২২শে অক্টোবর টেলিফোনে জামেদ আলীর আকষ্মিক মৃত্যু সংবাদ পেয়ে মনটা খারাপ হয়ে গেল। আগেরদিন তিনি ইন্তেকাল করেছেন। অথচ এই তো মাত্র সপ্তাখানেক আগে সাজজাদ হোসাইন খানের টেবিলে তার সঙ্গে দেখা। স্মিতহাস্যময় রসিক প্রাণবন্ত মানুষ। মৃত্যুর আসন্নতার চুলমাত্র লক্ষণ ছিলনা। তাঁর স্বভাব সুলভ মৃদুহাস্য আমার লেখায় কোন-কোন শব্দে ‘শ’ ব্যবহার সম্পর্কে তার আপত্তি শোনালেন। আমি তাকে বলেছিলাম সাদ—?—পরিবর্তমান। ‘সাল’ শব্দে এখন আর শ ব্যবহার করছিনা, কিন্তু ‘শাহেব’ শব্দে করছি। বললেন, এ শব্দ তো ফার্সি থেকে আগত, কাজেই ‘স’ লিখতে হবে। আমার যুক্তি ছিলঃ তাহলে তো বাঙ্গালী মাত্রকেই বহুভাষাবিদ হতে হবে। কেননা বাংলা বহু শব্দ গৃহীত হয়েছে বহু ভাষা থেকে। আর এই সব বিদেশী-বিভাষী শব্দ বাঙ্গালি তার নিজের মতো করে বদলে নিয়েছে। তার শব্দের স্বাদ ও উচ্চারণ হয়েছে আলাদা। যাই হোক, এ নিয়ে তর্ক হয়নি-আলাপের ধরনেই কথা হয়েছিল। তিনি ছিলেন কথা শিল্পী ‘লাল শাড়ী’ নামে তার একটি উপন্যাসের প্রকাশন-উৎসবে আমাকেও আহবান করা হয়েছিল কিছু লিখবার জন্য। উপন্যাসটি পড়ে একটু অবাকই হয়েছিলান। তখন পর্যন্ত আমার কাছে অজ্ঞাতনামা জামেদ আলীর রচনা কুশলতায় অবাক হয়েছিলাম। স্টাইল আধুনিক কিছু নয়, বরং একটু পুরানো ধাচেরই। তাঁরই মধ্যে তার বিশেষ বক্তব্যটুকু যে ভাবে তিনি উপস্থাপিত করেছিলেন, তার মধ্যে স্বভাব-কথা শিল্পীর একটি মুনশিয়ানা ছিল। তাঁর অনুরোধে তাঁর লেখা ‘মধুচন্দ্রিমা’ উপন্যাসের ব্লার্ব লিখে দিয়েছিলাম আমি। সেটি উদ্ধৃত করে এই সরল হৃদয় সজ্জন কথা শিল্পীর রুহের মাগফেরাত কামনা করি।
গত কয়েক বছরে ক্রমাগত গল্প উপন্যাস লিখে জামেদ আলী এখন পরিচিত কথাশিল্পী। তাঁর কথা সাহিত্য সাধারণ মানুষকে নিয়ে গড়ে উঠেছে। সাধারণ মানুষের সুখ দুঃখ আনন্দ বেদনার সেখানে অঙ্কিত। তার রচনা নীতিও সরল, সহজ, অকৃত্রিম। কিন্তু কখনও অসচেতন নয়। একটি দৃষ্টি ভঙ্গি কাজ করে সমাজ-সমালোচনা। আবার এই জাগ্রত দৃষ্টি ভঙ্গি তার সাহিত্যকে উদ্দেশ্যমূলক ও যান্ত্রিক করে ফ্যালেনি। একটি অকৃত্রিম অযান্ত্রিক আবহমান সহজতায় তার গল্প উপন্যাস সব সময় সুখপাঠ্য।