স্বপ্নরা আগুনের ফুলকী হয়ে ওড়ে

দরজায় খিল এঁটে একা বসে আছি ঘরে,
যেন কেউ না এলেই বাঁচি,
মাঝে মধ্যে আবার দরজা খুলে দেখি,
আহা কেউ দরজায় এসেছে নাকি!
এই দুঃসময়ে বলো কে দেখে কর মুখ?
তবু মনে ভাবি আহা,
কতদিন দেখি না তোমার মুখ,
কতদিন বসি না পাশাপাশি,
কতদিন শুনি না শব্দের সুরেলা সঙ্গীত ।
আহা দিন যে কাটে না আর স্বপ্নবিহীন!
স্বপ্নরা পাখা মেলে শূন্যে উড়ে যায়,
দগদগে আগুনের লেলিহান শিখায়
স্বপ্নরা আগুনের ফুলকী হয়ে
আকাশে উড়ে উড়ে প্রশ্ন চিহ্ন এঁকে দেয় ।
অসংখ্য পেঁজা তুলোর মত প্রশ্নচিহ্নের স্রোত
আকাশের বুকে সমুদ্রসৈকতের ফেনায় উপচে পড়ে;
দিনের আলো নিভে গেলে তারা বলে
এই কি আমার প্রিয় বদ্বীপ জননী জন্মভূমি
প্রিয় বাংলাদেশ ?
(নিষ্ঠুরভাবে একজনকে পুড়িয়ে মারার উপরে লেখা, যখন লিখেছিলাম তখন কল্যাণপুর বস্তিতে আগুন জ্বলছে ।
…………………………………………..

দস্যু ফুলন হবো আমি
(নারীত্বের অবমাননা আর নির্যাতনের বিরুদ্ধে আমার দুর্বিনীত প্রতিবাদ)

ইচ্ছে করে সব ছেড়ে ছুড়ে
ফুলন দেবী হয়ে যাই,
চলে যাই দূরে,
অমানুষের সীমান্তরেখা ছেড়ে।
দূর্গম পাহাড়ের চূঁড়োয় থেকে থেকে
নজর রাখি দেশের নারীদের উপর।
সি সি ক্যামেরা লাগিয়ে দিই সংগোপনে
অলিতে গলিতে,
ডাস্টবিন-চাটা কুকুরগুলো যখন লেজ নেড়ে
এগোয় সম্মুখে শিশু অথবা নারীদের দিকে
তখন ই পাঠিয়ে দেব এক এক প্লাটুন ফুলন বাহিনী ।
তাদের পরনে থাকবে সবুজ আর লাল শাড়ি।
হাতে থাকবে সোর্ড অব টিপু সুলতান,
আরো দেবো চক্রধরের চক্র, দেব শূল ত্রিশূল-
যেন নিমেষেই, অতি সহজেই যায় কাটা
পৈশাচিক যন্ত্র যখন তাদের সেটা দুঃসহ জ্বালা।
আরো দেব নানা অস্ত্র শস্ত্র যেখানে যা আছে,
ময়না কাঁটা, মাছের কাঁটা, খেজুর কাঁটা
অজস্র কাঁটা যেখানে যা পাওয়া যায় হাতে।
কী ভেবেছে ওরা?
নারীর গর্ভে জন্মে নাই কি তারা?
এ দেশে কি এসব দেখার কেউ নেই?
কী ভেবেছে লালাঝরা কুকুরগুলা ?
কে তাদের রূপান্তরিত করেছে এমন কুকুরে ?
কী ভেবেছে দেশের নিকৃষ্ট এ কুকুরেরা?
পার পেয়ে যাবে নারীর সম্ভ্রম কেড়ে?
তারা কি জানে না নারী সত্তাটির মানে?
তারা কি জানে না নারী মানেই অজস্র সন্তানের জননী?
তারা কি জানে না নারী মানেই বোনের স্নেহের ফল্গুধারা?
তারা কি জানে না নারী মানেই প্রেম, ভালবাসা?
তারা কি জানে না নারী শব্দটির মানে?
তারা কি জানে না নারী মানেই
একটি নিশ্চিত নিরাপদ আশ্রয়?
নারী মানেই জীবনানন্দের বনলতা সেন, তার চোখে দু’দণ্ড শান্তির আশ্রয়!
তারা কি জানে নারীর সম্ভ্রম কেড়ে সামনে তাদের
অপেক্ষমান অতল অন্ধকার?
তারা‌ কি জানে,
দেশের সম্ভ্রম বিকিয়ে দিচ্ছে কত সস্তা সুখের দামে ?
কুকুরেরা যখন বোঝে না কিছুই,
তখন ইচ্ছে করে ফুলন হয়ে যাই,
ইচ্ছে করে সব ছেড়ে দিয়ে
চলে যাই দূর অন্তরালে, যেখানে কুকুর পুরুষের
মুখ দেখতে হয় না আর ।
…………………………………………..

মায়ের সম্ভ্রম বিপন্ন এখন

এখন কবিতা লেখার নেই সেই আয়েশি সময় ,
পূর্ণিমার চাঁদ দেখলেই তুমি বলে উঠবে আহা !
তোমার থেকে ঐ চাঁদ খুব বেশি কিছু নয়,
আমি তখন ভীষণ জোরে চিৎকার দিয়ে বলে ফেলি,
উহ! অসহ্য এই চাঁদ, তোমাদের ধর্ষণে কলঙ্কে পোড়া!
তুমি বললে জড়িয়ে নিয়ে, এসো এই পূর্ণিমার রাতে
চাঁদ দেখতে নেমে যাই চল ঐ দখিনের ঝিলে,
জোছনার স্রোতে শরীর ভেজাতে,
তীব্র ঘৃণায় তখন বলে উঠতে ইচ্ছে হয় –
তোমরা তো পুরুষের জাতি,
ধর্ষণ ছাড়া বোঝো না কিছুই,
নারীর শরীর ছেনে ছেনে মুঠি মুঠি সুখে
ভরে ওঠে তোমাদের হৃদয়।
এখন কিন্তু নেই আর সেই প্রেমের সময়,
ঘণ্টার পর ঘণ্টা তোমাকে দেবার মত অজস্র সময় ।
তুমি যেমন অন্ধ হয়ে আছো, সব ভুলে,
দেশ, মাটি, মা, মায়ের শরীরী সম্ভ্রম বিপন্ন এখন তবুও;
অথচ আমার দু’চোখ থাকে খোলা।
আমার সামনের বড় জানালাটা এখন খোলা,
আমি দেখতে পাই একটা হরিণ কতগুলি বাঘের কবলে পড়ে
কীভাবে আর্ত চীৎকারে কঁকিয়ে কঁকিয়ে ওঠে সেকেন্ডে সেকেন্ডে
আমি তো শুনতে পাই এক একটি পরিবারের আমৃত্যু লাঞ্ছনায় গুমড়ে ওঠা বেদনার বেহালায় তোলা সুর,
কতটা করুণ-
অথচ তোমরা প্রেমের নামে নারীর কাছে আনন্দ গ্রাস করে নাও আগ্রাসী প্রেমের ছলে,
জানি তোমরা পুরুষ, তোমরা মানুষ নও।
মায়ের পেটে হয়নি জন্ম তোমাদের,
মায়ের বুকের দুধের নহরে হৃষ্টপুষ্ট হয়নি তোমাদের শরীর মন।
জানি বুঝি সব, তবুও বলি না কিছুই তোমাদের,
তোমরা যে ভালবাসার মানুষ আমাদের,
তোমরা যে যত্নে গড়া সন্তান আমাদের,
তোমরা যে পরম পূজনীয় পিতা আমাদের ।
।।।।।।।।।।।।।।।।।।।
মেঘের উপর ভেসে ভেসে
আজ এমন একটি মৃদু বৃষ্টিভেজা মেঘলা দিনে-
হঠাৎ কল্পনায় উড়ে যাচ্ছি মেঘের উপর ভেসে,
তুমি কোথা থেকে যেন উড়ে এলে ময়ূরের পালকে ভর করে হেসে হেসে,
আমি বললাম, তুমি, এতদিন পরে ? এতদিন কোথায় ছিলে?
বহুদিন দেখি না তোমাকে।
কতদিন খুঁজেছি মনে মনে,
ঘন বর্ষায় তোমার এলাকায় যখন তুমি ডুবে থাকতে মেঘজলে, আমি সেখানেও খুঁজেছি তোমাকে প্রতি বর্ষায়।
নীল-ময়ূরের পালক ধরে ধরে খুঁজেছি তোমাকে,
তবুও পাইনি তোমাকে।
কারা যেন বলেছিল তুমি উড়ে গেছো মেঘের দেশে,
তাইতো তোমাকে খুঁজতে উড়ে এলাম মেঘের দেশে ভেসে।
তখন একটানা কথা বলে চলেছি আমি,
অথচ তুমি বললে না কিছুই, দেখলাম বিস্ময়ে!
মৃদু স্পর্শে শীতল অনুভব ছড়িয়ে দিলে প্রাণমনে,
বললে আঙুলে ঠোঁট চেপে, এখনো আসেনি সময়।
তারপর, উড়েছি অনেকক্ষণ তোমার শীতল হাতে হাত রেখে,
আমার সমস্ত উষ্ণতা দিয়ে উষ্ণ সুষমায় উষ্ণ করেছি তোমার দু’হাত।
তোমার সকল অনুভবে মিলিয়ে দিয়েছি আমার অনুভব।
তুমি বললে, ‘অনেকদিন কথা হয় না আমাদের
অনেক কথা জমাট বরফ হয়ে জমে আছে মনে,
যা বলতে পারি না কারো কাছে,
বাতাস ও শত্রুর মত কান পেতে আছে;
আড়ি পেতে আছে সব ইন্দ্রজাল!’
‘কী আশ্চর্য সময় এখন, যত দিন যায়
তত ইন্দ্রজালের সুতোর জালে শিকল বাঁধছে পায়ে,
এর থেকে মুক্তি কোথায়?
বলতে পারো তুমি! সেখানে নিয়ে যাবে আমায়?’
এ কথা বলতেই-তুমি জমে গেলে বরফের টুকরোর মতো,
শিলাবৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়লে মেঘ থেকে,
আবার হাহাকারে হাহাকারে দীর্ণ হল, চূর্ণ হল আমার হৃদয় ।
…………………………………………..

কিছুই করার নেই

কখনো কখনো কিছুই করার থাকে না মানুষের,
নিরুদ্ধ যন্ত্রণায় ক্ষয়ে যাওয়া ছাড়া আর কিছুই করতে পারে না মানুষ।
শুধু ঈশ্বর নামক মহাশক্তির ক্ষমতার কাছে
প্রবোধের প্রার্থনায় রত হওয়া ছাড়া কীই বা করার থাকে?
এভাবে চলবে পৃথিবী-
যুগে যুগে মানুষের ভাগ্যের ইতিহাস এভাবেই লেখা হবে।
…………………………………………..

এসো আবার

এসো নতুন করে বেঁচে উঠি
আবার নতুন করে তোমাকে দেখি ।
ভোরের নতুন শিশিরের মত স্বচ্ছ জলে
ঘাসের বুক থেকে শিশিরের জল চুমে
তোমার শুষ্ক ঠোঁট ভিজিয়ে দিতে ইচ্ছে করে
শীতের নরম উষ্ণ ভোরের আলোয়,
এসো এমন নবীন হেমন্তের ঝরে যাওয়া দিনে
স্বপ্নের ক্ষেতে ফসলের বুননে নতুন স্বপ্ন বুনি –
এসো তোমার হাতে হাত রেখে মিশে যাই
দিগন্তের শেষ সীমানায়
শুধু তুমি আর আমি নির্জনে,
রাত্রিশেষে শুধু তুমি আর আমি।
…………………………………………..

দোহাই তোমার
(করোনা রোগে কবি আলম তালুকদারের প্রয়াণে)

দোহাই তোমার,
আর কারো মৃত্যুর খবর বোলো না আমার কাছে।
বরঞ্চ –
সেইসব যোদ্ধাদের কথা বলো,
কারা কারা যুদ্ধ করে সুস্থ আছেন,
হাসছেন, গান গাইছেন, খেলছেন
কবিতা আবৃত্তি করছেন কবিতা লিখছেন।
এইসব কথা বলো,
আনন্দের কথা বলো,
স্বপ্নের কথা বলো,
কোনো মৃত্যুর খবর আর সহ্য করতে পারি না ।
এসব কথা আর বোলো না আমার কাছে ।
এভাবে মানুষ মরতে পারে!
এভাবে মানুষের মৃত্যু হতে পারে?
অসংখ্য লাশের মিছিলে যে আমার কাছের মানুষ আছে,
আর কারো মৃত্যুর কথা তুমি বোলো না আমার কাছে।
…………………………………………..

আত্মসমর্পণ

আকাশ জুড়ে মেলে দিয়ে পাখা
শিরীষ গাছটি বলছে আমার কানে কানে,
আমি আছি ভয় কি তোমার?
আমার ঝিরিঝিরি পাতার কম্পনে আছে
তোমার জন্য রাখা অজস্র সুধা;
প্রাণ ভরে পান করে নাও তুমি যতটুকু প্রয়োজন।
কাঁঠালি চাপা, মহানিম, কদমফুলের ঘ্রাণ
সম্মোহিত করে রাখছে রাত্রিদিন –
চারিদিকে এত মৃত্যুর শোকে জগদ্দল
পাথরের ভার বয়ে চলা নিতান্তই অসম্ভব ।
তবু এরা মন্ত্রমুগ্ধ জাদুর জালে জড়িয়ে রাখে সারাক্ষণ
কী এক নিবিড় প্রেমে !
করোনা দুঃসময়ে তার প্রেমে ডুবে থাকা ছাড়া
নেই গত্যন্তর।
অক্সিজেনের অভাব নেই এই প্রেমে,
নেই লেনদেনের হিসেব নিকেশ।
আমি শুধু দিয়ে যাই তাকে, আমার যা আছে
সেও দেয় নির্নিমিখে তার যা আছে।
আমাদের লেনদেনে কেটে যায় গ্রীষ্মের
ভয়াবহ সূর্যাক্ত ঘর্মাক্ত দিন!
কেটে যায় বর্ষণমুখর ঝরঝরে রাত,
কেটে যায় সব নিদাঘ দুর্যোগের দিনগুলি।
সে যে আছে পাশে, সে যে আছে কাছে
রাতের অন্ধকারে নেমে এসে অজস্র চুম্বনের
ঝিরিঝিরি পাতায় সিক্ত করে রাখে বিক্ষুব্ধ মন,
ভালোবাসি বলে তার কাছে এই আত্মসমর্পণ।
…………………………………………..

কাছে যাবার ইচ্ছে

তোমার কাছে যাবার ইচ্ছে, অনন্ত বিরহ
পায়ে আমার নূপুর বাঁধা, বাজে অহরহ;
সামনে নদীর প্রবল ঢেউ, সাঁতার নেই জানা
নদীর জলে ডুবে গেলে, গুরুজনের মানা
নদীর ঘাটে বসে আছে মাঝি সে একজন
তার দুটি নিপুণ হাতে বৈঠা ঝলমল
নদীর দিকে তাকিয়ে আছি নদী কলকল,
জলের বুকে ঢেউ লেগেছে বিপুল উচ্ছল।
জানাশোনার ইচ্ছে নিয়ে যেই দেখেছি মুখ
আরে আরে তুমি তুমি কেমনে যে সম্ভব?
বহুদূরের পথ পেরিয়ে কেমন করে এলে
নদীর পারে দাঁড়িয়ে আছো ও মন মাঝি নেয়ে
নিয়ে চল তোমার সাথে সয় না দেরি আর
তোমার সাথে মিলে মিশে নদী পারাপার।
…………………………………………..

অভয়ারণ্য


হরিণের খুড়ের মত
ভালবাসা দ্রুত বেগে হারিয়ে যায় দূরে,
হয়তো বা খুঁজে ফেরে
নিরাপদ আশ্রয়, মনের মত মন
হয়তো অভয়ারণ্য
সবুজ ঘেরা বন।
…………………………………………..

বিস্মৃতির পারে

ভুলে গেছি বহু গান,
কেমন ছুঁয়েছিল প্রাণ-
কিছু মনে আছে তার
হারিয়েছি যা হারাবার,
ভুলে যেতে চাই সব
যত দ্রুত সম্ভব।
মনে পড়লে কষ্ট বাড়ে,
স্মৃতি এসে কড়া নাড়ে।
দূরে দূরে রাখি তারে
বিস্মৃতির পরপারে।
যা কিছু দেখতে পাই
মুহূর্তে মুহূর্তে ভুলে যাই
তোমার শরীরের ঘ্রাণ
ভুলে যেতে মন-প্রাণ
ঢেলে দেখি কী অসম্ভব!
কখন ও কি সেটা সম্ভব?
…………………………………………..

খেলাঘর

সাজানোই ছিল খেলাঘর,
ধোয়ামোছা পরিপাটি,
ঘড়ায় তোলা ছিল একটু জল
যেন কষ্ট লাঘবের চেষ্টা চারিদিকে
অথচ নির্মম নিষ্ঠুরতা,
এক ফোটা জল নেই তাতে।
কী সব এলোমেলো শিশুদের খেলা,
মাঠে খেলে শিশু আর বৃদ্ধেরা
বৃদ্ধেরা ছেড়ে দিয়ে মাঠ,
গুটিয়ে নিয়েছে হাত
বহুকাল আগে-
খেলা চলে চারিদিকে
পৌষের পিঠে ভাগ গোপন ইঙ্গিতে।
সবকিছু আসে যায় এমনি এক সঙ্গীতে
যা হবার তাই হয়,
অনর্থক অর্থের পেছনে পেছনে
আছি বহুদিন ধরে।
ভানুমতি বসে থাকে চোখ মেলে,
চোখের পলকে কখন কী নেবে
কখন কী কাকে দেবে!
লেনদেনে সব বেচা কেনা।
হিসেবের সংসারে শুধু লেনা দেনা,
দিন যায় রাত যায়-
রোদ্দুর ঝলমল,
নানা বর্ণের উৎসব আয়োজনে।