আমাদের পরিবারে বহুদিন হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা চলছে। কখনো ডাক্তার নিজামউদ্দীন। কখনো ডাক্তার মনিরুজ্জমান। কখনো ডাক্তার নূরুল ইসলাম। কখনো ডাক্তার গরীবুল্লাহ আরীফ। ডাক্তার আনিসুর রহমান কিংবা বাশারাত হোসেন। ডাক্তার শাহজাহান কিংবা গোলাম ফারুক। বাসা বদলের সাথে কখনো ডাক্তার বদল হয়। কিন্তু প্যাথি বদলায় না। এভাবেই আমাদের ভাগ্যে আসলেন ডাক্তার জামেদ আলী।

ডাক্তার জামেদ আলী আবার নতুন করে আমাদের পরিবারের ইতিহাস লেখেন। রোগ-বালাইয়ের ইতিহাস। সেই সাথে আরো কিছু। হোমিওপ্যাথির কাজ নাকি শুধু বিজ্ঞানের সাথে নয়। শারীর বিদ্যা ছাড়িয়ে এ বিদ্যা আরো বহুদূর যায়। ইতিহাস ভূগোল প্রকৃতি পরিবেশ মনোবিজ্ঞান। আরো কত কি। ডাক্তার জামেদ আলী রোগের চিকিৎসা করতে এসে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে রোগীর সব তথ্য বের করেন। এভাবেই তিনি আমাদের অস্তিত্বের ভিতর তাঁর সম্পর্কের ডালপালা ছড়িয়ে দেন। আমার স্ত্রী আর দুটি মেয়ে আর কাউকে ডাক্তার হিসেবে পাত্তা দিতে রাযী না। গোটা পরিবার বহু দিন একান্ত নির্ভরশীল ছিল এই চিকিৎসকের ওপর।

আরো একটি কারণে আমার মেয়েরা তাঁর ভক্ত ছিল। তিনি বাসায় এলে সাথে আনতেন সাদা সাদা দানাদানা শুগার অব মিলক। অষুধের চেয়ে এই জিনিসটার প্রতিই তাদের লোভ বেশী ছিল। আর আমার স্ত্রী জামেদ আলীর গল্প-উপন্যাসের ভক্ত। বন্ধু মহলে এ নিয়ে জামেদ আলীর বদনাম ছিল। তাঁর লেখার অধিকাংশ ভক্ত নাকি অন্দর মহলে।

ডাক্তার জামেদ আলী এক সময় আমার খদ্দের হলেন। আমি তাঁর ব্যাংকার। তিনি আমার গ্রাহক। এতদিন ছিল তাঁর পালা। এবার আমার পালা। ডাক্তার জামেদ আলী মাঝে মধ্যে আমার সাথে টাকা পয়সার হিসাব মিলাতেন। ঘর-বাড়ীর ব্যাপারে কথা বলতেন। তবে এসব নিয়ে খুব একটা উচাটন ভাব তাঁর মধ্যে কখনো দেখিনি। আয়ের সাথে সঙ্গতিহীন কোন কিছু করার ব্যাপারে তাঁর কোন আগ্রহ ছিল না। জামেদ আলী আর্থিকভাবে ধনী ছিলেন না। তবে অল্পে তুষ্ট ছিলেন। তাঁর প্রশান্ত চেহারার সব সময় একটা সুখী সুখী ভাব লেপ্টে থাকতো। তিনি থাকতেন বাড্ডা এলাকায়। বসতেন শান্তিনগর গ্রীন হোমিও হলে। আর মগবাজারে ছিল তাঁর কুষ্টিয়া হোমিও হল। চিকিৎসক হিসেবে তাঁর যশ ছিল। তাঁর ছিল মানুষকে আকৃষ্ট করার এক অসাধারণ সম্মোহনী ক্ষমতা। তাঁর রেফারেন্স নিয়ে অনেকে আমার কাছে আসতেন ব্যাংকে হিসাব খোলার জন্য। তাঁরা আসতেন বিভিন্ন এলাকা থেকে। একজন দুজন নয়। বহু লোককে তিনি বুঝিয়ে ছিলেন, ব্যাংকিং লেনদেন যদি করতে হয় তা করতে হবে সুদমুক্ত ব্যাংকের সাথে। সে দিক থেকে তিনি ছিলেন আমার ব্যাংকের অনারারি ডেভেলপমেন্ট অফিসার।

ডাক্তার জামেদ আলী প্রায়ই আমার অফিসে আসতেন জোহরের নামাজের সময়। শান্তি নগর থেকে ফিরার পথে। আমার অফিসের বাইরে নোঙর করা থাকতো তাঁর হালকা সবুজ রঙের ‘ময়ূর পঙ্খী’। এই পঙ্খীরাজ তিনি ‘মেঘলামতী’র রয়েলটি থেকে কিনেছিলেন। তিনি মোটর সাইকেল চালাতেন না। যেন পঙ্খীরাজে চড়ে গল্পের রাজকুমারের মতো হাওয়ায় উড়ে বেড়াতেন। ডাক্তার জামেদ আলী মৃদুভাষী মানুষ ছিলেন। কিন্তু গুরু-গম্ভীর বলতে যা বুঝায় তেমনটি নয়। তিনি ছিলেন সদা হাসি সহজ মানুষ। তাঁর জীবন দৃষ্টিতে একটা সহজতা আর স্বাভাবিকতা ছিল। সম্ভবত এ কারণেই তাঁর সান্নিধ্য সব বয়সের লোকদের আনন্দ দিত।

তিনি আদর্শের কথা বলতেন। মূল্যবোধের নিগঢ় চেতনা তাঁর ছিল। কিন্তু এসব কিছু তাঁর কাছে ভাসা ব্যাপার ছিল না। ছিল একান্ত অন্তর্লীন ব্যাপার। ফলে আদর্শ আর মূল্যবোধের বিষয়টি তাঁর কন্ঠে শ্লোগানের মতো শুনায়নি। তাঁর কথায় আচরণে আর কাজে তাঁর আদর্শ আর মূল্যবোধে স্বাভাবিক সহজাত রূপে অন্যদেরকে আকৃষ্ট করতো।

তিনি হকের পক্ষে কথা বলতেন। অন্যায় আর অসঙ্গতির প্রতিবাদ করতেন। সত্য ও সুন্দরের দিকে মানুষকে আহ্বান জানাতেন। তিনি সংগঠিত জীবন যাপন করতেন। অন্যদেরকে এ লক্ষ্যে সংগঠিত হতে বলতেন। কাউকে ভুল ধরিয়ে দিতে তিনি সংকোচ বোধ করতেন না। তবে সেখানে তিনি অসংযমী ছিলেন না।

কবি সুফিয়া কামাল একবার তাঁর এক বক্তৃতায় কিছু মন্তব্য করেন। ইসলামপন্থী এক কোটি ছাত্রকে তিনি পায়ে পিষে মেরে ফেলার কথা বলেন। এসব উক্তি কবিকণ্ঠে কি মানায়? কবি সুফিয়া কামালের এ সব কথা জামেদ আলীকে খুবই কষ্ট দেয়।

এ সময় দেশের একজন নামকরা আলেম রাজধানীর শাহজাহানপুর মাঠের বিরাট ওয়াজ মাহফিলে সুফিয়া কামালের বক্তব্যের প্রতিবাদ করেন। তিনি বলেনঃ ‘হাতীঘোড়া গেলো তল, বুড়ি বলে কত জল’ উপস্থিত মাঠ ভতির্ লোক এ বক্তব্য উপভোগ করেন। কিন্তু জামেদ আলী পরদিনই ফোন করলেন সেই প্রখ্যাত আলেমকে। বললেনঃ কবি সুফিয়া কামাল বয়সে আপনার মায়ের সমান। তিনি যত খারাপ কথাই বলুন, তাঁকে বুড়ি বলে গাল দিয়ে আপনি অন্যায় করেছেন। আপনার জন্য এটা শোভন নয়। মওলানা সাহেব সাথে সাথে ভুল স্বীকার করতেন। বললেন, ‘ভবিষ্যতে এ ধরনের কারো কোন বক্তব্যের জবাব দিতে আমি আরো সতর্ক থাকবো’।

জামেদ আলী মানুষের সাথে মিশতেন। তাদের ছোট বড় সুখ দুঃখের কাহিনী দরদ দিয়ে শুনতেন। তাদের ব্যথা তিনি অন্তর দিয়ে অনুভব করতেন। মানুষকে তিনি গল্প আর উপন্যাসের মতো পাঠ করতেন। এভাবে মানুষের অন্তলোক পথ চলতে চলতেই জামেদ আলী তখন থেকে তাদের কথা লিখতে শুরু করলেন। সেগুলোই জামেদ আলীর গল্প আর উপন্যাস নামে পরিচিত হলো।

জামেদ আলীর গল্পের ভিতর তাঁর চেনা-জানা মানুষের জীবনের নানা যন্ত্রণা ও আনন্দ বাঙময় হয়ে উঠেছে। উপন্যাস লেখা তো প্রকৃত জীবন-শিল্পীর কাজ। মানব জীবন সম্পর্কে বিস্তর অভিজ্ঞতা আর গভীর উপলব্ধি ছাড়া সার্থক উপন্যাস লেখা সম্ভব নয়। মানুষ সম্পর্কে জামেদ আলীর অভিজ্ঞতা আর উপলব্ধি ছিল। সে অভিজ্ঞতা তাঁর গল্প ও উপন্যাসে স্বভাব কথাশিল্পীর মুন্সীয়ানায় মূর্ত হয়েছে।

জামেদ আলীর প্রথম উপন্যাস ‘অরণ্যে অরুণোদয়’ প্রকাশিত হয় ১৯৮৪ সালের অক্টোবরে। বাংলা সাহিত্য পরিষদ তাঁর এই বই প্রকাশ করে। জামেদ আলী এই বইটি উৎসর্গ করেন ‘আব্দূল মান্নান তালিব ভাইকে।’ বাংলা সাহিত্য পরিষদ এরপর ১৯৮৫ সালে তাঁর উপন্যাস ‘লালশাড়ী’ প্রকাশ করে। ‘লাল শাড়ী’ উৎসর্গিত হয়েছে ‘সাজ্জাদ হোসাইন খান বন্ধুবরেষুকে। ১৯৮৬ সালে জানুয়ারী মাসে সুরুচি প্রকাশনী থেকে তাঁর প্রথম ছোট গল্পের বই’ গোধূলিতে’ প্রকাশিত হয়। এই গল্পের বই তিনি উৎসর্গ করেন ‘কবি আল মাহমুদ অভিন্ন হৃদয়েষু’কে। একই বছর বাংলা সাহিত্য পরিষদ প্রকাশ করে তাঁর উপন্যাস ‘মুনিরা’। এরপর ১৯৮৮ সালের এপ্রিলে সৃজন প্রকাশনী থেকে বের হয় তাঁর ‘মেঘলাবতীর দেশ’। উৎসর্গপত্রে লেখা হয়েছে ‘সাহাবুদ্দীন আহমদ শ্রদ্ধাভাজনেষূ’। তাঁর ছোট গল্পের বই ‘মধুচন্দ্রিমা’। বাংলা সাহিত্য পরিষদ থেকে রেব হয় ১৯৯১ সালের অক্টোবর মাসে। বইটি মাহবুবুল হক অভিন্ন হৃদয়েষুকে নিবেদিত।

১৯৮৪ থেকে ১৯৯১ সালের মধ্যে জামেদ আলীর চার-চারটি উপন্যাস আর দুটি গল্পের বই প্রকাশিত হয়। এখানে কোন জামেদ আলী বড়? ডাক্তার না গল্পকার? ডাক্তার জামেদ আলী রোগী দেখতে দেখতে লিখতেন। কিংবা লিখতে লিখতে রোগী দেখতেন। কিছু কিছু রোগী ছিল তাঁর গল্পের প্রথম পাঠক বা শ্রোতা। এ ছাড়া সারা দেশে ছিল তাঁর লেখার ভক্ত।

ষাটের দশকে ভেড়ামারা পাইলট স্কুলের শিক্ষক ছিলেন। একাত্তরের ঘূর্ণাবর্ত বহু মানুষকে তাদের গৃহকোণ থেকে শিকড়শুদ্ধ উপড়ে ফেলেছিল। জামেদ আলী সেই ঘূর্ণীতে পাঁক খেয়ে ঢাকায় ছিটকে পড়েন। তাঁর আর ফিরা হয়নি। কিন্তু কুষ্টিয়া-মেহেরপুর-চুয়াডাঙ্গার সাথে তাঁর নাড়ির বন্ধন আমৃত্যু অটুট ছিল। তাঁর সকল গল্প-উপন্যাসে ঘুরে ফিরে এসেছে তাঁর শিকড়। তাঁর ফেলে আসা অধিবাস। কুষ্টিয়ার মানুষ নদী প্রকৃতি।

শিক্ষক থেকে হলেন ডাক্তার। ডাক্তারী পরিচয় ছাপিয়ে জামেদ আলী গল্পকার, ঔপন্যাসিক, কথাশিল্পী। বাংলা সাহিত্যের এক দিকপাল ডা: লুৎফর রহমানও হোমিওপ্যাথ ছিলেন। উন্নত জীবন, মহৎ জীবন সৃষ্টি করে তিনি হলেন জাতীয় শিক্ষক। শিক্ষক আর চিকিৎসক জামেদ আলীও তার সাহিত্যের মাধ্যমে পরিশীলিত মহৎ মানুষ গড়ার স্বপ্ন দেখেছেন। সে জন্যই তিনি শিল্পের জমিতে বিশ্বাসের চারাগাছ রোপন করে গেছেন।

বাড্ডার বাসার বাইরে জামেদ আলীর একটি বেশ বড় সংসার ছিল। সে পরিবারের সদস্য আব্দুল মান্নান তালিব, কবি আল মাহমুদ, শাহাবুদ্দীন আহমদ, আবুল আসাদ, মাহবুবুল হক, সাজ্জাদ হোসাইন খান, হাসান আব্দুল কাইউম, মোহাম্মদ আব্দুল মান্নান, খন্দকার আব্দুল মোমেন, মতিউর রহমান মল্লিক, বুলবুল সরওয়ার, আসাদ বিন হাফিজ, মোশাররফ হোসেন খান, হাসান আলিম, নাসির হেলাল, গোলাম মোহাম্মদ।

এই সংসারে জামেদ আলীর সাথে নানা প্রকার রান্না বান্নায় ব্যস্ত থাকতাম আমরা। ঢাকা সাহিত্য সংস্কৃতি কেন্দ্রের সাংস্কৃতিক পাকশালায় জামেদ আলী পাকা পাচক ছিলেন। লালন ফকীরের দেশ থেকে, মীর মশাররফ হোসেনের গাঁও থেকে, মীয়াজান কাজীর বাজার থেকে তিনি নানা শাক-সব্জী তরি-তরকারি, ফল-পাকুড় যোগাড় করে আনতেন। তারপর কি চমৎকার অষ্ট-ব্যঞ্জন আমাদের পাতে তুলে দিতেন। এই পরিবারে আব্দুল মান্নান তালিবের আদরে শাসনে আমরা আমাদের সুখ-দুঃখ, স্বপ্ন প্রেরণা একত্রে আস্বাদন করতাম।

১৯৮১ সালে বাংলা সাহিত্য পরিষদের প্রতিষ্ঠার সময় সেই যে তিনি এর সাথে যুক্ত হলেন, ১৯৯৫ সালে মৃত্যুকাল অবধি তিনি তাঁর সকল অস্তিত্ব নিয়ে আঠার মতো লেগেই থাকলেন। ১৯৮৮ সালে আমি যশোর গেলাম। আমার অস্তিত্ব জুড়ে থাকলো বাংলা সাহিত্য পরিষদ। ঢাকা সাহিত্য সংস্কৃতি কেন্দ্র। আব্দুল মান্নান তালিবের ঘর-সংসার। জামেদ আলীর রান্নাঘর। মাহবুবুল হকের ডাইনিং টেবিল। আত্মার ছটফটানী নিয়ে ক’দিন পরই ফিরে এলাম।

বড় মগবাজার। ডাক্তার গলি। এককালের সংগ্রামী জাতীয় নেত্রী আমেনা বেগমের বাড়ী। সে বাড়ীতে বাংলা সাহিত্য পরিষদের অফিস। সে অফিসের সাথে আমার বাসা। বিচ্ছেদ প্রেমকে উস্কে দেয়। আমার ক্ষেত্রে তাই হলো। জামেদ ভাইয়ের সাথে আরো দ্রুত কদম মিলাই। তারপর একদিন হঠাৎ ১৯৯৫ সালে ২১ অক্টোবর আমাদের সকলকে চমকে দিয়ে তিনি থমকে দাঁড়ালেন। নাকি দৌঁড়ে পালালেন।

জামেদ আলীর ফেলে যাওয়া ঘর-সংসার এখন অনেক বড় হয়েছে। তাঁর হেঁসেলে নতুন নতুন পাচকরা এখনো হৈ হৈ রান্নায় ব্যস্ত। সেখান থেকে বিবিধ ব্যঞ্জনের সুঘ্রাণ চারদিক আমোদিত করছে। আর তাঁর সাথিরা দস্তরখানে গোল হয়ে বসে বরতনে আঙুল ঘষতে ঘষতে জামেদ আলীর কথা ভাবছে। লোকটা গেলো কই? এমন তো কখনো হয়নি।