ক’দিন থেকে রাইশার মনটা খুব খারাপ।
ফাগুনের পশ্চিমা হাওয়া সামনের মাঠে ধূলো উড়িয়ে যায়। বাড়িতে সে আর মা ছাড়া কেউ নেই। বৃদ্ধ পিতা সারাটা দিন মাঠের কাজে ব্যস্ত থাকে। পিতাকে দুপুরের খাবার দিতে কিছুক্ষণ আগে সে মাঠে গিয়েছিল। খেতের আলে দাঁড়িয়ে সে পিতার কর্মব্যস্ততা দেখেছে। জমির ঘাস পরিষ্কার করতে পিতাকে সাহায্য করেছে রাইশা। মেয়ে না হয়ে সে যদি ছেলে হয়ে জন্ম নিতো তাহলে পিতাকে সব কাজে সাহায্য করতে পারত। মাঠে এ সময় লোকজন নেই বললেই চলে। পিতার আপত্তি সত্ত্বেও অনেকক্ষণ জমির আগাছা পরিষ্কার করেছে সে। মাঠ থেকে ফিরতে পশ্চিমা বাতাস তার সোমত্ত শরিরে বড়ো বাড়াবাড়ি করেছে। অগোছালো বসনের ফাঁক দিয়ে যৌবনমত্ত দেহের লাবণ্য বেলাজ বেহায়া হয়ে প্রকাশ হতে চেয়েছে।

রাইশা সরাসরি বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করে না।
আম গাছের ¯িœগ্ধ ছায়ায় কিছু সময় চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে। এখান থেকে সহজে মাঠের প্রান্তে রাস্তাটা দেখা যায়। ধূলো উড়ছে খুব। আমের মুকুল এখন কুঁড়িতে রূপান্তরিত হয়েছে। ক’দিন আগে মুকুলের সুবাসে বাড়িটা মউ মউ করছিল। রান্নাঘরে, উঠোনে কাজ করতে রাইশা উদাস হয়ে যেত সে মাতাল করা সুবাসে। দুনিয়াটা তখন তার কাছে অন্যরকম লাগত। কখনও তার মনে হত একজন হৃদয়ের মানুষ যদি থাকত যার সাথে কথা বললে লজ্জা এসে মন অবসন্ন করে না। অতি সহজে তার সাথে অনেক কথা বলত রাইশা।

সেদিন হেলাল এসেছিল ওদের বাড়িতে। সুন্দর গঠনের মানুষ। রাইশাকে সে বলেছিল,“তোদের বাড়িতে দারুণ মিষ্টি গন্ধ! এ রকম গন্ধ আমার খুব ভালো লাগে। দূরে দাঁড়িয়ে রাইশা মৃদ্যু হাসছিল সে কথা শুনে। নিকটস্থ শহরে হেলালের বাড়ি। রুগি দেখতে সে মাঝে মাঝে এদিকে আসে। তাদের গ্রামটি নির্জন প্রকৃতির। শহর থেকে কিছুটা দূরে এর অবস্থান। এ গ্রামের লোকেরা কমবেশি হেলালকে চেনে। রোগব্যাধি হলে অনেকেই তার শরণাপন্ন হয়। রাইশাদের বাড়িতে সে প্রথম এসেছে এক শীতের রাতে। ওর মা সেদিন খুবই অসুস্থ হয়েছিল। পেটের প্রচ- ব্যথায় মা খুব কাহিল হয়ে পড়েছিল। মায়ের এমন অবস্থা দেখে রাইশা তার বাঁচার আশা ত্যাগ করেছিল। সেদিন হেলালের চিকিৎসায় মা দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠে। সেইদিনই হেলালের সাথে ওর প্রথম পরিচয়। রাইশার মা পরম শ্রদ্ধায় হেলালকে আব্বাজান বলে ডাকতে শুরু করে। হেলাল কিছুদিন না এলে মা বলে, “আব্বাজান বুঝি আমাদের ভুলেই গেল। এতদিনে একবারও আসলেন না এদিকে।”

রাইশা মায়ের কথার উপর কিছুই বলে না। ওদের বাড়িতে হেলালকে নিয়ে অনেক গল্প হয়। তার চিকিৎসার অভিজ্ঞতা, রুগি দেখার ধরণ, চলফেরা, বেশ ভূষা নিয়ে কথা চলে। রাইশার বড়ো বোন আলেয়া বলে,“হেলাল নানার ঔষধে আমার খুব কাজ হয়। একদাগ খেলেই অসুখ সেরে যায়।” প্রতিবেশি হারুণের মা বলে, “আমার মুখের ঘা উনিই তো সারালো। কতজনের অসুধ খেয়েছি। আল্লায় যেন ভালো রাখে ওনাকে।” রাইশার আব্বা বলে, “হেলাল আমাদের আপন জনের মতো। এদিকে এলে বেচারা আমাদের খোঁজ নিয়ে যায়।”

আমগাছের মদির ছায়ায় দাঁড়িয়ে দূরের রাস্তাটা দৃষ্টির গভীরতা দিয়ে নিরীক্ষণ করে রাইশা। তার শরিরে তখনও শোভা পাচ্ছে মাঠের শুভ্র ধূলো। হুমড়ি খাওয়া বাতাসে তার পিঠে উড়ছে অবিন্যস্ত ঘনকালো চুল। এক পল্লি যুবতি যার বয়স বিপজ্জনক সতেরোর কিনারায় দাঁড়িয়ে ফুলছে, সে কী করে একজন মানুষের বিবেচনাকে স্বাভাবিক মনে করতে পারে যার ঘরে আছে সুন্দরি বউ এবং যে দুই সন্তানের জনক।

পরিচয়ের পর থেকে হেলাল খালি হাতে কোনদিন রাইশাদের বাড়ি আসে না। মায়ের মন রাখার সাথে সাথে হেলাল রাইশার মনটাকেও নীরবে মাজার চেষ্টা করত। তার জন্য অনেককিছু সে নিয়ে আসত। সে সবের প্রতি রাইশা একটুও আগ্রহ দেখাত না। হেলাল ওর মাকে বলত, দেখ বেটি, “তোমার মেয়ের কেমন দেমাগ। আমি ওকে আদর করি আর সে দেখ কি করছে।” রাইশার মা বলে, “ওর কথা বলবেন না আব্বাজান। ও ঐ রকমই। ওকে নিয়ে আমার যত সমস্যা।” রাইশাকে সহজে আয়ত্ত করতে পারে না হেলাল। ও যেন এক ঢেউ দোলায়িত স্রোতবতি নদি। নীরবে চলা যার প্রকৃতি। বৈচিত্র যার রূপ এবং আত্মমগ্নতা যার দেহের ভূষণ। যাকে দেখলে হিজল তমালের ছায়া দৃষ্টিকে আচ্ছন্ন করে। হৃদয়ে এক শৈল্পিক প্রতিকৃতির মগ্নচিত্র প্রতিবিম্বিত হয়। ঘরছাড়া নেশাতুর মন চলমান সে নদিতে ভেসে যেতে চায়।

রাইশাকে নিয়ে হেলালের মনে বিদিশা চিন্তার জগত সৃষ্টি হয়। এক তৃষিত হৃদয়ের সাথে এক অনভিজ্ঞ গ্রাম্য যুবতির আঁধার আলোর অস্পষ্ট সংলাপ শুরু হয় নিভৃত মানসলোকে। রাতে বউয়ের মসৃণ দেহে হাত রেখেও হেলারের মন হারিয়ে যায় এক কালো যুবতির নিবিড় সান্নিধ্যে যাকে সে এক রোদধোয়া দুপুরে পুষ্ট হাতে মরিচ বাঁটতে দেখেছিল। সান্ধ্য প্রদীপের অনুজ্জ্বল আলোয় তার বেদনামলিন অবয়ব কী অপরূপ। কী মোহময় তার সর্পিল ভঙ্গিতে পথ চলা। সেদিনের কথা একটুও ভুলতে পারে না হেলাল। যেদিন গল্পে গল্পে তার অনেক রাত হয়েছিল রাইশাদের বাড়িতে। আকাশে জেগে ছিল মায়াবি চাঁদ। মনটাকে উদাস করে দিয়েছিল স্বপ্নজড়ানো ঘুমন্ত পৃথিবী। হাওয়ার রথে চেপে আকাশে উড়ে যাচ্ছিল ফুরপুরে মেঘ। রাইশা আনমনে তাকিয়ে ছিল বিমুগ্ধ চাঁদিনীর দিকে। চন্দ্রের কিরণাভা তার গ্রীবার ভাঁজে ঢেলে দিচ্ছিল সূদূরের মায়া। ব্যথাক্লিষ্ট হাসির সাথে যৌবনের উন্মত্ত অস্থিরতা গলে পড়ছিল তার শরির থেকে। সেদিন হেলালের প্রশ্নের জবাবে সে বলেছিল,“অবশ্যই সুন্দর এ রাত তার জন্য, দেখার চোখ যার আছে।” নিরক্ষর এক রমণির মুখে এমন বাক্য আশা করা যায় না। তার বাণি মার্জিত সুচিন্তিত এবং চিত্তাকর্ষক।

মায়ের অসুস্থতার কারণে শোকবিহ্বল হয়ে যে রাতে হেলালকে জড়িয়ে ধরেছিল রাইশা সেদিনই তার দেহমনে ছড়িয়ে পড়েছিল কষ্টের তরঙ্গ। তার মনের অবরুদ্ধ ফটক খুলে আকাশের নির্জনতা থেকে গলে পড়েছিল একগুচ্ছ জোসনার কুসুম। হেলালের পাশে নিরুত্তর পাথরের মতো বসে সে শুনেছে উষ্ণ হৃদয়বৃত্ত্রি কথা। মনের অতল থেকে স্বচ্ছ বুদবুদের মতো যে কথামালা উদগীরণ হয়, সে রকম বিরহের কল্পনাশ্রয়ি বেদনাবোধ ; চাঁদ কুয়াশার দুর্বোধ্য রাতের ধীরোদ্ধত অভিব্যক্তি হয়ে রাইশার মনে গোপনে ঢালে বেদনার অমিয় নেশা। কে যেন গোপনে তাকে ডেকে নিয়ে যায় বিজন দুঃখের কাছে। প্রান্তরের মনোলোভা ঘাসের স্তূপে কে যেন তাকে নিশুতি রাতের গভীর স্বপ্নে নিক্ষেপ করে। মসৃণ চন্দ্রালোকে লক্ষ যোজনের শূন্যতার বিরহি সুর তার অর্বাচীন অন্তরে কে যেন ঢেলে দেয়। রাইশা বুঝতে পারে না কেন তার মনটা ছন্নছাড়া হয়ে যাচ্ছে। কেন সে নিজকে আগের মতো সংযত রাখতে পারে না। হেলালকে সে এড়িয়ে চলার চেষ্টা করে। কিন্তু তার উপস্থিতির আবেদনকে তুচ্ছ করে উড়িয়ে দিতে পারে না সে। সম্মোহিতার মতো সে হেলালের সঙ্গসুখ কামনা করে। অনেক নির্জনতা সেও তাকে উপহার দেয়। হাসির নির্মেঘ বৈচিত্র দিয়ে সে স্বপ্ন বাস্তবতার ব্যবধানকে একাকার করে দেয়। হেলালের বিশুদ্ধ প্রাণাবেগ আর সরলতায় সে মুগ্ধ হয়। সাপ যেমন তার মাথার মণিকে কেন্দ্র করে ঘুরে বেড়ায় তেমন এক মোহের টানে হেলালের স্মৃতিকে বেষ্টন করে রাইশা সবার অলক্ষ্যে বিচরণ করে।

সেদিন ছিল বৃষ্টিমগ্ন রাত। রুগি দেখতে এসে হেলাল আটকা পড়ে রাইশাদের বাড়িতে। রাতে একটুও ঘুম আসে না রাইশার চোখে। পতনশীল বৃষ্টির বাতাসের ঝাপটায় বাঁশের বনে আছড়ে পড়ে। গাছের ডালে ভেজা পাখির আর্তস্বর বজ্র তরঙ্গে ছিটকে পড়ে। রাইশার হৃদয়ের বাসনা ঝড়ে দুমড়ানো মেঘের মতো ক্ষতবিক্ষত হয়। জ¦লন্ত ধুপকাঠির অন্তর্জালার মতো তার প্রবৃত্তি অশান্ত হাহাকারে চৌচির হয়। আকাশ শান্ত হলে পাশের ঘরের দরজা খুট করে খুলে যায়। রাইশা জানালা খুলে দেখে ঘর থেকে বের হয়ে কে যেন অন্ধকারে মিশে গেল। সেও ছায়ার পেছনে ঝাঁকড়া গাব গাছের নিচে এসে দাঁড়ায়। এতটুকু সংকোচ তাকে আচ্ছন্ন করে না। রাতের অবগুন্ঠনে বেপর্দা অভিসারের মাতাল সুগন্ধ তাকে তাড়না করে। রাইশা দাঁড়িয়ে থাকে মন্ত্রমুগ্ধের মতো। সংসারের বৃহৎ টানে পরস্পর বিমুখি দু’টি প্রাণ পলকের আকর্ষণে অদ্ভুত মোহনায় হারিয়ে যায়। ঘরে এসে রাইশা দেখে মা জেগে আছে। মায়ের পাথর চোখ, নির্বাক মুখভঙ্গি দেখে ওর বুক কেঁপে ওঠে। ঠা-া গলায় মা বলে,“চাঁদ ধরতে চাস, ধরতে পারবি, শরিরে দাগ লাগালি, ধুতে পারবি ও দাগ, ধুতে পারবি?”

রাইশার সাথে হেলালের সম্পর্ক নিয়ে একসময় গ্রামে গুঞ্জন ওঠে। ওর মাকে একজন কথাচ্ছলে বলেই ফেলে,“আমাদের ঘরে যুবতি মাইয়া নাই যে হা করলে ডাক্তার পাব।” কথা শুনে রাইশার মা আকাশ থেকে পড়ে। এসব কী কথা শুনতে হচ্ছে লোকের মুখে? তারা সরল মনে হেলালের সাথে যে সম্পর্ক করেছে একী তারই বিষময় পরিণাম। মেয়ের ভবিষ্যৎ অন্ধকার দেখে সে। হেলাল যদি রাইশাকে বিয়ে করে তাহলেই কী সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। রাইশা তো পড়তে জানে না। হেলালের জীবনসঙ্গিনী হওয়ার যোগ্যতা তার নেই। সাময়িক এ মোহ বাস্তবের বিচারে মুল্যহীন। রাতের নির্জনে রাইশা যে সব খুইয়ে বসে আছে তারই বা কী প্রতিকার। এক গ্রাম্য চাচি কথা প্রসঙ্গে রাইশার পিতাকে বলে,“তোমার নসিব ভালো গো আলিমুদ্দি। মেয়ে নিয়ে চিন্তা করছিলে এখন দেখি ডাক্তার তোমার হিতে লাগল। কালো হলে কি হবে মেয়ে তোমার চোখে ধরা।” এ কথা শুনে রাইশার আব্বা বলে,‘
“নাগো চাচি, এ কী সম্ভব। রাইশা কি তার যোগ্য। এটা তোমরা আন্দাজে বলছ।” সেও ভাবে মেয়ে আগের মতো নেই। বিষণ্ন মনে সারাদিন কী যেন চিন্তা করে। তবুও মনকে প্রবোধ দেয় সে। মানুষ যা বলে সব মিথ্যা বানোয়াট। হেলাল একজন ভালো মানুষ, তাকে জড়িয়ে এসব বলা দারুণ অনুচিত।

হেলাল রাইশাকে নতুন জীবনের স্বপ্ন দেখায়। তাকে আলাদা বাড়ি বানিয়ে দেবে। সেখানে সে মনের মতো করে হাঁস-মুরগি পালবে, সবজি লাগাবে। সেলাই মেশিনে কাপড় সেলাই করবে। ওকে কেন্দ্র করে স্বপ্নময় ভূবন সৃষ্টি করতে চায় সে। এসব কথায় হাঁ বা না কিছুই বলে না রাইশা। একদিন রাইশা হেলালের বাড়িতে বেড়াতে যায়। হেলাল তখন বাড়িতে ছিল না। তার গোছনো পরিপাটি সংসার নিজ চোখে অবলোকন করে সে। একটি মায়াগভীর শান্তির নীড়। সোনার মতো উজ্জ্বল বউ, দুটি শিশু সন্তানের নিভৃত আলয় তার উপস্থিতিতে হতাশার অন্ধকারে তলিয়ে যাবে এ কথা সে চিন্তাই করতে পারে না। হেলালের বউ তাকে পেয়ে খুশি হয়, পরিচয় জানতে চায়। পাশে বসে হাসিমুখে কথা বলে। কী অমায়িক এবং পরিচ্ছন্ন ব্যবহার। রাইশা অপলক চোখে তার সহাস্য মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। রাইশার কালো কাজল প্রাণময় সুঠাম চেহারার দিকে হেলালের স্ত্রীও অনিমেষ দৃষ্টিতে তাকায়। কালোও যে একটি রঙ, এ রঙের মহিমায় মোহময় নারি যে দৃষ্টিনন্দন অনিন্দ্য রূপ-গৌরবে সমৃদ্ধ হতে পারে মনিরা এই প্রথম তা প্রত্যক্ষ করল। তার চোখে তখন ঘনকালো রজনীর প্রান্তে একটি উজ্জ্বল নক্ষত্রের উপস্থিতি। অল্প সময়ে দুজন দুজনার প্রিয় হযে যায়। রাইশা ভাবে এমন মানুষের সাথে বাস করা কতই না ভালো হত যদি পৃথিবীতে স্বার্থের সংঘাত না থাকত। অন্যের সংসারে কী করে নিজকে অবাঞ্চিতের মতো ঠেলে দেয়া যায়। তার চেয়ে ধৈর্যধারণ করাই রাইশা যথোচিত মনে করে। নিজের সুখের জন্য অন্যের স্বস্তি নষ্ট করা কোনো ধর্মে নেই।

বাড়ি ফিরে একা একা কাঁদে রাইশা। কাঁদে আর নিজের মনকে প্রবোধ দেয়। নিজ স¦ার্থকে প্রাধান্য দেয়া সে জানে না। কেঁদে কেঁদে অবসন্ন দেহে সে ঘুমিয়ে পড়ে। ঘুমে সে স্বপ্ন দেখে। মনিরা তার কপোলে চুমু খেয়ে আদর করছে। সে বলছে,“বোন তুমি কাঁদছ কেন? তোমার মতো একজন নারির সাহচর্যে কে না থাকতে চায়। তোমাকে প্রথম দেখে আমার খুব ভালো লেগেছে। তোমার মতো আমার এক বোন ছিল। তুমি যদি আমার সেই হারিয়ে যাওয়া বোন হয়ে পাশে থাকো তো মন্দ কি। আমরা কি একে অপরের জন্য একটু সহজ হতে পারি না।” স্বপ্ন ভেঙ্গে গেলে বিছানায় নিসাড় হয়ে পড়ে থাকে রাইশা। সে ভাবে, স্বপ্নের জগৎ কত ভালো, কত উদার ও সংঘাতহীন। সে বলে,“মনিরা তুমি আমার বোন এর চেয়ে বেশি কিছু চাই না।” ক’দিন পরে রাইশার কাছে আসে হেলাল। অনেক কথার পর সে বলে, “রাইশা, আমি তোমাকে স্ত্রীর মর্যাদা দিতে চাই। পরিচয়ের পর কখন তোমার মাঝে বিলীন হয়ে গেছি নিজেই জানি না। আমার বিশ^াস আমার মতো তুমিও তোমার সত্তাকে হারিয়ে ফেলেছ আমার মধ্যে।”

রাইশা হেলালের কথায় সব সময় চুপ থাকলেও আজ প্রথম মুখ ফুটে জবাব দিল। সে বলল,“আমার মনের অবস্থা আপনাকে বুঝাতে পারব না। একজন নারি হয়ে আরেক নারির সুখ আমি কেড়ে নিতে পারব না। আমাকে বিয়ে করলে সবাই আপনাকে নিন্দে করবে। দোহাই আমাকে নিয়ে আর আপনি ভাববেন না। এখন থেকে মনে করবেন রাইশা মরে গেছে। আমার খোঁজ কোনদিন করবেন না আপনি।” আর একটি মুহুর্তও রাইশা দাঁড়ায় না সেখানে। দুহাতে মুখ ঢেকে ছুটে পালিয়ে যায়।

আম গাছের সতেজ ছায়ায় দাঁড়িয়ে দূরের রাস্তাটার দিকে অপলক তাকিয়ে থাকে রাইশা। ওই রাস্তা দিয়ে এ গ্রামে এখনও যাওয়া আসা করে হেলাল। চৈত্রের মাঝামাঝি রাইশার বিয়ে হবে পাশের গ্রামের একজনের সাথে। বিয়ের দিন বাড়িতে অনেক লোক আসবে। তাকে নিয়ে যে ঘর বাঁধবে সেও আসবে বরযাত্রি পরিবেষ্টিত হয়ে। তার অন্তরের মরা নদিতে বেদনার ঝড় তুলে সে তাকে নিয়ে যাবে জীবনের জটিল জঙ্গমে। কিন্তু একজন হয়ত আর আসবে না। বিয়ে বাড়িতে সকলেই খোঁজ করবে তাদের সুপ্রিয় হেলালকে। রাইশার জীবনের কুসুমিত চারটি বছর চুরি করেছে সে জীবনচোর।