জসীম উদ্দীনের প্রতিভা এই বাংলার এই বাঙালির জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। যে আবেগ নিয়ে বাঙালি জন্মায়, যে আবেগ নিয়ে তার জীবনযাপন করে—সেই আবেগকেই জসীম উদ্দীন কবিতায় রূপ দিয়েছেন। তাই তাঁর কবিতার মধ্যে বাঙালির প্রেম, বাঙালির বিরহ, বাঙালির স্বপ্ন, বাঙালির অভিমান, বাঙালির ক্রোধ সবমিলিয়ে বিছানো আছে বাঙালিরই হৃদয় প্রপাত। বাঙালিরই ঘর-সংসার। তবু সমস্ত বাঙালির সুখের আয়োজনেই এক করুণ সুর শুনতে পাই—যা প্রচন্ড মর্ম বিদারক। কখনও আমজনতার ভেতর কারও কারও চোখে জল এনে দেয়। যে বাস্তব বিষয়গুলি আমরা লক্ষ করি না, যে সব দুঃখ প্রাত্যহিকতার ধূলামলিনে চাপা পড়ে যায়, যে তুচ্ছ ঘটনার ভেতর আমরা দীর্ঘশ্বাস শুনেও শুনি না— জসীমউদ্দীন সেসবই আমাদের কাছে তুলে ধরেন। ঘাসের ডগায় শিশির চিরন্তন সৌন্দর্যে ঝলকিত হয় ঠিকই, কিন্তু তা বহু দৃষ্ট, বহু ব্যবহৃত। তেমনি মানব সমাজে নর-নারীর আকর্ষণ, প্রেম-বিরহ বহু লিখিত, বহু পঠিত। রাধাকৃষ্ণের ধারায় আমরা চিরকাল স্নাত। তবু সেইসব বিষয়, স্বপ্ন-মধুর-হাহারোল জসীমউদ্দীনের কাছে এসে ভালো লাগে। আরও সহজ ও সুন্দর মনে হয়। আবেগ যে পুরনো হয় না এবং প্রাণ প্রয়োগে যে সমৃদ্ধ তা তিনি দেখিয়েছেন। এর মূলে আছে মানবজীবন সম্পর্কে এক অতি সূক্ষ্ম অথচ গভীর দৃষ্টি। অতি সাধারণ গ্রাম্য কথার ভেতর দিয়ে কাহিনি বলার ভঙ্গি। তার সঙ্গে প্রকৃতির নিবিড় সংশ্লেষণ। মানব জীবনের কতকগুলি মৌলিক প্রবৃত্তিকে আমরা অস্বীকার করতে পারি না। তা যতই প্রাচীন হোক, তা যতই স্থূল হোক। কিন্তু তা-ই নতুন করে আসে নতুন জীবনে। ‘রাখালী’ কবিতায় গাঁয়ের রাখালেরও তাই হয়েছে। গাঁয়ের মেয়ের প্রেমে পড়ে তার অনুরাগ:

‘রাঙা দুখান পা ফেলে যাও এই যে তুমি কঠিন পথে,
পথের কাঁটা কতকিছু ফুটতে পারে কোনোমতে।’

আবার বিরহও শুনতে পাই:
‘কোথায় জাগো বিরহিনী ত্যাজি বিরল কুটিরখানি,
বাঁশির ভরে এসো এসো ব্যথায় ব্যথায় পরান হানি।’

এই অনুরাগ, এই বিরহের লৌকিক কাহিনি নিয়ে তাঁর ‘নকসী কাঁথার মাঠ’, ‘সোজন বাদিয়ার ঘাট’ বিখ্যাত প্রণয় উপাখ্যান। সমাজ জীবনের নিখুঁত চিত্র তুলে ধরতে, প্রণয়লীলার ক্রমবিকাশকে মননশীলভাবে গতিময় করে তুলতে, সেইসঙ্গে এক বৃহৎ ট্রাজেডির মধ্যে টেনে নিয়ে যেতেও কবি সক্ষম হয়েছেন। চেতন মনের বিবৃতিধর্মী কাহিনির ভেতর দিয়েই তিনি পাঠককে পৌঁছে দিয়েছেন হৃদয়ের রাজ্যে, অশ্রুজলের রাজ্যে। বাংলার করুণ পাড়াগাঁয়ের রূপ-মাধুর্যের এক অকৃত্রিম ছবি, সেই সঙ্গে মানুষও। হয় তারা রাখাল, নয়তো চাষি, নয়তো নিরক্ষর নর-নারী। তারা চাষ করতে জানে, ফসল কাটতে জানে, ফসলের বোঝা বয়ে আনতে জানে। আবার বাঁশিও বাজাতে জানে, কাঁথায় ফুলও তুলতে জানে, গানও গাইতে জানে। কাজকর্মে তাদের দিন যায়। আরাম বিলাস বলে কিছু নেই:
‘খেলা মোদের গান গাওয়া ভাই, খেলা লাঙল-চষা,
সারাটা দিন খেলতে জানি, জানিইনেক’ বসা।’
(রাখাল ছেলে)

গ্রামের মানুষের কাছে যেমন কাজ-কর্ম সত্য, জীবনের রোমান্স মধুর গান গাওয়াও সত্য। ঠিক তেমনিভাবে বুকের গোপন ব্যথা লুকিয়ে ফেলে কান্নাও সত্য। তারা যেমন ঈশ্বর বিশ্বাসী তেমনি ধর্মভীরু। তেমনি স্নেহ-মমতায় অভিষিক্ত। আমাদেরই কেউ তারা। তাদের আমরা ভালো করেই চিনি, ভালো করেই জানি। একদিন স্নেহ-মমতার টানে সংসারে আপনজনদের তারা আঁকড় ধরে রাখতে চায়। ভালোবাসতে চায়। রবীন্দ্রনাথের ‘যেতে নাহি দিব’ কবিতার মতোই তাদেরও ইচ্ছে জাগে:
‘যেতে আমি দিব না তোমায়’
তারপরও পরাজয় মানতে হয়:
‘তবু যেতে দিতে হয়’

‘কবর’ কবিতায় দাদু নাতির কাছে সে কথাই ব্যক্ত করেছে। একে একে স্ত্রী-পুত্র-পুত্রবধূ, নাতনি, কন্যা সবাইকে কবরস্থ করার কারণে:
‘তারপর এই শূন্য জীবনে যত কাটিয়াছি পাড়ি,
যেখানে যাহারে জড়ায়ে ধরেছি সেই চলে গেছে ছাড়ি।’

এই বেদনার রাগিনী জসীমউদ্দীনের অধিকাংশ কবিতারই স্বরলিপি। কিন্তু একটা কথা ভুললে চলবে না—তিনি এইসব লৌকিক জীবনের ব্যথা-বেদনার অন্তরালে মাটি-মা-মানুষের গান গেয়েছেন। কবির কাছে জন্মভূমি বারবার বড় হয়ে উঠেছে। জন্মভূমির মাটি কবির প্রাণ। জন্মভূমি কবির মা। তাই তাঁর কাব্যের সকল চরিত্রই বড় সাধাসিধে। মাটির সঙ্গে সম্পৃক্ত। তাদের রক্তে-ঘামে-মেধায়-মননে মাটির রস প্রবাহিত। তারা দেশকে ভালোবাসতে জানে। দেশের প্রতিটি বস্তুতে নিজেকে খুঁজে পায়। ধানগাছ, লাউ-কুমড়ো, শিম, মটরশুঁটি, নাড়া, মাঠের ফুল, কলমিলতা, পুঁইশাক, বেগুন, কিংশুককলি, কুসুমফুল, মটরশাক, শাপলাফুল, শালুক-পদ্ম, বাঁশঝাড়, ঘাস তাঁর কাব্যের উপাদান হয়। কখনও এগুলি উপমা হিসেবে আসে নায়ক-নায়িকার রূপ বর্ণনায়:
‘বাঁশি বাজে আর নোলক যে দোলে বউ কহে আর বার,
আচ্ছা আমার বাহুটি নাকি গো সোনালী লতার হার?’
অথবা
‘ওই বাহু আর ওই তনু-লতা ভাসিছে সোঁতের ফুল,
সোঁতে সোঁতে ও যে ভাসিয়া যাইবে ভাঙিয়া রূপার কূল।’
(নকসী কাঁথার মাঠ)

পল্লিজীবনের গাথাকাহিনি ‘নকসী কাঁথার মাঠে’ একদিকে আছে প্রেমিক রূপাই এবং অন্যদিকে যোদ্ধা রূপাই। তবু জুজুর ভয়ে সে দেশছাড়া হয়েছে, আত্মগোপন করেছে। তার ফলেই উভয়ের জীবনে নেমে এসেছে বিচ্ছেদ কিন্তু প্রেমের জয়ই সেখানে ঘোষিত হয়েছে। কারণ রূপার হাতের লাঠি মারাত্মকভাবে শক্তিশালী হয়ে উঠেছে শুধু প্রেমের কারণেই। কাব্যের শেষে রূপার মৃত্যুতেও আছে প্রেমের ঘোষণা। সুচারু শিল্পবোধের সঙ্গে যন্ত্রণার রূপকার কবি বেশি মরমী হয়ে উঠেছেন। ‘সোজন বাদিয়ার ঘাটে’ও এ চিত্র দেখতে পাই। দুলি ও সোজনের প্রেম। ভিন্ন জাত, ভিন্ন সম্প্রদায় হয়েও তারা সমাজ-ধর্মের তোয়াক্কা করেনি। এমনকী কঠিন কঠোর শাস্তি মৃত্যুকে উপেক্ষা করেছে। তারা এক বাস্তব জীবন সংগ্রামের ক্ষেত্রে পৌঁছেছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দুলির জীবনেও নেমে এসেছে বিরহ। সে সাজুর মতো নকসী বোনেনি, ছবি এঁকেছে। প্রকৃতির ছবি। সোজন জেল খেটে ফিরে এসে তাকে পায়নি। পরে মৃত্যুর মধ্যে দিয়ে পূর্ণতায় পৌঁছে গেছে। নিতান্ত মানবিকতা বোধেই কবি চালিত হয়েছেন। কোনও তত্ত্ব নেই, তথ্য নেই। জীবনের ক্ষুৎপিপাসা। স্বপ্ন। ভাঙচুর। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। দলাদলি। প্রেম, মন নিয়ে খুব সাধারণ আর বাস্তবমুখী ঘটনার সন্নিবেশে কবি জীবনকেই বড় করে দেখেছেন। যৌনতা নয়, কোনো রাজনৈতিক মতবাদ নয়—আবহমান কালস্রোতের মানবচরিত্রের কথাই তাঁর কাব্যের উৎসভূমি। মস্তিষ্ক নয়, হৃদয়ই সেখানে প্রধান। যুক্তি নয়, আবেগই সেখানে সম্বল। ‘কবিতা’য় কবি বলেছেন:
‘হৃদয়ের ফুল আপনি যে ফোটে কথার কলিকা ভরি,
ইচ্ছা করিলে পারিনে ফোটাতে অনেক চেষ্টা করি।
অনেক ব্যথার অনেক সহার, অতল গভীর হতে,
কবিতার ফুল ভাসিয়া যে ওঠে হৃদয় সাগর স্রোতে।’

অতএব তাঁর কবিতায় মানবিক আবেদনটাই মুখ্য। হৃদয়ের পরিধিতেই তাঁর অনুভূতিকে সীমাবদ্ধ করা যায়। জটিল জীবনদর্শনের কোনও শাশ্বত প্রশ্নের অনুসন্ধান তিনি করেননি। তিনি জীবনের ভাসান দেখেছেন, জীবন-অন্ধকারের ভেতর ডুব মারেননি। সুতরাং লোকসাধারণের কাছ থেকে তিনি অবশ্যই আদরণীয়, কিন্তু গভীর ও গম্ভীর পাঠকের কাছে তিনি ততটা প্রেরণার উৎস নন। পল্লিকবি, পল্লিপ্রেমিক হিসেবে তিনি নিজের আসনটি দখল করেই রয়ে গেছেন। উত্তরণের কোনও পর্যায় সৃষ্টি করে যাবার চেষ্টা করেননি।