জসীম উদ্দীন বাংলা কাব্যের এক সম্পূর্ণ নতুন দিগন্ত। নগর নাগরিকতার জয়গানে মুখর আধুনিক বাংলা কাব্যের অঙ্গনে জসীম উদ্দীনের কাব্যে পল্লীর মেটো ও মেঠো সুরের আলাপন নিঃসন্দেহে একটি গভীর তাৎপর্য-নির্দেশক ব্যতিক্রম। এই ব্যতিক্রমই জসীম উদ্দীনের দিকে তাকাতে বাধ্য করে আধুনিক বাংলা কবিতার পাঠকদের। এই ব্যতিক্রম কবি সত্তা নিয়েই জসীম উদ্দীন হয়ে উঠে অনন্য ও অনিবার্য আর অপরিহার্যতার দাবিদার। তিনি তার নতুন দিগন্তে হয়ে উঠেন সময়ের অসাধারণ উপস্থাপক তথা অনন্য রূপকার।
আধুনিক বাংলা কবিতার মৌলিক কবিদের তালিকা থেকে অনেকে খুব সহজেই জসীম উদ্দীনের নামটি বর্জন করে চললেও তিনি যে বাংলা সাহিত্যে এক সম্পূর্ণ নব দিগন্ত সৃষ্টি করেছেন এবং প্রবলভাবে তা প্রসারিতও করেছেন এ কথা অস্বীকার করার উপায় সম্ভবত কারোই নাই। পল্লী ছিল পল্লী কবি সসীম উদ্দীনের নবদিগন্ত। তিনি তার সমস্ত শ্রম দিয়ে ফুটিয়ে তুলেছেন পল্লীর রূপ তথা বহিরাবরণ এবং আত্মা। পল্লী হৃদয়ের অনুবাদই তার সাহসিকতা, এটাই তার মৌলিকতার, এখানেই তার স্বার্থকতা, এটাই তার মৌলিকতার, এখানেই তার স্বার্থকতা। জসীম উদ্দীনের স্বার্থক উপস্থাপনা আরও সার্থক হয়েছে আধুনিক পাঠকের মন জয় করার মাধ্যমে। এর একমাত্র কারণ হলো তিনি পল্লীকে উপস্থাপন করলেও নাগরিকতা ও আধুনিকতাকে অস্বীকার করেননি একবিন্দু। তিনি পল্লীকবি হলেও পল্লীকবির সাধারণ সংজ্ঞায় তাকে সংজ্ঞায়িত করা যায় না কিছুতেই, কেননা পল্লী নিয়ে লিখেও তিনি গ্রাম্য হয়ে দাঁড়াননি কোথাও। তার সুদীর্ঘ সাহিত্য জীবনে তিনি আধুনিক শিল্পীসুলভ মন নিয়ে। পথ চলা অব্যাহত রেখেছেন এবং এ জন্যই তার পল্লীজীবন ভিত্তিক কাব্যসাধনা এত প্রাণবন্ত, এত আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পেরেছে। এভাবেই তিনি অক্ষুণœ রেখেছেন তার সৃষ্টির শিল্পমান তার কাব্যে সর্বাবস্থায় সমকালীন দেশ ও কালের একটি সত্য পরিচয় সুস্থিরভাবে উপস্থিত বলেই, নাগরিকতার উত্তোরোত্তর ব্যাপক প্রভাবের দিনেও আধুনিক শিক্ষিত পাঠকের মনজয় করতে কোন অসুবিধাই তার হয়নি। আধুনিক হৃদয়ের অধিকারী ছিলেন বলেই গ্রাম বাংলার অসামান্য রূপকার জসীম উদ্দীন নিজেই তার কবিতায় এই অনিবার্য সত্যটি উচ্চারণ করতে পেরেছেন দ্বিধাহীন শব্দমালা বিদায় নিলো লালপেড়ে আধ ঘোমটাটি বধূর। সরল সভয় তরল চোখের সুমধুর চাউনি আর গ্রাম্য বধূর লালপেড়ে আধ ঘোমটাটি বিদায় নিলেও জসীম উদদীন কিন্তু বিদায় নেননি তার গ্রাম থেকে কিংবা পল্লীকেও বিদায় দিতে পারেননি তার সৃষ্টি থেকে। একটা সময়ে এসে শহরের প্রাচীন ক্রমশই উঁচু হয়ে উঠে পল্লীকে তার দৃষ্টি সীমার আড়াল করে ফেললেও তখনো তিনি স্মৃতির সুরভি হৃদয় থেকে উদগীরণ করতে পেরেছেন অনায়াসে তার সমস্ত আবেগ ও আকাক্সক্ষার সেই চিরন্তন পল্লী সুর। বিষয়বস্তু, প্রকাশভঙ্গি ও জীবন দৃষ্টিতে জসীম উদ্দীন গ-িবদ্ধ। গ-ি অতিক্রমের চেষ্টা কখনো করলে সে ক্ষেত্রে তিনি সফলতা অর্জন করতে পারেননি এবং জীবন দৃষ্টিতেও মূলত: তিনি যে পশ্চাদমুখেই রয়ে গিয়েছেন সে কথা অস্বীকার করার কোন উপায় নেই। ‘মাটির কান্না’ কাব্য গ্রন্থ তার মৌল স্বভাবের অনেকটা ব্যতিক্রমী সেই রূপ যা উপযুক্ত শিল্পচেতনা দ্বারা সমর্থিত হয়নি বলেই তেমন কোন মহৎ তাৎপর্য লাভ করতে পারেনি। জসীম উদ্দীন তার পল্লীতেই সার্থক এবং সেখানেই তিনি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। আর এ জন্যই সম্ভবত কাল কালান্তরের সাক্ষী হয়ে তিনি এবং তার সৃষ্টিকে ইতিহাস করে দাঁড়িয়ে গেলেন বাংলা কাব্যের মোহনায়। একথাও সত্য নয় যে এ ক্ষেত্রে জসীম উদ্দীন একমাত্র কবি; যতীন্দ্রমোহন বাগচীর অন্ধবধূ ‘কাজলাদিদি’ গ্রামীণ প্রেক্ষাপটে রচিত এক অনবুধ্য কর্ম। তবুও সার্বিকভাবে জসীম উদ্দীনের সার্থকথা থেকে তার দূরত্ব অনেক। এভাবেই নিশ্চয় আরও বেশকিছু উচ্চারণ করার দাবিদার। কিন্তু তাদের কেউও কি জসমি উদ্দীনের মতো সার্থক। না আর কেউ নয়, জসীম উদদীনই এ ক্ষেত্রে একমাত্র সার্থক ব্যক্তি। জসীম উদ্দীন হ্যাঁ কেবল জসীম উদ্দীনই তার প্রবল অনুভূতি দিয়ে অনুবাদ করতে পেরেছেন গ্রাম বাংলার হৃদয়ের ঐশ্বর্যকে। তিনি উপস্থাপন করেছেন প্রকৃতি ও প্রেম, তিনি উপস্থাপন করেছেন দুঃখ ও দারিদ্র্য, তিনি উপস্থাপন করেছেন আনন্দ ও উচ্ছ্বাস, তিনি উপস্থাপন গোপন বেদনা আর প্রত্যক্ষ করেছেন প্রেমের মৃত্যুঞ্জয় রূপ-গাছের পাতারা সেই বেদনায় বুনো পথে যেত ঝরে। ফাল্গুনী হাওয়া কাঁদিয়িা উঠিত শূন্যে মাঠখানি ভরে। প্রসঙ্গত বলা যায় ‘পল্লী জননীর’ দারিদ্র্য আর কবরের মতো মৃত্যুঞ্জয় প্রেমের রূপ জসীম উদ্দীনের মতো এত প্রবলভাবে আর কেউ উপস্থাপন করতে পারেননি বাংলা কবিতায়। জসীম উদ্দীন তার সমস্ত সৃষ্টি দিয়ে নির্মাণ করেছেন তিনি গ্রাম প্রধান বাংলার হৃদয়ের ছবি, যেখানে সমাবেশ ঘটেছে অসংখ্য বিষয়বস্তুর। আতিশয্য কিংবা কৃত্রিমতার আশ্রয় না নিয়ে সাধারণ মানুষের মূল্যবোধকে সাধারণভাবে বিকশিত হতে দিয়েছেন তিনি তার রচনায়। সুতরাং কাব্যস্বভাব ও কাব্যানুভূতিতে তিনি রয়ে গেছেন সৎ ও স্বাভাবিক। প্রকৃতি ও জীবনবোধের আশ্চর্য সুন্দর আলেখ্য নির্মাণে একই সঙ্গে ক্রিয়াশীল থেকেছেন তিনি। গাঁয়ের মানুষের ঐহ্যিক ও আধ্যাত্মিক সকল ভাবনার প্রকাশ ঘটিয়ে গোটা দেশের আত্মাকেই তিনি আবিষ্কার করেছেন মূলত। সম্ভবত এ জন্যই তার ‘নকশী কাঁথার মাঠ’ বিশেষভাবে হয়ে উঠেছে অপরিহার্যতার দাবিদার। জসীম উদ্দীন সম্পর্কে এটা একটা অভিযোগও হতে পারে যে তার কবিতায় শ্রী, ছাদ ও মর্জি একান্তই পল্লীর। কিন্তু তবুও তিনি গ্রাম্য কবি নন। কারণ, উপমা রূপক-প্রয়োগেও পরীক্ষা-নিরীক্ষায় তার আধুনিক কবি মানস যথার্থভাবেই ফুটে উঠে। তাছাড়া একথাও অনস্বীকার্য যে, পল্লী গাঁথা ও গীতিকার পল্লী কবিরা যেভাবে পল্লীকে ফুটিয়ে তুলেছেন, জসীম উদ্দীন ঠিক তাদের সে রীতি অনুসরণ করেননি। অজ্ঞাত, অখ্যাত, নিরক্ষের পল্লী কবিদের রচনায় কখনই সচেতন শিল্প-প্রয়াস দেখা যায় না। তাই তাদের বেশভূষায় দেখা যায় প্রচুর অসঙ্গতি। কিন্তু জসীম উদ্দীন আধুনকিকালের নিষ্ঠাবান শিক্ষিত শিল্পী, তার রচনায় স্বাভাবিকভাবেই সচেতন শিল্পপ্রয়াস লক্ষিত হয়। পল্লীকাব্য তার হাতে অনেক বেশি শ্রী-সৌন্দর্যম-িত হয়ে অশিক্ষিত পল্লী কবির রচনা থেকে প্রায় সম্পূর্ণ আলাদা সৃষ্টি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এভাবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই জসীম উদ্দীন তার স্বাতন্ত্র্য নির্মাণে সক্ষম ও সার্থক।
জসীম উদ্দীনের কাব্যই একদিন হবে ইতিহাস, সমস্ত বাংলা ধ্বংস হয়ে গিয়ে যদি জসীম উদ্দীন ‘নকশী কাঁথার মাঠ’ এবং জীবনানন্দের রূপসী বাংলা অবশিষ্ট থাকে তাহলে হাজার বছর পরও আবিষ্কার করা সম্ভব হবে সতেজ করুন বাংলার বৈচিত্র্য ভরা। এভাবেই জসীম উদ্দীন হয়ে উঠেন অনবদ্য, এভাবেই জসীম উদ্দীন হয়ে উঠেন কীর্তিমান আর এভাবেই তিনি হয়ে উঠেন অনস্বীকার্য। ‘কবরের’ নিস্তব্ধতা করে মৃত্যুঞ্জয় প্রেমের রূপকার জসীম উদ্দীন বিচরণ করেন বাংলা কাব্যের সবুজ ভুবনের অভ্যন্তর, জসীম উদ্দীনের কাব্যের মূল্য অক্ষুণœ হয়ে আছে, হয়ে থাকবে পাঠকের হৃদয়ে। আর এ জন্যই তা অক্ষুণœ থাকবে যে, তিনি আবিষ্কার করেছেন আমাদেরই হৃদয়, তিনি উপস্থাপন করেছেন আমাদেরই ঐশ্চর্য। তার অনেক কবিতাই হয়ত গতানুগতিকতার ঊর্ধ্বে উঠতে পারেনি, কিন্তু ‘কবর’ ও ‘পল্লী’র মতো কবিতা ‘নকশী কাঁথার মাঠ’ ও ‘সোজন বাদিয়ার ঘাট’ এর মতো কাব্যোপন্যাস কবিত্বের সকল মাপকাঠিতেই উত্তীর্ণ হবে। এ কথা অস্বীকার নিশ্চত কেউই করবে না।