যাপারে সাজিদ নিশ্চিত হওয়ার জন্য অস্থির হয়ে উঠল।
তোমার আম্মুর নাম কী?
অবন্তী…
অবন্তী? অপর্ণা কি তাহলে নিজের নাম বদলে ফেলেছে? সাজিদ মগ্ন হয়ে আনমনে ভাবতে লাগল। আর নিজের সামনে রাখা কফির মগের কথা ভুলে অর্চির পরম আগ্রহে ভরা স্যান্ডউইচ খাওয়া দেখতেই থাকল। অর্চির পেটে মনে হয় রাজ্যের ক্ষুধা লেগে ছিল। প্রিয় মানুষের সঙ্ঘ-আনন্দ ছাড়া শিশুর ক্ষুদ্র পেট খুব একটা ক্ষুধা অনুভব করে না মনে হয়। কোনো শিশুর খাদ্যগ্রহণের দৃশ্যে এত মায়া লুকিয়ে থাকতে পারে! সাজিদের শুধু মনে হলো -যুগ যুগ ধরে তার অর্চি ক্ষুধার্ত! কোনো এক অচেনা শংকায় কখনোই সে পেট পুরে খায় না। এই দৃশ্যের সামনে বসে সাজিদের চোখ ভরে জল আসতে চাইল। সংযত হয়ে সে অর্পিতাকে বলল
আরো স্যান্ডউইচ দিতে বলি আম্মু?
‘আম্মু’ শব্দটা সাজিদের অজান্তে তার ভেতর থেকে বের হয়ে এল। আর সাজিদের ওমন প্রস্তাবে অর্পিতার উচ্ছলতায় অবাক আর লাজুক ভঙ্ঘিমা এসে তাকে দখল করল। সাজিদ ওয়েটারকে আরো তিনটা স্যান্ডউইচ দিতে বলল। অর্পিতা বলল
কিন্তু সুমন চাচু যেন না জানে আমি চারটা স্যান্ডউইচ খেয়েছি।
কেন, জানলে কী হবে? অর্পিতা চেয়ার টেনে দ্রুত সাজিদের পাশে চলে এল। আশেপাশে অক্ষিগোলক ঘুরিয়ে দেখল তার সুমন চাচা কোথাও আছে কিনা। কোথাও তার অস্তিত্ব নেই দেখে সাজিদের কানে ফিসফিস করে বলল
উনি তাহলে মাকে বলবে আমি আটটা স্যান্ডউইচ খেয়েছি। বাবা আমাকে ‘রাক্ষস’ বলবে।
কিন্তু সে আটটা বলবে কেন?
যা খাব তার ডাবল সে শো করবে। এটাই সুমন আঙ্কেল’স ল। মানে নিয়ম। নিয়ম মেনে চলতে হয়। না মানলে সে তার লুকিয়ে রাখা স্টিক বের করে আমাকে মারবে। কথাগুলো বলেই নুয়ে আসা ভীত চোখে অর্পিতা তার ফ্রক তুলে পেটের নাভি বরাবর লম্বা-কালচে দাগটুকু দেখাল।
এই যে দ্যাখো, উনি রংপুরে গিয়ে আমাকে কেমন মেরেছেন! টলটল জলে অর্পিতার চোখ ভরে এল। তাড়াতাড়ি চোখ মুছে সে সাজিদকে চুপ থাকার ইশারা করে বলল
ইসস! তুমি একথা কাউকে বলতে যেও না প্লিজ। সে বলেছে, এ কথা কেউ জানলে সে আমাকে তরবারি দিয়ে কেটে ফেলবে। তরবারি মানে বুঝেছ? ঐ যে… যেটা সোর্ড!
সাজিদের অন্তরাত্মা কেউ যেন সত্যি সত্যি ধারালো এক সোর্ড দিয়ে ভাগের পর ভাগ করে চলছে। তার অর্চিকে এভাবে কেউ প্রহার করছে তা তার পিতৃহৃদয় কিছুতেই মানতে পারল না। ছলকে উঠা একরাশ আবেগের সাথে প্রচন্ড আক্রোশ তার চোখের ভাষাকে সুদূর-প্রসারী অথচ নীমিলিত, ভয়ংকর অথচ মায়াবী করে তুলল। অর্পিতা ততক্ষণে আবার গোগ্রাসে স্যান্ডউইচ খেতে আরম্ভ করে দিয়েছে। এত ক্ষুধার্ত মেয়ের জন্য প্রথমে মাত্র একটা স্যান্ডউইচ অর্ডার করায় সে যেন নিজেকে ক্ষমা করতে পারল না। দ্রুত ওয়াশরুমে গেল সাজিদ। অর্পিতার ছোট্ট পেটের নরম ত্বকে, নাভি বরাবর লম্বা-কালচে দাগ ওর চোখের সামনে ভাসতেই থাকল। ঐ দাগটুকু আকুল আকুতি মেখে যেন সাজিদের দিকে তাকিয়ে আছে। ট্যাপের পানিতে তার হাত সঞ্চালন দ্রুত হলো এবং অনবরত সে চোখে-মুখে পানির ঝাপটা দিতে থাকল। ধাতস্থ হয়ে সে একসময় রেস্তোরার বাইরে এসে সুমনকে খুঁজে বের করল এবং এক হাজার টাকার দুটা নোট তার হাতে গুঁজিয়ে দিয়ে বলল
আপনি খেয়ে নিন আর বাঁকি টাকায় ঢাকায় গিয়ে অর্পিতাকে কিছু কিনে দিলে আমি খুশী হব। টাকা পেয়ে সুমন গদগদ হয়ে ‘জী স্যার’ বলে রেস্তোরার নীচতলার দিকে হাঁটা শুরু করল। সেদিকে তাকিয়ে সাজিদের ভেতরের হিংস্র এক সত্তা বলল
বাস্টার্ড! ইউ হ্যাভ ইনভেস্টেড মাই অর্চি টু আর্ন মানি! নাউ আই’ল বাই ইউ টু কাট ইন পিচেস… সাজিদের ভেতর থেকে আরেক সাজিদ বলে উঠল
অর্চির জন্য নয় অর্পিতার জন্য তোমার পিতৃহৃদয় এতদিন পর জাগল?
আমি কি জানতাম আমার অর্চি…
এ অর্চি নয় সাজিদ; ওর নাম অর্পিতা।
এই-ই আমার অর্চি। ‘নারী’ শব্দধারী অপর্ণা নামের ডাইনী বদলে দিয়েছে আমার মেয়ের নাম। ঢাকায় গিয়ে আমি অর্চির বুকের ডানপাশ হতে বগল পর্যন্ত আঁকাবাঁকা নদীর মতো বিস্তৃত জন্মদাগ দেখে নিশ্চিত হয়ে নিব।
অর্পিতাকে নিজের পাশে বসানোর জন্য সাজিদ পাশের ভদ্রলোককে অনুরোধ করে অর্পিতার সীটে বসিয়ে দিল। জানালার পাশে বসেই অর্পিতা সাজিদের শরীরে মাথা এলিয়ে নিশ্চিত আর পরম তৃপ্তির ঘুমে ঢলে পড়ল। বাইরে বৃষ্টির দাপুটে ঝাপটা। সবার চোখ এড়িয়ে সাজিদ বামে একটু কাত হয়ে ঘুমন্ত অর্পিতার শ্বাস-প্রশ্বাস, তার কোষে কোষে জেগে থাকা স্থির অভিব্যক্তির দিকে বুবুক্ষু-পিপাসার্ত অভিব্যক্তি নিয়ে তাকিয়ে থাকল। হাজার বছর ধরে; যেন এই জন্মেরও অনেক আগে চেনা এই মুখশ্রী সাজিদের হৃদয়ে ছটফট কথার কাঁপন তুলল। মনের অতলান্তে ঝিরঝির করে ঝরা বৃষ্টি-ফোটাগুচ্ছের এই দৃশ্যকল্প সাজিদের বুকে লুকিয়ে থাকা এক সাগর ভালোবাসার ঢেউকে উথলে তুলল।
এ আমার অর্চি! অর্পিতা নয় -অর্চি!
৩.
বাস থেকে নেমে অর্পিতার সাথে সাজিদ তাদের বাসায় গেল। ধানমন্ডি লেকের পাশে তিন হাজার স্কয়ার ফিটের এই বাসায় অর্পিতার জন্য অসংখ্য খেলনা-সামগ্রী। বোঝা যায় খেলনা সামগী দিয়ে ব্যস্ত বাবা-মা তাদের ভালোবাসা স্থানান্তরের প্রচেষ্টা কম করেন নি। উচ্ছল অর্পিতা সাজিদের হাত ধরে দৌড়ে তাকে তার ঘরে নিল। অর্পিতার ঘরে ঢুকেই দেওয়ালে বাধাঁনো ছবির ফ্রেমে চোখ আটকে গেল সাজিদের। অর্ধেক মাথা চুলশূন্য, টাই-কোট পড়া ভদ্রলোকের পাশে কৃত্রিম হাসি মুখে যে সুন্দরী নারী সে যেন তার পূর্বজন্ম হতে চেনা! অস্ফুট এক স্বর ঝরল সাজিদের কন্ঠে
অপর্ণা!
কী সব কথার খেলায় থরথর করে বুকের প্রান্ত কেঁপে উঠল সাজিদের। অপর্ণার জন্য নয়; অর্চির জন্য। সাজিদ আজলা ভরে জল খাবার ভঙ্ঘিমায় দ্রুত হাঁটুগেড়ে অর্চির সামনে বসল। কাঁপা কাঁপা দু’হাত রাখল অর্চির গালে। এই যেন সেদিন-জন্মানো অর্চিকে প্রথম বুকে জড়িয়ে অপার আনন্দে ভাষা হারিয়ে ফেলেছিল সাজিদ। সেই অর্চিকে আজ পিপাসার্ত চোখে নতুন করে দেখছে সে। প্রগাঢ় মুগ্ধতায় সে অর্চিকে দেখতেই থাকল এবং আচমকা সাজিদ নিজের গায়ের টি-শার্ট খুলে ফেলল। নগ্ন বুকের প্রান্ত হতে বগল পর্যন্ত ঢেউয়ের মতো বিস্তৃত নিজের লালচে জন্মদাগ দেখিয়ে বলল ‘তোমার গায়ে এমনি একটি ঢেউ আছে তাই না আম্মু? অর্পিতা নয় তোমার নাম অর্চি। হ্যা, তুমি আমার অর্চি!’এবং কোনো দ্বিধা অথবা দ্বিরুক্তি ছাড়াই সে অর্চির ফ্রক খুলে ফেলল।
একই গড়নের দুই শরীর। বড় শরীরটার প্রতিবিম্ব হয়ে যেন হতভম্ব অর্চি দাঁড়িয়ে আছে। দুজনের বাদামী বর্ণের বুকের প্রান্ত হতে কোনো এক অদৃশ্য-শিল্পী মায়াময় তুলিতে এঁকে দিয়েছেন অদ্ভূত এক ঢেউ। এক জীবন-স্পন্দনের থেমে যাওয়া প্রতীক!
সম্বিত ফিরে সাজিদ দেখল, অর্চি প্রাণহীন আর ভয়ার্ত চোখে তাকিয়ে আছে ঘরের দরজার দিকে। অর্চির দৃষ্টি অনুসরণ করে সাজিদ পিছনে মুখ ঘুরিয়ে দেখল, কফির কাপ হাতে সুমন দরজায় দাঁড়িয়ে। তার হাতে ছোট্ট এক ক্যামেরা।
৪.
বাড়ি ফিরতে ফিরতে সাজিদ অফিসের ম্যানেজারকে ফোন করল। নির্মোহকন্ঠে আদেশ দিল
আজ সন্ধ্যায় আমি উকিলের সাথে বসতে চাই। আর আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে ধারালো এক তরবারী চাই। ‘তরবারি মানে বুঝেছেন? ঐ যে… যেটা সোর্ড!’
৫.
তিনদিন পর সন্ধ্যায় উকিল এলেন। একগাদা ফাইল টি-টেবিলের রেখে হতাশ কন্ঠে বললেন
এ কেস লড়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়। বিরক্ত হয়ে সাজিদ বলল
কত টাকা চাই আপনার, সবকিছুর বিনিময়ে আমি আমার অর্চিকে ফেরত পেতে চাই।
দেখুন সাজিদ সাহেব, আপনি একজন নামী স্থপতি। আপনার কাছে আপনার মেয়েকে ফিরিয়ে দিতে পারলে বড় তৃপ্তি পেতাম। টাকা তো জীবনে কম কামাইনি।
তাহলে?
৬.
এক সম্পদশালী মিডিয়া-মোগলের সাথে যুদ্ধ করে টেকা বড় মুশকিল। তাছাড়া ওরা সব ডকুমেন্টস বদলে ফেলেছে।
কীসের ডকুমেন্ট?
তার আগে বলুন তো মিসেস অপর্ণা আপনার মতো হ্যান্ডসাম পুরুষ ছেড়ে…
ওর ভেতরে ‘বিখ্যাত’ হওয়ার জন্য এক ধিকিধিকি আগুন জ্বলত জ্বল-জ্বল। নাটক-সিনেমা করতে চাইত। আমি তা করতে দিতে চাইনি বলে …
বিখ্যাত হয়ে কী লাভ আসলে জীবনে?
তা তো জানি না। যা হোক আপনি ডকুমেন্টের কথা কী যেন বলছিলেন।
মিসেস অপর্ণা জন্ম নিবন্ধনে নিজের নাম,জন্ম-তারিখ সব বদলে নিয়েছেন। অপর্ণা মিডিয়া মোগলের সাথে প্রথম বিয়ে দেখিয়ে তাদের বিয়ের নিবন্ধনও করিয়েছেন অর্চির জন্মের দেড় বছর আগে।
কী বলছেন?
আপনার কাছে বিয়ের ডকুমেন্টসগুলো আছে?
না, ওগুলো অপর্ণাই রাখত।
আরো সমস্যা আছে, অর্চির নামটাও জন্ম নিবন্ধনে অর্পিতা হয়ে গেছে।
তবু কেসটা আমি লড়তে চাই। বলেই আবার গায়ের শার্ট খুলল সাজিদ। উকিলকে শরীরের জন্মদাগ দেখিয়ে বলল
আমার মেয়ের শরীরে হুবুহু একটা জন্মদাগ আছে – অর্চিকে আমার মেয়ে প্রমাণ করতে এরচেয়ে বড় ডকুমেন্ট আর কী হতে পারে?
সাজিদের পৌরুষদীপ্ত শরীর হতে চোখ ফিরিয়ে নিয়ে উকিল মনে মনে আৎকে উঠল, ‘তাইতো, অপর্ণা এজন্য মেয়েকে হাসপাতালে প্লাস্টিক-সার্জারীর সার্জনের কাছে নিয়েছেন! প্লাস্টিক-সার্জারী করে মেয়ের শরীর থেকে জন্মদাগ মুছে দেওয়ার জন্য?’ তারপর বিষন্ন চোখে ব্যাগ হতে তিনি কয়েকটি জাতীয় পত্রিকা বের করলেন এবং দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে পত্রিকাগুলো সাজিদের দিকে এগিয়ে দিলেন। একের পর এক পত্রিকার পাতায় চোখ রেখে হতভম্ব আর স্থবির হয়ে গেল সাজিদের সমগ্র সত্তা-
‘বাবা সাজার অভিনয় করে আট বছরের শিশুকন্যা ধর্ষণ করলেন স্থপতি!’ অন্য আরো একটি পত্রিকা সাজিদ আর অর্চির সেদিনের জন্মদাগ দেখানোর মুহূর্তে খালিগায়ের ছবি ছাপিয়ে লিখেছে
‘ধর্ষণের আলামত প্রমাণিত।’
নিজের জন্য খারাপ লাগছিল না সাজিদের। অপমান শব্দটা তার সত্তার অভিধান থেকে কোথায় যেন অদৃশ্য হয়ে গেছে। রোজগারের পূঁজি পাকাপোক্ত করার জন্য সুমন তার অর্চিকে ধর্ষণ করেছে? অর্চি ধর্ষিত হয়েছে এক গল্পের প্রয়োজনে! এমন ভাবনায় সাজিদের চোখে অশ্রুর বন্যা নামল। হাতের মুঠো প্রাণপণে শক্ত, আরো শক্ত করে সে ঘামতে থাকল। তার চোখের অশ্রু বৃষ্টিফোটার মতো ভিজিয়ে দিচ্ছিল তার গন্ডদেশ। প্রাণান্ত চেষ্টায় সে ম্যানেজারের উদ্দেশ্যে হুঙ্কার ছুড়তে চাইল
‘ম্যানেজার! আমার সোর্ড…?’
একটাও শব্দ তার কন্ঠ হতে নিঃসৃত হলো না। দৃষ্টি তার কোন সুদূরে প্রসারিত… সে যেন দেখতে পাচ্ছিল, সুমন ছিড়ে ফেলেছে তার ছোট্ট অর্চির কাপড়। মেয়ের কুঁকড়ে উঠা ওমন ভীতিময় চোখ সাজিদের সমস্ত শক্তি নিঃশেষ করে ফেলল।
ঠিক তখন দরজা অতিক্রম করে পুলিশ এসে সাজিদের সামনে দাঁড়াল। সাজিদের চোখের শূন্য-দৃষ্টতে শ্যেন দৃষ্টি হেনে বলল
মিঃ সাজিদ, ইউ আর আন্ডার এরেস্ট!
কিন্তু পুলিশের কথায় কান ও মন কোনোটাই নেই সাজিদের। তার দৃষ্টি তখন তার ফ্লাটের খোলা দরজায়। সাজিদের ঝাপসা দৃষ্টি পেরিয়ে এক নারী মূর্তি ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছিল। সন্তান কোলে এক ‘মা’! চিরন্তন সেই মূর্তি অবিরল বৃষ্টির ঝাপটা অথবা হেমন্তের ভরা কুয়াশা পেরিয়ে যেন এগিয়ে আসছে। হতভম্ব সাজিদের ভেতরটা চির-পরিচিত দুই চোখের চাহনী দেখে চমকে উঠল।
কী এক অদ্ভুত অনুরণনের খেলায় তার সত্তা কেঁপে উঠল। ঝাপসা চোখ সাজিদ মুছে নিল দ্রুত। ভীত-সন্ত্রস্ত অর্চিকে কোলে তার সামনে দাঁড়িয়ে অপর্ণা! অপর্ণার ডানপাশের কেটে যাওয়া কপালে চোট্ট ব্যান্ডেজ। সাজিদের কণ্ঠে অস্ফুট স্বর ফুটেই মিলিয়ে গেল। কিন্তু মিলে গেল না তার ঠোঁটের কোণে জেগে উঠা অপার্থিব এক হাসি
অপর্ণা!
টলটল অশ্রুকণা অপর্ণার চোখ ভরিয়ে তুলল। দুচোখের ভাষায় ক্ষমা চাওয়ার আকুল আর্তি তুলে সে বলল
হাসপাতালে নেওয়ার নামে অর্চিকে নিয়ে তোমার কাছে পালিয়ে এসেছি…
সন্তানের বিপদের মুহূর্তে মাতৃত্ব সবচেয়ে বেশী সজাগ হয়ে উঠে। মাতৃত্বের সকল গ্রন্থি হতে ঝরা সজাগ আবেগ আর ঋজুতা গিলে অপর্ণা অর্চিকে বুকের মাঝে আরো শক্ত করে আঁকড়ে ধরে আবার বলল
ফরগিভ মী, সাজিদ… চলো অর্চিকে নিয়ে আমরা চলে যাই, অনেক দূরে কোথাও। তোমার-আমার অর্চি!
সাজিদ আর অর্চি। মাঝখানে পিতার শরীরের জন্মদাগ সন্তানের মাঝে প্রবাহিত করা এক মাতৃত্ব। নারী ‘মা’ হয়ে গেলে তার চিরন্তন সত্তায় সন্তান রক্ষার এক মূর্তি জেগে উঠে। অর্চির জন্য অপর্ণার মাতৃত্বে আজ জেগে উঠেছে সেই অপরুপ মূর্তি!
অপর্ণা আজ ‘মা’ হয়েছে, পৃথিবীতে এর চেয়ে শ্রেষ্ঠত্ব আর কী আছে!