গ্রামের পাশ দিয়ে একটি সরু রাস্তা চলে গেছে প্রাইমারি স্কুলের কাছে। পশ্চিম দিকে একটি খাল। পুবে কাঁচা বাড়িঘর। খালটিতে বর্ষায় নৌকা চলে। হেমন্তের পর হাঁটু পানির বেশি থাকে না। গ্রীষ্মের নতুন জোয়ারে খালটি কানায় কানায় ভরে যায়। মেঘনায় স্রোত আর ঢেউ বেশি থাকলে মাছ ধরার নৌকাগুলো এই খালে এসে আশ্রয় নেয় তখন। চাঁদপুর শহর থেকে মালবাহী পানসি যায় হাইমচর বাজারে। বেদেরা দল বেধে আসে বর্ষায়। সন্ধ্যায় খালের দু’পাড়ে হারিকেন আর কুপির আলো বাতাসে জোনাকপোকা খেলে। জোসনা রাতে খালের পানি রূপার পাটির মতো ঝলমল করে। তখন ফিরোজরা রাতের পড়া শেষ করে দলবলে এসে গল্প করে খালের পাড়ে। খালপাড়ের রাস্তাটি যেমন নির্জন, তেমনি অন্ধকার। একা একা হাঁটলে মনে হবে দিনে-দুপুরেও কে যেনো পিছু নিচ্ছে। সরু রাস্তাটি পার হলে দেখা মিলবে বেড়িবাঁধের। বাঁধের দু’পাশে ফসলি জমি। কোথাও রাস্তা ঘেঁষে সুপারি বাগান। বেতঝাড়, নারিকেল আর নানা জাতের ফলজ গাছ পথিকের বন্ধু হয়ে আছে অনেক দিন। বিকেলে হাঁটার সময় বাতাস থাকলে ধানের ক্ষেতগুলোকে ক্ষীপ্রগতির ঘোড়ার কেশরের মতো লাগে। ধানের গন্ধ ম ম করে চারদিকে।
বেড়িবাঁধ দিয়ে দশ মিনিট হাঁটার পর ফিরোজদের স্কুল। গ্রামে এখনো বিদ্যুৎ আসেনি। গরমে ক্লাস করা কঠিন। মাথার ঘাম পায়ে পড়ে। বড়োরা অর্থ উপার্জন করে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে, আর ওরা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে বিদ্যা অর্জন করে। গরমের সময় স্কুলের সামনে আমগাছতলায় ওয়ানের শিশুদের ক্লাস চলে। ফিরোজরাও একসময় ওখানে চাটাইতে বসে ক্লাস করতো। যারা বড়ো ক্লাসের ছাত্র বিশেষ করে ফোর ও ফাইভের, নামতা পড়ানোর দায়িত্বটা পড়তো তাদের উপর। ওয়ানের ক্লাস নিতেন ওয়ালিউল্লাহ স্যার। ফিরোজরা সবাই তাকে ডাকতো কুট্টিস্যার বলে। তিনি ছিলেন সাড়ে চার ফিটের মতো লম্বা। তাই তার এই নাম। মুখ ভর্তি দাড়ি। পাজামা পাঞ্জাবি পরে স্কুলে আসতেন। প্রচুর পান খেতেন। অন্যদের চেয়ে কুট্টি স্যার ফিরোজকে বেশি আদর করতেন। তিনি যখন বদলি হয়ে ওদের স্কুলে আসেন তখন ওরা থ্রিতে। প্রথম দিনই ফিরোজ কুট্টি স্যারের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়। বাংলার ক্লাসে হেডস্যার নজরুল মাস্টার ফিরোজদের সাথে তাকে পরিচয় করিয়ে দেন। পরিচয় পর্ব শেষে ওদের রিডিং পড়তে বললেন কুট্টিস্যার। রিডিং আর পড়া যে একই কথা সেটা তখন এই প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষকরা জানতেন কি না সন্দেহ। এই ভুল শব্দটা এখনও গ্রামের স্কুলগুলোতে প্রচলিত আছে। ফিরোজের পড়ার ঢং আর উচ্চারণ স্যারের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়। ফিরোজ তখন বারো বছরের গ্রাম্য দুরন্ত কিশোর। পড়ে ক্লাস ফাইভে। ক্লাসের ফার্স্টবয়। তাই মাঝে মাঝে ওর উপরও নামতা পড়ানোর দায়িত্ব পড়তো। তাছাড়া ছোটরা ওকে পছন্দ করতো বেশি। ফিরোজ দেখতে যেমন সুন্দর আর ওর পড়ানোর ঢংটাও শিশুরা পছন্দ করতো বেশি। মাঝে মাঝে এমন হতো ছোট্ট ছেলে-মেয়েরা ওর হাতের আঙুল, জামার আস্তিন ধরে টানাটানি শুরু করে দিতো। ওর আর তখন না করার উপায় থাকতো না। ফিরোজদের ক্লাস হতো এগারোটায়। সচরাচর ওরা একঘন্টা আগেই স্কুলে আসতো। ওদের স্কুলের মাঠে সারা বছরই নানা জাতের শাকসবজির বাগান করা হতো। হেডস্যারের বাগানপ্রীতি এলাকাতে বেশ মশহুর। গ্রীষ্মে ঢেঁড়স, ঝিঙা, চিচিঙ্গা, চালকুমড়া আর শীতকালে টমেটো, ধনেপাতা, ফুলকপি, বাঁধাকপি ইত্যাদি চাষ করতো সবাই মিলে। ওই সময় তেলের চাহিদা পূরণ করতে সয়াবিন চাষ কিভাবে করতে হয় তা স্কুলে শেখানো হতো। ফিরোজরাও ওদের স্কুলে সয়াবিন চাষ শুরু করে। এর আগে ওরা সয়াবিন গাছ দেখেনি। তাই সয়াবিন বীজ থেকে কবে পাতা বের হবে তার জন্য সয়াবিন ক্ষেতে কৃষিবিদের মতো পর্যবেক্ষণ করতো ওরা। একদিন সত্যি সত্যি পাতা বের হলো। সয়াবিনের কচি পাতাগুলোর মতো ওদের কচি চোখগুলো আবেগে আনন্দের অশ্রু ঝরালো।
ফাইভে ওঠার পর ফিরোজদের পড়াশোনার চাপ কিছুটা বেড়ে গেছে। যেভাবেই হোক বৃত্তি পেয়ে স্যারদের বাজারে যাওয়ার পরিমাণ বাড়াতে হবে। চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে তারা খ্যাতির বিড়ম্বণায় পড়বেন। এই বিড়ম্বণাতে তারা বিরক্ত হন না দুকড়ি বাবুর মতো। ওদের স্কুল বরারবই ভালো করে। এবার ফিরোজদের ঘাড়ে দায়িত্বটা বেশি। হেডস্যার বলেছেন ওরা যেনো স্কুলের রেকর্ড ভঙ্গ করে। রেকর্ড ভঙ্গ ব্যাপারটা প্রথমে বুঝতে পারেনি ওরা। যখন বুঝতে পারলো তখন সয়াবিন চাষ করবার মতোই একটা দায়িত্ব ও আনন্দ মাথায় চাপলো। বৃত্তি কোচিং শুরু করার ঘোষণা দিলেন হেডস্যার। বাগান কার্যক্রমের আওতার বাইরে রাখা হলো বৃত্তি পরীক্ষার্থীদের। এমনকি নামতা পড়ানোর পার্ট-টাইম ডিউটিটাও গেলো। ওই সময়টা ওরা ব্যয় করলো কোচিং এ।
ফিরোজের ফাইভে প্রথম হওয়া বন্ধুরা মেনে নিতে পারেনি। ওর বাড়ি ছিলো অন্যদের চেয়ে একটু দূরে। কয়েকজন ফিরোজের দিকে একটু বাঁকা দৃষ্টিতে তাকাতে লাগলো। দু’জন বন্ধু ছাড়া সবাই একজোট। মাঝে মাঝে মধ্যবিরতির সময় বাইরে থেকে এসে দেখতো ওর বইগুলো সামনের বেঞ্চ থেকে সরে লাস্ট বেঞ্চে এতিমের মতো পড়ে আছে। ফিরোজের তখন কান্না পেতো। কিছুই বলতো না কাউকে। ক্ষোভটা মনের মধ্যেই পুষে রাখতো। মাঝে মাঝে মনে হতো ফার্স্ট না হওয়াটাই ভালো ছিলো। ওদের মধ্যে আগে খুব মিল ছিলো। সবাই মিলে-মিশে থাকতো। মনে হতো একই মায়ের সন্তান। ইদানিং একটা দূরত্ব তৈরি হচ্ছে। তবে ক্লাসের বাইরে এর প্রভাব তেমন একটা পড়তো না।
মেঘনার ভাঙন এতো বেড়ে গেলো যে স্কুলের এসব ব্যাপার স্যাপার আর ভালো লাগতো না। ফিরোজদের বাড়িটাও কিছুদিনের মধ্যে মেঘনার রাহুমুখে আশ্রয় নেবে। আর দেখবে না পালতোলা নৌকা। গাছে গাছে লাফিয়ে লাফিয়ে কাঠবিড়ালির মতো পেয়ারা খেতে পারবে না আর। বন্ধুদের সাথে মেঘনায় সাঁতার কাটা হবে কিনা জানে না। সঙ্গীহীন বন্ধুহীন হয়ে যাবে! একটা সঙ্কা ফিরোজের মনে। বড়োদের মধ্যেও একটা হাহাকার। এতোদিন শুধু দাদা-দাদির মুখে শুনেছে ওদের পুরনো বাড়ির কথা। কিভাবে মেঘনা গিলে খেয়েছে বসতভিটা দাদির কাছে শুনতো। দাদির পাশে শুয়ে এসব শুনতে শুনতে তা রূপকথার মতোই মনে হতো ফিরোজের কাছে। এখন আর নদীভাঙার কথা রূপকথা মনে হয় না। মানুষের বাস্তবচিত্র চোখের সামনে ভেসে ওঠে। অনিশ্চিত ভবিষ্যত হাতছানি দিয়ে ডাকে।
সেদিন ছিলো শ্রাবণের জোসনা রাত। চাঁদের আলোও আগের মতো নেই। হয়তো পারিপার্শি¦কতার কারণে চাঁদের আলো ফিরোজের চিত্তকে নাড়া দেয়নি। প্রবল স্রোত। খালের উপর একটি বাঁশের সাঁকো। সাঁকোটা পার হয়ে খালের ওপাড়ে যায় ফিরোজ। ঝিঁঝির করুণ ডাক শোনা যায়। ঝিঁঝিদের এরকম ডাক ফিরোজ এর আগে শুনেনি। ওদেরও তো গৃহ আছে। এই ঝোপঝাড়ইতো ওদের বাড়িঘর। ওরাও কি তাহলে ঘরহারাবার আশঙ্কায় শঙ্কিত! ঢেউয়ের গর্জন মনের মধ্যে দেহ ভাঙার মতো মনে হয় ওর কাছে।
অনেকেই রাতে মেঘনার পাড়ে আসে নদীর ভাঙন পরিস্থিতি দেখতে। কারো চোখে আরামের ঘুম নেই। অনিশ্চিত গন্তব্যের জাহাজের সবাই যাত্রী। হঠাৎ ধ্রুম করে ভেঙে পড়লো এক বিশাল মাটির চাকা। তলিয়ে গেলো মুহূর্তের মধ্যে। ওকে ভিজিয়ে দিলো। ফিরোজ ভাবলো যেনো ওর বুকের ভিতর থেকে হাড়গোর টেনে কেউ মেঘনায় ছুঁড়ে দিলো। মনে হলো মাটির চাকাটি ওর দেহেরই একটি অংশ। ফিরোজের সমস্ত দেহে একটা বেদনার শিহরণ খেলে গেলো। ফিরোজের মনে হলো ও যদি মাটির ওই চাকাটির মতো তলিয়ে যেতে পারতো! তাহলে আর কোনোদিন ভাবতে হতো না এই মাটি হারানোর কথা। এই পাঁজর ভাঙার কথা। এই বাড়িখেকো মেঘনার কথা। পাষাণ এই নদীর পেটে জমা হয়েছে কতো হাজার হাজার বসতভিটা, জমি-জিরাত, স্কুল, মক্তব, পাঠশালা, খেলার মাঠ…। রাহুর মতো গিলে খায় সবকিছু। তবু তার তৃপ্তি মেটে না!
ফিরোজের খেলার মাঠটি মেঘনা আস্তে আস্তে এক লোকমা, দু’লোকমা করে খেয়ে যাচ্ছে। শিয়াল মুরগীর হাড়গোড় চিবিয়ে খেলে যেরকম শব্দ হয় ফিরোজ সেরকম একটি শব্দ পাচ্ছে। দু’চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি গড়িয়ে পড়ছে। একটি দুখের শীতল স্রোত ওর ভিতর বয়ে চলেছে। শীতকালে যেরকম শীতল পানির ধারা বয় ওদের খালটিতে, একটি সাপের চলার গতির মতোÑ মন্থর, ধীর স্থির; সেরকম। ফিরোজের জাগতিক কোনো অনুভূতি নেই। ও যেনো অন্যগ্রহের মানুষ। মা বলেন ওর অনুভূতি নাকি প্রবল, বড়োদের মতো। ফিরোজের বয়সী ছেলেরা যেরকম ভাবে, ও সেরকম করে ভাবে না।
কে যেনো ফিরোজের পাশে এসে আলতো করে কাঁধে হাত রাখলো। ও কিছুই টের পায়নি। অনেকক্ষণ পর কাঁধে একটা ঝাঁকুনি খেলো ফিরোজ। পিছনে ফিরে তাকাতেই দেখে, সুইটি। হঠাৎ ঝাঁকুনিতে ও একটু ভয় পেয়ে গিয়েছিলো।
Ñতুই কখন এলি।
Ñঅনেকক্ষণ।
Ñতো তুই এখানে কি জন্য এসেছিস?
Ñবিজ্ঞানী গ্যালিলিওকে দেখতে। তবে কলম্বাসকে দেখতে পেলেও চলবে।
ফিরোজ আর কিছু বললো না। সুইটির বড়ো আপুদের বই ওর মুখস্থ। এমনিতেই হেডস্যারের মেয়ে তার উপর চারবোন বড়ো হওয়াতে সে একসাথে ছয় ক্লাসের ছাত্রী। চারজনের ছাত্রী আর একজনের টিচার।
Ñতুমি কি জন্য এতোরাতে নদীর পাড়ে এসেছো ফিরোজ ভাইয়া?
Ñএকটা ক্ষুধার্ত পেট দেখতে। ওর জন্য কিছু খাবার নিয়ে এসেছি।
ফিরোজ ঘুরে তাকালো সুইটির দিকে। ওর কপালের ভাঁজ আর ভাবনার রেখাগুলো ফিরোজ জোসনার আলোতে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে।
কতোক্ষণ আকাশের দিকে আর কতোক্ষণ ফিরোজের দিকে তাকিয়ে বোকার মতো বললো
Ñঠিক বুঝলাম না ভাইয়া!
Ñবুঝবি কেমন করে। গ্যালিলিও আর কলম্বাসের বাড়িঘর তো আর মেঘনায় গিলে খায়নি। নিচে তাকিয়ে দেখ।
সুইটি নিচের দিকে তাকালো।
Ñকি দেখলি
Ñআমাদের দাঁড়িয়াবান্ধার কোর্ট।
Ñএই খাবারটি শ্রদ্ধাভাজন মেহমান মেঘনা আজ রাতের মধ্যে ডলি আপার জামাই তোদের বাাড়িতে আসলে মুরগীর রান যেভাবে মজা করে খায়; ঠিক সেভাবে খাবে।
ফিরোজের কথা শুনে বাক্যবাগিশ সুইটির আর কোনো কথা বলার সাহস জোগালো না।
Ñফিরোজ ভাইয়া তুমি এতো সুন্দর, গোছালো কথা শিখলে কিভাবে?
Ñআমার অন্তর ফেটে যাচ্ছে আর তুই এসেছিস গ্যালিলিও আর কলম্বাস দেখতে।
Ñসরি ভাইয়া। তুমি এতো গভীরভাবে নদীর দিকে তাকিয়ে ছিলে যে তোমাকে দেখে আমার ভাস্কো দা গামা কিংবা কলম্বাসের কথা মনে পড়ে গিয়েছিলো। আমাকে মাফ করো। বলেই সুইটি ফিরোজের দু’টি হাত ধরে ক্ষমা চাইতে লাগলো।
Ñধুর পাগলি। এতে ক্ষমা চাওয়ার কি আছে।
Ñচল রাত অনেক হয়েছে। বাড়ি চলে যাই।
Ñএটা আর এমন কি রাত। মাত্র সাড়ে আটটা বাজলো।
ফিরোজ কোনো কথা বললো না। বহু দূরে নৌকার আলোগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকলো দু’জন। অনেকগুলো আলো কখনও দেখা যায় আবার কখনও ঢেউয়ের আড়ালে চলে যায়। আজকে জোসনা যেনো তার সবটুকু রূপ ঢেলে দিয়েছে মেঘনায়। জোসনার এতো জৌলুস ফিরোজ এর আগে কখনো দেখেনি। এই প্রবল স্রোতেও মানুষ জীবনের মায়া ছেড়ে নাও নিয়ে বের হয়েছে মাছ ধরতে। এই নদীই তাদের জীবন, তাদের সংসার। নদীর ফসল মাছই সংসারের চাল ডাল কেনার উপকরণ। মাছ দেখলে সন্তান দেখার আনন্দ হয় জেলেদের। এই রূপালি ইলিশ যেনো জেলেদের কাছে তাদের সন্তান তুল্য।
আকাশে তারা আর মেঘের লুকোচুরি। বড়ো বড়ো জাহাজের সাইরেন কানে এসে বাজে। স্রোতের জন্য বেশি দূর উজানে আগাতে পারছে না জাহাজগুলো। ছোট ছোট নৌকাগুলো দাঁড়টেনে জাহাজ থেকে দূরে থাকতে প্রাণপন চেষ্টা করছে। অনেক দূর থেকেও মাঝিদের হাকডাক শোনা যায়। কাঁধের গামছা নেড়ে সারেঙকে সতর্ক হতে বলে। সারেঙও কখনো কখনো ট্রাক ড্রাইভার হয়ে যায়। জাহাজের নিচে চলে যায় ছোট ছোট নৌকাগুলো। জেলে পাড়ায় পরদিন শোকের মাতম বসে। বর্ষায় এরকম ঘটনা প্রায়ই ঘটে।
আরেকদিন ফিরোজ নদীর পাড় দিয়ে হাঁটছে। সুইটি ওর সঙ্গী হলো। দু’জন অনেক ঘুরলো। অনেক দেখলো। অনেক কথা বললো। এটাইতো শেষ। আর হয়তো কোনোদিন তার সাথে দেখা হবে না। পুতুল খেলার আসর হবে না। কানামাছির দম হবে না। চাঁদনী রাতে লুকোচুরি খেলা, রান্না বান্না খেলা হবে না আর। দাঁড়িয়াবান্ধা খেলার কোর্টের দাগগুলো গিলে খেয়েছে ক’দিন হলো। উড়িগাছের তল, যেখানে ওরা বৌচি খেলতো সেখানটায় এখন নৌকা চলে। সাতগুদ্দা খেলার গর্তগুলোতে এখন বড়ো বড়ো ঢেউয়ের দাপাদাপি। স্মৃতিচিহ্ন সব টেনে-টুনে ছিঁড়ে হয়েছে জলের বসতি। জলের জিহবা হাত বাড়ায় বাগানে। বাগান ঢেউয়ের জিহবা হয়ে যায়। উঠোন হয়ে যায় ঢেউয়ের ফণা। ফিরোজদের আর আকুপাকু সুপারি খোঁজা হবে না বাগানে। সুপারি দিয়ে আইসক্রিম, শনপাপড়ি খাওয়া হবে না আর। এমন নিদয় হৃদয় মানুষেরও হয় না যতোটা হয়েছে এই সর্বনাশা মেঘনার। তুই তো নদী। মানুষ উদারতার প্রতীক হিসেবে জানে তোকে। তবে কেনো এতো নির্দয় হলি তুই। পাড়ে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করে মেঘনাকে। মেঘনা শুধু শোঁ শোঁ আওয়াজ করে। ওর ভাষার মর্ম বুঝতে অক্ষম ফিরোজ। দাঁতাল ঢেউগুলো ফণা তুলে হাসে। বুঝে না তার হাসির মর্ম।
ঠিকানা হারিয়ে ফিরোজ চলে আসে ঢাকায়। কেটে গেলো অনেকদিন। জীবনটাকে গড়বার নেশা ছিলো প্রচন্ড। জীবনের বাঁকে বাঁকে শুধুই যুদ্ধ আর দ্রোহ। তবুও জীবন এগিয়ে চলে যুদ্ধ করে করে।
কথাগুলো ভাবতে ভাবতে ফিরোজের চোখে পানি এসে যায়। আজ সে আপন মনেই অতীতের সব স্মৃতি রোমন্থন করতে চাইছে। জীবন চলমান। সে চলবেই। নদীর মতোই জীবনের গতি। তবে সময়গুলো বরেেফর মতো ক্ষয়িষ্ণু। জীবনে অনেক কিছু হারিয়ে আজ অনেকটাই একা। এতো হারাবার পরও খুচরো পয়সার মতো কিছু প্রাপ্তি জমা হয় জীবনের পকেটে।
ফিরোজ আজ তেজগাঁও কলেজের মেধাবী ছাত্র। এবার ইন্টারমিডিয়েট দিয়েছে। এখন শুধু রেজাল্টের অপেক্ষা। অবসর কাটাবার জন্য গ্রামে যাবে বলেই অতীতের সব স্মৃতি শুকনো পাতার মতো জড়ো হয়েছে মনের উঠোনে।
আজ বারে বারে সুইটির কথাই মনে পড়ে তার। সে এখন অনেক বড়ো হয়েছে নিশ্চয়ই। তার দেহে যৌবনের ফোয়ারা বইছে। রূপ সৌন্দর্য হয়তো ফুটে উঠেছে সর্বাঙ্গে। মায়াবী চোখ দু’টো কি এখনও ফিরোজের দিকে তাকিয়ে আছে; নাকি মেঘনার চাকার মতোই অতলে তলিয়ে গেছে সব পুরনো স্মৃতি? ফিরোজের চোখে সন্দেহ। তার মন আনচান করতে লাগলো। নিরাশার পাখির মতোই ছটফট করতে লাগলো। সুইটিকে দেখার জন্য তার মন চঞ্চল হয়ে উঠেছে। একেই কী বলে প্রেম! ফিরোজ প্রেম চিনে না। তার হৃদয় আছে, হৃদয়ে ভালোবাসা নেই হয়তো বা। তাই প্রেম কি তা হৃদয় দিয়ে অনুভব করতে পারেনি। আজ যেনো প্রথম সে অনুভব করতে পেরেছে প্রেমের প্রথম পরিচয়। তা না হলে থাকে সাত বছর আগে যে কিশোরবেলার স্মৃতির মালা ছিঁড়ে ছিলো, তাকে নিয়ে কিসের এতো স্বপ্ন, আবেগ, অনুভূতি। ফিরোজ তা বুঝতে পারে না। সে হারিয়ে যাচ্ছে কোনো এক অচেনা অরণ্যে। লোকালয়হীন কোনো মরুভূমিতে। অথই কোনো সাগরে যেনো সে ডুবে যাচ্ছে। কেঁপে উঠলো ফিরোজের ঠোঁট দু’টো। ভাবলেশহীন তাকিয়ে আছে জানালার ওপাশে। দূর আকাশে। তার কল্পনার রাজ্যে শুধু মাত্র সে আর সুইটি। সেখানে সমস্ত সুখ তারা দু’জনেই ভোগ করবে।
কি রে কি ভাবছিস? আচমকা প্রশ্ন করলো শামীম
Ñকে? ও-তুই। বস।
Ñকি, পরশু গ্রামে যাবি বলে রাজকুমারীর স্বপ্ন দেখছিস?
Ñদেখ বাজে বকিস না।
Ñবাজে বকিশ না! রাজপুত্র হীরা-মণি-মুক্তা খচিত মুকুট পড়ে রাজকুমারীকে নিয়ে নীল আকাশের কল্পতরীতে হাতে হাত ধরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আর …
Ñব্যাস্ হয়েছে। সিনেমাতে অভিনয় করলেই তো পারিস।
Ñএকমাত্র বন্ধুর গোপন রাজ্যের খবর যদি না বলতে পারি তাহলে বন্ধুর টালিখাতায় নাম থাকবে কেনো! আচ্ছা থাক এসব। চল বাইরে থেকে একটু ঘুরে আসি। পাঁচটা বাজে প্রায়।
Ñঠিক আছে চল। আমি কিন্তু আজ রাত আটটার লঞ্চে যাচ্ছি।
Ñতার মানে? তোর তো পরশু যাবার কথাছিলো।
তা এতো তাড়াতাড়ি। রাজকন্যা সুতোয় টান দিলো না কি?
Ñদেখ এক কথা বার বার বকিস না। বিকেলের ঘোরাটাই বরবাদ হয়ে যাবে।
শামীম আর কথা বাড়ালো না।
এই মস্তবড়ো ঢাকা শহরে একমাত্র শামীমকেই প্রকৃত বন্ধু এবং আপনজন হিসেবে পেয়েছে ফিরোজ। অনেকে এদেরকে সহোদর বলেই জানে। দু’জনে একই সাথে এসএসসি পাশ করেছে। একসাথেই এবার ইন্টারমিডিয়েট দিয়েছে।
ফিরোজ বাইরে যাবার জন্য রেডি হয়ে নিলো। মানি ব্যাগে কয়েকটি টাকা পুড়ে নিয়ে বেরিয়ে পড়লো শামীমকে নিয়ে। রাস্তায় নেমে দু’জনই হাঁটতে লাগলো। অভ্যাস মতো দু’টাকার বাদাম কিনে একটা গাছের নিচে বসলো। বাদাম খেতে খেতে শামীমই বললো
Ñআচ্ছা ফিরোজ কয়েকদিন পর রেজাল্ট বের হবে আর তুই এখন চলে যাবি। এ কেমন কথা হলো। আর চেয়ে বরং রেজাল্টের খবরটা শুনেই যা।
ফিরোজ নিচু মাথাটাকে উঁচু করে শামীমের দিকে তাকিয়ে বললো
Ñযে কোনো কাজই করতে যাই না কেনো তোর বাধা ছাড়া একটাও করতে পারি না।
Ñদেখ আমি তো তোর ভালোর জন্যেই বলছি। এটা কতো দিনের আশার ফসল। তাছাড়া পিছনে সাফল্য রেখে সামনে এগিয়ে গেলে তো আর মনকে পুরোভাবে স্বাধীন করা যায় না। মন পিছনের দিকেই ছুটে যেতে চায় তার প্রাপ্য সাফল্য কুড়িয়ে আনার জন্য। তাই বলছি রেজাল্টটা দেখে যা। তাতে আনন্দে ঘুরতে পারবি।
ফিরোজ কতোক্ষণ চিন্তা করে বললো
Ñতা অবশ্য খারাপ বলিসনি। আমি রেজাল্টের বিষয়টা এভাবে ভাবিনি।
Ñভাবার সময় কই। আল্লাহর দেয়া চব্বিশ ঘন্টাতো প্রেমের ভাবনাতেই ব্যয় হয়। তবে আর রেজাল্ট নিয়ে ভাববার সময় কই।
শামীম অবশ্য আসল সত্যটাই বলেছে। ক’দিন যাবৎ ফিরোজের মনে শুধু সুইটির কল্পনার ছবিটাই ঘুরপাক খাচ্ছে। খাবার সময়ও মন থাকে না। হঠাৎ থেমে যায়। গলা থেকে ভাত আর নামতে চায় না। চলতে গেলে থমকে দাঁড়ায়। আর যদি কোনোরকমে গা-টা বিছানার নাগাল পায়, তবে আর কোনো চিন্তা নেই। সুইটির কথা চিন্তা করতে করতে মৃতের মতো পড়ে থাকে। মানুষের মন কখন যে কি হয়ে যায়, তা ভাবা মুশকিল। ক’দিন আগেও যে ফিরোজ লেখাপড়া ছাড়া আর কিছু ভাবতে পারেনি। বন্ধুরা সবাই বলত বইয়ের মাছি। সে-ই আজ মেয়েদের ভাবনায় অধির। এরই নাম প্রেম! তাই আজ শামীমের কথায় প্রতিবাদ হারিয়ে থ হয়ে গেছে ফিরোজ। শুধু বোকার মতো তার দিকে তাকিয়ে রয়েছে। শুনতে তার ভালোই লাগছে। ফিরোজ অসহায়ের মতো শামীমের হাত দু’টো ধরে বললো
Ñআচ্ছা দোসত বলতো আমার কেনো এমন হলো? আমি তো এমন ছিলাম না। আমি তো চেয়েছিলাম জীবনের ঘাত-প্রতিঘাত অতিক্রম করে সাফল্যের চূড়ান্ত শিখরে আরোহন করা। কিন্তু আমি যে ভারি পদার্থের মতো পানিতে তলিয়ে যাচ্ছি যা কোনোদিন ভাসবে না। আমি কি আমার লক্ষ্যে পৌঁছতে পারবো না? আমার সোনালি স্বপ্নগুলো কী বাস্তবে রূপ নেবে না।
Ñতুই পাগল হয়ে গেলি না কি! এটা কোনো একটা ব্যাপার হলো? হৃদয়হীনভাবে আগালে সাফল্য আসলেও তা ধরে রাখা যায় না। আর হৃদয়কে প্রস্ফূটিত করতে হলে সেখানে নারীর উপস্থিতির প্রয়োজন। নইলে জীবন সাগরে হাবুডুবু খেতে হয়। আর এটা তো মানুষের মানবিক চাহিদা। যার হৃদয় আছে তাকে নারীর ভালোবাসায় সাড়া দিতেই হবে। আর যদি নারীর প্রয়োজন পুরুষের জন্য না হতো, তাহলে স্রষ্টা নারী জাতিকে সৃষ্টি করবেন কেনো? মানুষের এ প্রয়োজনটা দেখা দেয় একটা বিশেষ সময়ে। তাই সৃষ্টিকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য মানুষকে এ প্রয়োজনে সাড়া দিতে হয়। আর মানুষের এ বিশেষ সময়টাই হলো যৌবনকাল। যৌবনের তরঙ্গ যখন উদ্বেলিত হয়, তখন তার সমস্ত দেহে প্রবাহিত হয় ভালোবাসার ফোয়ারা। তখনই মানুষ খুঁজে ফেরে তার জীবনসাথীকে। যা তোর মধ্যে বর্তমানে বর্তমান। এতে সাড়া দেয়া না দেয়া তোর ব্যক্তিগত আবেগের ব্যাপার। মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপকের মতো একটা লেকচার দিয়ে শামীম ফিরে আসলো তার স্বাবাবিক ভুবনে। অধ্যাপনা ছেড়ে বন্ধুত্বে নেমে বললো
Ñফিরোজ তোর কাছে একটা বিশেষ অনুরোধ, তুই পরীক্ষার রেজাল্ট বের হবার পরেই গ্রামে যাবি।
অনুগত ছাত্রের মতো এতোক্ষণ ফিরোজের লেকচার শুনলো। মুচকি হেসে শামীমের পিঠে হাত রাখলো। ফিরোজ হঠাৎ ঘড়ির দিকে তাকিয়ে আৎকে উঠলো।
Ñশামীম সাড়ে পাঁচটা বেজে গেছে। তাড়াতাড়ি চল বাসায় যেতে হবে।
দু’জনে রাস্তায় নেমে পড়লো। হাঁটতে হাঁটতে বাসার কাছে চলে আসলো মুহূর্তের মধ্যে। দু’দিকের দোলনায় দোল খাচ্ছে ফিরোজ। গ্রামে যাবে, না রেজাল্ট বের হলে যাবে। কিছুই ভেবে পাচ্ছে না সে। কতো কথাই না গুছিয়ে রেখেছিলো গ্রামে গিয়ে সুইটিকে বলার জন্য। কতোদিন গ্রামে যাওয়া হয়নি। নদীর স্নিগ্ধ বাতাসে মনকে সতেজ করবে। আশাগুলো যেনো গুলিয়ে যাচ্ছে।
প্যান্ট সার্ট ছেড়ে বিছানায় গা এলিয়ে দিলো ফিরোজ। একটু বিশ্রাম না নিলে হয় না। কিছুক্ষণ পর আবার টিউশনিতে যেতে হবে। এটাই হলো তার ইনকাম সোর্স। দুটো টিউশনি করে ফিরোজ। এ দিয়েই চলতে হয় তাকে। খুব মেধাবী ছাত্র হয়েও মেধাকে ঠিকমতো কাজে লাগাতে পারেনি আর্থিক অস্বচ্ছলতার দরুন। শিক্ষা জীবনের প্রতিটি মুহূর্তেই তাকে অনেক কষ্ট করতে হয়েছে। অনাহারে, অর্ধাহারে কেটেছে বহু দিন। আসলে এগুলো তার কাছে কোনো কষ্টই মনে হতো না যখন সে ভাবতো তার ভবিষ্যতের কথা।
স্বপ্ন কল্পনার পাততারি গুটিয়ে আবার বের হলো টিউশনির উদ্দেশ্যে। শহরে টিউশনির অবস্থাও খুব খারাপ। ভালো কাপড় চোপড় না পরে গেলে চাকরসুলভ আচরণ করতেও গৃহকর্ত্রীর বাধে না। মাস শেষে কিছু মাইনে দেবে বলে মনে করে নিজের কেনা গোলাম। আর ছেলে মেয়েদের কথা তো বাদই দিলাম। শিক্ষককে মনে করে খেলনার বস্তু। মাঝে মাঝে ক্লাসমেটের মতো ফ্রি স্টাইলে পার্কে বসে গল্পমারার মতো আড্ডা বসায়। আর গল্প জুতসই না হলে টিউশুনি নট। প্রথম প্রথম ফিরোজের খুবই খারাপ লাগতো গালগল্প করে সময় নষ্ট করতে। নানান গল্প শুনতে পছন্দ করে এই শহুরে ছেলেমেয়েরা। অনেক সময় ইচ্ছার বিরুদ্ধে গল্পের জুড়ি বসাতে হয় তাকে। যে শিক্ষক যতো বেশি গল্পবাজ তার টিউশনির রেট ততো বেশি। বাবা-মা ছেলে-মেয়ের চাওয়া-পাওয়াকে মূল্য দেয় বেশি।