হাওয়া আসছে কয়েকশো বছর থেমে থেমে

আমাদের জন্মের কোটি কোটি বছর আগে আদিম সৃষ্টির চেতনায় আমরা যদি নিজেদের প্রবাহিত করি তাহলে আমাদের ব্যাপ্তি ও প্রবৃত্তির অবিনশ্বর কণাগুলি উড়তে দেখি—প্রাণীতে—প্রকৃতিতে—জীবনে। আমাদের স্বয়ংক্রিয় চলাচল চেতনে—অর্ধচেতনে—অবচেতনে কত দৃশ্য ও সংলাপ তৈরি করে আর ক্রিয়াগুলি নিজস্ব নিয়মেই সকর্মক ও সমাপিকায় সম্পন্ন হতে থাকে। তখন দেখি আত্মক্ষরণের নিবিষ্ট পথেই আত্মবোধের ক্ষেত্রটি তার প্রকাশ নির্দেশ করে :

“অন্ধকারে তোকে
সৈকতের পাশে ফেলে এসেছি, এখন বালি সরিয়ে বসুধা
অর্ধখান করতেই জলরাশি, ঝকঝকে চোয়াল,ব্যারাকুডা…”

যে প্রবাহ আজ সভ্যতার সংবাদ দেয়, প্রবৃত্তির অমোঘ টান চিনিয়ে দেয়,নিজেকে আবিষ্কারের উদ্দীপনে সচকিত করে—সেই কৌতূহল থেকেই জয় গোস্বামী(১৯৫৪) যাত্রা শুরু করেন। আমাদের জীবন-জীবিকা, চেঁচামেচি, চাওয়া-পাওয়া, স্বপ্ন ও সম্ভাবনাকে কবিতায় লিখতে থাকেন আর সব লেখাই আত্মজীবনীর অংশ হয়ে যায়। প্রথম কাব্য ‘ক্রীসমাস ও শীতের সনেটগুচ্ছ'(১৯৭৭) সেই তীরভূমির দিকেই যাত্রার সংকেত দেয়। ক্ষুধা, আগুন, জল, মাটি এবং হাওয়ার অনন্ত বিথার থেকে নিজস্ব সত্তাটির গঠন চলতে থাকে। সব সম্পর্কের ভেতর-ই কবি দাঁড়িয়ে থাকেন। ‘তরুণ পুরনো মুখ দেখো আজ ছেয়ে গেছে প্রাচীন ছত্রাকে’… এই সেই আদিম আর উৎসের বাতাবরণ, যার সম্পূর্ণতার ভেতর ‘জন্মপত্রকে’ই খুঁজতে হয়। কিন্তু স্ফুলিঙ্গ ঝাঁপিয়ে পড়েও দর্পণে অর্ধেকটাই মাত্র চিনতে পারা যায়। কবি বলে দেন :

‘আজ তুমি জানো
মুকুরে বাকিটা মুখ পড়ে আছে, দগ্ধ, ঝলসানো!’

আমাদের পর্যাপ্ত জীবনের পাশে শূন্যতা ও অপূর্ণতার মাঝেই জিশুখ্রিস্ট নেমে আসেন আর আমরাও মানবের উৎসে পৌঁছানোর সুযোগ পেয়ে যাই। জীবনের কুয়াশা ভেদ করে আলোর সাবলীল রেখা আর অব্যর্থ প্রত্যয়কেই চিহ্নিত করে দেন কবি। ‘ওই মহামানব আসে’ সেই পদধ্বনি শুনতে পাই।

‘প্রত্নজীব'(১৯৭৮) দ্বিতীয় কাব্যে কবি এক প্রশ্ন আর লিরিকের ভেতর দিয়ে আমাদের টেনে নেন। রোমান্টিক আবহাওয়া বাঁশি বাজিয়ে দিলে চনমন করে ওঠে স্বপ্ন ও গান। এক মগ্নতার ভেতর আমাদের বেড়ে-ওঠা, রাত্রিযাপন, স্বপ্নস্নান আর চৈতন্যদহন চলতে থাকে। প্রশ্নটিই সামাজিকতার, নৈতিকতা ও মূল্যবোধের—কিন্তু লিরিক তো ছন্দ, জীবনের গতি। দেশ-কাল সীমানাহীন, পর্যাপ্ত মানবমহিমায় তা ঝলসে ওঠে। ‘জিভ’ কবিতায় সেই প্রাণপ্রত্নকেই নিবিড় করে তোলেন আর প্রশ্নের মাঝেই এক প্রশ্নহীন বিবেকের ডাক উপলব্ধি করেন। যার মধ্যে কথা আছে, অথবা কথা নেই। দৃশ্য আছে, অথবা দৃশ্য নেই। স্মরণ আছে, অথবা স্মরণ নেই। তবু সকলের ঊর্ধ্বে বিরাজ করে এক আস্বাদের অঙ্গ আর সেটাই ‘প্রত্ন’ হয়ে ওঠে বিলক্ষণ সকল প্রাণধর্মের অন্তরীক্ষ সান্নিধ্যের। কবিও একীভূত হয়ে তাঁর সত্তাটিকে stream of consciousness-এ পৌঁছে দেন :

“দেয়াশলাই, জ্বলে ওঠা, কেঁপে ওঠে দুরাশায়।
আমি শুধু মূককীট, পিউপা
চিরজীবনের মত। করতল,
পেট, মুখ কিছু নেই জেগে আছে আস্বাদ
দু কোটি বছর ধরে, সারাদিন।
কোনোদিন অঞ্জুর, নূপুরের
শব্দ শুনেছি আমি? বাংলার? মনে আছে। মনে নেই।”

এই গতিপথেই আমাদের ক্রমমুক্তির ইশারাও কবি দিয়েছেন। বাঁকবদলের ভেতর শিল্প ও শিল্পীকেও যেতে হয়েছে। তবু বন্যতার ভেতর আদিম ছায়ার লাফিয়ে ওঠা উপলব্ধি করেছেন এবং প্রত্নসীমানার প্রগাঢ়তা আরো ভরাট হয়ে এসেছে। কবি লিখেছেন:

“ওগো মার্চ মাস, গর্বিত,
শেখাও আগুন অভেদ্য, খড়্গ, গোলাপ, সন্তরণ
শেখাও অতল ভূগর্ভে এবং গহীনমন্যতা
মেশাও স্বপ্নে, সন্দেহে।….”
(কালো ত্রিভুজের আস্তরণ)

এক জটিল ত্রিসীমানা থেকে প্রেমজলের স্রোত—
প্রবৃত্তির গহীনমন্যতা আর সৃষ্টির উল্লাস। আদিম পৃথিবীর নখ-দাঁত—শব্দ-শ্বাস ষোলো-শো বছর সঞ্চিত থেকেও কোনো ব্যত্যয় ঘটেনি। কিংবা বুড়ো ঈগলের জেগে থাকা সবই কালো ত্রিভুজের অন্ধকারে সমাহিত। এসব নিয়ে গল্প তৈরি হয়। সংসার হয়। বিকেল হয়। হামি দেওয়া মুন্নু-মামণির দেখা মেলে। সাইকেল ছোটে। যুবকের চোখ পড়ে স্বামীর পথ চেয়ে থাকা যুবতীটি দিকে। চাকার শব্দ ওঠে। মানুষ ও সাপের রতি প্রত্নকৌশলে জেগে ওঠে। ১৯৭১-এর দেশভাগ ও বাংলা ভাষার দাবির জন্য দাঙ্গা আর অফিসারের জোর হুকুম ‘থেঁতলে দাও বুট দিয়ে’ সবই প্রত্নবিজ্ঞাপন ইতিহাস হয়ে উঠে আসে। সমাজ ও রাষ্ট্রবিপ্লবের ভেতরও জীবনের দৌড় অব্যাহত থাকে। মায়া, আসঙ্গ লিপ্সা, প্রেম ও প্রণয়ের লীলাগুলি কখনো কি পুরনো হয়? মৃত্যু ও ধ্বংস ভেদ করেও সূর্য ওঠে। সকাল হয়, পাখির কাকলি ও সৌরভসংরাগে ভরে ওঠে পৃথিবী। আবার হাঁকডাক শোনা যায়। লাশ আর রক্তের ওপর গড়ে ওঠে জীবনের প্রত্ন সাম্রাজ্য :

“মাদল বাজেছে দূরে, ডিমডিম
ক্রুদ্ধ মাদল ছড়িয়ে পড়ছে রাত্রিদুপুরে…”

এক বিস্ময়ের কাছে জয় গোস্বামী আমাদের পৌঁছে দেন। সেখানে দেখতে পাই যুদ্ধের বিরুদ্ধে আবার যুদ্ধ শুরু হল। বাঁচার অঙ্গীকারে মানুষও রঙিন হয়ে উঠল। সৃষ্টির আরও গভীরে ডুব দিলে আবহমান ব্যাপ্তির ক্ষেত্রটি উঠে আসে। সেখানে মানুষ, প্রাণী ও উদ্ভিদে কোনো তফাত থাকে না। উৎসের বিচারে, আমাদের বোধের বিচারে এবং প্রবৃত্তিগত বৈশিষ্ট্যে জীবনের রসায়নে কোনো ভেদ নেই। পৃথিবী সেই রসদের পাত্র, যে-পাত্রে মুখ রেখে সকলেই লালিত পালিত হতে পারে। কবি বলেন:

“যে-পাত্রে রয়েছে মদ, ঘনীভূত নাতি-শীত-উষ্ণ জলবায়ু আমাদের, বাষ্প ও আরক।
আরকের মধ্যে রয়ে গেছে ডুবে যাওয়া ফুল, ফুলে শরীর গুটিয়ে নিয়ে শুয়ে আছে পতঙ্গ, মানুষ, পাখি আর উদ্ভিদের মিশ্রিত শিশুটি।

তিন লক্ষ বছর পর তার বেরিয়ে আসবার কথা…”
এভাবেই প্রত্নপৃথিবীর সন্ধান পান কবি প্রত্নজীবনের বৈভবে। একদিকে বিজ্ঞানের অবিনাশিতা সূত্র, অন্যদিকে রূপান্তরের পর্যায়টি ধরা পড়ে কবিতায়। সদর্থক চেতনায় কবির ইতিহাস-বোধের সঙ্গে জীবনবোধের মেলবন্ধন ঘটে যায়। ব্যক্তিছায়ার ভেতরেই সমগ্র মানবছায়া তথা প্রাণীজগৎও দর্শন করেন কবি। কবিতা তাৎক্ষণিক আবেগ আর ছন্দের কারিকুরির অধিগত শিল্প বা বিদ্যা নয় সে ধারণা জয় গোস্বামী পাল্টে দেন। জীবনানন্দের নঞর্থক জীবনের উচ্চারণে যে ধূসরতা, ক্লান্ততা এবং অসহায়তা আমাদের গ্রাস করেছিল—তার অনেকখানিই কেটে গেল জয় গোস্বামীর কবিতায়। আত্মদর্শনের এমন সুগভীর পাঠ হতাশা-ক্লান্তির বাইরেও এক জগতের সন্ধান এনে দিলেন, যেখানে আমাদের প্রাণধর্মের মহিমা আরও নতুন ব্যঞ্জনায় বেজে উঠল। আমরা দেখতে পেলাম কবিতা তাঁর কাছে ‘in life as in art’; আমাদের বেঁচে থাকা, স্বপ্নদর্শন, ঘটনাচক্র, উপলব্ধি, সুখ-দুঃখ, বোধ সবই কবিতা। আবার এসবকে ছাড়িয়েও এক আদি সংযোগ উৎসের নিয়ন্ত্রণে সর্বদা ক্রিয়াশীল। কবি তাই জানিয়ে দেন :

“আমার জন্মের কোনো শেষ নেই”

জন্ম তো অশেষই, শুধু রূপান্তরটি দেখতে পাই। পঞ্চভূতের দেহতত্ত্বে মিশে থাকা সত্তাটির কথা কবি এভাবে লেখেন :

“—আগুন, এখনো তুমি আমার সন্তান, তুমি প্রতি রাত্রিবেলা
দিগন্তে আমার ছেলে মেয়ে
এবং আমার নাভি এখনো কঠিনতম ধাতু—যাকে
তুমি শত চেষ্টাতেও পোড়াতে পারো না”

সুতরাং দেহও পৃথিবীর অংশ, জীবনও আদিম প্রবাহের স্পন্দন, বারবার তার কাছেই ফিরে যেতে হয়। জন্ম ও মৃত্যুর সীমানা, মৃত্যু ও জন্মের বার্তাই বহন করে। টি এস এলিয়টও East Coker-এ মৃত্যুর দ্যোতক হিসেবেই বুঝিয়ে দিলেন :

‘In my end is my beginning’
অথবা
‘We are born with the dead’

তাঁর Four Quartets কাব্যে চারটি পর্বে চারটি উপাদানেরই ব্যঞ্জনা আছে: মাটি, জল, হাওয়া ও আগুন। জয় গোস্বামী এই চারটি উপাদানকেই আদি সৃষ্টির নিরীক্ষণে বারবার উল্লেখ করেছেন। এলিয়ট Burnt Norton-এ বায়ুর ব্যঞ্জনায়,The Dry Salvages-এ জলের ব্যঞ্জনায় এবং Little Gidding-এ আগুনের ব্যঞ্জনায় সৃষ্টির মূলতত্ত্বকে বোঝাতে চেয়েছেন। উপনিষদের বাণীর সঙ্গে কবির প্রতীতির যে কোনো পার্থক্য নেই তা বলাই বাহুল্য।ছান্দোগ্য উপনিষদে আছে:’কথম্ অসতঃ সজ্জায়েতেতি’ (৬/২/২)॥অর্থাৎ ‘অসৎ'(নাস্তিত্ব) থেকে ‘সৎ'(অস্তিত্ব) জন্মাবে কীভাবে? Nothing থেকে Something আসবে কী করে? বৈদান্তিকরা এরও উত্তর দিয়েছেন :’নাসতো সদ্ জায়েতে’ অর্থাৎ অনস্তিত্ব থেকে কোনো অস্তিত্বের উদ্ভব হয় না। শূন্যতা থেকে কোনো বস্তু জন্মায় না। বিশ্বপ্রবাহ এই অনন্তেরই আধার। সেখানে সৃষ্টি-স্থিতি-লয়ই তার ক্রিয়া। কঠোপনিষদে অগ্নির কথা বারবার বলা হয়েছে:

“অগ্নির্যথৈকো ভুবনং প্রবিষ্ট রূপং রূপং প্রতিরূপ বভূপ।
একস্তথা সর্বভূতান্তরাত্মা রূপং রূপং প্রতিরূপ বহিশ্চ॥”
(২/২/৯)

অর্থাৎ এক অগ্নি যেমন বিশ্বে বহুরূপ ধারণ করেছে, সেইভাবে চরম এক সত্তা যিনি সর্বভূতের অন্তরাত্মা, তিনি বহুরূপ ধারণ করার পরও সবকিছুকে অতিক্রম করে বাহিরে অবস্থিত। এই ব্রহ্মসত্তাকেই জয় গোস্বামী নানাভাবে উপলব্ধি করেছেন এক দার্শনিকের বোধে বা ঐকান্তিক ঐতিহ্যের স্বীকৃতি হিসেবে। তাই তাঁর কাব্যে আত্মবিস্তারের এক ঘোর লক্ষ করা যায়। স্বয়ংক্রিয় ব্যক্তিযাপনেও নৈর্ব্যক্তিক অন্বেষাটি কখনো থেমে যায় না। ‘ওঃ!স্বপ্ন’ কাব্যের ‘দৌড়’ কবিতায় সেই সংবাদ লিপিবদ্ধ করেছেন:

“আবার জুতো বেঁধে নিলাম। মশাল খুলে
আবার আমায় ছুটতে হবে
বর্ষা বর্ষা—গ্রীষ্ম গ্রীষ্ম—শীতে শীতে—
পরের সূর্যে আগুন দিতে…”

ঋতু ঋতু ঘুরে ঘুরে আসে, দৌড় থামে না। জীবন যেন এভাবেই ছোটে। সকাল হয়। সূর্য ওঠে। ‘পাগলী তোমার সঙ্গে’ কাব্যের ‘ও আকাশপার’ কবিতাতেও এই তত্ত্বকথাটিরই মর্মটি কবি এভাবে লেখেন:

“যা-কিছু মৃত্যুর নিচে যা-কিছু অগ্নির
নিচে ডুবে যায় তারা ফিরে ফিরে আসে
জলভাবে, বায়ুভাবে, ঘাস থেকে ঘাসে
ফেলে দেয় লঘু পাখা—”

জল, বায়ু, অগ্নি ও মাটির এই প্রতিরূপ মিশ্রণটিতে মানবসঞ্চারই কবি দেখতে পান। মৃত্যুর নিচে যা, তাই অগ্নির নিচে। আবার তা-ই জল ও বায়ু রূপে রূপান্তরিত। ব্যক্তিসত্তা এভাবেই infinity সত্তায় রূপ পায়, আবার ফিরেও নতুন পরিচয়ে।

২.
আমার আনন্দ রক্ত ফিনকি দিয়ে মেঘে মেঘে লাল

যৌবনের রক্ত যে আনন্দের, জীবনকে বয়ে নিয়ে যাওয়ার, স্বপ্নকে রঙিন করে তুলবার, মৃত্যুকে পদানত করবার, গতিকে ত্বরান্বিত করার মহাশক্তি এবং শিল্পকে নতুন পথে চালিত করার পর্যাপ্ত প্রয়াস জয় গোস্বামীর কাব্যগুলি পাঠ করলে বারবার এ-কথাই মনে হয়। ‘আলেয়াহ্রদ'(১৯৮১), ‘উন্মাদের পাঠক্রম'(১৯৮৬), ‘ভুতুম ভগবান'(১৯৮৮), ‘ঘুমিয়েছো ঝাউপাতা'(১৯৮৯) প্রভৃতি কাব্যগ্রন্থগুলি এক ঘোরের প্রবাহে আমাদের ঠেলে দেয়। দৈনন্দিনের বার্তাবহ সফলতা-অসফলতাগুলি এবং ব্যক্তিনির্মাণের প্রক্রিয়ায় ভাস্বর রোমান্টিক স্বপ্নলোকের ঠিকানায় সর্বদা ঊর্ধ্বমুখীন এক গতিবাদ যেন নিয়ন্ত্রিত করছে। যে বিষণ্ণতায় আত্মবিকাশ সংকুচিত, বিধ্বস্ত; যে অপূর্ণতায় আমরা বিড়ম্বিত, নঞর্থক বেদনায় ভারাক্রান্ত—জয় গোস্বামী সেখানেই এক ঝলক অমৃতধারা পাঠাতে পারেন। পার্থিবের কদর্য কলুষ বিপন্নতা থেকে প্রাণের উচ্ছ্বাসে আমরা ভিজে যাই। কখনো স্বপ্ন ও বাস্তবের সঙ্ঘারামে প্রবেশ করে মোহময় করে তোলে আমাদের। ‘ভুতুম ভগবান’-এ তিনি লেখেন:

“আকাশে বনবন ঘুরছে ঘড়ি চক্র ঘড়ি মস্ত ঘড়ি অগ্নি ঘড়ি দিগ্বিদিক
যতবার মেরে ফেলবে, জয় জয় সব উত্থান, ততবার বেঁচে উঠব ঠিক”

সামান্য লোকের নুন-ভাতের ব্যবস্থা থেকে অপরিমেয় প্রাণের উত্থানে সচকিত হতে হয়। এই বেঁচে উঠাও আত্মিক শক্তির সঞ্চয়। আত্মিক ক্ষমতায় সর্ববিদিত দার্শনিক হিসেবে আমরা রবীন্দ্রনাথকেই পায় আর রবীন্দ্রনাথের পরেই জয় গোস্বামীকে দেখি। যে কবি বলতে পারেন: ‘আমি মৃত্যুর পরের অংশ লিখতে চাই।’ প্রকৃত অর্থে সেই কবিই তো ‘ভুতুম ভগবান’ লেখার যোগ্যতা অর্জন করেছেন। জল-মাটি-বাতাসের ও আগুনের থেকেই উত্থান সম্ভব। স্বজ্ঞায় ও স্বরিকে নিজেকেই উদ্বোধিত করেন। ‘ঘুমিয়েছো ঝাউপাতা’ কাব্যের ‘স্নান’ কবিতায় কবির পৌরুষদৃপ্ত ব্যক্তিত্বের প্রকাশ কতটা স্বকীয় তা পড়লেই বোঝা যায় :

“আজ যদি বলি, সেই মালার কঙ্কালগ্রন্থি আমি
ছিন্ন করবার জন্য অধিকার চাইতে এসেছি? যদি বলি
আমি সে-পুরুষ দ্যাখো, যার জন্য তুমি এতকাল
অক্ষত রেখেছ ওই রোমাঞ্চিত যমুনা তোমার?”

‘সেই পুরুষ’ তো আদি স্রষ্টার স্বরূপ পুরুষ সত্তাকেই বোঝায়, যিনি পতিত-পাবন হয়ে এসে উদ্ধার করবেন কোনো মিথ্যা বাগদত্তাকে। সাহসী যৌবনঘোর উদ্দাম কবি যৌবনের মহিমায় মহিমান্বিত করলেন বাংলা কবিতাকেও। ‘আগুন’ শব্দটি জয় গোস্বামীর যৌবনের উত্তাপের ও শক্তির প্রকাশ হয়েও দেখা দিয়েছে। ‘পুনর্বার প্রেমে পড়ার’ আকাঙ্ক্ষা আর রাখি বেঁধেও আগুনের ছোঁয়া পাওয়ার মতো চিরন্তন ঘটনাক্রমকে তিনি পাঠকেরও গোচর করেছেন। ‘ঝাউপাতাকে রুগ্ন কবির চিঠি’তে লিখেছেন: ‘ঝাউগাছের পাতা, তোমার নতুন নতুন পুরুষবন্ধু হোক’। যৌবন যে ‘গান’ও—যার জন্য পুরুষ বা সন্তান উভয়েই প্রলুব্ধ হয়। উভয়েরই জৈবিক বাসনায় তা সম্পৃক্ত করার বস্তু। কবিরও প্রশ্ন :

“দুই বুক থেকে গান
যে শুষে নিচ্ছে, সে
প্রেমিক না সন্তান?”

‘জন্মদিনের কবিতা’য় কবির প্রার্থনা:

“অসাধ্য নয়, কিছুই এখন
অসাধ্য নয় তোমার পক্ষে
নদীর উপর নৌকা রাখো
পুরুষ রাখো নারীর বক্ষে”

এভাবেই বর্ষা, বসন্ত, পলাশ কত পথেই না কবি আমাদের নিয়ে যান। রঙিন দিন জ্বলে উঠবার, প্রেম নিবেদনের স্বপ্ন-আকাঙ্ক্ষারা সব ভ্রুকুটি জয় করে দৃঢ়তায় জানিয়ে দেয় :

“সত্যি যদি পরলোক বলে কিছু থাকে, তবে
একদিন সন্ধ্যেবেলা, পায়ে হেঁটে
পৌঁছব সেখানে।”

আমাদের সংস্কার আর বিশ্বাসের মূলে আর একবার যৌবন আলো জ্বেলে দিয়েছে—যে আলো পরকালের নয়, ইহলোকেই—বেঁচে থাকার সামর্থ্য আর সাহস এনে দেয়। জীবন ও প্রেমের জয়গান কবি গাইতে পারেন বলেই এই প্রাচুর্যও আছে কবির।

আজ যদি আমাকে জিজ্ঞেস করো (১৯৯১) গোল্লা (১৯৯১), পাগলী, তোমার সঙ্গে (১৯৯৪), বজ্রবিদ্যুৎ-ভর্তি খাতা (১৯৯৫), পাখি হুস্ (১৯৯৫), ওঃ! স্বপ্ন (১৯৯৬), পাতার পোশাক (১৯৯৭), বিষাদ (১৯৯৮), মা নিষাদ (১৯৯৯), তোমাকে, আশ্চর্যময়ী (১৯৯৯) এবং সূর্যপোড়া ছাই (১৯৯৯) প্রভৃতি কাব্যগুলিতে এক আশ্চর্য মানবীয় দর্শন ফুটে উঠেছে। ‘দমদেওয়া পুতুল’ মনে হলেও জীবনের পরিধি আর একাগ্রতা বেড়ে গেছে কবির। স্মৃতি-সাহচর্য, প্রেম ও ছন্দ সাবলীল হয়ে উঠেছে আরও। তীব্র হয়ে উঠেছে কবির গোপন ব্যাধি। পৃথিবীর ধুলোমলিন রক্তপিপাসু মানব হন্তারকদের বিরুদ্ধে অপরিমেয় ক্ষমতা নিয়ে রুখে দাঁড়িয়েছেন। মনন পরিক্রমায় অতীতও উঁকি দিয়েছে প্রেমের সদর্থক ভূমিকায়। শিল্প ভেঙে গেছে, কৃষ্ণও রূপ পরিবর্তন করেছে বলে বিপন্ন সময়টিকে কবি রাজনীতির অন্ধকার যুগ হিসেবে দেখেছেন। কৃষ্ণের রূপের বর্ণনা দিতে গিয়ে লিখেছেন:

“এখন কৃষ্ণের মুখে চাপ দাড়ি, গালে কাটা দাগ
লাল গেঞ্জি, ঝাঁকড়া চুল,কৃষ্ণ বসে চুল্লুর আড্ডায়”

কৃষ্ণ প্রেমিক নয়, এলাকার মস্তান, রাজনীতির গুন্ডা, মানুষ হন্তারক। সুতরাং প্রেম কোথায়? প্রেমিক-ই বা কোথায়? মূল্যবোধ পাল্টে যাওয়া সমাজে শুধু শোষণ আর শাসন, ভয় আর আতঙ্ক সৃষ্টিই কৌশল হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেখানে মানবতার বীজ পুঁতে কবিই বা একা কী করবেন? তবু যৌবনঘোর রক্তবমির ভেতর থেকেই সাড়া দেয়:

“আগুন, আমি হঠাৎ কিছু করে ফেলতে পারি!”

এই ‘করে ফেলা’র মধ্যে শরীর শরীর খেলা শুধু নয়— বিদ্রোহী হয়ে ওঠাও, অসহ্য হয়ে ওঠাও আছে। যা কিছু অন্তরায়, যা-কিছু কলঙ্ক, যা কিছু শূন্যতা— সব নঞর্থককেই গ্রহণ করতে চান কবি। এক কঠিন কঠিনতর জীবনের ঝোঁক তাঁর। ‘পাগলী, তোমার সঙ্গে ভয়াবহ জীবন কাটাব’— এই অঙ্গীকার নিয়েই তিনি জীবন শুরু করতে চান। সত্তার দীর্ণ হাহাকার, কুশ্রিতা যা-ই থাকুক না কেন—এক প্রাণময় ঐশ্বর্যের দীপ্তি আছে সেখানেই যেন সব perfection অপেক্ষা করছে। তাঁর unification of sensibility অসাধারণ, যার জন্য মনন বিস্তারে রোমান্টিক জগতেও মানবীয় পদধ্বনি শোনা যায়। জীবনের আলো-ছায়াকে তিনি আত্মযাপনের দৃশ্যে রূপান্তরিত করতে পারেন। চরিত্র, চিত্ত এবং চেতনায় বারবার ‘আগুন’কেই ফিরিয়ে আনেন—কেন না আগুনই আত্মজীবনীর সমূহ অংশজুড়ে বিরাজ করছে:

“তুমি জানতে থাকবে
আমরা আগুন ছাড়া কিছু ছিলাম না
আমরা আগুন ছাড়া কিছু ছিলাম না
আমরা আগুন ছাড়া কেউ নই”

অতএব এই আগুনই ব্রহ্মজীবনের যৌবন, উত্থান, রহস্য ও পবিত্র আধার। এখানেই বিলীন হওয়া যায়, আবার এখানেই আত্মদর্শন ঘটে। কৃষ্ণও অর্জুনকে এই আগুনের লীলাতেই দিব্যদর্শন করিয়েছিলেন।

কীটস থেকে রবীন্দ্রনাথ, শঙ্খ ঘোষ থেকে শ্যামলকান্তি দাশ সকলেই কবির স্পর্শে উজ্জীবিত হয়েছেন। আয়ুলেখা কবি, শুভরাত্রি লেখা যাচ্ঞার কবি, ছড়া লেখা কবি এক বিন্যাসে সকলেই কবির দিব্যদর্শনের সাক্ষী। বৈষ্ণব পদাবলী থেকে মেঘনাদ বধ, রামায়ণ থেকে কাশীরাম দাস, ভারতচন্দ্র থেকে ঈশ্বর গুপ্ত কে কবির ইশারায় উঠে দাঁড়াননি? তাঁদের ভাবনা ও সময়কালকে নিজস্ব ভাবনা ও সময়কালে প্রতিস্থাপন করেছেন। subjective-এর সঙ্গে objective-কেও সূক্ষ্মভাবে মিলিয়ে দিয়েছেন। এই কারণেই তাঁর যৌবনের দীপ্তি আকাশ ও নিসর্গে পরিব্যাপ্ত। ঐতিহ্যকে অস্তিত্বের আনন্দে রূপান্তরিত করতে পেরেছেন এক নতুন মূল্যবোধ সৃষ্টি হল আমাদের কাছে। রবীন্দ্রনাথ যখন লিখলেন:
“আমার সকল নিয়ে বসে আছি সর্বনাশের আশায়”

জয় গোস্বামী একথা উদ্ধৃত করে লিখলেন:

“শিরে বাজ পড়ে যদি, এ আশায় দাঁড়িয়েছি মাঠে
আমার কপালে ঝড় ফাটে”

বাজ থেকে দূরে যাওয়া নয়, ঝড়ের প্রতিরোধ হিসেবেই নিজেকে যুগের দেওয়াল করে নিলেন। এই objective correlative-এর জোরেই বস্তুও সত্যের এক দার্শনিক প্রত্যয়ে পরিণত হয়। যার কারণে ভাবনার ও প্রকাশের মোচড়ে লিরিক ধর্মিতার আড়ালে একটা সামাঞ্জস্য বিরাজ করে। পাঠ করতে করতে সময় প্রবহমান হয়ে ওঠে।

৩.
ওই যে রাত্রি বইছে যমুনাতীরে

এক মানবিক দায় থেকেই জয় গোস্বামী রাজনীতির চক্রান্তকারী আর প্রজাহন্তারকদের বিরুদ্ধে তাঁর কলম চালনা করেন। শিল্প শুধু বিমুর্ত নয়, বিষয়হীন নয়, স্বপ্নপরবশও নয়— বাস্তবজীবনের মানবিক মূল্যবোধের ধারক এবং বাহকও। তাই কবিতাকে সরাসরি বিদ্রোহ ঘোষণায় নিয়োজিত করেছেন। শিল্প কি সব বিবেক আর অবক্ষয় ঢেকে রেখে উদ্দেশ্যহীন হতে পারে? না, পারে না বলেই শাসকগোষ্ঠীর নন্দীগ্রাম বা সিঙ্গুর দখলকে কেন্দ্র করে সাধারণ মানুষের কান্না হাহাকার রক্তপাত মৃত্যু দেখে কবিও চুপ থাকতে পারেননি। কলম ধরেছেন আর উগরে দিয়েছেন আগুন ও ক্রোধ। অভিমান ও ঘৃণা। অন্যায়-অত্যাচারের বিরুদ্ধে কবি না দাঁড়ালে কে দাঁড়াবে? কবিই তো বলেছিলেন:

“‘হিন্দু না ওরা মুসলিম?’ ওই জিজ্ঞাসে কোন্ জন?”

জয় গোস্বামীও শাসক-অত্যাচারী গোষ্ঠীকে হুঁশিয়ার করে দিয়ে লিখলেন:

“অতই সহজ আমাদের মেরে ফেলা?
আমাদের পায়ে রাত্রিচক্র ঘোরে
আমরা এসেছি মহাভারতের পর
আমরা এসেছি দেশকাল পার করে”
(মা নিষাদ)

প্রতিবাদী মানুষ, বিদ্রোহী মানুষ, মূল্যবোধের ধারক মানুষ আবহমানকালের মানব। মহাভারতের যুগ থেকে আজও তাঁরা পৃথিবীতে বিরাজ করেন। দেশকাল বা সময়ের পরিবর্তনে তাঁরা দিকভ্রান্ত বা পথভ্রষ্ট হয়ে পড়েন না। আর সেই মানুষের দলে কবিও পড়েন। কবির কলমও তাই বন্দুকের নল বা বীরের বল্লম হয়ে যেতে পারে।

মহাকবির প্রতিভা নিয়েই জয় গোস্বামী জন্মেছেন, তাই তাঁর ব্যাপ্তিও সীমাহীন। সময়, ইতিহাস ও মানবজীবনের নিরীক্ষায় তাঁর শিল্পেরও বাঁকবদল ঘটেছে। তিনি শব্দে আছেন, আবার নৈঃশব্দ্যেও। ছন্দে এবং ছন্দহীনতায় নিজের দগ্ধডানার উড়াল বড়ো বিস্ময়কর করে তুলেছেন। প্রেম, পরমাণুঘূর্ণি,নারী, আগুন এবং মনন ভ্রমণে দিগ্ দিশারি কবি কোনো শাশ্বত বোধের দরজায় আমাদের উপনীত করেন। বৈচিত্রময় বহুমুখী অন্বয়কে নিয়ে আসেন কাব্যকুসুমের সৌরভে। এক মহাজীবনের পর্যাপ্ত আলো-ছায়ায় স্রোতের অব্যর্থ নৈকট্যে কোনো ত্রিকালদর্শী দার্শনিকের মুখোমুখি হয়ে আমরাও যেন প্রশ্ন করি—”কই শ্লোক? শ্লোক ফিরে দাও!” এই শ্লোক তো কাব্য ও জীবন, জন্ম ও মৃত্যুর মাঝের শূন্যতাটুকু পূরণ করে বিরাজ করছে। কবির ‘ভালোটি বাসিব’, ‘আমার শ্যামশ্রী ইচ্ছে, আমার স্বাগতা ইচ্ছেগুলি’ এবং ‘মায়ের সামনে স্নান করতে লজ্জা নেই’ কাব্যগুলিতে একাধারে প্রেম ও নবজন্মের অনুষঙ্গ বারবার ফিরে এসেছে। প্রেমের অমোঘ রসায়ন কীভাবে পাক খেয়ে উঠেছে কবির হৃদয়ে তারই উষ্ণতায়, তীব্রতায় আমরা ভেসে যেতে থাকি।তেমনি মৃত্যুস্পর্শটি খুব কাছের হয়ে যায় কবির। নারীময়তা, শরীরময়তার মধ্যেও অসাধারণ দার্শনিক ও কাব্যকুশলী বলেই তিনি প্রেম ও যৌন অনুষঙ্গগুলিকে মৃত্যুর গর্ভে নবজন্মের প্রতীক করে তুলেছেন। হৃদয় নিংড়ে প্রেমের তাপ বিকিরণ করেছেন। মাঝে মাঝে বিষয় পাল্টেছে, কিন্তু সেই ‘বিষাদে’র পরিবর্তন হয়নি। সেলফ আইডেন্টিটি খুঁজতে খুঁজতেই সত্তাকে আবার সেই পঞ্চভূতের ভেতর দেখলেন। ‘মায়ের সামনে স্নান করতে লজ্জা নেই’ কাব্যে লিখলেন:

“শারীরিক অশান্তিরা আমাকে আরো একবার জানিয়ে দিয়ে গেল যে, সবদিক দিয়েই আমার শরীরে এসে পড়েছে জরা… জরার পরপরই কার আসবার কথা? মৃত্যু না?… এক সময় আমার শরীরে যখন যৌবন আসতে শুরু করেছিল তখনই শুরু হয়েছিল কবিতা লেখা। আজ জরা যখন অভ্রান্তভাবেই উপস্থিত তখন তাকে নিয়ে একটা কবিতা বই থাকুক…”।— এই জরাও কবিকে দ্বিতীয়বার শিশু করতে চলেছে। মৃত্যুর পরের অংশ জল, জলের তলায় চুপচাপ বসে থাকার অনুভূতি তো পঞ্চভূতেই বিলীন হওয়া। ‘মা’ সেই ব্যাপ্তির আধার। আমাদের সামাজিক এবং দৈনন্দিন ক্রিয়াকর্মের ভেতর আকাশ দেখা চলতে থাকে, তেমনি নারী এবং নারীর শরীর দেখাও। ‘মৈথুন’ শব্দটা আমরা জৈবিক তাড়না বা যৌনক্রিয়ার আনুষঙ্গিক ভাবতে পারি। কিন্তু জয় গোস্বামী মৈথুনকে মৃত্যুর অনুষঙ্গের সঙ্গেও মিলিয়ে দিয়েছেন। এ এক নতুন পথ। রতিময় ঘোরের যাত্রায় প্রেম ও মৃত্যুর অবস্থান তখন একই মনে হয়। তবে এই আত্মিক শূন্যতা থেকেই যৌবন অতিক্রান্ত কবির বোধে জরায়ু যেন আশ্রয়ও। প্রেম সর্বদা সদর্থক হবে এমনটিও কথা নয়; নঞর্থকও (মৃত্যুও) হতে পারে সেইটিই দেখালেন। কামময়তা যেমন প্রেমে থাকে, তেমনি জীবনে মৃত্যুর গন্ধও থাকে—সেসবকে অনুধাবন করাও তো দার্শনিকের কাজ। সেই কাজটিই সম্পন্ন করেছেন ব্যাপ্তিময় কবি জয় গোস্বামী। টি এস এলিয়ট এজন্যই Burnt Norton-এ লিখেছেন:

“Words move, music moves
Only in time; but that which is only living
Can only die.”

গান, কথা নীরবতার মধ্যে বিরাজ করলেও গতি কালের দ্বারাই নিয়ন্ত্রিত হয়। প্রতিটি মুহূর্তই মনে হতে পারে আমাদের জীবনের শেষ মুহূর্ত। তাই আমরা বেঁচে থাকি মৃত্যুর প্রতীক্ষায়। জয় গোস্বামী প্রতীক্ষায় সৃষ্টির আদিম মৈথুনের দিকেই ধাবিত হয়েছেন। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য দার্শনিকের ঐতিহ্যে তিনি সমৃদ্ধ। শুধু ‘মৈথুন’ শব্দটি ব্যবহারে এবং সৃষ্টির নবজন্মে কাম ও রতির প্রয়োগে নতুনত্ব আনতে চেয়েছেন। এক্ষেত্রে তিনি সফলও। সাধনার শেষ পর্যায়ে পৌঁছে গেলে সমস্ত সাধকই বোধের একই স্তরে উন্নীত হতে পারেন। জয় গোস্বামীও সৃষ্টির আদি বিষাদ থেকেই অ্যারিস্টটল, সেইন্ট অগাস্টিন, রার্ডিয়ার্ড কিপ্লিং এবং কবি টি এস এলিয়টের বোধের সঙ্গে সামিল হতে পেরেছেন। মৃত্যুভাবনায়ও যৌনতা থাকে এবং যৌনতায় মৃত্যুও থাকে। আলোও অন্ধকারের পাশাপাশি বিরাজ করে। মনন বিক্রিয়ার বিশ্লেষক ফ্রয়েড অনেক আগেই তা বিশ্লেষণ করেছেন। জয় গোস্বামী কবিতায় যে বোধের দরজা খুলে দিয়েছেন তা একজন সৎ সাহসী দার্শনিকেরই একান্ত যাত্রা। যে যাত্রায় নিজের সঙ্গে নিজের কথা হয়; নিচুস্বরে মনের অতলে প্রবেশ করার অবকাশ থাকে। সংলাপে, স্বয়ংক্রিয়তায়, অবচেতনের পরিধি বিস্তারে, আত্মঅন্বেষণের দ্রাঘিমায় সতত সচল, নির্বাক, নিস্তব্ধতায় পৌঁছানো সম্ভব হয়।

জয় গোস্বামী বরাবরই মনের গহনে নিষিদ্ধ, অনালোকিত কোনো অন্ধকারের খোঁজ করেন আর সেই অন্ধকারকেই বাস্তবের আলোয় নিয়ে আসতে চান। যে মগ্নতায় আমাদের আত্ম-উন্মোচন সম্ভব, সেই মগ্নতার নৈঃশাব্দ্যিক ভাষাও জয়ের কবিতায় পেয়ে যাই। সুদূর ব্যঞ্জনায় তিনি মানবীয় চিরন্তন বলয়ে ঘোরাফেরা করলেও বাস্তবের অতি সূক্ষ্ম জীবনচর্যাকে উপেক্ষা করেন না। নিজেকে এবং মেয়েকে নিয়ে দশটার সকালের দৃশ্য এভাবে তুলে ধরেন:

“পাঞ্জাবি ও ঝোলাসহ আমি রোগা দাঁড়কাক,
পিছনে স্কুলব্যাগ হাতে গৃহিণী বিরক্ত চিল,
লাফাতে লাফাতে সামনে
বুকুন চড়াই!”
(পাখি হুস্)

নিজের পরিবার স্বামী-স্ত্রী-সন্তানের এই কর্মব্যস্ততাও কবিতায় আয়না হয়ে উঠে আসে। তখনই মনে হয় কবি মহাকবির মতোই তত্ত্বে দর্শনে লিরিকে ক্লাসিকে মহাজীবনের স্রোতকেই চিনিয়ে দিলেন। প্রতিভার সর্বব্যাপী চিরন্তনতায় সবকিছুকেই ধারণ করলেন। সাহিত্য সর্বকালের দরজায় উপনীত হল তার গভীরতর অসাধারণ পর্যবেক্ষণ নিয়ে।