যুদ্ধে যাবার জন্য মন উতলা হল মমনুলের। নদির কোল ঘেঁষে বয়ে চলা একটি নিভৃত গ্রামে তার বাড়ি। স্বাধীন বাংলা বেতারের খবর শুনে মমনুল দেশমাতৃকার শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য উজ্জীবিত হল। মমনুলের বাড়ি থেকে চার মাইল দূরে ইউনিয়ন পরিষদ অফিসে রাজাকার ক্যাম্প বসিয়েছে। সেখান থেকে টহলে বেড়িয়ে তারা গ্রামবাসীদের হাঁস মুরগি গরু ছাগল এমনকি টাকাকড়িও কেড়ে নিয়ে যায়। মমনুলের গ্রামের নাম সাবানন্দ। সেখানে যদিও রাজাকার আসেনি তবে আসতে কতক্ষণ লাগে। নৌকাযোগে খান সেনারা আক্রমন চালালে প্রথম টার্গেট হবে সাবানন্দ। রাতের অন্ধকার নেমে এলে কারও চোখে ঘুম আসে না। অনেকেই মেয়েদের দূরের আত্মীয় বাড়িতে রেখে চিন্তামুক্ত হয়েছে। মমনুলের একটি মাত্র বোন। বছর দুয়েক আগে তার বিয়ে হয়েছে তিনশ বিঘার চরে। এখন বাবা মায়ের চিন্তা শুধু মমনুলকে নিয়ে। কখন খানসেনা এসে ওকে ধরে নিয়ে গুলি করে মেরে ফেলে । ধরলার ওপর তীরে খানেরা মানুষ মেরে সাবাড় করছে। যুবতী মেয়েদের ধরে নিয়ে আস্তানায় আটকে রেখে পাশবিক নির্যাতন করছে। রাতের বেলা মুক্তিবাহিনী আক্রমন করলে শুরু হয় তুমুল গোলাগুলি। গুলির শব্দ এতটা মারাত্মক, মনে হয় রাতেই খানেরা ধরলা পার হয়ে সাবানন্দে আস্তানা ফেলবে। মমনুলের বাবার কথা, গুলি খেয়ে মরবে তবু বাড়ি ছেড়ে কোথাও যাবে না। দেশের মাটিতে যদি জীবন চলে যায় তাই ভালো। কিন্তু বিদেশ বিভুঁইয়ে কুকুর শৃগালের মতো পড়ে থেকে লাভ নেই। রাতের খাবার খেয়ে মমনুলের বাবা কলেমা জপে বিছানায় শুয়ে পড়ে। যখন ধরলার ওপারে গুলির শব্দ হয় তখন বড়ো আব্বা এসে দরজায় ধাক্কা দিয়ে ডাকতে থাকে। বড়ো আব্বা বাবাকে সরকার বলে ডাকে। বাবা ছাড়া দশ গ্রামে কেউ লিখতে জানত না। বাইরে দাঁড়িয়ে বড়ো আব্বা তোতলানো কণ্ঠে বলে,
“এইদন করি ঘুমাইলে চলে। গুলির শব্দ কি তোমার কানোত যায় না?”
“কি কইরবার কন। গুলি তো পত্তি আইতে হইতে আছে।” ঘুম জড়ানো গলায় বাবা জবাব দেয়।
“কোন উপায় করা নাইগবার নয়। বিচনাত শুতি থাইকলে চইলবে?”
“শুতি না থাকি কি করমো। দুয়োরত বসি থাইকপার কন?”
“দুয়োরত বসি থাকে মানে। মাইনষে ছওয়া পওয়া গোরু-বাছুর ভাগবার নাইগচে।”
“নোয়ায় তো কি? আর্মি আইসলে ঠ্যকপার পামো? কার বাড়ি যামো জিনিষপাতি ধরি।”
“মাইনষে বাইর জাগাত যাবার নাইগচে। এমার মাথাত কোন ভাবনা নাই।”
“আইত পোবার দ্যাও। চউক মুন্দি ঘরত শোতো যায়া। চর জাগাত কোনটে আর্মি আইসে?”

বড়ো আব্বার সাথে প্রতি রাতে বাবার এমন কথা হয়। কিন্তু সকাল হলে অন্যত্র যাবার কথা মনে থাকে না। ওদের গ্রামের দক্ষিণে হিন্দু পাড়া। সেখানে না গেলে মমনুলের ভাত হজম হয় না। হিন্দুপাড়ার কাছে নদির ধারে আজমল কর্মকার আপন মনে কথা বলে। ওর কথা মনোযোগ দিয়ে শোনে মমনুল। একটা ইংরেজি বাক্য কোথায় যেন শিখেছে আজমল । প্রায় সময় সেই বাক্য খ- করে বলে আর হাসে। মমনুল ভাবে, “এফিট ইয়ার ফিটার ম্যানিস সাইড কম এডমিশন ক্রোসাস ইওর ক্যান্ট্রি ক্রুলি ক্রুলি” বাক্যটির মানে কি? জানতে চাইলে সে বলে না। ওর মেয়ে সান্তা সুন্দরি বটে! সান্তা সামনে এলেও ওর সাথে কথা বলে না মমনুল। সব সময় চোখও তোলে না। বাইরে এসে বাবার সাথে কথা বলে মমনুলের দিকে আড় চোখে তাকিয়ে চলে যায় সান্তা। কখনও এসে এটা ওটা বায়না করে। মমনুল বাবার কাছে কোনকিছুর বায়না করে না। জমি ভেঙ্গে অবস্থা যা হয়েছে তাতে বায়না করা মানে বাবা মাকে উত্যক্ত করা। না তাকালেও মমনুল হৃদয়ের আয়নায় ওর গর্বিত ছবি প্রত্যক্ষ করে। ওর ¯িœগ্ধ ছবি মমনুল বুকের ভেতর লুকিয়ে রাখে। নিজের বক্ষস্পন্দনে নিজেই শিহরিত হয় সে। অর্থাভাবে মমনুলের লেখাপড়া হুমকির সম্মুখীন। সে এক উদ্দাম যুবতীকে বুকের নিভৃতে লালন করছে। সে ভাবে এ অবস্থায় ¯্রষ্টাও পরিহাস করবে তাকে । মমনুল সান্তার স্বপ্নিল মুখখানা কল্পনার বাষ্পে মলিন করে না। রাতের আকাশে যখন চাঁদ উঠে তখন খোলা মাঠে দাঁড়িয়ে মমনুল নির্মল জোসনার ধারায় সান্তার ছবিখানা ধুয়ে দেয়। একদিন সান্তাই কথা বলে মমনুলের সাথে,
“আমাকে একটা অঙ্ক বুঝিয়ে দিন না মমুভাই।”
“আমি অঙ্ক বুঝাতে একদম পারিনা।”
“এমন করে বলছেন কেন।”
“কেমন করে বলছি।”
‘এই যে বলছেন অঙ্ক পারেন না।’
“যা সত্য তাই সহজে বললাম।”
“মনি আর শংকরকে আপনি অংক শেখাননি?”
ওর কথা ফেলতে পারেনি মমনুল। ওর মগজে ভালো করে অঙ্কের পাঠ ঢুকিয়ে দিয়েছে। সান্তার নারী দেহের মদির সুবাসে হৃদয় মন ভরে গেছে মমনুলের। অঙ্কে সান্তার দক্ষতা কম নয়। সহজে বুঝতে পারে। একটু গাইড দিলে কঠিন অঙ্ক কষেও দিতে পারে। কিন্তু অনেক ঝামেলা পাকায়।
“ইস, আপনি এমন কঠিন অঙ্ক কষতে দেন যে মাথা ঘুরায়। এটা আমি পারব না।”
“এটা তো আগের নিয়মে। সুত্র বসিয়ে দিলেই হবে।”
“কোন সুত্র বসাব?”
“কেন, বর্গের সুত্র।”
“এ স্ককার প্লাস বি স্কয়ার?”

যুদ্ধ নিয়ে গ্রামে আতঙ্ক বিরাজ করছে। ইতোমধ্যে অনেকে গোরু-বাছুর এবং মালপত্র সরিয়ে নিয়েছে অন্যখানে। সান্তার বাবাও মনে হয় এ বিষয়ে চিন্তা করছে। কিন্তু কারও কাছে প্রকাশ করছে না। কোথায় যাবে সান্তারা? মমনুলের মনে প্রশ্ন জাগে। মমনুল ভাবে সান্তা নিশ্চয়ই তাকে এ বিষয়ে কিছু জানাবে। কেন জানি ওর কথা ভাবলে বিষণœ মেঘে ছেয়ে যায় মমনুলের মন । দেশে যুদ্ধ চলছে। যার যেদিকে সুবিধা চলে যাচ্ছে। তাদেরও যাবার জায়গা নেই। মামার বাড়িতে ওরা যেতে পারে। কিন্তু মামাদের অবস্থা ভালো নয়। পরিস্থিতি খারাপ হলে বাবা ওখানেই যেতে হতে পারে। মমনুল দেখল সান্তা তার সামনে আসছে না। না আসাই ভালো। কী হবে মিথ্যে মায়ায় জড়িয়ে। এক তরুণির রূপের জালে জড়িয়ে উদাসি পথিকের মতো ঘুরে বেড়ানোর কি প্রয়োজন। এই ঘোলাটে পরিবেশে হৃদয়ের কান্না কেউ শুনবে না। তবু এই সংকটাবস্থায় সান্তার পরিবারের কথা ভেবে মমনুলের মন কেঁদে ওঠে। এক নির্জন দুপুরে মমনুল সান্তার বাড়ির পেছনের বিলে বড়শি ফেলে মাছ ধরছিল । বিলের পাড়টা ছিল জঙ্গলাটে এবং সুমসাম। সহসা ওর পাশে এসে পা ছড়িয়ে বসে সান্তা। মমনুলের বড়শিটা হাতে নিয়ে ও বলে,
“আমিও মাছ ধরি মমুভাই?”
“ধরতে মানা নেই। তবে একটু সমস্যা আছে।”
“কি সমস্যা হবে আপনার সাথে মাছ ধরলে?”
“কেউ দেখে ফেললে সারা গ্রামে রটিয়ে দেবে।”
“কি রটিয়ে দেবে সারা গ্রামে?”
“এই যে নির্জন ঘাটে একজন যুবতীর মাছ ধরছি। এসব জড়িয়ে অনেক কথা বলবে।”
“আমাকে যদি খানেরা ধরে নিয়ে ক্যম্পে আটবে রাখে। তখন কিছু বলবে না?”

সান্তার চোখে পানি আসে। সত্যি যদি ওকে খান সেনা ধরে নিয়ে নির্যাতন করে। এমন কথা ভাবতে পারে না মমনুল। কেন জানি সান্তাকে বড়ো আপন মনে হয় তার। দেশে এখন হাজারও সান্তার উপর অত্যাচার হচ্ছে । কি করার আছে মমনুলের? সেজন্য সে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহন করতে চায়। কিন্তু সে কথা সে জানাতে চায় না সান্তাকে। কি হবে ওকে জানিয়ে? সান্তা তো ওকে জানাচ্ছে না কোথায় যাবে তারা। মাছ পড়ছে মমনুলের বড়শিতে। ছিপ ফেলে আনমনে মাছ ধরছে সান্তা ওর পাশে বসে। এতটুকু সংকোচ করছে না। মমনুলের গা ঘেষে বসে সে বারবার ছিপ ফেলছে।
“শুনলাম, আপনি নাকি যুদ্ধে যাবেন?” ব্যথাতুর চোখ তুলে মমনুলকে প্রশ্ন করে সান্তা।
“সবাই যাচ্ছে। ভাবলাম আমিও যাই।”
“আমাকে তো একবারও বলেননি। কেমন মানুষ আপনি?”
“কখন বলব? তোমার দেখা পেলে তো।”
“আমার কথা আপনি ভাবেন?”
“ভাবি বললে ভুল হবে। তবে মনে পড়ে।”
“কখন মনে পড়ে মমুভাই?”
“সব সময়। তবে জোসনা রাতে বেশি মনে পড়ে।”
“সত্যি বলছেন। বৃষ্টি এলে মনে পড়ে না?”

রিয়াজুলের সাথে যুদ্ধে যাবার আলাপ হয় মমনুলের। ওরা শুনেছে পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়িতে গিয়ে নাম লেখাতে হয়। আসামের ধুবড়িতে একজন প্রাক্তন এম.এল.এ নাকি এ কাজের দায়িত্বে আছেন। সাবানন্দ থেকে যাত্রাপুর হয়ে ধুবড়ি পৌঁছা অনেকটা সহজ। সেজন্য তারা একদিন ধুবড়ির দিকে রওনা করল। পায়ে হেঁটে তারা মদিনা সরকারের চর, তিনশ বিঘা, তিনহাজারি হয়ে তারা সীমান্তবর্তী আইড়মারির চরে পৌঁছল। কিন্তু ভারতের ছালাপাড়া ক্যাম্পের বি,এস.এফ ওদেরকে আটকে দিল। ওদের নিকট যা ছিল সব কেড়ে নিল তারা। রাতে কিছুই খেতে দিল না। পরদিন সকালে ওদেরকে বাংলাদেশের দিকে ঠেলে দিল। ওদের অনুরোধে কোন কাজ হল না। বাধ্য হয়ে তারা বাড়ি ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নিল। মমনুলের মামার বাড়ি গবরির চরে। সেখানে দুদিন থাকল তারা। মামাত ভাইদের সাথে নদিতে মাছ ধরে হৈ-হুল্লোড় করে সময় কাটাল। ওখানে খান সেনার ভয় নেই। গবরির চরের চারদিকে ¯্রােতস্বিনী নদি। জালের মতো নদি পার হয়ে খানেরা এদিকে কোনদিনই আসবে না।

মামাত ভাই হোসেন আলীরও যুদ্ধে যাবার প্রবল ইচ্ছা। তার একটাই কথা যে খানেরা এদেশের মা বোনের উপর অত্যাচার করে তাকে মেরে সে হাতের সুখ করবে। ষ্টেনগানের ম্যাকযিনে গুলি ভরে হামাগুড়ি দিয়ে সে চলে যাবে খানদের ক্যাম্পের কাছাকাছি। তারপর ব্রাশ ফায়ার করে সবার বুক ঝাঁঝরা করে চোখের নিমিষে চলে আসবে নিজের আস্তানায়। ওদের যুদ্ধে যাবার কথা শুনে হোসেন আলী উতলা হয়ে ওঠল। এবার তারা তিনজনে মিলে রওনা করল জলপাইগুড়ির দিকে। তারা এতটা আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছিল যে পথ খরচা সাথে নেয়ার কথা একটি বারের জন্যও ভাবেনি। শুধু ঠা-া পানি আর কাচা আম খেয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল তারা। পথ ভুল করে তারা খানদের দখল করা এলাকায় ঢুকে পড়েছিল। এক হৃদয়বান লোকের সহায়তায় তারা জান বাঁচিয়ে বাড়ি ফিরে এসেছিল। যুদ্ধে যাওয়া হয়নি তাদের ভাগ্যে।

দুদিন ঘর থেকে বের হতে পারেনি মমনুল। পরিশ্রম এবং অভুক্ততায় শরীর খারাপ হয়ে পড়েছিল। কিছুটা সুস্থ হয়ে বিধ্বস্ত মন নিয়ে সে যায় সান্তাদের বাড়ির দিকে। কিন্তু কোথায় সান্তারা? ওদের পাড়ায় সমস্ত বাড়িঘর ফাঁকা। টিকিন সরকার, কৃষ্ণধর ডাক্তার আর শিবরাম বাবুর বাড়ির দরজা জানালা কারা যেন খুলে নিয়ে গেছে। টিকিন সরকারের ছেলে কৈশল্ল মমনুলের বন্ধু। মমনুল যখন গোবিন্দপুর থেকে বালুর প্রান্তর পার হয়ে রেলবাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়তে আসত তখন কৈশল্লের সাথে পরিচয়। তখন থেকেই ওরা বন্ধু হয়ে যায়। অন্তত স্কুলে থাকার সময়টায় ওরা কেউ কাউকে ছাড়া থাকতে পারত না। নদিতে বাড়ি ভেঙ্গে মমনুলেরা আব্বাছ ম-লের জোতে এলে কৈশল্লদের বাড়ি ওদের কাছাকাছি হয়ে যায়। কিন্তু একটা চাপা সংকোচের কারণে ওরা কেউ কারও বাড়ি যায়নি। একবার দূর্গাপূজার সময় কৈশল্লের জ্বরের কথা শুনে মমনুল ছোট বোনকে নিয়ে ওদের বাড়ি যায়। নিজ হাতে ধরা পাঁচ ডজন জিওল শিঙমাছ নিয়েছিল সে বন্ধুর জন্য। সে মাছ দেখে কৈশল্লের মা, দাদি এবং শৈভ্যা নামের ছোট বোনটি খুব খুশি হয়েছিল। গ্রামের সব মেয়েলোক ভেঙ্গে এসেছিল ওদেরকে দেখতে। এতগুলো উৎসুক চোখের সামনে কী লজ্জায় যে পড়েছিল ওরা! বড়ো বড়ো দুখানা কাসার থালায় দেয়া ফলার নিয়ে তারা প্রাণহীন পুতুলের মতো অনড় হয়ে বসেছিল। সে কথা মনে হলে এখনও খুব হাসি পায় মমনুলের। কৈশল্ল আজও জানে না সান্তাকে নিয়ে ওর হৃদয়ের শিহরণের কথা। নবিন ¯্রােতের নদির মতো সান্তার অবয়ব ওর অন্তরে দিনরাত ঢেউ দিয়ে যায়।

সান্তার বাড়ির ভেতরে ঢুকে পরিত্যক্ত ঘরে ওর গন্ধ তালাশ করে মমনুল। রাতে কোন ঘরে শুতো সান্তা? সেকি একা থাকত? রাত যখন গভীর হত তখন ঘুম থেকে জেগে তারার ন¤্র হাসি দেখে সেকি ওর কথা একবারও ভাবত না? চলে যাওয়ার সময় সান্তা কি তার কথা একবারও খেয়াল করেনি? এসব কথা ভেবে মমনুলের হৃদয় বেদনায় ভরে যায়। তার চোখ দিয়ে উষ্ণ জলের ফোঁটা গড়িয়ে পড়ে। খড়ের বেড়ায় সান্তার একখানা ছবি দেখতে পায় মমনুল। আনত চোখে তাকে বড়ো সুন্দর লাগছে। বড়ো মিষ্টি এবং প্রাণবন্ত। বুকে জড়িয়ে নেয় মমনুল ছবিখানা। মাঠের উপর দিয়ে বিরহী বাতাসের ছুটে চলার করুণ কান্না ধ্বণিত হয় ওর বুকে। সান্তার মলিন ছবি ওর বুকে বোশেখের ঝড় তোলে। ওর ছবিতে হাজারো সান্তার হাহাকার আর বঞ্চনার প্রতিশব্দ খোঁজে মমনুল। সান্তাদের সব গাছ কারা যেন কেটে নিয়ে গেছে। একটি লেবুর চারা নদির কাছাড়ে অযত্নে পড়ে আছে। খন্তা দিয়ে খুব সাবধানে লেবুর গাছটি তুলে নিয়ে বাগানে রোপন করে মমনুল। হয়ত এ গাছটিতে সান্তার হাতের ছোঁয়া আছে। হয়ত সে এর গোড়ায় পানি ঢালত। গাছটির গোড়ায় দুবেলা পানি দেয় মমনুল। সব সময় হৃদয়ের মায়া ঢেলে ওর যত্ন করে। কিন্তু সান্তার ছবি নিয়ে সমস্যায় পড়ল সে। কোথায় রাখবে সে ছবিখানা! সান্তাকে এ পাড়ার সবাই চেনে। ঘরের বেড়ায় লটকিয়ে রাখলে প্রশ্ন তুলবে সবাই। তখন কি জবাব দেবে মমনুল? নিজের ট্রাঙ্কের এক কোণে অতি সাবধানে রাখে সে ছবিখানা। কিন্তু সমস্যা আছে তাতেও। ট্রাঙ্কে তালা নেই। বাড়ির সকলে বিশেষ করে মমনুলের মা এবং ছোটবোন ট্রাঙ্ক খুলে সব জিনিষ উল্টেপাল্টে দেখে। ওর ছোটবোন একদিন ছবিখানা বের করে মাকে দেখিয়েছে,
“মা দেখ। ভাইয়ার ট্রাঙ্কে কী সুন্দর ছবি।”
“কার ছবি ? আনো তো দেখি।”
“মা, ভাইয়া মনে হয় এই মেয়েকে বিয়ে করবে।”
“ও, এই মেয়ে! এটা তো আজমলের মেয়ে সান্তা। ওর ছবি এখানে কেন?”
“মা, ভাইয়া ওদের বাড়ি যায়। আজমলের দোকানে আড্ডা মারে।”
“তাই বলে এই মেয়েকে বিয়ে করবে? আসুক আগে বাড়ি।”
মা খুব রেগে থাকে মমনুলের ওপর। এখনও কলেজের চৌকাটে পা রাখেনি তাতেই এই দশা। মেয়েদের ছবি নিয়ে লুকোচুরি খেলা। বাড়ি ফিরে মায়ের সামনে থতমত খায় মমনুল। কি জবাব আছে তার কাছে। হৃদয়ের এই চিরন্তন দুর্বলতার কি জবাব জানা থাকে অসহায় মানব সন্তানের। বেয়নেটের সামনে নিরীহ মানুষ যেভাবে নিজকে সঁপে দেয় তেমন নিরুত্তর অবয়ব নিয়ে জন্মদাত্রীর ক্রুদ্ধ চোখের দাহ্যশক্তি হজম করে নেয় সে।
“সান্তার ছবি তোমার ট্রাংকে আসল কেমন করে?”
“ওদের ঘরে পেয়েছি। ওকে দেব বলে তুলে রেখেছি।”
“ওসব কথা আমাকে বল? ভাত খেয়ে কথা বুঝিনা।”
‘কি বুঝ তুমি? খারাপ লোকেরা ওর ছবি পেলে যাদু করবে।”
“তাতে তোমার কি? ও জাহান্নামে যাক। ওর ছবি ও আগলে রাখতে পারে না। তোমাকে রাখতে হবে?”
“ওকে আমি পড়িয়েছি। ওর ক্ষতি হলে আমার খারাপ লাগবে না?”
“শাক দিয়ে মাছ ঢাকবে না। শেষ পর্যন্ত ওই মেয়েটার পাল্লায় পড়লে?”
“মা। তোমার মুখে কিছুই আটকায় না। কী সব বল তুমি?”

সান্তার ছবি মা নিজের কাছে রাখে। মায়ের দিকে নজর রাখে মমনুল। কী করবে মা ছবি কাছে রেখে। মমনুল রাতে মায়ের কাছে থাকে। প্রতিরাতে মা প্রদীপ জ্বালিয়ে নীরবে মুগ্ধ চোখে সান্তার ছবি অবলোকন করে। অনেক সময় ধরে তাকিয়ে থাকে মা। আঁচলে অশ্রু মোছে মা। মমনুল সব বুঝতে পারে। কিন্তু মায়ের কাছে ধরা দেয় না। লেবু গাছটারও পরিচর্যা করে সতেজ করে তোলে মা। মাঝে মাঝে মা চুপ করে লেবু গাছের সবুজ পল্লবের দিকে তাকিয়ে থাকে। ওর গোড়ায় পানি ঢেলে দেয়। আর কোনদিন মা সান্তার বিষয়ে মমনুলকে খোটা দেয়নি। দেয়নি তার ছবি নিয়ে লুকোচুরি আর চোখের জলের অর্থ বুঝতে। সান্তার ছবি মায়ের কাছ থেকে ফেরত চাওয়াও সম্ভব নয় ওর পক্ষে। কিন্তু সান্তাকে দেখতে বড়ো ইচ্ছে জাগে মমনুলের। এই যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে ওকে না দেখে মমনুলের মনটা বিষাদ মেঘে ছেয়ে যায়। তখন সে আনমনা হয়ে লেবু গাছের পাশে দাঁড়িয়ে থাকে। এই গাছের প্রতিটি পাতায় সে অসহায় জন্মভুমির সকরুণ চিত্র এঁকে দেয়।