লকডাউন এর পঞ্চাশ তম দিন… এতগুলো দিনের মধ্যে বাইরে বের হয়েছি মাত্র দুই দিন। লক ডাউনের শুরুতেই সেফটির জন্য বুয়া কে অনির্দিষ্টকালের জন্য ছুটি দিয়ে দিয়েছিলাম। বর এবং বাচ্চা উভয়ের অফিস ছুটি… বাসায় থাকাকালীন সময়ে তাদের নানা রকমের আবদার,একবেলার খাবার শেষ না হতেই অন্য বেলার খাবারের আয়োজন…পাশাপাশি সংসারের নানারকম কাজে কখন যে সকাল থেকে সন্ধ্যা হয়েছে, একটা একটা করে এতগুলো দিন পেরিয়ে গিয়েছে বুঝতেই পারিনি।

ছোট চাচা এবং তার পরিবার লকডাউন শুরুর আগেই মার্চের ১৭ তারিখ মাইক্রো নিয়ে নারায়ণগঞ্জ থেকে সরাসরি বাড়ি চলে যায়। যাবার আগে চাচা আমাকে ফোন দিয়ে সাথে যাবার জন্য বলে, তখনো মেহেদীর অফিস খোলা ছিল… তাই ইচ্ছা থাকলেও চাচাকে না করে দিয়েছিলাম! ছয় বছর আগে সবাই বাড়িতে এক সঙ্গে থাকত, এই অনির্দিষ্টকালের লকডাউন আরেকবার ফিরিয়ে দেয় সংসারের সেই ছবি।বাড়িতে আমাদের যৌথ পরিবারে রোজ ঈদের আনন্দ হয়…. ভাই, বোনদের দুষ্টুমি, আম্মু, চাচির মজার মজার রান্না… এদিকে আমাকে ফোন করলেই আব্বু-আম্মু, চাচা-চাচি শুনতে পায়, আমার নিজের রান্না খেতে খেতে অভক্তি হয়ে যাওয়া,আকাশ না দেখা… দম বন্ধ হয়ে আসার গল্প! বারবার আফসোস করে বলে, কেন চাচাদের সাথে বাড়ি গেলাম না…

মে মাসের ১৩ তারিখ চাচা ব্যবসায়ীক জরুরী কাজে নারায়ণগঞ্জে আসতে বাধ্য হয়… চাচা গাড়ি নিয়ে বাড়ি থেকে আসে, আবার সেই গাড়িতেই ফিরবে ! চাচা আসার দিন থেকে শুরু হয় আব্বু-আম্মু, চাচা-চাচির ঘন ঘন ফোন কল… বাড়িতে যাবার জন্য ডাকছে! আমার ছোট ভাই বদরুল আমার বাসায় আটকা পড়ে গিয়েছিল, আমি না গেলেও সে চাচার সঙ্গে বাড়ি যাবে…আরিয়ান ও জিদ ধরেছে, সে তার মামার সাথে চলে যাবে। আমারতো মন আগেই ছুটে গিয়েছিল কিন্তু মেহদি যেতে নারাজ, কিছুতেই যাবে না! প্রাইভেট কারে যাব, বাইরের কেউ থাকবে না, আমরা সব রকম প্রটেকশন নিয়ে বের হবো..অনেক কষ্টে, সবাই মিলে অনেক বুঝিয়ে তাকে রাজি করানো হলো! ফোন করে বাড়িতে জানালাম আমি আসছি, কেউ বিশ্বাস করে না… বোনেরা হেসে বলে তোমাকে দরজায় না দেখা অব্দি বিশ্বাস করব না।

১৫ ই মে শুক্রবার বিকাল তিনটায় চাচা নারায়ণগঞ্জ থেকে গাড়ি নিয়ে এসে আরামবাগ থেকে আমাদের তুলে নিলেন। আমরা মাওয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হলাম… চারটার মধ্যে মাওয়া ঘাটে পৌঁছে গেলাম, গিয়ে দেখলাম ফেরিঘাটে গাড়ির লম্বা লাইন ! আমরা গাড়ি থেকে নেমে পদ্মার পাড়ে হাটাহাটি করলাম, ছবি তুললাম… ইফতারের সময় হয়ে এল, আমরা গাড়িতে গিয়ে বসে ইফতার করলাম! ঘাট থেকে ইতিমধ্যে কয়েকটা ফেরি ছেড়ে গিয়েছে, আমাদের সামনে সিরিয়ালে থাকা কিছু গাড়ি ফেরিতে উঠে গিয়েছে।ঠিক যখন সাতটা বাজে, হঠাৎ করে ঘোষণা দেয়া হলো, উপর থেকে অর্ডার এসেছে আর কোন ফেরি ছাড়া হবে না। সমস্ত গাড়িগুলোকে ঘুরিয়ে ঢাকায় ব্যাক করানো হলো… আমার আর আমার ছেলের সমস্ত আনন্দ মুহূর্তেই চুপসে যাওয়া বেলুনের হাওয়া র মত উড়ে গেল, আমার বুঝি আর বাড়ি যাওয়া হলো না। মেহেদী মহাখুশি… “খুব ভালো হয়েছে যাওয়া হবে না, বাসায় চলো”, বলতে লাগল সে !

আমি জানি একবার বাসায় গেলে আর বাড়িতে যাওয়া হবেনা আমার, তবুও আমতা আমতা করে এক সমুদ্র আশঙ্কা নিয়ে বলতে লাগলাম, “আচ্ছা তাহলে সবাই মিলে বাসায় যাই, কাল সেহেরী খেয়ে আবার রওনা হব!”

চাচা বারবার আমার মুখের দিকে তাকাচ্ছেন, আমার শুকনো মুখ দেখে বুঝে গিয়েছিলেন আমি কি ভাবছি… তার সমস্ত লিংক ইউজ করলেন, মানিকগঞ্জের ওসিকে ফোন করে খবর নিলেন, পাটুরিয়া ফেরিঘাটের ফেরি চলাচল স্বাভাবিক আছে কিনা!আমরা গেলে কোন কারনে ফেরিতে উঠতে বাঁধা পেলে সে সাহায্য করতে পারবে কিনা ! সমস্ত কিছু কনফার্ম হলে রাত আটটার দিকে আমরা মাওয়া থেকে গাড়ি ঘুরিয়ে রওনা হলাম পাটুরিয়া ফেরিঘাটের দিকে… মেহদী তখনও বলছে, আমরা যাব না, আরামবাগে নেমে যাব ! চাচার সম্মানে উচ্চ আওয়াজ করতে পারছেনা, কিন্তু বারবার বলে চলছে, “তুমি গেলে যেতে পারো, আমি যাবো না!”

আমি ভয়ে কোন কথা বলছি না, মনে মনে আল্লাহকে ডাকছি, বদরুল তাকে শান্ত রাখার চেষ্টা করছে… ফাঁকা রাস্তা, ঘন্টায় ৮০ কিলোমিটার বেগে গাড়ি ছুটে চলছে পাটুরিয়া ফেরিঘাট এর উদ্দেশ্য। রাত সাড়ে বারোটার দিকে আমরা পাটুরিয়া ঘাটে পৌঁছে গেলাম। সেখানেও সিরিয়াল কিন্তু বেশিক্ষণ দাঁড়াতে হলো না আমাদের, আমাদের গাড়ি ফেরিতে উঠলো।

পুরো রাস্তায় থেকে থেকে আম্মু, চাচি, আব্বু এবং আরো অনেকের ফোন আসতে লাগলো। রাত সোয়া একটার দিকে আমরা ফেরি থেকে নামলাম… তারপর আরও আড়াই ঘন্টা টানা জার্নি করে টোটাল ১৩ ঘণ্টা জার্নি শেষে আমরা বাড়িতে পৌঁছালাম। আম্মু, চাচি ,আব্বু সারারাত একফোঁটা ঘুমায়নি… বাড়িতে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে আমরা কারো সাথে দেখা না করে এক একজন, এক এক বাথরুমে ঢুকে গেলাম… আগেই রেডি করে রাখা সাবান পানিতে কাপড় গুলো খুলে ভিজিয়ে দিলাম। ফজরের আজান পড়ল… আমরা খেতে বসলাম… আম্মু চেয়ার নিয়ে বসে আছে, চাচী হেসে হেসে খাবার বেড়ে খাওয়াচ্ছে… খেতে বসে অনুভব করলাম অবশেষে আমি বাড়ি এসেছি,পরিবারের সবার মুখে তখন আনন্দের হাসি !

এমন একটা পরিবারে জন্মেছি, যেখানে মায়ের চেয়ে চাচির আদর বেশি, বাবা বকলেও চাচা কখনো বকে না… ভাই বোনদের একসঙ্গে দেখলে বোঝার উপায় নাই কে-আপন-কে চাচাতো! গর্বে বুক ভরে গেল আমার !