খালাম্মার চোখের আরও একটা অপারেশন বাঁকি। সেই ২৪ শে মার্চ থেকে বেকারত্বের ঘানি টেনে আসছি। তাই আর দেরি না করে পরবর্তি এ্যপয়েন্টমেন্ট এর উদ্দেশ্যে রওনা হলাম মহানগরীর দিকে। রাস্তার ইট পাথরের উঁচুনিচু অবস্থান পর্যবেক্ষণ করে এই উজ্জল পৃথিবীর ঝাপসা আলোয় তাকে নিয়ে হাঁটছি। বড্ড ভয় পায় খালাম্মা যেন হোঁচট খেয়ে পড়ে না যায়। এমনিতেই চোখে ছানি তার উপরে সিঁড়িতে একবার পড়েও গিয়েছিল। চক্ষু বিভাগের বড় সার্জন বলেছেন রেটিনা ছিঁড়ে গিয়েছে। এক আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় সেই মার্চ মাস থেকেই। এবারও তার বিপরীত হলো না। নিপুণ যত্নে খালাম্মাকে তারা দেখে রাখেন। অবশেষে ২১ শে নভেম্বর ভোরে রওনা হলাম চিকিৎসার উদ্দেশ্যে ইসলামীয়া চক্ষু হাসপাতালে। এ্যপয়েন্টমেন্ট ফাইল জমা দিলাম, কিছুক্ষণ লাইনে দাঁড়ানোর পর মাইকে ডাক পড়ল পেসেন্টের। স্বচ্ছ গ্লাস ভেদ করে নিয়ে গেলাম খালাম্মাকে। ডাক্তার চোখে আগের মতই লাইট দিয়ে দেখে কয়েক ফোঁটা ড্রপ দিয়ে দিলো।

১২ বছরের বেশি সময় ডায়াবেটিস রোগে আক্রান্ত খালাম্মা। তবুও শরীরের নানা রকমের টেস্টের জন্য না খাইয়ে আনতে হয় প্রতি বারই। তিন দিন পর ২৪ তারিখে আরও একটা এ্যপয়েন্টমেন্ট ছিল। রিকুয়েস্ট করে ২১ তারিখেই ডাক্তারদের পরামর্শ নিয়ে সেরে ফেললাম কাজ। তারপর আবারো সেই আত্মীয়ের বাড়ি গিয়ে উঠলাম। এত ধকল সহ্য করার মত মানসিকতা এই কংক্রিটের শহরে খুব কম মানুষে রই হয়ত আছে। অবশেষে খালাম্মা আমার সাথে বাড়ি ফিরতে নারাজ। একে তো বাসে উঠলেই বমি, তার উপরে কার না কার গায়ে ময়লা ফেলে! এই ঘটনাও অপরিচিত নয়। আর মূল বিষয় হচ্ছে চোখে কোন রকমের চাপ লাগানো যাবেনা।ডাক্তারের পুরোদমে নিষেধ। কি আর করার! অবশেষে খালাম্মাকে মামাদের জিম্নায় রেখে বেরিয়ে পড়লাম জন্মভূমির উদ্দেশ্যে। মাথায় দেড় মাস পর আবারো এ্যপয়েন্টমেন্ট এর চাপ নিয়ে। গাবতলি গিয়ে উঠে পড়লাম বাসে। তারপর ভাবছি সুস্থতা আল্লাহ্‌ তায়ালার কত বড় নেয়ামত। যে অসুস্থ হয় সেই উপলব্ধি করতে পারে। গাড়ি চলছে আর মাঝে মাঝে অভ্যন্তরীণ কাউন্টার গুলোতে থামছে। যাত্রীরা উঠছে কোলাহল সমাগম সবই চলছে। কিছুটা বিরক্ত নিয়ে এয়ারফোনটা জায়গা মত গুঁজিয়ে দিলাম। তারপর তারপর অনেকটা ক্ষন কেটে গেল ভার্চুয়াল জগতের সাথে। এভাবে আর কতক্ষণ থাকা যায়! গাড়ি দেখি বঙ্গবন্ধু সেতুতে উঠে গেছে। বাস বলে কথা খুব দ্রুতই চলছে। মনে হলো দিপ্রহরের অথৈ জলের বুকে ঝিকিমিকি আলোক রশ্মিগুলো একটু ক্যামেরা বন্দি করি।

কিন্তু এ যেন জানালার বাহিরে দেখা কম্পিউটার স্ক্রিনে খালাম্মার চোখগুলো। কি বিচিত্র এ পৃথিবী রুপ। প্রকৃতির সাথে মানুষের কত মিল। তারপর দেখি আমার ফোনে বালুচর থেকে হটাৎ সবুজের সমারোহ, বুঝতে পারলাম সেতু পেরিয়ে গেছি। তারপর গাড়ি উত্তরবঙ্গে ঢুকে গেছে, যেটা মহানগরীর বুকে আমাদের পরিচয় বহন করে আসছে বহুকাল ধরে। গাড়ি ২৫ মিনিটের বিরতিতে একটা রেস্টুরেন্ট এ দাঁড় করিয়েছে।আমি শুধু ওয়াশরুম থেকে বের হলাম। মার্ক করে রেখেছিলাম সবার সাইটের গাড়িটিতে লিখা আছে ঢাকা টু জয়পুরহাট। তাই যথারীতি উঠে পড়লাম গাড়ীতে। কিন্তু ফেলে আসা সেই জানালার বাহিরের দৃশ্য যেন মনটা কেড়ে নিয়েছিল! আমার আসনে গিয়ে মাথার ঠিক উপড়ে ব্যাগ রাখার জায়গাতে হাত দেই। হায়! আমার ব্যাগ কই? বাসের পেছন থেকে সামনে কয়েকবার ঘোরাঘুরি করলাম। সবায় আমার দিকে অবাক দৃষ্টিতে চেয়ে আছে। নিজেকে খুব অসহায় মনে হতে লাগল। তারপর নিজেকে সামলিয়ে নিয়ে বসে পড়লাম আমার সিটে। ভাবলাম চাকুরীর নামেও প্রতারিত হয়েছি। আবার যে কোন পরীক্ষায় পড়লাম আল্লাহ্‌ ভাল জানেন। যাই হোক আল্লাহ্‌ যাহা করেন তাহাতে মঙ্গল রয়েছে। কিন্তু পাশের সিটের লোকটি বারবার আমার দিকে তাকিয়ে আছে। লজ্জা ত্যাগ করে লোকটিকে বললাম, ভাই এখানে আমার ব্যাগটা ছিল দেখেছেন কি? লোকটি না সূচক সম্মতি জানিয়ে বলল আমিও মাত্র এলাম বলেই চানাচুর চিবুতে লাগল। কি আর করার পেছনের ভদ্রলোককে জিজ্ঞেস করলাম আমার ব্যাগের মত দেখতে এই ব্যাগটি কার? উনি বললেন আমার। তারপর খুব স্বাভাবিক ভাবে বললেন আমার ব্যাগের নিচে দেখুন তো! যেন তার মাঝে সততা প্রস্ফুটিত হচ্ছিল। আমি হাতিয়ে দেখলাম আমার ব্যাগ নেই।

ভদ্রলোক বলল আপনার সিট কোনটা? আমি আমার সিট দেখিয়ে দিলে উনি আমাকে আশ্বস্ত করলেন যে এটা আপনার সিট নয়। আমার মেজাজ খারাপ হয়ে গেল, আমি বললাম এটা আমারই সিট। তখন উনি জানতে চাইলেন আমার গন্তব্যের স্থান। আমি বললাম। তখন উনি বললেন জয়পুরহাটের একই নামের আরও দুটি গাড়ি মাঝখানে অবস্থান করছে। আপনি দ্রুত দিয়ে দেখুন। আমার মনে খটকা লাগল। জয়পুরহাট কে এত বেশি ভালবাসি যে গাড়ির নাম্বারটিও খেয়াল করিনাই। যেই কথা সেই কাজ। মাঝের গাড়িতে উঠে দেখি আমার পাশে বসা ধামুইরহাটের চাচামিয়া। মনটা যেন শীতল হয়ে গেল। আবারও গাড়ি থেকে নেমে দৌড় দিয়ে ভদ্রলোককে ধন্যবাদ জানিয়ে নিজের ভুলের জন্য দু:খ প্রকাশ করলাম। তারপর দ্রুত গাড়িতে উঠে চাচামিয়ার পাশে প্রশান্তির ভঙিতে বসে পড়লাম। গাড়ি ছেড়ে দিল। আবারও ভাবলাম আল্লাহ্‌ যা করেন বান্দার মঙ্গলের জন্যই করেন। এতক্ষনে গাড়ি বগুড়া শেরপুর পেরিয়ে গেছে।

এ যেন বিকেলের শেষ অংশ। আবারো জানালার ওপাশটায় তাকালাম, রক্তিম গোলাকার সূর্য। সারিসারি গাছের কিছুটা উপরে। লোভ সামলাতে না পেরে আবারও মোবাইল বের করে কিছু স্থিরচিত্র ধারণ করলাম। জানালার গ্লাসটা একটু খুলে দিলাম প্রচন্ড বাতাস বইছে, এদিকে আমার কোন খেয়াল নেই। আমি দেখছি পৃথিবী থেকে ১৩ লক্ষ গুন বড় সূর্যটি কিভাবে দৃষ্টির অগোচরে চলে যাচ্ছে। হটাৎ সুপারভাইজার আমার কাঁধে হাত দিল আমি চোখের পানি মুছে তার দিকে তাকাতেই সে বলল জানালাটা বন্ধ করেন ভাই। মানুষটি সম্ভবত শীতে কাঁপছিল। আমি গ্লাসটি টেনে দিলাম।তারপর আবারো সেই সূর্যের মিলিয়ে যাওয়া দেখতে থাকলাম। কিছুক্ষণ বাদে সুপারভাইজার আবার ঘাড়ে হাত দিল! বলল এটা কোন জায়গা সামনে থেকে ড্রাইভার পাঁচশিরা বাজারে কেউ নামার আছে কিনা বলতে লাগল। আমিও বলে দিলাম পাঁচশিরা বাজার। সুপারভাইজার একটু হাঁসি দিয়ে মাথাটা চেয়ারে হেলিয়ে দেওয়ার ভান করল। আমার সন্দেহ হলো তাই তাকে জিজ্ঞাস করলাম এটা কোন জায়গা তা আমার থেকে আপনি ভাল জানেন তো আনায় জিজ্ঞেস করলেন কেন? লোকটা আলতো করে উত্তর দিল ঘুমের ভাব আইছিলো তাই।আমিও একটা হাঁসি দিয়ে আবারও জানালার বাইরে চোখ রাখলাম।