আমরা কোথায় যাচ্ছি? –সহজাত কৌতূহলে প্রশ্ন করলো জয়ী। এলাকাটা একেবারেই অচেনা তার। এদিকটাতে আসা হয়নি আগে কখনই। রাস্তাগুলো নির্জন, ফাঁকা। দু পাশের বিল্ডিংগুলো কেমন বিষণ্ন, মুখভার করে দাঁড়িয়ে আছে। বিকেলের মরে আসা রোদে তাদের ছায়াগুলো দীর্ঘ এখন, কৃশকায়।
বাসায়। -অস্বাভাবিক দ্রুততায় উত্তর দিলো শিবলী।
বাসায় কেন? –অবাক সরল গলা জয়ী’র। এমন কিছুর জন্য প্রস্তুত নয় সে। এমনটি ভাবনাতেই আসেনি তার।
যাই চলো। -লাজুক, তেলতেলে একটু হেসে বললো শিবলী। তারপর ঝট করে জয়ীর দিকে ফিরে বললো, তুমি কি ভয় পাচ্ছ?
না না! ভয় পাবো কেন? –দ্রুত, সহজ উত্তর দিলো জয়ী, বিরক্তি লুকিয়ে। ভেতরে ভেতরে বিরক্তি জমতে শুরু করেছে ততক্ষণে। এভাবে কারও বাসায় যাওয়া মোটেই পছন্দ নয় তার। তাছাড়া কথা ছিলো বাইরে কোথাও বসবে তারা। হুট করে তাকে না জানিয়ে বাসার পথ ধরাটা কোন ধরণের ভদ্রতা! মনে মনে খুব আহত বোধ করলো জয়ী। পা চলছে শিবলীর সাথে তাল মিলিয়েই। বিকেলটা গাঢ় হচ্ছে আরও। রোদ মরে আসছে ধীরে।
চারতলা বাড়িটা নির্জন। ছিমছাম। কেমন একটা মনখারাপ করা বিষণ্নতা লেপ্টে আছে বিল্ডিং জুড়ে। দেওয়ালে বেড়ে ওঠা সবুজ শ্যাওলা শীতল নির্লিপ্ততা মেলে দিয়েছে হাওয়ায়। বাড়ির সামনের খালি জায়গাটাতে অযত্নে বেড়ে ওঠা বেশ কিছু ফুলের গাছ। শেষ বিকেলের উদাস হাওয়ায় দুলছে মৃদু মৃদু। সামনে একটা কুকুর শুয়ে। জয়ীকে দেখে মাথা তুলে সামান্য কুঁইকুঁই করে পেছনে শিবলীকে দেখে থেমে গেলো। স্বস্তিতে শুয়ে পড়লো আবার আগের মতোই।
সিঁড়ি বেয়ে উঠতে উঠতে টুকটাক কথা বলছিলো শিবলী। হ্যাঁ, হুঁ উত্তর দিচ্ছিলো জয়ী। ব্যাপারটা মোটেই ভালো লাগছে না তার। একটা অস্বস্তি খোঁচা দিচ্ছে মনের ভেতর। এমন পরিস্থিতির সাথে পূর্বপরিচয় নেই তার। তবে হ্যাঁ, নিজের ওপর পুরোপুরি আস্থা আছে। ভয় পাচ্ছে না মোটেই। তাছাড়া শিবলীকেও যতটুকু চেনে, তাতে ভদ্র, রুচিশীল মানুষই মনে হয়। মানুষ চিনতে তার সচরাচর ভুল হয় না। কিন্তু অস্বস্তিটা যাচ্ছে না মন থেকে। খুঁচিয়ে চলেছে সমানে। যেখানে সে জানে যে শিবলীর বাসা ফাঁকা এখন। তার বউ, ছেলে-মেয়ে নিয়ে ঘুরতে গেছে সিলেট। নেহাত শিবলী অফিস থেকে ছুটি পায়নি তাই যেতে পারেনি। না-কি ইচ্ছে করেই যায়নি শিবলী? –প্রশ্নটা মনের ভেতর ভুস করে মাথা তুলেই তলিয়ে গেলো আবার। মরুকগে।- মাছি তাড়ানোর মতো ভাবনাটা তাড়িয়ে দিলো মন থেকে।
ড্রইংরুমটা পরিপাটি, গোছানো। মনে মনে শিবলীর বউয়ের রুচির প্রশংসা করলো জয়ী। মুখেও। শিবলী ঠোঁট উল্টালো তাচ্ছিল্যে। বললো, আরে দুর! ও গোছায় নাকি! কাজের বুয়া গুছিয়ে রাখে সব।
আরেকদফা বিরক্তি ভর করলো জয়ীর মনে। পুরুষগুলো এমনই! নিমকহারাম একেকটা! বউয়ের প্রশংসা করতে গেলেই কোষ্ঠকাঠিন্যে ভোগে! –ভাবলো আপন মনেই।
মন দিয়ে দেখলো চারপাশ। জানালার পর্দাগুলোয় শিল্পের ছোঁয়া। বোঝা যায় অনেক ভেবেচিন্তে তৈরি করা হয়েছে ওগুলো। দেওয়ালে বেশ কিছু ওয়েল পেইন্টিং ঝুলছে। সস্তা কিন্তু রুচির ছোঁয়া স্পষ্ট। শোকেসে হরেক শোপিস। বেশিরভাগই মাটির, কিছু ধাতবও আছে। একপাশে বুকশেলফে যত্ন করে অনেকগুলো বই সাজানো। বইয়ের চেহারা বলে দিচ্ছে ওগুলো স্রেফ সাজিয়ে রাখার জন্য নয়। মাঝে মাঝে হাতে তোলা হয়। মন দিয়ে বইগুলো দেখলো জয়ী। বেশিরভাগই চিত্রকলার ওপর। ইংরেজি বই। দালি, পিকাসোও আছে। চমকালো জয়ী। দেখেই বুঝলো বইগুলো মোটেই সহজলভ্য নয়। হাতে নিয়ে নেড়েচেড়ে দেখলো। পেঙ্গুইন প্রকাশনী।
এগুলো তোমার? –বইয়ের পাতা উল্টোতে উল্টোতে প্রশ্নটা হাওয়ায় ছুঁড়ে দিলো জয়ী। শিবলী পাশের সোফাটাতে বসে তখন উসখুস করছে সিগারেটের প্যাকেট হাতে। চোখের কোণায় তাকে দেখেও বইয়ের পাতায় মনোযোগ ধরে রাখলো জয়ী।
আরে নাহ্! –গলায় তাচ্ছিল্য ঢেলে বললো শিবলী।তার বলার ধরণে জয়ীর ভেতর তৈরি হওয়া বিরক্তির পালে হাওয়া লাগলো জোর।
তাহলে? –কৌতূহলটা ধরে রেখেই নাছোড়বান্দার মতো আবার প্রশ্ন করলো জয়ী।
ওগুলো আমার বউ শেলী’র। ও চারুকলার স্টুডেন্ট ছিলো।
ওমা! তাই! কখনও বলোনি তো! –বলে এবার পুরো রুমটা গভীর মনোযোগে দেখলো জয়ী। হ্যাঁ, মিলছে। শেলী মেয়েটার প্রতি তীব্র আগ্রহ জন্মালো হঠাৎ, কেমন একটা মায়াও হলো। শোকেসে চোখ পড়লো। বাঁধানো একটা ছবি, সাদাকালো। হরিণ চোখের একটি মেয়ে, মাথার দু পাশে বেণী দুলিয়ে দু চোখে রাজ্যের মায়া নিয়ে তাকিয়ে আছে। দেখলেই মায়া জন্মে যায়।
কিছু মনে ক’রো না। একটা সিগারেট খাই? –দ্বিধা সরিয়ে বললো শিবলী।
কী আশ্চর্য! আমার অনুমতি চাইছো কেন? নিঃসঙ্কোচে খাও! –বলে চোখের ইশারায় ছবিটা দেখিয়ে প্রশ্ন করলো –কে মেয়েটা?
শেলী। চারুকলায় ফার্স্টইয়ারে পড়ার সময়ের ছবি। -একমুখ ধোঁয়া ছেড়ে নিরুত্তাপ উত্তর দিলো শিবলী।
জয়ী ততক্ষণে এগিয়ে গিয়ে দেখছে ছবিটা। উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বললো, বাহ্! তোমার বউ তো খুব সুন্দর! স্নিগ্ধ!
হুঁ। -অন্যমনস্ক, দায়সারাভাবে বললো শিবলী।
এটা তোমার খুব অন্যায়! বুঝেছো তো?
কোনটা? –চমকে উত্তর দিলো শিবলী।
এই যে, শেলী’র অনুপস্থিতিতে আমাকে বাসায় ডাকলে তুমি! ও বেচারা জানলে খুব কষ্ট পাবে। ব্যাপারটার অন্যরকম একটা অর্থ দাঁড় করাবে। সেটাই স্বাভাবিক। অথচ তেমন কিছু তো নয় আসলে, তাই না?
হুঁ, তা অবশ্য ঠিক! –মিইয়ে যাওয়া গলায় অন্যদিকে চোখ রেখে উত্তর দিলো শিবলী। ঘন ঘন কয়েকটা টান দিলো সিগারেটে। তারপর ঝট করে উঠে বললো, চলো বাসাটা দেখাই তোমাকে।
বাসা দেখায় জয়ী’র আগ্রহ নাই মোটেই। একে তো এভাবে চোরের মতো কারও বাসায় ঢুকে পড়ায় তার নিজের ভেতর একটা অপরাধবোধ কাজ করছে, তার ওপর কারও একান্ত ব্যক্তিগত জায়গায় তার অনুমতি ছাড়া এভাবে চলাচল নিতান্তই রুচি বিরুদ্ধ জয়ীর। কিন্তু শিবলী ততক্ষণে পর্দার আড়ালে। ওপাশ থেকে হাঁক দিলো, কই, এসো!
অগত্যা গেলো জয়ী। দেখলো ঘুরে ঘুরে। সারা বাসায় একজন রুচিশীল, পরিশীলিত শিল্পীর হাতের ছোঁয়া লেগে আছে। অনুপস্থিত একজন মানুষের অশরীরী উপস্থিতি ছড়িয়ে আছে পুরো বাসায়। কেমন একটা অস্বস্তি চেপে ধরলো জয়ীকে। মনে হলো পেছন থেকে শেলীর মায়া মায়া দুটো চোখ তীক্ষ্ণভাবে লক্ষ্য করছে তাকে। অনাহুত জয়ীর উপস্থিতিতে বিরক্তি আর শাসন নিয়ে তাকিয়ে আছে তাদের দিকে। শিবলীর পেছন পেছন চুপচাপ বাসাটা দেখলো জয়ী। অদেখা কোনো এক শেলী’র জন্য ভালোবাসা টের পেলো মনে। শিবলী সবশেষে বললো, এবার আমার বেডরুম দেখবে এসো।
পায়ে পায়ে ঢুকলো দুজনেই। ঢুকেই দমবন্ধ লাগলো। বাসাটার সাথে এরুমটা একেবারেই বেমানান। গুমোট একটা গন্ধ হাওয়ায়। দরজা জানালা বহুকাল খোলা হয় না, বোঝা যায়। বিছানার একপাশে তখনও মশারি ঝুলছে, অমনই ঝোলে, মশারির হালই বলছে সে কথা। বিছানাটা এলোমেলো। কতকাল যে গোছানো হয় না কে জানে! মাথার কাছে একদঙ্গল বইপত্র ছড়ানো। পাশের আলমারি ভর্তি বই, অগোছালো, অযত্নে ধূলোজমা। মেঝেতে ইতস্তত ছড়িয়ে আছে সিগারেটের আধ খাওয়া অংশ, খালি প্যাকেট, ছাই। দ্রুতহাতে জানালার একটা কাঁচ সরিয়ে দিলো জয়ী। পর্দার আড়াল সরাতেই শেষ বিকেলের গোধূলি আলো উঁকি দিলো ঘরে। হাতে জমে যাওয়া ধূলো সরিয়ে নাক কুঁচকালো জয়ী। বললো, বাসাটা এমন পরিপাটি, গোছানো, তোমার ঘরটার তাহলে এ অবস্থা কেন? দরজা-জানালা খোলো না না-কি? দমবন্ধ লাগে না তোমার? অদ্ভুত!
আর ব’লো না। আমি তো সারাদিন থাকি বাইরে, ঘরে ফিরি সেই রাতে। আমার ঘরে কেউ বড় একটা আসে টাসে না। আমি নিজেও সেটা খুব একটা পছন্দ করি না। সে কারণে এ ঘরটার দরজা-জানালা বন্ধই থাকে বেশিরভাগ সময়। তাছাড়া চুরির সমস্যাও আছে। জানালা খোলা থাকলে চুরি হয়ে যায়। সেজন্য বন্ধই থাকে বেশি। তুমি বসো না!
হ্যাঁ, বসছি। বলে বিছানার একপাশে পা ঝুলিয়ে বসে জয়ী। অন্যপাশে শিবলী। তার হাতে গ্রীক সভ্যতার ওপর দুষ্প্রাপ্য একটা ইংরেজি বই। সেখান থেকে সে পড়ে শোনায়। ব্যাখ্যা করে বুঝিয়ে দেয়। জয়ী চুপচাপ শোনে। হুঁ হ্যাঁ করে মাঝে মাঝে। হ্যাঁ একথা ঠিক, শিবলীর প্রতি তার একটা মুগ্ধতা তৈরি হয়েছিলো, একধরণের শ্রদ্ধাবোধও, সেটা এখনও আছে। মুগ্ধতা ঠিক ব্যক্তি শিবলীর প্রতিও নয়। তার সৃষ্টিশীলতার প্রতি, তার লেখক সত্ত্বার প্রতি। এ সময়ের তরুণ লেখকদের মধ্যে শিবলী এক উজ্জ্বলতম নাম। গতানুগতিক ধারার বাইরে জীবনকে দেখে সে। তার কাছে জীবন মূলত এক সম্মোহনী জূয়ার নাম। মানুষকে যে প্রাণপণে বেঁধে রাখতে চায় প্রেমে ও প্রতীজ্ঞায়, ত্যাগে ও তিতিক্ষায়, মুগ্ধকর সুন্দরের সম্ভাবনায়। মানুষ সে জুয়ার প্রলোভনে আত্মাহুতি দেয়। কেউ কেউ জিতে যায়। অধিকাংশই হারে। তবু এ জুয়ায় অংশ নেয় প্রত্যেকেই, নিজেরই অজান্তে, অলঙ্ঘনীয় কোনো এক অদৃশ্য জুয়ারীর অঙ্গুলিহেলনে। শিবলীর লেখকসত্ত্বার প্রতি মুগ্ধতা থেকেই মূলত তাদের মধ্যে একটা বোঝাপড়া তৈরি হয়েছে, বন্ধুত্বও বলা যায়, প্রেম কিছুতেই নয়। না, প্রেম নয়। -মাথা ঝাঁকিয়ে ভাবনাটাকে নিজেই নাকচ করে দেয় জয়ী। কিন্তু শিবলীর তাকে না বলে এভাবে বাসার পথ ধরাটা একেবারেই পছন্দ হয়নি তার। শিবলীর সাথে কোনোভাবেই এটা মেলাতে পারছে না সে। শিবলীর বই পড়া, বা তার ব্যাখ্যা দেওয়া কোনোটাতেই সে কারণে মনোযোগ রাখতে পারছে না জয়ী। তার মনের মধ্যে শেলী নামের মেয়েটা ঢুকে গেছে। মেয়েটা যদি কোনোদিন ঘূনাক্ষরেও জানতে পারে, তার সাজানো বাগানটাতে কোনো এক অনাহূত অতিথিকে ডেকে এনেছিলো শিবলী, যে এসে ঘ্রাণ নিয়ে গেছে তার একান্ত গোপনীয়তার, তাহলে কেমন হবে মেয়েটার মুখ? জয়ী’র প্রতিই বা কেমন ধারণা হবে তার? সস্তা, বাজারি কোনো মেয়ে? যে অন্যের অনুপস্থিতিতে তার বাসায় অনুপ্রবেশ করে শরীরী সুখ পেতে? ভাবতেই ঘেন্নায় বমি পেলো জয়ী’র। ছিঃ! ঘেন্নায় কুঁকড়ে গেলো জয়ী।
অথচ তেমনটা ভাবাই স্বাভাবিক। নির্জন বাসা। কাঙ্ক্ষিত নিরালা। দু জন নারী-পুরুষ, যারা এই নির্জনতার সুযোগ নিয়ে ঢুকে পড়েছে বাসায়, তাদের সম্পর্কে এরচে ভালো আর কী-ই বা ভাবার থাকে অন্যদের! জয়ী নিজে শেলী হলে এরচে অন্যরকম কী-ই বা ভাবতো আর!
নিজের ভেতরে জমা হওয়া বিরক্তিটাকে আর পুষে রাখতে পারে না জয়ী। বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায় আচমকা। কোনোদিকে না তাকিয়ে বলে, এখানে ভালো লাগছে না আর। চলো ড্রইংরুমে গিয়ে বসি।
থতমত খায় শিবলী। জয়ীর মুখের দিকে তাকিয়ে থমকে যায়।
আচ্ছা, চলো। -বলে হাতের বইটা গুটিয়ে রেখে হাঁটতে থাকে জয়ীর পেছন পেছন। অনেকক্ষণ কথা বলে না কেউ আর। অস্বস্তিকর একটা নীরবতা পাক খেতে থাকে ঘরময়। শেষে নীরবতা ভাঙে শিবলীই।
কিছু খাবে? চা বা কফি?
নাহ্। -হতাশ উত্তর দেয় জয়ী। ক্লান্ত লাগছে তার। চলে যেতে ইচ্ছে করছে এক্ষুনি। ইচ্ছেটাকে চাপা দিয়ে সোফায় বসে থাকে শান্ত, নিরুত্তাপ।
তুমি খাবে? চা বা কফি? খেলে আমি তোমাকে খাওয়াতে পারি। -শিবলীর চোখে চোখ রেখে উত্তর দেয় জয়ী।
না থাক। কেক আছে ঘরে, বরং কেক খাওয়া যাক। কী বলো? –জিজ্ঞাসু চোখ তুলে বলে শিবলী।
আচ্ছা! খাওয়া যাক! –হালছাড়া উত্তর দেয় জয়ী।
শিবলী ঘরে থেকে বেরিয়ে যায়। একটু পরেই ট্রেতে কয়েক পিস কেক আর দুটো গ্লাশ ভর্তি স্প্রাইট নিয়ে ঢোকে। সেন্টার টেবিলে রেখে বসে এবার শিবলী, জয়ীর পাশে। মাঝখানে হাতখানেক দূরত্ব।
আনমনে কেকের টুকরোয় কামড় দেয় জয়ী। গ্লাশে চুমুক দেয় ধীরে। শিবলীর সম্ভবত খিদে পেয়েছে বেশ। সে গোগ্রাসে খায়। একচুমুকে গ্লাশের তরলটুক গিলে নিয়ে মুখ মোছে হাতের তেলোয়। চোখের কোনে দেখে জয়ী। বিতৃষ্ণা জাগে আরও। সাধারণ। নিতান্তই সাধারণ এক মানুষ শিবলী। সম্ভবত তার লেখকসত্ত্বার সাথে ব্যক্তিসত্ত্বার বিরোধে তার মতোই বিতৃষ্ণ শেলী নামের মেয়েটাও। সে কারণেই পুরো বাসাটার বিপরীত চিত্র শিবলীর বেডরুমে দৃশ্যমান। সে কারণেই সম্ভবত গৃহদাহের শুরু, অতৃপ্তির সূচনা। লেখক শিবলীর প্রতি জয়ীর যে শ্রদ্ধাবোধ, যে মুগ্ধতা সেটুকুতে চিড় ধরেনি একচুল। কিন্তু ব্যক্তি শিবলীর প্রতি এই সামান্য সময়েই যথেষ্ট বিরক্তি জমে গেছে তার মনে। হাঁপিয়েও উঠেছে অনেকখানি। সে ভেবেছিল শিবলীর লেখার মতোই অসাধারণ হবে তার ব্যক্তিজীবন। তার প্রতিদিনের যাপন কৌশলেও থাকবে বর্ণনাতীত মুগ্ধতা। কিন্তু এই মুহূর্তের শিবলীর অসুখি, অতৃপ্ত মুখ, নিতান্তই আটপৌরে জীবনে সাধা তার অগোছালো, অভ্যস্ত জীবন, যারপর নাই হতাশ করে তাকে। সে পালাতে চায় শিবলীর সামনে থেকে। ভয় হয়, পাছে লেখক শিবলীর প্রতি তার মুগ্ধতাটুকু টুটে যায় এবার! যদি মিলিয়ে যায় তার প্রতি শ্রদ্ধাবোধের পারদটুকু! সেটা বড় কষ্টের হবে। সেটুকু টিকে থাক। লেখক শিবলীর সাথে তার কোনো বিরোধ নেই। ব্যক্তি শিবলীকে যেমন কোনো প্রয়োজন নেই তার।
ক্লান্ত, হতাশ চোখ তুলে শিবলীর দিকে তাকায় জয়ী। বলে, এবার তাহলে উঠি?
এখনই যাবে? আরেকটু বসো! –কাঙালের মতো বলে শিবলী। শিবলীর এই কাঙালপনা আরও অসহ্য ঠেকে জয়ীর। কাঠ কাঠ গলায় সে বলে, আচ্ছা।
আর বাঁচতে ইচ্ছে করে না, জানো? ভালো লাগে না কিছুই আর। এই যে দেখো, তুমি আমার বাসায় এলে, ফাঁকা বাসা। আমি কি পারতাম না তোমার হাতটা একটু ধরতে? দু হাতে তোমার মুখটা ধরে আলতো একটা চুমু খেতে? পারতাম না, বলো?
নির্লিপ্ত, ভাবলেশহীন মুখে শিবলীকে দেখে জয়ী। চুপচাপ শোনে তার কথা। তার নৈর্ব্যক্তিক অভিব্যক্তি শিবলীকে স্পর্শ করে না তেমন। সে তেমনই বলে যায়, আমার কিছুই ইচ্ছে করে না আজকাল জানো তো! আমি পারি না। নিজেকে ভালোবাসতে পারি না, শেলিকে ভালোবাসতে পারি না, কাউকেই ভালোবাসতে পারি না। নির্লিপ্তির অভিশাপ আমাকে শেষ করে দিচ্ছে একটু একটু করে। চিনিয়ে দিচ্ছে মৃত্যুর পথ। আমার আর ভালো লাগে না কিছুই। মরে যেতে ইচ্ছে করে খুব। আচ্ছা জয়ী, তুমি কি আমাকে এ ব্যাপারে একটু সাহায্য করতে পারো?
সাহায্য? কীভাবে? –বিস্মিত প্রশ্ন জয়ী’র।
আমাকে ভালোবাসবে জয়ী? ফিরিয়ে দেবে আসক্তি? প্রেম? আমি জীবনে ফিরতে চাই জয়ী! আরেকবার জড়াতে চাই জীবনজুয়ায়!
সন্ধ্যা হয়ে আসছে। আমি এবার উঠি। -শিবলীর কাঙালপনা আর তার বিহ্বল দৃষ্টি পেছনে ফেলে দরজা খুলে বের হয়ে পড়ে জয়ী। তখন সন্ধ্যা হালকা ছায়া ফেলেছে শহরের আধো নির্জন এলাকাটাতে। একে একে ঘরে ফিরছে কর্মব্যস্ত মানুষ। ক্লান্ত পথ চলে জয়ী। সন্ধ্যার ছায়াটা ঘন হতে থাকে মনে। আলোর আড়ালে থাকা অন্ধকারে ছেয়ে যায় মন। তখনও স্ট্রিট লাইটগুলো চোখ মেলেনি। সেই সুযোগে হামাগুড়ি দিতে থাকে সন্ধ্যার অন্ধকার। জয়ী অন্ধকার চিরে এগোয়। হাঁটতে হবে অনেকটা পথ।