বাংলা ভাষার অন্যতম প্রধান ভাষাশিল্পী, বাগ্মী, প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ কবি, প্রাবন্ধিক, শিক্ষা, সাহিত্য-সংস্কৃতি গগণের উজ্জ্বল নক্ষত্র জাতীয় অধ্যাপক সৈয়দ আলী আহসান আর নেই। ২৫ জুলাই আমাদের ছেড়ে তিনি গত হয়েছেন।তিনি দুই পুত্র, দুই কন্যা, বহু ছাত্র-ছাত্রী, আত্মীয়-স্বজন এবং অগণিত গুণগ্রাহী ও শুভাকাঙ্খী রেখে যান। আলী আহসান ছিলেন এক বহুমূখী প্রতিভার অধিকারী। তাঁর এই বর্ণাঢ্য জীবনে তিনি জাতীয় জীবনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গনে যেভাবে নিজ প্রতিভা সমৃদ্ধ অবদান রেখে গেছেন, এমন সৌভাগ্য খুব কম লোকেরই ঘটে থাকে।
১৯২২ সালের ২৬ মার্চ আলী আহসান মাগুরার আলোকদিয়া গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত সৈয়দ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা সৈয়দ আলী হামেদ, মাতা সৈয়দা কামরুন্নেগার খাতুন। দাদা ছিলেন সৈয়দ কাশেম আলী মুন্সী, নানা সৈয়দ মকররম আলী মুন্সী। আলী আহসানের অন্যান্য ভাইগণ হচ্ছেন ড. সৈয়দ আলী আশরাফ, (অধ্যাপক কেমব্রীজ বিশ্ববিদ্যালয়, ইংরেজী বিভাগ ও সাবেক ভি.সি. দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়), ডাঃ সৈয়দ আলী রেজা, (একজন খ্যাতিমান হোমিও চিকিৎসক), ড. সৈয়দ আলী নকী, প্রো-ভি.সি. (দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়) সৈয়দ আলী তকী, (অধ্যাপক বাংলা ভাষা ও সাহিত্য)।
১৯৩৭ সালে ঢাকার আর্মানিটোলা হাইস্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন, একই সালে স্কুল ম্যাগাজিনে The Rose নামক ইংরেজী কবিতা প্রকাশের মধ্য দিয়ে তাঁর লেখালেখি শুরু হয়। ১৯৩৮ সালে আজাদ পত্রিকায় ‘হিন্দু-মুসলিম সমস্যা এবং গণতন্ত্র ও ডিক্টেটরশীফ’ নামক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। ১৯৩৯ সালে ঢাকা কলেজ থেকে আই.এ., ১৯৩৯-৪০ সালে ঢাকা কলেজের ছাত্র ইউনিয়নের জিএস, ১৯৪০-৪৩ মাসিক মোহাম্মদী ও সওগাতে গল্প উপন্যাস লেখা প্রকাশিত ও ১৯৪৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজী বিষয়ে অনার্সসহ এম.এ. ডিগ্রী অর্জন করেন। ১৯৪১-১৯৪৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালীন সময় হিন্দু ও মুসলিম ছাত্রদের মাঝে দাঙ্গা হয়। এ সময় নজির আহমদ নামে একজন মুসলিম ছাত্র শহীদ হন। ‘নজির আহমদ’ নামক পুস্তুকটি তিনি সম্পাদনা করেন। ১৯৪৪ সালে ছাত্রাবস্থায় ঢাকা ইসলামিক ইন্টারমিডিয়েট কলেজে অধ্যাপনার মধ্য দিয়ে তাঁর কর্মজীবনের শুরু হয়। ১৯৪৬ সালে ৭ জুলাই কমর মুশতারীকে বিবাহ করেন। ১৯৪৫-৪৭ সময়কালে হুগলী ইসলামিক ইন্টারমিডিয়েট কলেজে অধ্যাপনা এবং একই সথে অল ইন্ডিয়া রেডিওতে যোগদান করেন। ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতা লাভের পর তিনি ঢাকা চলে আসেন এবং রেডিও পাকিস্তান ঢাকা কেন্দ্রে যোগদান করেন। একই বছর ১৫ মার্চে প্রথম সন্তান সৈয়দা নাজ কমরের জন্ম হয়। তার ২ মেয়ে, ২ ছেলে রয়েছেন।
১৯৪৮ সালে Our Heritage নামক গ্রন্থ প্রকাশ করেন। আব্দুল গণি হাজারীর সঙ্গে ঢাকার ‘আর্ট ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার আন্দোলন করেন। ১৯৪৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক, ১৯৫০-৫১ সালে Step to English নামে ৫ম থেকে ৮ম শ্রেণী পর্যন্ত পাঠ্যপুস্তক রচনা করেন। ১৯৫২ সালে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে সংগ্রাম করেন। ভাষা আন্দোলনে স্মৃতিময় ঘটনাপ্রবাহ তিনি নিজেই বর্ণনা করেছেন এইভাবে, ‘অনেকগুলো ঘটনা বিক্ষিপ্তভাবে মনে পড়ে। তারিখগুলো মনে নেই, কিন্তু ঘটনাগুলোর তাৎপর্য মনে আছে। উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার প্রতিবাদে বাংলাদেশের মানুষ একত্রিত হয়েছিল। কায়েদে আযম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার কথা বলেছিলেন এবং বাংলাদেশের মানুষের কাছ থেকে তিনি প্রতিবাদ পেয়েছিলেন। এরপর আন্দোলন ক্রমশ স্তিমিত হয়ে পড়েছিল এবং এদেশের মানুষ চিন্তা করেছিল যে, পাকিস্তানের চৈতন্যেদয় হবে, কিন্তু বাস্তবে তা হল না। কায়েদে আযমের মৃত্যুর পর নাজিমুদ্দিন সাহেব প্রথম প্রথম গভর্ণর জেনারেল হলেন এবং লিয়াকত আলী হত্যার পর তিনি প্রধানমন্ত্রী হলেন। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি ঢাকায় এলেন ১৯৫২ সালের জানুয়ারীতে। তখন পুরানা পল্টনে একটি জনসভায় ভাষণ দেন। তিনি যেদিন ভাষণ দেন সেদিনকার কথা আমার সুস্পষ্ট মনে আছে। সকালবেলা তথ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা জয়নুল আবেদীন আমাকে অনুরোধ করেন গবর্ণর হাউজে এসে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণের বাংলা অনুবাদের ভাষাটা পরীক্ষা করে দেখতে। আমি সম্ভবত বেলা দশটা কি এগারটার দিকে গবর্ণর হাউজে যাই। সেখানে তথ্য মন্ত্রণালয়ের কিছু লোককে বসে থাকতে দেখি। চীপ সেক্রেটারী আজিজ আহমদের কাছ থেকে প্রধানমন্ত্রীর বক্তৃতা ইংরেজীতে তৈরী হয়ে আসছিল এবং সেগুলো তথ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বাংলাতে অনুবাদ করছিলেন। এক সঙ্গে পুরো ভাষণটি আসেনি, খন্ড খন্ডভাবে আসছিল। বোধ হয়, দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে একজন অনুবাদক ইংরেজী ভাষণ নিয়ে জয়নুল আবেদীনের কাছে আসেন এবং তাকে বলেন, এটা কায়েদে আযমের পুরনো ভাষণ মনে হচ্ছে। বোধ হয় ভুলক্রমে এসেছে। এখানে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার কথা বলা হয়েছে। আবেদীন স্ক্রীফটা মনোযোগের সঙ্গে দেখলেন এবং অত্যন্ত ব্যস্তসমস্ত হয়ে পাশের ঘরে গিয়ে কাকে যেন টেলিফোন করলেন। কিছুক্ষণ পর ফিরে এসে বললেন, চীপ সেক্রেটারী বলেছেন-এটাই যাবে। এর মধ্যে কোন ভুল নেই। আমি তখন আবেদীনের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে গেলাম। আবেদীনও আমাকে আর রাখতে চাইলেন না। ভারাক্রান্ত মনে চলে এসেছিলাম মনে হয়। মনে মনে তখন ভাবছিলাম, একটি বিপর্যয়ের মুখে দেশকে ঠেলে দেবার চেষ্টা হচ্ছে। আজিজ আহমদের হটকারিতা এবং নির্বূদ্ধিতায় দেশে আবার আন্দোলন আরম্ভ হবে এবং প্রচন্ড বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবে। আজিজ আহমদ ছিলেন একজন দক্ষ প্রশাসনিক কর্মকর্তা এবং তিনি ভাবতেন যে, শক্তির সাহায্যে সবকিছুই সম্ভব করা যায়। আজিজ আহমদের ছোট ভাই এজাজ আহমদ আমার বন্ধু ছিল। সে রেডিও পাকিস্তানের ইংরেজী ঘোষণ ছিল। তার চরিত্র ছিল তার জেষ্ঠ ভ্রাতার সম্পূর্ণ বিপরীত। সে জীবন উপভোগ করতে চাইত এবং হাসি খুশী ও উচ্ছলতার জীবন কাটাতে চাইতো। যাইহোক সেদিন আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে গিয়ে চুপ করে বসেছিলাম। আমার কাছে এসে বসেছিলেন মোজাফফর আহমদ চৌধুরী। দেশের পরবর্তী যে ঘটনা মনে পড়ে তা হচ্ছে প্রধানমন্ত্রীর বক্তৃতার প্রতিবাদে দেশব্যাপী একটি সফলকাম হরতাল। দোকানপাট, যানবাহন সবই বন্ধ ছিল এবং কোথাও কোন বিশৃঙ্খলা ঘটেনি। এদেশের মানুষ নীরবে কিন্তু বলিষ্ঠভাবে তাদের প্রতিবাদ জানিয়েছিল। এর পরের ঘটনা যে আমার মনে আছে তা হচ্ছে একুশে ফেব্র“য়ারীর ঘটনা। ঢাকায় আর্ট গ্র“প নামে একটি শিল্পী সংস্থা গড়ে উঠেছিল। এ সংস্থার প্রধান ছিলেন শিল্পী জয়নুল আবেদীন। তিনি তখন লন্ডনে ছিলেন। তার জায়গায় সভাপতির দায়িত্ব পালনকরেছিলাম আমি। কামরুল হাসান, আনোয়ারুল হক, সফি উদ্দিন এবং অজিত গুহ ছিলেন সহ-সভাপতি। চিত্র প্রদর্শনী উপলক্ষে বেগম ফিরোজ খান নুনের সঙ্গে আমি এবং জয়নুল আবেদীন সাক্ষাৎ করেছিলাম। তিনি সরকারীভাবে সর্বপ্রকার সাহায্য প্রদানের আশ্বাস দিয়েছিলেন। বেগম নূন নিজে একজন শিল্পী ছিলেন। লন্ডনের স্লেড স্কুলে তিনি পড়াশুনা করেছিলেন। তখন শিল্পী আমিনুল ইসলাম আর্ট স্কুলের ছাত্র। সে কর্মী হিসেবে আমাদের সঙ্গে সব সময় যোগাযোগ রক্ষা করছিল এবং প্রদর্শনীর সর্বপ্রকার ব্যবস্থা সুচারুভাবে সম্পন্ন করবার দায়িত্ব নিয়েছিল। সিদ্ধান্ত হয়েছিল যে, গভর্ণর ফিরোজ খান নুন ২৬ ফেব্র“য়ারী প্রদর্শনী উদ্বোধন করবেন। নিমতলী পুরনো যাদুঘর ভবনে প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছিল। আমরা প্রায় প্রতিদিন বিকাল বেলা জাদুঘর ভবনে এসে বসতাম এবং প্রদর্শনীর ব্যাপারে আলাপ-আলোচনা করতাম। ২১ শে ফেব্র“য়ারী সকাল বেলা ৯টা/ ১০ টার দিকে আমরা সবাই পুরনো জাদুঘরের সামনের চত্বরে এসে বসেছিলাম। আমরা যারা সেদিন ওখানে বসেছিলাম তারা হচ্ছেন ঃ কামরুল হাসান, সফি উদ্দিন আহমদ, আনোয়ারুল হক, খাজা শফিক আহমদ, অজিত গুহ, আমিনুল ইসলাম এবং আমি। আমি সকালবেলা বিশ্ববিদ্যালয় লাইব্রেরী থেকে একটি বই নিয়ে যখন বেরুই তখন বটতলায় ছাত্ররা আসতে শুরু করেছে। সেখানে একটা প্রতিবাদ সভা হবে জানতাম। বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে বন্দুকধারী সারিবন্দী পুলিশ ছিল। তখন বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা ছিল বর্তমান ম্যাডিকেল কলেজের পূর্বভাগ, ইউনিভার্সিটি জিমনেসিয়ামের কাছে। বর্তমান জিমনেসিয়ামটি স্টেডিয়াম হয়েছে এবং বিশ্ববিদ্যালয় এলাকাটি ম্যাডিকেল কলেজের পুরোপুরি অন্তর্ভূক্ত হয়েছে। জাদুঘরের সামনে বসে আমরা দেশের বিক্ষুব্ধ অবস্থা নিয়ে আলোচনা করছিলাম-মনে আছে। আমাদের চিন্তা ছিল প্রদর্শনী নিয়ে। প্রদর্শনী যাতে সুষ্ঠুভাবে হয় সে বিষয়ে আমাদের প্রত্যেকের আগ্রহ ছিল। যতই বেলা বাড়তে লাগলো ততই বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা থেকে কোলাহলের শব্দ শুনতে লাগলাম। বোধ হয় ১২ টার দিকে কোলাহলটা খুব বৃদ্ধি পেয়েছিল মনে পড়ে। সে সময় গুলির শব্দ পেয়েছিলাম। আমরা চিন্তিতভাবে বসে ছিলাম। এমন সময় মুনীর চৌধুরী সাইকেল নিয়ে সেখানে এল। মুনির চৌধুরী জানালো বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় খুব গোলমাল, পুলিশের গুলি চলছে এবং কিছু ছাত্র নিহত হয়েছে। এ খবর শুনে আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম যে, চিত্রপ্রদর্শনী এখন স্থগিত থাকবে। আমি, কামরুল হাসান এবং অজিত গুহকে নিয়ে গভর্ণর হাউজের গেটে পুলিশের যে নির্বাহী ঘাটি ছিল সেখান থেকে গভর্ণরের সামরিক সচিবকে টেলিফোন কররাম। তাকে জানালাম যে, ২৬ তারিখে প্রদর্শনীর উদ্বোধন হতে পারবে না, এ খবর তিনি যেন গভর্ণরকে জানিয়ে দেন। নতুন তারিখ আমরা পড়ে জানাব। সামরিক সচিব ছিলেন একজন ইংরেজ। ভদ্রলোক তারিখ পাল্টানোর কারণ জানতে চাইলেন। আমি গোলযোগের কথা বললাম এবং কিছু ছাত্র নিহত হয়েছে সে কথাও বললাম। সেখান থেকে পায়ে হেঁটে আমি, অজিত বাবু এবং কামরুল হাসান ধীরে ধীরে চিন্তিতভাবে ওয়ারীর দিকে রওয়ানা দিলাম। কামরুল হাসান এবং অজিত গুত উভয়েই ওয়ারীতে থাকতেন।’ (সূত্রঃ একুশে ফেব্র“য়ারীঃ কিছু স্মৃতি, সৈয়দ আলী আহসান, দৈনিক বাংলা ২১ ফেব্র“য়ারী ১৯৮৯)
সৈয়দ আলী আহসান ১৯৫৪ সালে করাচী বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগের প্রধান, ১৯৫৪ সালে আন্তর্জাতিক পি.ই.এন পাকিস্তান শাখার সেক্রেটারী জেনারেল নিযুক্ত হন। ১৯৫৯ সালে আন্তর্জাতিক কংগ্রেস ফর কালচারাল ফ্রীডম এর পাকিস্তান শাখার উদ্যোগে ইসলাম ইন দ্যা মর্ডাণ ওয়ার্ল্ড বিষয়ক সেমিনারের আয়োজন করেন এবং শাখার সেক্রেটারী জেনারেল হন। ১৯৬০ সালে বাংলা একাডেমীর পরিচালক, ১৯৬১ সালে তাঁর প্রচেষ্টায় বাংলা একাডেমী মিলনায়তনে চিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। ডিসেম্বরে তাঁর প্রচেষ্টায় রক্তপদ্ম, নওফেল ও হাতেম, ইডিপাস-রেকস, শকুন্তলা উপাখ্যান, আওয়ার টাউন, রক্তাক্ত প্রান্তর প্রমুখ নাটকগুলো নিয়ে ঢাকায় নাট্যোৎসব উদ্যাপন করেন।
১৯৬১ সালে ‘আমার পূর্ব বাংলা’ শীর্ষক কবিতা লিখে ব্যাপক আলোচিত হন। সৈয়দ আলী আহসানের ‘আমার পূর্ব বাংলা’ শীর্ষক লেখায় ড. সদরুদ্দিন আহমেদ লিখেছেন, ‘আমার পূর্ব বাংলা সৈয়দ আলী আহসানের একটি সাড়া জাগানো সুপরিচিত কবিতা। স্কুল-পাঠ্য বাংলা সংকলনে এর অংশবিশেষ অন্তর্ভূক্ত হয়েছে। সাধারণ পাঠকের জন্য একাধিক সংকলনে কবিতাটির স্থান পেয়েছে। কবির ‘নির্বাচিত কবিতা’র মধ্যে এটি অন্যতম। আমার পূর্ব বাংলা শুধু সাড়া জাগানোই নয় একটি রসোত্তীর্ণ কবিতা হিসেবেও স্বীকৃতি লাভ করেছে। এমন একটি কবিতা নিশ্চয়ই মূল্যায়নের দাবী রাখে। মূল্যায়ন করতে হলে খুঁটিয়ে পড়া দরকার, নইলে যথার্থ মূল্যায়ন করা যায় না। কবিতাটি তিনটি তরঙ্গে বিভক্ত। খুঁটিয়ে পড়তে গেলে আলোচনা দীর্ঘ হতে পারে। সে সুযোগ এখানে নেই। তাই এই প্রবন্ধে শুধু তরঙ্গের বিশ্লেষণ করা হলো। প্রথম তরঙ্গের শুরু এভাবে- ‘আমার পূর্ব-বাংলা কি আশ্চর্য/ শীতল নদী।’ বাক্যটি আক্ষরিক অর্থে সত্য নয়, এখানে গবঃধঢ়যড়ৎ বা রূপক ব্যবহার করা হয়েছে এবং এই রূপকটি সমস্ত তরঙ্গব্যাপী বি¯তৃত। রূপক-এ কোন বস্তুকে অন্য একটি বস্তুর মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। দু’টির মধ্যে কোন একটি ব্যাপার মিল থাকতে হবে। তবে এই মিল সব সময় স্পষ্ট নয়। কবিরা কোন উপমা এবং রূপক ব্যবহার করেন তা নিয়ে মতভেদ আছে। A.E. Housman. The Name and Nature of Poetry বইতে লিখেছেন ঃ উপমা এর রূপক কবিতার জন্য প্রয়োজনীয় নয় (things inessential to poetry) একজন কবি এগুলো ব্যবহার করেন তার বক্তব্য স্পষ্টতার করার জন্য অথবা তাঁর ধারণাকে জীবন্ত করে তোলার জন্য অথবা এগুলো অলংকার হিসেবে ব্যবহৃত হয়, কারণ এগুলোর আনন্দ দানের একটি নিজস্ব ক্ষমতা আছে। (an independent power to please) ভিন্ন মতটি হলো রূপক অপ্রয়োজনীয় নয়, অলংকার ও নয় এটি Functional; যে কথাটি রূপকের মাধ্যমে বলা হয় তা অন্য কোনভাবে যথাযথরূপে প্রকাশ করা যায় না। তাই বক্তব্য ও রূপক অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত। আমরা দেখবো যে শেষোক্ত মতটি অধিকতর যুক্তিযুক্ত। বলা বাহুল্য কবিতায় শুধু উপমা বা রূপক নয়, প্রতিটি শব্দের ব্যবহার গভীর অর্থবহ হতে পারে। আমার পূর্ব বাংলা কি আশ্চর্য/শীতল নদী। অর্থাৎ পূর্ব বাংলাকে একটি নদীর সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। কিন্তু বাক্যটিতে শব্দ প্রয়োগ লক্ষণীয়। কবি আমাদের পূর্ব বাংলা না বলে আমার পূর্ব-বাংলা বলেছেন। আমার শব্দটিতে দেশের প্রতি তাঁর ব্যক্তিগত সম্পর্ক, আবেগ ও মমত্ববোধ প্রকাশ পেয়েছে। আমাদের শব্দের মধ্যে এসব অনুপস্থিত। কি আশ্চর্য এই শব্দ সমষ্টি। একটি অবাক বিস্ময়ের অভিব্যক্তি। এদেশের গরম আবহাওয়ার প্রেক্ষিতে শীতল নদীর ব্যঞ্জনা সংবেদনশীল পাঠকের কাছে আবেদন সৃষ্টি না করে পারে না। কিন্তু কবি তাঁর দেশকে একটি আশ্চর্য শীতল নদী বলে থামেনি। তিনি এই নদীর আরো বর্ণনা দিয়েছেন। এর দু’টি রূপ তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন একটি শান্ত, আর একটি স্ফীত। নদীটি অধিকাংশ সময় (অনেক বার) শান্ত, শিথিল, স্তিমিত, মৃদু কল্লোলময়ী। এই রূপের বর্ণনায় আরো এসেছে কয়েকটি দৃষ্টিগ্রাহ্য চিত্রকল্প (Visualimages) বক, গাংশালিক, মাছরাঙ্গা, কাক, বাতাসে আন্দোলিত, কাশবন, কিছু গাছ আর নারকেল, শন পাতার ছাউনির ঘরে যেন এক টুকরো মাটির দ্বীপ। এসব চিত্রকল্পের মাধ্যমে কবি এদেশের একটি Landscape তৈরী করেছেন এবং এই Landscape একটি প্রতীক হিসেবে কাজ করেছেন। এগুলো শান্ত, নিরুদ্বেগ অথচ প্রাণচঞ্চল জীবনের প্রতীক। নদীর দ্বিতীয় রূপটি হলো-স্ফীত, বিস্ফোরিত অতলান্ত এবং এর পরিধি আদিগন্ত, স্রোতবাহী নৌকার মত গলুয়ের উপরে বসে গলা ছেড়ে দিয়ে গান গাওয়ার মতো এসব চিত্রকল্পগুলোও প্রতীক হিসেবে গ্রহণ করা যায়। এগুলো কিসের প্রতীক সেটা অনেকটা অনুমাননির্ভর। তবে স্ফীত, প্রাচুর্যে আনন্দিত, অপরিমিত হৃদয়ের বৈকুণ্ঠ, স্রোতবাহী নৌকার গলুয়ের ওপরে বসে গলা ছেড়ে দিয়ে গান গাওয়া, কি আশ্চর্য প্রাণের প্রসার-এসব দেশের মানুষের প্রাণের প্রাচুর্য ও হৃদয়ের ঔদার্য ও আনন্দোচ্ছল জীবনের ইঙ্গিত বহন করে। এরপর দৃশ্য পরিবর্তন হয়েছে। কবির মানসপটে ভেসে এসেছে বিভিন্ন সময়ে দেখা বিভিন্ন দেশের চিত্র (কতদিন কত বিদেশে……. দেখেছি) পাথর, বরফ, ধোঁয়া, সমুদ্র, সূর্য ওঠা, সূর্য ডোবা, বরফের ওপর বিচিত্র রঙের খেলা, ব্যাভেরিয়ার অরণ্যের বিস্তারে সবুজের সমারোহ-এসব চিত্রকল্পের মাধ্যমে তিনি আর একটি খধহফংপধঢ়ব তৈরী করেছেন বৈপরীত্য সৃষ্টির লক্ষ্যে। এই দৃশ্যগুলো তাকে মুগ্ধ করেছে, সম্মোহিত করেছে। তারা শিথিল বিশ্রামের মতো আমাকে আচ্চন্ন করেছিলো। কিন্তু কীটস যেমন নাইটিংগেলের সুন্দর আনন্দঘন জগত থেকে হঠাৎ করে ফিরে এলেন এই বাস্তব পৃথিবীতে, আমাদের কবিও তেমনি বিদেশের মোহনীয় রূপের বন্ধন কাটিয়ে হঠাৎ ফিরে এলেন তার পূর্ব বাংলায়। কিন্তু উভয়ের মধ্যে তফাৎ এই যে, কীটস কল্পনার পাখায় ভর করে নাইটিংগেলের জগতে গিয়েছিলেন বাস্তব পৃথিবীর দুঃখ-বেদনা থেকে পরিত্রাণ লাভের জন্য। কিন্তু তিনি উপলব্ধি করলেন যে, কল্পনার জগতে ফিরে আসতে হয়, তাকে মেনে নিতে হয়। আমাদের কবি কোন স্বপ্ন জগতে বিচরণ করতে যাননি। তিনি গেছেন এই বাস্তব জগতের বিভিন্ন দেশে নানা উপলক্ষ্যে। সেসব দেশের দৃশ্যাবলী তাকে মুগ্ধ করেছে, তাকে আচ্ছন্ন করেছে। কিন্তু হঠাৎ নতুন প্রত্যাগত তাঁর কাছে মনে হলো যে, তার পৃথিবী আরো সুন্দর, আরো রূপময়ী, বিচিত্ররূপিনী। উভয় ক্ষেত্রে নতুন উপলব্ধী আছে। কিন্তু এদেশে আমাদের কবির কাছে বিদেশের চেয়ে কোনরূপময়ী বিচিত্ররূপিনী মনো হলো সেটা খুব স্পষ্ট নয়। তিনি বিদেশের Landscape-এর বর্ণনায় যে, সব চিত্রকল্প ব্যবহার করেছেন তার সঙ্গে এদেশের চিত্রকল্পের কিছু মিল আছে। উদাহরণস্বরূপ, তিনি এদেশের বন্য উচ্ছলতার সবুজের ঔদার্যের কথা বলেছেন, কিন্তু ব্যাভেরিয়ার অরণ্যের বিস্তারেও সবুজের সমারোহ দেখেছেন, উত্তরে ব্যাভেরিয়ার অরণ্যের বিস্তার/ বাতাস/ সূয্যের আলো আর প্রতিটি প্রহর যেন সবুজ-এদেশ তাঁর কাছে বিচিত্ররূপিনী মনে হয়েছে, এখানে তিনি অনেক বর্ণের রেখাঙ্কন দেখেছেন, কিন্তু বিদেশেও তিনি গাছ পাথর, সমুদ্রের সমৃদ্ধি বরফের ওপর বিচিত্র রঙের খেলা লক্ষ্য করেছেন। এদেশের খধহফংপধঢ়ব তাঁর কাছে শান্ত, স্নিগ্ধ বলে ইঙ্গিত করেছেন, কিন্তু বিদেশের বিভিন্ন দৃশ্যও তাকে শিথিল বিশ্রামের মতো আচ্ছন্ন করেছিলো। তাই তিনি যখন বলেন যে, আমার পৃথিবী অনেক রূপময়ী তখন এই বক্তব্যের সমর্থনে আমরা কবিতায় খুঁজে পাই না। তাছাড়া, কবিতাটিতে প্রধান রূপক একটি নদী যা কখনো শান্ত, কখনো স্ফীত। নদীর বর্ণনায় বিভিন্ন চিত্রকল্প ব্যবহৃত হয়েছে। কিন্তু তার মধ্যে সবুজের ঔদার্য ও অনেক বর্ণের রেখাঙ্গনের কোন চিত্রকল্প উপস্থাপিত হয়নি। তবু পরিচিত জগৎ দেখার নতুন দৃষ্টিভঙ্গি, একটি সম্প্রসারিত রূপকের সুকৌশল প্রয়োগ, চারপাশের পরিবেশ থেকে গৃহীত দৃষ্টিগ্রাহ্য চিত্রকল্প এবং তাদের প্রতীক ব্যঞ্জনা, শব্দ-বিন্যাস, ধ্বনি-মাধুর্য্য, নাটকীয়তা, আবেগের সংযত প্রকাশ, এসবের সংমিশ্রণে আমার পূর্ব-বাংলা বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবিতা।’ (সূত্রঃ দৈনিক সংগ্রাম ২৬ জুলাই ২০০২)
সৈয়দ আলী আহসান নিজেই লিছেছেন, ‘আমি ১৯৬০ সালের ডিসেম্বরে ঢাকায় বাংলা একাডেমীর দায়িত্বভার গ্রহণ করি। ১৯৫৪ সাল থেকে ১৯৬০ সাল পর্যন্ত আমি করাচীতে ছিলাম। এই সময়কালে নানা উপলক্ষে আমি বহুবার বিদেশ গিয়েছি এবং বিদেশ ভূমির সাংস্কৃতিক ও প্রাকৃতিক বৈচিত্র অনুভব করবার চেষ্টা করেছি। ফ্রান্স, জার্মানী-বিশেষ করে জার্মানীতে প্রকৃতির ও মানুষের সঙ্গে একটি নিবিড় সখ্য আমার গড়ে উঠেছিল। জার্মানীর উত্তর ব্যাভেরিয়ার বনাঞ্চলের মধ্য দিয়ে আমি গিয়েছি এবং সে অঞ্চলের অপরূপ সৌন্দর্য আমাকে মুগ্ধ করেছিল। ঢাকায় ফিরে আসার পর আমার বিদেশ যাত্রা শেষ হয়নি। ১৯৬১ সালে আমি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যাই এবং কিছুটা সময় নিউইয়র্কে কাটাই। সুতরাং ঢাকায় যখন কাজে বসলাম তখন বিদেশের অভিজ্ঞতাটা আমার কাছে খুব প্রবল ছিল। বাংলা একাডেমীতে যোগ দিয়ে আমি সিদ্ধান্ত নিলাম বিদেশে যেমন করে দেখেছি তার চেয়েও অধিক সুন্দর করে আমার নিজের মাতৃভূমিকে দেখব। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক বৈচিত্র জানবার জন্য আমি সিলেট গেলাম, চট্টগ্রাম গেলাম, বগুড়া ও দিনাজপুর গেলাম এবং কুমিল্লায় গেলাম। সদ্য বিদেশ থেকে প্রত্যাগত আমার কাছে আমার মাতৃভূমি বড় অপরূপ হয়ে দেখা দিয়েছিল। এই যে আমার মাতৃভূমি আমার কাছে অপরূপ হয়ে দেখা দিয়েছিল এরই পটভূমিকায় আমার পূর্ব বাংলা শীর্ষক তিনটি কবিতা আমি লিখি। এ নামটি গ্রহণ করার পেছনে সুপ্ত একটি রাজনৈতিক প্রতিবাদ ছিল। তখন বাংলাদেশের সরকারী নাম পূর্ব পাকিস্তান। পূর্ব পাকিস্তান নামটি আমার ভাল লাগেনি। আমার দেশকে তাই আমি চিহ্নিত করলাম পূর্ব বাংলা বলে এবং আমার দেশের মধুরতা ও বিকশিত সত্তাকে তিনটি কবিতার মধ্য দিয়ে প্রকাশ করলাম। আমি যখন দিনাজপুরে গেলাম তখন দিনাজপুরের রাজবাড়ীর সামনে পুঞ্জিভূত পত্রগুচ্ছ নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা একটি অপরূপবৃক্ষ দেখেছিলাম। গাছের পাতাগুলোর পরস্পর এত ঘনিষ্ঠ ছিল যে, সেগুলোকে সবুজ মনে হচ্ছিল না, উজ্জ্বল কালো মনে হচ্ছিল। গাছের নীচের ছায়াটি ছিল হালকা অন্ধকার। আমি ব্যাকুল হয়ে উঠলাম গাছটির নাম জানবার জন্য। একজন বয়স্ক বৃদ্ধ লোক আমাকে জানালেন যে, গাছটির নাম তমাল। বৈষ্ণব পদাবলীর কথা আমার সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়ল। এই তমাল বৃক্ষের তলায় অভিসারিকা শ্রীরাধা কৃষ্ণের জন্য অপেক্ষা করতেন। আমি আমার ব্যাকুল আনন্দকে প্রকাশ করেছিলাম এই ভাবে ঃ
‘‘আমার পূর্ব-বাংলা একগুচ্ছ স্নিগ্ধ
অন্ধকারের তমাল
অনেক পাতার ঘনিষ্ঠতায়
একটি প্রগাঢ় নিকুঞ্জ।
সন্ধ্যার উম্মেষের মতো
সরোবরের অতলের মতো
কালো-কেশ মেঘের সঞ্চয়ের মতো
বিমুগ্ধ বেদনার শান্তি
আমার পূর্ব বাংলা বর্ষার অন্ধকারের
অনুরাগ।
হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়া
সিক্ত নীলাম্বরী।
সে সময় আমি নিজেকে বিদেশ থেকে সদ্য প্রত্যাগত বলে চিহ্নিত করেছিলাম। আমি আমাদের নদীমাতৃক দেশকে একটি শীতল নদীর সঙ্গে তুলনা করেছিলাম। লিখেছিলাম ঃ
‘‘হঠাৎ নতুন প্রত্যাগত আমার কাছে
বন্য উচ্ছলতার সবুজের ঔদার্য
এখানে আমার পৃথিবী অনেক
রূপময়ী
এখানে নদীর মতো এক দেশ
শান্ত, স্ফীত কল্লোলময়ী
বিচিত্রারূপিণী অনেক বর্ণের রেখাঙ্কন
এ আমার পূর্ব বাংলা
যার উপমা একটি শান্ত শীতল নদী।
আমি এই কবিতা তিনটির মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের প্রকৃতির প্রাচুর্যের একটি সম্ভার প্রকাশ করতে চেয়েছিলাম। বৈষ্ণব পদাবলী থেকে রাধিকার অভিসারের পদগুলো আমার বিশেষভাবে মনে পড়েছিল। সে পদগুলো আমাদের প্রকৃতির বিচিত্র স্বাদের পটভূমিতে রচিত হয়েছিল এবং সে কথা একটি বিমূর্ততায় আমি প্রকাশ করেছিলাম এ কবিতায় ঃ
‘‘কাকের চোখের মতো কালো চুল
এলিয়ে
পানিতে পা ডুবিয়ে-রাঙা-উৎপল
যার উপমা
হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়া সিক্ত নীলাম্বরীতে
দেহ ঘিরে
যে দেহের উপমা স্নিগ্ধ তমাল-
তুমি আমার পুর্ব বাংলা
পুলকিত স্বচ্ছলতায় প্রগাঢ় নিকুঞ্জ।
আমার পূর্ব বাংলা শীর্ষক তিনটি কবিতাই আমার অত্যন্ত প্রিয়। এই কবিতা তিনটি রচনার সময় আমার মধ্যে একটি তন্ময় ছিল। আমি আমার দেশের মধ্যে আমার নিজস্বতাকে আবিষ্কার করতে চেয়েছিলাম। আমি মনে করি আমি সক্ষম হয়েছি। আমার দেশের প্রতি আমার আনুগত্য এবং বিশ্বস্ততা অত্যন্ত অন্তরঙ্গভাবে এই তিনটি কবিতার ভেতর দিয়ে প্রকাশিত হয়েছে। দেশের প্রতি অনুপম নির্ভরতা এই কবিতা তিনটির বিশিষ্টতা।’ (সূত্রঃ আমার পূর্ব বাংলা, সৈয়দ আলী আহসান, দৈনিক ইনকিলাব ৩ ডিসেম্বর ১৯৯৯ )
সৈয়দ আলী আহসান ১৯৬৩ সালে ঢাকায় কংগ্রেস ফর কালচারাল ফ্রীডমের সহযোগিতায় আধুনিক কাব্য সাহিত্য সম্পর্কে এক সেমিনারের আয়োজন করেন। বাংলা একাডেমীতে থাকাকালীন তিনি বাংলার সঠিক মান নির্ধারণে একটি উপসংঘ গঠন করেন। তিনি ছিলেন সভাপতি। অন্যান্য সদস্যগণ হলে জনাব ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ, ড. কাজী মোতাহার হোসেন, আবুল হাসনাত, মুহাম্মদ আব্দুল হাই, মুহাম্মদ ওসমান গনি, মুহাম্মদ ফিরদৌস খান, মুনির চৌধুরী ও মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী। ১৯৬৫ সালে বাংলা একাডেমীর পক্ষ থেকে জুলাই মাসে ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর অশীতিবর্ষ পূর্তি উপলক্ষে সংবর্ধনা জ্ঞাপনের আয়োজন করেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকাকালীন সময় ‘সাহিত্য কমিটি’ প্রতিষ্ঠা করেন। এর মুখপাত্র হিসেবে ‘পান্ডুলিপি’ নামক সাহিত্য সংকলন প্রকাশ করেন। ১৯৬৭ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রধান, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গন থেকে ১১০ জন বাংলাদেশী লেখক, বুদ্ধিজীবীর সহায়ক তহবিল সংগ্রহসহ ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক প্রতিনিধিত্ব ও জনমত গঠনে ভূমিকা পালন করেন। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে তিনি কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে ইসলামী আদর্শের উপর বক্তব্য দিতেন। ১৯৭২ সালে জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি, বাংলাদেশ সংবিধান প্রণয়ণ কমিটির সদস্য, ১৯৭৫ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি, প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ১৯৭৭ সালে তাকে শিক্ষা ও সংস্কৃতি বিষয় উপদেষ্টা নিয়োগ করেছিলেন। ১৯৮৯ সালে সৈয়দ আলী আহসানকে জাতীয় অধ্যাপক হিসেবে সম্মান প্রদান করা হয়। একই বছর বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের চেয়ারম্যান ও ১৯৯৯-২০০০ সালে দারুল ইইসান বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
দেশী-বিদেশী ভাষা সাহিত্য ও কাব্যের উপর তাঁর অনেক মূল্যবানগ্রন্থ রয়েছে। দেশের শিক্ষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিকাশে সৈয়দ আলী আহসান ব্যাপক মৌলিক অবদান রেখে গেছেন। বহুমূখী প্রতিভার এই মহিরূহ আমৃত্যু প্রায় সকল সংবাদপত্র ও সাময়িকীতে লেখালেখি, আলোচনা সভায় বক্তব্য, রেডিও-টিভিতে মূল্যবান বক্তব্য পেশ ইত্যাদির মাধ্যমে জাতির চিন্তা-মননের সমৃদ্ধি ও মানবীয় গুণাবলী বিকাশে বুদ্ধিভিত্তিক বিরাট অবদান রেখে যান। ১৯৫২ সালে দুইখন্ডে প্রকাশিত হয় ‘গল্প সংগ্রহ’ নামের সংকলন গ্রন্থ। ইকবালের কবিতা (অনুবাদ ১৯৫২), ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর সাথে যৌথ সম্পাদনায় গল্প সঞ্চয়ন (১৯৫৩), নজরুল ইসলাম (১৯৫৪), একক সন্ধ্যায় বসন্ত (কাব্যগ্রন্থ ঃ ১৯৫৪), সহসা সচকিত (কাব্যগ্রন্থ ঃ ১৯৫৫), বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত (মুহাম্মদ আব্দুল হাই সহযোগে-১৯৫৬), কবিতার কথা (১৯৫৭), কবি মধুসুদন (১৯৫৭), ইভান পল ও ক্লেয়ার গলের কবিতার অনুবাদ (ড. সৈয়দ আলী আশরাফ সহযোগে-১৯৫৮), অনেক আকাশ (কাব্য-১৯৫৯), ইডিপাস (১৯৬২), যন্ত্রস্থ উচ্চারণ (কাব্য ঃ ১৯৬৮), পদ্মাবতী (কাব্য সম্পাদনা ঃ ১৯৬৮), কবি মাইকেল মুধুসূদনের ‘একই বলে সভ্যতা’ ও বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ) দু’টি গ্রন্থ সম্পাদনা (১৯৬৮), গল্প সংকলন (১৯৬৯), সাম্প্রতিক জার্মান গল্প (যুগ্ম অনুবাদ -১৯৭০), আধুনিক বাংলা কবিতা ঃ শব্দের অনুষঙ্গে। (১৯৭০), পান্ডুলিপি (১৯৭১), বাংলাদেশ (১৯৭২), মধুমালতি (১৯৭৩), আমার প্রতিদিনের শব্দ (১৯৭৪), রবীন্দ্রনাথ ঃ কাব্য বিচারের ভূমিকা (১৯৭৪), মধুসূদন কবিকৃতি ও কাব্যদর্শ (১৯৭৫), আধুনিক জার্মান সাহিত্য (১৯৭৬), উইলিয়াম মেরিডিথের নির্বাচিত কবিতা (অনুবাদঃ ১৯৮২), শিল্পবোধ ও শিল্পচৈতন্য (১৯৮৩), সততা স্বাগত (১৯৮৩), শিশুতোষঃ কখনো আকাশ (১৯৮৪), চাহার দরবেশ ও অন্যান্য কবিতা (১৯৮৫), সহরপার দোহাকোষ গীতি (১৯৯৩), জিন্দাবাহারের গলি (উপন্যাস ঃ ১৯৮৪), চট্টাগীতি (১৯৮৪), কখনও আকাশ (কাব্যগ্রন্থঃ ১৯৮৪), ভ্রমণ কাহিনী ঃ প্রেম যেখানে সর্বস্ব (১৯৮৭), হে প্রভু আমি উপস্থিত (আবেগপ্রবণ ভ্রমণ গ্রন্থ) সন্দেশ রাসক (১৯৮৭), নাহাজুল বালাগা (১৯৮৮), বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস প্রাচীন যুগ (১৯৯৪), মহানবী (১৯৯৫), শাহ আলী বোগদাদী (১৯৯৫), আল্লাহর অস্তিত্ব (১৯৯৫), আমাদের আত্ম পরিচয় এবং বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ (১৯৯৬), নির্বাচিত কবিতা (১৯৯৬), মৃগাবতী (১৯৯৮), শিল্পের স্বভাবন ও আনন্দ (২০০১), আধুনিক বাংলা কবিতা (জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রদত্ত বক্তৃতামালা ২০০১) কথাবিচিত্র ঃ বিশ্ব সাহিত্য (২০০১), বাংলা একাডেমীর কথা ১৯৬০-৬৭, মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস (২০০১), আধুনিক জার্মান সাহিত্য, প্রাচীন জার্মান সাহিত্য (সম্পাদনা) অ ষরঃবৎধৎু ঊহপড়ঁহঃবৎ : টহফবৎ ্ ইবহমধষর (ইধহমষশধ অপধফবসু), ওংষধস রহ ঃযব গড়ফবৎহ ডড়ৎষফ (১৯৬২) ইত্যাদিসহ মোট ১১০টি বই প্রকাশিত হয়।
সৈয়দ আলী আহসান লন্ডন, টোকিও, ম্যানিলা, হংকং, ইরান, বৈরুত, বাগদাদ, ইস্তাম্বুল, কায়রো, ফ্রাংফুর্ট, বার্লিন, ডুমেল, ডর্ফলিসবন, দক্ষিণ আমেরিকা, হাঙ্গেরী, ব্রাজিল, আমেরিকার বিভিন্ন শহর, প্যারিস এডিনবরা, পশ্চিম জামান, ভারত, পাকিস্তান, সৌদি আরব, মস্কো, জেনেভা, কুয়েত, সিঙ্গাপুর, ইত্যাদি দেশ ও শহরে বিভিন্ন্ আন্তর্জাতিক সাহিত্য সংস্কৃতি লেখক সম্মেলনে যোগ দেন। লাইব্রেরী অব কংগ্রেস, নিউইয়র্ক পাবলিক লাইব্রোরী, তাসখন্দ পাবলিক লাইব্রেরী, শিকাগো ইউনিভার্সিটি, পাবলিক লাইব্রেরী, সানফ্রান্সিসকো ইউনিভার্সিটি, লাইব্রেরী, করাচী বিশ্ববিদ্যালয় লাইব্রেরীসহ বিশ্বের নামী-দামী লাইব্রেরীগুলোতে তাঁর বই সংরক্ষিত আছে। বাংলাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর বই পাঠ্যসূচীভূক্ত। পৃথিবীর বিভিন্ন বিখ্যাত ব্যক্তির মধ্যে সেনেগালের প্রেসিডেন্ট লিুপোন্ড সেদর, সেংঘার ঘানার প্রধানমন্ত্রী কুকি বোসিয়া, বিখ্যাত ইংরেজ কবি স্টিফেন স্পেন্ডার, আঁদ্রে সাঁচো (একাডেমী অব ফ্রান্সের মেম্বার), কবি টিএস ইলিয়ট, ইটালিয়ান লেখক আলবার্টো, মোরাভিয়া, জাপানের নোবেল বিজয়ী ইউসিনারী কাওয়াবাতা প্রমুখের সঙ্গে ছিল তাঁর ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতা।
নোবেল প্রাইজ কমিটি সাহিত্য শাখার সদস্য সৈয়দ আলী আহসান সাউথ ইষ্ট এশিয়ার গ্রন্থ সম্পর্কিত একটি জুরি বোর্ডের ও সদস্য ছিলেন। ১৯৬৭ সালে তিনি বাংলা একাডেমী পুরস্কার, ১৯৬৭ সালে সূফী মোতাহার হোসেন স্বর্ণপদক, ১৯৬৮ সালে দাউদ সাহিত্য পুরস্কার, ১৯৮৩ সালে একুশে পদক, ১৯৮৫ সালে নাসির উদ্দিন স্বর্ণপদক, ১৯৮৫ সালে মধুসূদন পুরস্কার, ১৯৮৮ সালে স্বাধীনতা স্বর্ণপদক ও ১৯৯৭ সালে স্বদেশ সংস্কৃতি সংসদ স্বর্ণপদক ও ১৯৯৭ সালে মুক্তিযুদ্ধ পদক লাভ করেন। নোবেল পুরস্কারের প্রি-কোয়ালিফাইং মানের ফ্রান্সের যে পদকটি প্রায় সব নোবেল বিজয়ীই পেয়ে থাকেন সেই বিরল পদক OFFICER DEL OFDERDES ARTS ET DE LETRES তিনি লাভ করেন ১৯৯২ সালে।
আমাদের জাতীয় জীবনের অনৈক্যজনিত বহুমূখী সর্বনাশ ও সমস্যার মূল কার্যকারণ হচ্ছে আমাদের জাতীয় শিক্ষাদর্শ ও শিক্ষানীতি। সৈয়দ আলী আহসানও তা অন্তর দিয়ে মনে করতেন। তাই তিনি তাঁর মরহুম ভ্রাতা ড. সৈয়দ আলী আশরাফের শিক্ষার ইসলামীকরণ নীতিকে জীবনের শেষ পর্যায়ে মনে প্রাণে মেনে নিয়েছিলেন, যা ইতিমধ্যেই মুসলিম দুনিয়ায় প্রজ্ঞাশীল মহলে প্রায় স্বীকৃতি পেয়েছে। বাংলাদেশে দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয় তাঁর বাস্তব পরিচর্যা কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। মরহুম এ কারণেই এই মহান প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব পালনকে জাতির প্রতি জীবনের শ্রেষ্ঠতম দায়িত্ব মনে করতেন। অধ্যাপক আহসান দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি হিসেবে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যথেষ্ট সুনাম অর্জন করেছেন। রাজনীতিতে বহু দলীয় গণতন্ত্র পুণঃ প্রতিষ্ঠায় ও জাতীয় বিনির্মাণের প্রয়াসেও সৈয়দ আলী আহসানের ছিল বিরাট ভূমিকা। দেশ-জাতি-ধর্মের প্রতি উপমহাদেশের এই অঞ্চলের কোটি কোটি মানুষের কাছে বহুমূখী প্রতিভার মহামনীষী সৈয়দ আলী আহসানের যেসন মহান অবদানের কথা উল্লেখিত হয়েছে, তম্মধ্যে আমাদের দৃষ্টিতে আরেকটি বড় অবদান হলো অনেকের বস্তুবাদী জীবনবোধের নানামূখী-বিভ্রান্তির বেড়াজাল থেকে বর্তমান প্রজন্মকে তিনি রক্ষাকল্পে তাঁর জীবনবোধ ও জীবন দর্শনের অতীব সুন্দর ও যুক্তিগ্রাহ্য ব্যাখ্যা দিয়ে গেছেন। বিশেষ করে নাস্তিকতা ও ধর্ম নিরপেক্ষতার অন্তসার শূণ্যতা তুলে ধরে তিনি বলেছেন, ‘একজন মুসলমানের সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে কৃতজ্ঞতার উৎসব সাধন করা।’ তিনি বলেন, ‘আমি যেই পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করেছি এবং পৃথিবীকে গ্রহণ করেছি, সে জন্য সর্বমুহুর্তে স্রষ্টার নিকট কৃতজ্ঞ থাকা একজন মুসলমানের কর্তব্য। এ কৃতজ্ঞ থাকার পথটি হচ্ছে পরিচ্ছন্নতার পথ। নিজের শরীর এবং মনকে পরিচ্চন্ন এবং পরিশুদ্ধ রাখতেহবে, যেমন করে একটি প্রস্ফুটিত পুষ্প নিজেকে পরিচ্ছন্ন রাখে। প্রস্ফুটিত হবার পর থেকে ঝরে পড়ার মুহুর্ত পর্যন্ত পুষ্টটি উদ্ভাসিত থাকে। আমাদেরকেও তেমনি উদ্ভাসিত থাকতে হবে বিশ্বাসের বলয়ে একটি আচরণীয় শুভ সম্পাদনার জন্য। আমি তাই নাস্তিকতাকে কখনও গ্রহণ করিনি এবং একজন নাস্তিককে কখনই প্রজ্ঞাজান বলে মনেকরি না।’ ধর্ম নিরপেক্ষতা বাদ সম্পর্কে তিনি বলেছেন, ‘ইসলামের অভ্যন্তর থেকে ইসলামী অনুশাসন মানার অর্থ হচ্ছে সৎবিবেচক এবং কল্যাণকামী মানুষ হওয়া। একজন মুসলমানের নিকট ধর্ম নিরপেক্ষ শব্দটি কোনো অর্থই বহন করেন না। ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন-বিধান। এই অর্থে ধর্মীয় কর্মকান্ডের সঙ্গে যুক্ত করে একজন মুসলমানের ধর্মীয় জীবন যাত্রাকে ব্যাখ্যা করা যাবে না। ইসলামে মানুষের জীবনব্যবস্থা হচ্ছে জীবন সাপেক্ষ একটি পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থা। আমাদের দেশে যারা ধর্ম নিরপেক্ষতার কথা বলেন, তারা মুলতঃ ধর্মবিরোধী অনুশাসন মানার কথাই বলেন। আমি নিজেকে কখনও ধর্ম নিরপেক্ষ মনে করি না, আমি জীবন সাপেক্ষে যে ইসলাম ধর্ম, তাকেই অনুসরণকরি। আমাদের রাজনিিততে ধর্ম নিরপেক্ষ শব্দটি কোনরূপ বিচার-বিবেচনা ছাড়াই উপস্থিত হয়েছে এবং দুর্ভাগ্যক্রমে এর ফলশ্র“তিতে আমাদের অনেকেই বিভ্রান্তিতে পতিত হয়েছেন। আমাদের দেশকে ও মানুষকে ধর্ম সাপেক্ষে রাখা প্রয়োজন।’