জিগর মুরাদাবাদি (উর্দু: جگر مرادآبادی), আলি সিকান্দার (১৮৯০-১৯৬০), ২০ শতকের সবচেয়ে উর্দু কবি ও উর্দুভাষী গজল লেখক ছিলেন। তিনি তাঁর অত্যন্ত প্রশংসিত কবিতার সংগ্রহ “Atish-i-Gul” জন্য ১৯৫৮ সালে সাহিত্য একাডেমি পুরস্কার পেয়েছেন।
জিগর মুরাদাবাদি ১৮৯০ সালের ৬ এপ্রিল মুরাদাবাদে, উত্তরপ্রদেশে, ভারত জন্মগ্রহন করেছিলেন। এখানে, তিনি আসগর গান্ডভি, বন্ধুত্ব করেন যিনি পরেও উল্লেখযোগ্য উর্দু কবি হিসেবে আবির্ভূত হন। গন্ডভি জিগারের চেয়ে মাত্র ছয় বছর বয়সে বড় ছিলেন, এর পরও বন্ধুত্বে তারা প্রফুল্ল ছিলেন। জিগরের উপর গন্ডভির প্রভাব এবং তার জীবনে যে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রয়েছে। জিগর, গন্ডভীর স্ত্রীর এক বোনকে বিয়ে করেছিলেন।
তিনি গন্ডাকে তার স্থায়ী বাড়িতে পরিণত করেন এবং গন্ডা সেখানে বসবাসরত সবচেয়ে বিখ্যাত সাহিত্যিক পরিসংখ্যানগুলির একটি অর্জন করেন।
জিগর, গন্ডারে ১৯ সেপ্টেম্বর ১৯৬০ এ মারা যান।তার সন্মানে গন্ডা শহরের একটি ছোট আবাসিক কলোনি কে জিগরগঞ্জ নামকরণ করা হয়। এটি তার মূল বাসভবনের কাছাকাছি। শহরের অন্তর্বর্তী স্কুলটির নামকরণ করা হয়- জিগর মেমোরিয়াল ইন্টার কলেজ। মাজার-ই-জিগর মুরাদাবাদি, তোফাখাঁয়া, গন্ডা।
জিগর মুরাদাবাদি গজল লেখালেখির শাস্ত্রীয় বিদ্যালয় ছিলেন এবং তিনি মঞ্জুরহ সুলতানপুরীর একজন পরামর্শদাতা ছিলেন, যিনি ভারতীয় চলচ্চিত্র শিল্পের একজন বিশিষ্ট গীতিকার হয়ে ওঠেন এবং উর্দুতে অনেক জনপ্রিয় গান রচনা করেন।
জিগর জনসাধারণের সাথে অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিলেন, যিনি তাকে গণিতের কবিতা হিসেবে গণ্য করেছিলেন।
জিগর মুরাদাবাদি তার মৃত্যুর পরেও আরও বেশি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে, যেমন তাঁর কবিতা আরো বেশি প্রশংসিত, বিশেষ করে চলচ্চিত্র পরিচালকদের মধ্যে, যারা তাঁর গানের সাথে পরিচিতও লাভ করতে থাকে।
তিনি কোনও আনুষ্ঠানিক উচ্চতর শিক্ষা লাভ করেন নি।তিনি এখন সর্বকালের শ্রেষ্ঠ উর্দু কবিতার একজন বলে বিবেচিত। জিগর আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে কেবলমাত্র দ্বিতীয় কবি ছিলেন যিনি সম্মানিত ডি লিটকে সন্মানে ভূষিত – এই সম্মান অর্জনকারী প্রথম ব্যক্তি ছিলেন মুহাম্মদ ইকবাল।
ফয়েজ আহমদ ফয়েজ(বিশিষ্ট উর্দু কবি এবং একাডেমিক) এর মতে জিগর মুরাদাবাদিকে একজন মাস্টার কারিগর হিসেবে গণ্য করেছিলেন। আলিগড় জিগরের প্রিয় শহরগুলির মধ্যে একটি।আলীগড় মুসলিম ইউনিভার্সিটির প্রাক্তন ছাত্র, যিনি প্রায়ই মুশাইরে অংশগ্রহণ করতেন যার মধ্যে ফয়েজ ও জিগর উভয়ই অংশগ্রহন করতেন, স্মরণ করেন যে, জিগর তাঁর নিজের গজল দিয়ে তাঁর অনুষ্ঠানটি করবেন এবং মুশাইরের তিনি জীবন ও আত্মা ছিলেন।

গালিবের সুপরিচিত উর্দু পন্ডিত মালিক রাম এবং জিলার জগতের একজন নেতৃস্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানতেন যে, জুন১৯৫২ সালের জুনে নূকূশ-এর সম্মানিত লাহোর মাসিক উর্দু লিটারারি জার্নালে প্রকাশিত একটি সমালোচনামূলক নিবন্ধটি তিনি লিখেছেন।১৯৭৪ সালে মালির রাম জিগর, গালিবের সাথেও তাঁর পুরস্কার-বিজয়ী বই “ওহ সুন্টেন ইলাহী” (দ্য ইম্পর্টস) -তে উর্দু সাহিত্যিক জগতের নয়টি দৈত্যদের জীবনের জীবনী রচনায় অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।
জিগর মুরাদাবাদি ও তাঁর কবিতার গবেষণা চলছে এবং উর্দু ভাষার উন্নয়নের জন্য ভারত সরকারের পৃষ্ঠপোষক জাতীয় পরিষদকেও উৎসাহিত করেন। জিগর এর কবিতা এখন অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের উর্দু বিভাগে একটি প্রতিষ্ঠিত একাডেমিক বিষয় হিসেবে পঠিত হচ্ছে।

তাঁর কয়েকটি বিক্ষিপ্ত পংক্তির তরজমার চেষ্টা
১.
ছর তরফ ছা গয়ে পয়গামে- মুহাব্বত বলকর,
মুঝসে আচ্ছি রহি কিসমত মেরে আফসানো কি।
তরজমা:
প্রণয় কাহিনি আমার চারদিকে ছড়িয়ে গেলো,
আমার চেয়ে প্রণয় কাহিনির ভাগ্যই দেখি ভালো।

২.
হুম ইস্ ক মে মারোকাঁ ইৎনা হী ফাসানা হ্যায়,
রোনে কি নেহি কোই, হঁসনে কো জামানা হ্যায়।
তরজমা:
প্রেমের গল্পে এটাই সত্য – কাঁদবার নেই কেউ,
অমর প্রেমের কীর্তি কথার হাসবার আছে কেউ কেউ।

৩.
নজর সে উনকি পহলী হী নজর ইউ মিল গই আপনি,
কি যৈ সে মুদ্দতোঁ সে থি কিসি সে দোস্তি আপনি।
তরজমা:
প্রেয়সির সাথে প্রথম দৃষ্টি, নয় যেনো প্রথম দৃষ্টি বিনিময়,
দীর্ঘ বিচ্ছেদ শেষে বন্ধুর সাথে এ যেনো মোলাকাতের যাপিত সময়।

৪.
ইক জাগা ব্যইঠ কার পিলু মেরা দস্তর নেহি,
ম্যয়কাদা তঙ্গঁ বানা লু মুঝে মনজুর নেহি।
তরজমা:
একাধারে পান করে যাবো এমন তর নই,
গড়ে নেবো নিজস্ব পানশালা তেমন মাতাল নই।

‘উর্দু কবিতাকে অক্ষরে অক্ষরে নেয়ার অবকাশ নেই – যে অক্ষর পাঠক পড়ছে, তাতে যা বলা আছে এ তার চাইতেও বেশি কিছু সেখানে থাকে। এখানে প্যয়মানা কেবল পানপাত্রই নয়, বরং নিয়তি; ম্যয়খানাকে শুঁড়িখানাই নয়, এ বরং গোটা ব্রহ্মাণ্ড, সাকি শুধুই পরিচারক-পরিচারিকা নয় এখানে, সে স্বয়ং স্রষ্টা । আর কবি সেই স্রষ্টার কাছে ছুঁড়ে দিলেন অতিপ্রাচীন এক দ্বন্দ্ব, যে, কেনো আমার ভাগ্যই এত অপ্রসন্ন যা অন্যের সাথে মিলিয়ে দেখতে হবে বা দরাদরিতে নামতে হবে? কবি, এক অর্থে, স্রষ্টাকেই সাবধান করে দিচ্ছেন যেন তাঁর সাথে সদাচরণ করা হয়; অন্যথায় প্রতিহিংসা বশতঃ হয়ে ধরাধামে একটা অনাসৃষ্টি ঘটিয়ে ফেলবেন কবি।’
সাধারন পাঠককুলের ভ্রান্ত ভাবনা এর চেয়ে ভিন্ন কিছু নয়। প্রখর চোখ খুব কম পাঠকেরই থাকে, যা শব্দের গভীরে প্রোথিত মর্মার্থকে অবগুণ্ঠন থেকে আলোয় নিয়ে আসতে পারে। উর্দু কবিতা বিষয়ে বলতে গিয়ে কেবল অপেশাদার পাঠকই নন, বেশ ভাল মানের পাঠকও আতান্তরে পড়ে যান। বস্তুত উর্দু কাব্যে সাকি-ও-ম্যয়খানা বা পরিচারক/পরিচারিকা আর শুঁড়িখানার প্রতীক প্রচণ্ডভাবে ব্যবহৃত হয়েছে, তার মানে এই নয় যে এতে মাদকাসক্তি, মাদকাসক্ত বা মদ্যপদের সমর্থন করা হল। পঙক্তিতে পঙক্তিতে তা উস্কে দেওয়ার মতনও কিছু নয়, এমনকি কবিরা পানশালা প্রতিনিধিও নন।

অন্যান্য সব ভাষার কবিতার মতই, উর্দু কবিতার শব্দও রূপকাশ্রয়ী। প্রসঙ্গের ওপর ভিত্তি করে, শব্দরা আক্ষরিক বর্ণনার চাইতে রূপককেই বেশি আস্থাশীল। অন্যান্য কবিতার মতই, উর্দু কবিতাও সুবিবেচনা আর অহিংস উপলব্ধির পংক্তিমালা। বহুদিন ধরেই সমালোচকরা একটা বিষয়ে তর্কে মেতে আছেন,যে,উর্দু কবিতায় শব্দ-প্রকরণের যে ব্যবহার তা অন্যান্য ভাষার কবিতার মতো নয়,এছাড়া কোনও একটি পঙক্তির একধরনের ব্যাখ্যা সবসময় নিশ্চিত করে বলাও সম্ভব নয়। তুলনা হিসেবে কাবিতা থেকে মোহনীয় শরীর থেকে অসংখ্য বিচ্ছুরণ না নিয়ে কেন কেবল পানপাত্র, শুঁড়িখানা, নারী শব্দগুলো সব সময় ব্যবহার হতে দেখা যায়? আসলে এর কোনও সহজ উত্তর নেই। হয়তো উপনিবেশিক চিন্তা চেতনার ফলশ্রুতি। প্রতীকের এই নির্বাচন কি নিছক সংস্কৃতির আচারের অধীন না কি ব্যক্তিক উদ্বেগাকুল পরিস্থিতির ফসল, তা বলা মুশকিল। একটা শব্দ বা বাক্যের প্রচলিত মানে কি বা কি কি আর কবির কোন এখতিয়ার থেকে নিষ্পন্ন হয়ে তা কি মানে ধারণ করেছে, এই প্রশ্ন করাটাই বরং যথাযথ। সচারচর দেখা যাচ্ছে, প্রায় সব ভাষাই প্রচলিত শব্দ বা শব্দবন্ধকে রূপকের মাধ্যমে অখ্যায়িত করে থাকে। ফলে, রূপক হিসেবে হিন্দিতে যেখানে ধর্মশালা এসেছে, উর্দু সেখানে ব্যবহার করছে ম্যয়খানা। উর্দু রূপক এমন-ই বিলাসী, ইন্দ্রিয়পরায়নও বলা যায়। আর এমন প্রতীক নির্বাচনের কারনে উর্দু রূপককে উপহাস করা অনেকটা ফ্যাশনের মত দাঁড়িয়েছে। পাশাপাশি উর্দু কবিদের এই পক্ষপাতদুষ্ট শব্দের ঘন ঘন ব্যবহার, যেমন সাকি এবং ম্যয়খানা কবিতার মানের ক্রমাবনতিকেই প্রতিনিধিত্ব করে ফলে কাব্যউৎকর্ষতা গ্রাহ্য হচ্ছে না। নিছক প্রতীক নির্বাচনশৈলীতার কারনেই কি উর্দু ভাষা জনগনের কাছে সুবিধাজনক? এটা ভাববার বিষয়।

অন্যান্য ভাষা থেকে সরে এসে, উর্দু কবিতা বিশেষত জড়বাদী এবং কামদ প্রতীকের ব্যবহার বেশী হতে দেখা যায়। কখনও কখনও অধি-প্রাকৃতিক, অধি-মূলদ এমনকি বিতর্কিত, উদ্ধত শব্দবলীও। এখানে, প্রতীক এবং প্রতীকি অবস্থান যেন একেবারেই বিপরীত মেরুর দুটো বিষয়; বস্তুত চিন্তক যেখানে স্বীয় চিন্তাকেই অশুচি হিসেবে তুলে ধরছে। প্রতিনিধিত্বশীল এসব প্রতীকের মধ্যে শরাব, শাদাব এবং সাকি সমধিক ব্যবহৃত। নানা বৈচিত্র্যপূর্ণ শব্দ ব্যবহারের মুন্সিয়ানাকে আমলে নিলে, বেশিরভাগ কবিই এইরূপ শব্দের আশ্রয় নিয়েছেন প্রচুর। বস্তুত, এমন কবি খুঁজে পাওয়া বেশ দুষ্করই হবে যিনি এই শব্দগুলো কবিতায় ব্যবহার করেননি। তাই বলা যায় এই শব্দত্রয় সবসময় অপব্যাখ্যাই হচ্ছে।

এদের মধ্যে শরাব বা মদ শব্দটার ওপর সবচেয়ে বেশি ফাড়া! উর্দু কাব্যে প্রতীকি এই শব্দের আমদানী নিয়ে কিছু বলার আগে এর পরমাত্মীয় কিছু শব্দের সাথে যেমন: প্যয়মানা, ম্যয়খানা, সাকি এবং আবশ্যিকভাবে যাহিদ (যিনি সুরা পান পরিহার করে চলেন) ও বায়িজ (গোঁড়া মৌলভি বা পুরোহিত) এর সম্পর্কটা কিরূপ তা জেনে নেওয়া দরকার, এক অর্থে যাদের সাথে এর একটি নেতিবাচক পরম্পরা চলমান। আর সবগুলো মিলেঝুলে এমন একটা অবয়ব দেয় যে মনে হয় কেবল মদ-ই সত্য কিংবা একমাত্র প্রশংসাযোগ্য। সবসময় এইরকম ভাবনা ভাবাও সমীচীন নয়।
উর্দু সাহিত্যে এমতন শব্দগুলোর আগমন ঠিক কবে থেকে তার দিনক্ষণ বলে দেওয়া কিছুটা মুশকিল, তবে সবচেয়ে কাছাকাছি উদাহরণ পাওয়া যায় মধ্যযুগের কবিতা বিশেষত মুঘল আমলে। মুঘল যুগে উর্দু কবিতা তাঁর রচয়িতাকে রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতা পাওয়ার সুযোগ এনে দেয়। তন্বী পরিচারিকাদের পরিবেশিত অবারিত দ্রাক্ষারস সহযোগে পৃষ্ঠপোষকগণ প্রায়ই বিভিন্ন মুশায়রায় অংশ নিতেন আর কাব্যরসে ডুবে যেতেন। বলাবাহুল্য, তৎকালে মুশায়রা বা আবৃত্তি-সন্ধ্যাগুলো ছিল বিনোদনের অন্যতম মাধ্যম আর নির্ধন কবিদের কাছে ওইসকল পৃষ্ঠপোষকগণ ত্রাতার চাইতে কম কিছু ছিল না, তাই এটা খুব স্বাভাবিক যে কবিরা শুন্য পানপাত্র ভরে দেওয়ার জন্য দ্রাক্ষারসকেই আপন করে নিয়েছিলেন।
শব্দগুলো তাই অবচেতন থেকে সমসাময়িক কবিদের কবিতায় জুড়ে বসেছে, পরে উত্তরাধিকারসূত্রে গজল রচয়িতারাও তা আপন করে নেন। কবিগণ এই শব্দগুলোকে বুনে দিয়েছেন নানা অর্থবাচকতায় আর যা ধীরে ধীরে হয়ে উঠেছে তীব্র প্রতীক। এসবের ব্যবহার দেখা যায় উপহাস অর্থে, কখনও নিষিদ্ধ কিছু বা সমাজের সঙ্কির্ণতা বোঝাতে।

তাই উর্দু কবিতা শব্দার্থের অতিরিক্ত আরো কিছু অর্থ নিয়েই পাঠকের কাছে উপস্থিত হয়, যা সচেতন পাঠককে হৃদয় উপলব্ধি দিয়ে পাঠে মনোনিবেশ করতে হয়।

তথ্যসূত্র: উইকিপিডিয়া ও ইন্টারনেট