চিঠি পাওয়ার পর

বনফুলের গল্প আছে— চিঠি পাওয়ার পর
ট্রেনে ছিল অমিতা আর সঙ্গে ছিল বর।
লক্ষ্ণৌগামী ট্রেনের খোঁজে প্রেমিক স্টেশনঘাট
দাঁড়িয়েছিল প্রতীক্ষাতে, কিন্তু কী ললাট!
প্রেমিক-ঘড়ির দম দেওয়া আর হয়নি সেদিন, হায়
অনেক আগেই ট্রেন গড়িয়ে ফাঁকি দিয়ে যায়।
হলো না আর আলাপ-সালাপ, সাক্ষাত-অভিসার
চিঠিখানাই এখন স্মৃতি প্রিয় অমিতার।
(বনফুলের ‘চিঠি পাওয়ার পর’ গল্প অবলম্বনে)
…………………………………………..

কোনো এক নারীকে

মুখ তার মায়াময়, চোখ তার ফুল
বারেবারে দেখি তারে। ভেবে করি ভুল—
অপ্সরী নয় সে, তাও দেবী মেনে
দূর থেকে পুজো করি নাহি কিছু জেনে।
মনে মনে ভাবি তারে, অনুভবে তার
মনপ্রাণ ছুঁয়ে গেছে কোন অবতার?
কোন সুরে বাজে তার মনোবীণা রোজ
কে তারে অনিমেষে করে যায় খোঁজ?
…………………………………………..

নীলের পহেলা বৈশাখ

‘এবার দুজন সারাটা দিন নগ্ন পায়ে হেঁটে
ঘুরবো সারা শহর জুড়ে নতুন ছড়া কেটে
পরবো শাড়ি, পরবে তুমি পাঞ্জাবি— তাও লাল
দেখবো দুজন নিবিড় করে কৃষ্ণচূড়ার ডাল।
কেমন করে সাজছে সুখে উজাড় করে সব
কেমন করে পাখির সাথে করছে কলরব!

কাঁচের চুড়ির বহর দিয়ে সাজাবো এই হাত
মাটির সানকি ভরে নেবো স্বাদের পান্তাভাত,
ইলিশ ভাজা, পেঁয়াজের কুচি, চ্যাপা ভর্তা। ওই,
ভাবছো তুমি এত্ত কথা কেমন করে কই?
কথায়, গানে, আড্ডা জমে যখন হবে ক্ষীর
মেলার পথে হাঁটা দেবো— আহা কী অস্থির!
ফুলের টায়রা পরিয়ে দিবে, চুপিসারে চুম
আঁকবে আমার কপাল জুড়ে, তাতেই পাবো উম।
কিনবো চুড়ি, কিনবো ঘুড়ি— চড়বো ঘোড়ার ’পর
গাঁয়ের বধু সাজবো আমি, সাজবে তুমি বর।’

এমন স্বপ্ন-আশার কথাই লিখেছিল নীল
নীলকে আজই তুলে নিল কিছু শকুন, চিল!
বলছে ওরা— ফিরবে আবার সুস্থ হওয়ার পর
নইলে তাকে বাছতে হবে গোরস্থানের ঘর।

বলেছিল নীল, যে হলে থাকে সেটার ডান
দিকের রুমের একটা মেয়ের ওষ্ঠাগত প্রাণ!
হাঁপানি তার আগেই ছিল পাত্তা দেয়নি ছাই!
করোনা তার সঙ্গী হলো, নীলার হলোও তাই।

নীলাভ নববর্ষ আমার কেড়ে নিল সুখ
নীল-বিরহের কষ্টে এখন হচ্ছে ভারী বুক।
…………………………………………..

মরার ক্ষুধা

বাড় বেড়েছে চোরের দলের, মাতলো চুরির উৎসবে
দাবি করে তারাই সেবক, আসলে তো ভূত সবে!
নীতির গীতি মুখে তাদের চাইবে যখন ভোটখানা
ত্রাণের জন্য গেলেই তবে ফুলিয়ে দিয়ে ঠোঁটখানা
বলবে, ‘আমার কাছে কেন আসিস? সেটা জানতে চাই৷
আমি তোদের কোন জনমের শ্যালক, জিজু-দুলাভাই?
করেছি কি বিয়ে তোদের বোবাকালা বোনটাকে?
তা হলে নয় মানিয়ে নিতাম, প্রবোধ দিতাম মনটাকে।
আমি তোদের নইকো দুলা, নইকো গণশ্যালক৷ তাই,
আবার যদি বায়না নিয়ে আসিস তোদের রক্ষা নাই।

দিন-মজুরের ভাব দেখেছো? ডায়াল করে তিনটা তিন!
চাবকে তোদের ভুলিয়ে দেবো বাপ-দাদাদের বংশ-চিন
আরে মরা, আরে জরা- মরবি তোরা একলা মর!
মরার আগে আমায় কেন? ভগবানকে স্মরণ কর৷
এখন আমার মরার ক্ষুধা, মিটবে ক্ষুধা ত্রাণ-চালে
তাই তো বুঝি চোখ পড়েছে আমার খাওয়া বানচালে?
…………………………………………..

মনু মিয়ার ঈদ

তিন কেজি চাল সাথে আলু দেড় কিলো
এক কেজি ডাল সাথে, সয়াবিনও ছিল।
তারাই তো দুইজন! সাথে ছেলে চার—
তা-ই দিয়ে খোরপোশ চলে ক’দিন আর।
কোনোমতে এই করে তেরো দিন যায়
কাজ নেই, খাওয়া নেই দিশেহারা, হায়।
ভাবে বসে— কত আর ক্ষুধা পেটে নিয়ে
ক’দিন আর চলা যায় এইটুকু দিয়ে?
তবু ভালো, গেল মাস জুড়ে ছিল রোজা
ক্রমে বেড়ে ভার হবে অভাবের বোঝা।

ঈদ হতে বাকি আছে গোটা চার দিন
এ সময়ে তাকে এসে কে যে দেবে ঋণ!
চাল নেই, ডাল নেই, নেই কোনো কাজ
ঈদ যেন ঈদ নয়, যেন পড়া বাজ।
মনু মিয়া বহু ভেবে কিনে আনে দড়ি
বাকি কথা বাকি থাক। বলব না, সরি।
…………………………………………..

তখনকার ঈদ

কেমন ছিল শিশুকালের ঈদুল ফিতর? তারই
স্মৃতিচারণ করবো আজই। চড়ে স্মৃতির গাড়ি।
তখন এত শপিং করার ম্যানিয়া না ছিল
কিনতো কাপড় গজ হিসেবে, করে গিঁরার মিলও।
নতুন কাপড় চলে যেত দর্জিবাড়ি যেই
তখন থেকে শুরু হতো অপেক্ষা; তা-ও সেই।
অনেক দিনের অপেক্ষা শেষ হওয়ার পরে তাই
নতুন জামা পেয়েই যেন বাদশাহ বনে যাই!
নতুন জামা জামা-ই নয় তা পাতালপুরীর ধন
ঈদের আগে গোপন রাখার চলতো আয়োজন।
ঈদের আগে ঈদের জামা দেখা মানেই মাটি
হয়ে যেত আনন্দ সব। হতো কান্নাকাটি।
নতুন জামা লুকিয়ে রাখার মানেই ছিল ঈদ
সেলফি তোলার নামে তখন করতো না কেউ জিদ।
…………………………………………..

ঘুষ হালতে

রঙ্গভরা বঙ্গদেশে চলছে আজব কারখানা
নেতা-নীতির অবক্ষয়ে, খুলছে পাপের দ্বারখানা
প্রকাশ্যে কেউ নিচ্ছে ঘুষের টাকা কিংবা হাদিয়া
কেউবা চাইছে খেতে সেরেফ পরোটা; তাও চা দিয়া।
চায়ের সাথে কফিটফি, মেয়ের বিয়ের আলমারি
চাইতে পারেন খুব সহজেই, শুনেই কি আর ফাল মারি?

চা, পরোটা, আলমারিতে— করতে যদি পারি পাশ
ফাইলটা তবে বনে যাবে সোনার ডিম্ব পাড়া হাঁস।
লক্ষ টাকার কাজ করে বিল তুলবো কোটি কম করে
যাক না কিছু ঘুষ হালতে, থাকব তবু দম ধরে।
…………………………………………..

নেতা আবুল

আবুল বড় নেতা হবে— স্বপ্ন দেখে রাত্রিদিন
রাজনীতিজ্ঞান তথৈবচ মাকাল ফল সে গুণবিহীন।
দীক্ষা নিতে হিক্কা ভাইয়ের সংগ্রামী সব তালিম নেয়
জনসভার ময়দানে সে জ্বালাময়ী স্লোগান দেয়।

প্রচারণার দায়িত্ব সব তার ঘাড়েতেই ন্যস্ত হয়
নির্বাচনী প্রচারণায় আবুল মিয়া ব্যস্ত রয়
সকাল-বিকাল স্লোগান তোলে, ‘বড় নেতা হিক্কা ভাই,
জয়টা এবার তারই হবে, একখানা ভোট ভিক্ষা চাই।’

অবশেষে হিক্কা ভাইয়ের কাঙ্ক্ষিত সেই জিৎ আসে
হিক্কা ভাই-ই আবুল মিয়ার মামু-খালু, পিতা সে।
হিক্কা ভাইয়ের মতোই নেতা আবুল মিয়াও হতে চায়
হিক্কা ভাইয়ের পিছ ছাড়ে না, ছায়ার মতো সঙ্গে যায়।

দিবে তারে পদ জুটিয়ে— হিক্কা ভাইয়ের আশ্বাসে
স্বপ্ন দেখে আবুল মিয়া নিজকে ভাবে বাশশা সে।
দিন ঘুরেছে, মাস ঘুরেছে, ঘুরে গেছে বছর পাঁচ
সকল আশার গুড়ে বালি করতে পারে আবুল আঁচ।
নেতা হওয়া যায় না শুধুই, বড় ভাইয়ের পা চেটে
সত্যটা সে জানতে পারে ইতিহাসের গা ঘেঁটে।
…………………………………………..

শাশুড়ি-বচন

মেয়ের জামাই লক্ষ্মী আমার, মেয়ের কথায় ঘোরে
বিনাবাক্যে কোথাও কাদা, কোথাও থুতু ছোড়ে।
এমনই সে ভদ্র, নরম, শান্ত, অনুগত—
সকল হুকুম তামিলেতে সদাই থাকে রত।
প্রতি ঈদে আমার জন্য দুটি নতুন শাড়ি
পাঞ্জাবি ও পায়জামাতে শ্বশুরও খুব ভারি
হন খুশি। তাই বলেন শ্বশুর, ‘তুমিই আমার পুত্র
শ্বশুরবাড়ি খুশি রাখাই হলো জামাই-সূত্র।’

মেয়ের জামাই নিয়ে কোনো ভয় ছিল না মোটে
লক্ষ্মীছাড়া ছেলের লাগি দুঃখ যত জোটে।

ছেলে আমার ম্যান্দা ভীষণ, বউয়ের অনুগামী
ভাবখানা তার এমন— যেন বউ-ই ছেলের স্বামী!
বউয়ের কথায় ওঠেবসে, বউয়ের কথায় খায়
বউয়ের আঁচলতলে ছেলে এ কোন মধু পায়!
বাপ ও মায়ের খেয়াল তো নেই, কেবল শ্বশুরবাড়ি
নিয়ে ব্যতিব্যস্ত থাকে, সব কথাতেই ঝাড়ি!
বিয়ের আগে ছেলে আমার এমন ছিল না তো
অনায়াসে যেতো তোলা ছেলের পিঠে হাতও।
কী জাদুতে বশ করেছে বউয়ের পরিজন!
বিয়ের পরেই বদলে গেল আমার জাদুধন।

সর্বনাশা বউটা ছেলের নিলে পুরো স্বত্ব
হারিয়ে গেল চিরতরে ছেলের পুরুষত্ব!
…………………………………………..

কাপলেটসমগ্র
ক.
তোমার কথায় জলকে আগুন ভাবতে যদি পারি
তবেই তুমি আমার প্রথম অনন্যা সে নারী।
খ.
তোমার জন্য যদি দু’চোখ ভিজে আঁখি-নীরে
তবেই বাতিঘর যে হইয়ো আমার নোঙর-তীরে।
গ.
তোমার জন্য তবেই আমার আকাশ হবে লীন
আমি যদি হই সরোবর, হও তুমি তার মীন।
ঘ.
তোমার কাছে আমার সকল সমর্পিত হবে
যখন তুমি সকল দুঃখ-ব্যথায় পাশে রবে।
ঙ.
কার তরে রোজ খুলছো মেয়ে ব্রা, শাড়ি ও সায়া
কে তোমাকে খুব নীরবে করে ভীষণ মায়া?
চ.
প্রেমিকার ঠোঁটে যদি ফোটে সব ফুল
তারে চুমু খেতে কভু করো না’কো ভুল।
ছ.
আস্তে, আরো আস্তে আসো, যখন তুমি রমণে।
উচ্ছলতায় ভরিয়ে দিয়ো সঙ্গে নিয়ো ভ্রমণে।
জ.
পিতার বুকই জায়নামাজ আর মায়ের মুখই স্বর্গ
জীবন তোমার মহাকাব্য, জনম প্রথম সর্গ।
ঝ.
আকাশ উপুড় হয়ে নদীর অনাবৃত স্তন দেখে
আকাশ-নদীর অভিসারে হাওয়া শুধায় ‘দ্বন্দ্বে কে?’
ঞ.
তোমার-আমার আকাশ একই, ভিন্ন তবু ঘর
তোমার-আমার একই নদী, খণ্ডিত দুই চর।