সেদিন মেহমানদের বিদায় জানিয়ে শামীমের মা স্বামীর কাছে ছেলের বিয়ের প্রসঙ্গ তুললেন। শামীমদের বাবার মনেও মিলিকে দেখার পর থেকে এই চিন্তাটাই এসেছে। এ দেশে যে এতো সুন্দর মেয়ে হয় এটা দীর্ঘদিন দেশের বাইরে থাকাতে শামীমের বাবার
চিন্তাও আসেনি। দারুন মানাবে ছেলের সাথে। একালের ছেলে-মেয়েরা নিজের পছন্দটা এখন আর বাবা-মার কাছে সপে দিতে চায় না। শামীমেরও পছন্দ অপছন্দের ব্যাপার থাকতে পারে। রফিক সাহেব এ বিষয়ে শামীমের সাথে আলাপ করার জন্য স্ত্রী জাহেদার উপর সম্পূর্ণ ভার দিয়ে রাখলেন। মিলির মায়ের সাথে কথা বলে কনে দেখার ব্যবস্থাটিও যাতে করা যায়। একটি পরিতৃপ্ত ভোজ ও ছেলের বিয়ের ব্যাপারে আলাপ আলোচনার একটি স্কেচ এঁকে নিজেদের বিয়ের স্বৃতি রোমন্থন করতে করতে রফিক সাহেবের বাহুতে আবদ্ধ হলেন জাহেদা। একটি বিমুগ্ধ রাতের ভ্রমণে সওয়ার হলেন পড়ন্তবেলার দু’জন মানব-মানবী।
পরদিন টেবিলে ফিরোজ ও শামীমকে নাস্তা পরিবেশন করছেন জাহেদা বেগম। রফিক সাহেব খুব ভোরেই বের হয়েছেন একটা জরুরি কাজে। মা শামীমের পাশে গিয়ে পরোটার সাথে ভুনা গোস্ত পরিবেশনের সময় জানতে চাইলেন
-মিলিকে তোর কেমন লাগেরে!
শামীম কেবল পরোটার একটি টুকরা গোস্তের সাথে পেঁচিয়ে মুখে দিয়েছে কেবল। এ সময়ে মায়ের কাছ থেকে এমন একটা প্রশ্ন আশা করেনি শামীম। লজ্জায় কানের লতিটাও লাল হয়ে গেছে ওর। মা এতো অল্পসময়ে শামীমের মনের কথাটা জানলো কী করে। মুখটা ঘুরিয়ে মায়ের দিকে চাইতেই মা শামীমের মাথাটা তার বুকের কাছে টেনে নিলেন। শামীম চেয়ার থেকে উঠে মাকে জড়িয়ে ধরে। ফিরোজও উঠে এসে প্রিয় বন্ধুটির আনন্দের সঙ্গী হলো।
নাস্তা খেয়ে ফিরোজ শামীমকে নিয়ে ছমির গাজির বাড়িটি দেখতে গেলো। বড়ই, আম আর পেয়ারা গাছের পাতায় সাড়া উঠোন একাকার। দোচালা টিনের ঘরটা নড়বড়ে। জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়টা এখানে পার করেছে ফিরোজ। সেই বৃদ্ধ দু’টি মানুষের বিদেহী আত্মার স্পন্দন যেনো ফিরোজ শুনতে পাচ্ছে। গভীর মমতা আর শ্রদ্ধায় ফিরোজের অন্তরটা ভরে ওঠে। পাথর ফেটে ঝর্ণাধারা থেকে যেমন নিচে গড়িয়ে পড়ে পানি, ফিরোজের দু’গাল বেয়ে ঝরে পড়ে অশ্রুর ধারা। শামীম ফিরোজের কাঁধে একটা ঝাঁকুনি দেয়। ফিরোজ চোখ মুছে শামীমকে বলে
-আমি প্রথম মাসের বেতন থেকে তোকে টাকা পাঠাবো। তুই বাড়িটার সংস্কার করবি। আমি এখানে একটা এতিম শিশুদের স্কুল করবো। কিরে পারবি না? শামীম হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ে। এখানে ফিরোজ ও শামীমের কিশোরবেলার সেই স্মৃতিগুলো মনে করার চেষ্টা করে। ডানপিঠে শামীম ফিরোজের সংস্পর্শে এসে আজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টার্স ডিগ্রিধারী। ফিরোজের সংস্পর্শে না হলে হয়তো আমিন বাজারের ট্রাকের মালিক, কিংবা ইট বালুর আড়তদার হিসেবে সবাই তাকে চিনতো। অথবা বাবার মতো বিদেশ চলে যেতে হতো অনেক আগেই। প্রিয় বন্ধুটির এই ঋণতো কোনোদিনই শোধ করতে পারবে না শামীম। বরং ওর মহৎ ভাবনা ও কাজের সাথে শামীম যদি নিজেকে জড়াতে পারে তাতেই ও আনন্দ পাবে বেশি। শামীম তার হাত দু’টি ফিরোজের কাঁধে রেখে বললোÑ
ছমির গাজির এই পর্ণ কুটিরেই তোর সাথে আমার হৃদয় বাঁধা পড়েছে বন্ধু। এইখানেই তুই প্রতিজ্ঞা কর সারা জীবন তোর পাশে রাখবি আমাকে। শামীমের চোখে অশ্রু। ফিরোজ দেখলো বড়ই গাছের পয়সার মতো পাতাগুলোর ফাঁক দিয়ে রোদের কণাগুলো ফিরোজের চোখের কোণায় চিকচিক করছে। দু’টি পরিপূর্ণ যুবকের চারটি বাহু ছমির গাজির আম-জামের শাখার মতোই একাকার হয়ে রইলো।
মহা ধুমধামের সাথে শামীমের বিয়ের আয়োজন চলছে। সাব্বির এসেছে এক সপ্তাহ হলো। মিলির মা নূর জাহান বেগম সবকিছুই খুলে বললেন সাব্বিরের কাছে। সাব্বির অবশ্য অনেক কিছুই বিদেশে থাকতেই জানতে পেরেছে চিঠিপত্রের মাধ্যমে। তাদের নতুন বাড়িটি বানানোতে ফিরোজ যথেষ্ট সহযোগিতা করেছে। ফিরোজ-শামীমের ব্যাপারে মা মাঝে মাঝেই চিঠি লিখে জানাতেন সাব্বিরকে। রাজউকের প্ল্যান, কনস্ট্রাকশনের কাজ, ডিজাইন, টাইলস সবকিছুই হয়েছে ফিরোজের তদারকিতে। বিদেশের কষ্ট বাড়িটি দেখার পর ভুলে গেছে সাব্বির। আদরের বোনটি যে তার অনুপস্থিতির সুযোগে বিদেশি টাকায় বখে যায়নি, এটাও তার কম আনন্দের বিষয় নয়। চাচাত ভাইদের উৎপাতে বাড়ি ছাড়া হয়ে বিদেশে পাড়ি জমানো যে কতোটা কষ্টের ছিলো তা সাব্বিরের চাইতে কে আর বেশি বুঝবে। একটি দুই রুমের বাসায় পিতার জমানো টাকাগুলো নিয়ে অজানা গন্তব্যে পাড়ি জমায় সাব্বির। আজ সে পরিতৃপ্ত। বিদেশ ফেরৎ একজন সুখি মানুষ এখন সে। নিজের পড়াশুনাটা বেশি না হলেও বোন যে অনার্স শেষ করে মাস্টার্স পড়ছে- এটাই বা কম কি? শামীমের মতো শিক্ষিত ভদ্র ও এতো বড়োলোকের ছেলে বর হিসেবে সে কোথায় পাবে? পিতা বেঁচে থাকলে আজ কীই না খুশি হতেন। সাব্বির বোনের বিয়েতে আনন্দের কোনো কমতি রাখতে চাইছে না। বিয়েতে ওর চাওয়া পাওয়ার সবটাই পূর্ণ করবে সাব্বির।
মিলি সাব্বিরের দীর্ঘ অনুপস্থিতিতে ফিরোজকেই যেন বেশি ভালোবেসে ফেলেছে। দু’জনের ভিতর কে বিশি প্রিয় তা পরিমাপ করতে গিয়ে সাব্বিরকেই যেনো দূরের মনে হয় ওর কাছে। দুই ভাই-ই যেন মিলির বিয়েতে ধুম-ধামের কমতি রাখতে চাইছে না। মিলি ফিরোজকে একা পেয়ে বললো
-ভাইয়া! তুমি আমার একটা ইচ্ছে পূরণ করবে?
ফিরোজ, মিলির ইচ্ছেটা জানতে চাইলো।
-আমি নাহারকে আমার বিয়েতে পাশে দেখতে চাই। সে তো আমারও একটি ছ্ট্টো বোন। গতো বছর ওর পরীক্ষার পর যে একটি সপ্তাহ আমার কাছে ছিলো সে সময়টিতে ও আমার খুব কাছে চলে এসেছে। আর নাহার আসলে সেও খুব খুশি হবো।
ফিরোজের হাতে একদম সময় নেই। এই সময় বাড়িতে যাওয়া অসম্ভব। ওর অফিসিয়াল ফরমালিটি এখনও অনেক বাকি। তাছাড়া বরবাড়ি, কনেবাড়িÑ দু’দিকেই সময় দিতে হচ্ছে ফিরোজকে। অনেক ভাবনা চিন্তা করে ফিরোজ দু’হাতে মিলির মুখটা তুলে ধরে বললো
-তোমার ইচ্ছেটা পূরণ করা হলো। আমি আজই চট্টগ্রামে রেজিস্ট্রি চিঠি পাঠিয়ে দিচ্ছি। মেহরাজ চট্টগ্রাম থেকে চাঁদপুর হয়ে নাহারকে সাথে করে সরাসরি চলে আসে ঢাকায়। কী খুশি তো?
এক সাথে দু’জনকে পেয়ে মিলির খুশির অন্ত নেই। ফিরোজকে জড়িয়ে ধরে আনন্দে নাচতে লাগলো সে।
মহা ধুমধামে হয়ে গেলো শামীমের বিয়েটা। হল ছাড়ার পর মিলিদের মিরপুরের নতুন বাড়িতে ফিরোজের জন্য একটা রুম রাখা হয়েছে। ফিরোজ ওখানেই থাকে বেশিরভাগ সময়। তবে হাতে সময় থাকেলে শামীমদের বাসাতেই চলে যায় সে। বিয়ের সাজে শামীম-মিলিকে দারুন লাগছিলো। সেদিন নাহারও শাড়ি পড়েছিলো। শাড়ি পড়ে যখন নাহার ফিরোজের সামনে এসেছে অপরিচিত মেয়ে মনে করে ফিরোজ পাশ কেটে চলে যাচ্ছিলো। পিছন থেকে নাহার ভাইকে জড়িয়ে ধরে হাসতে লাগলো। ফিরোজ ভয়ে মুখ ফিরিয়ে তাকাতেই বোনকে দেখে অবাক। নিজের চোখকেই বিশ্বাস করাত পারছিলো না। নাহার এতো সুন্দর! অপলক তাকিয়ে থাকলো এই অপরূপা সহোদরার দিকে।
-হয়েছে আমাকে আর দেখা লাগবে না। চলো তোমাকে আপু ডাকছে। বলেই নাহার ফিরোজকে টেনে কনের ঘরে নিয়ে গেলো। মিলির চারপাশে তার কয়েকজন বান্ধবী। নাহার গিয়ে বসলো মিলির পাশে। ফিরোজ ধন্ধে পড়ে গেলো কে বেশি সুন্দরী। বয়সের কারণে এখনো কিশোরী ভাবটি যায়নি নাহারের চেহারা থেকে। চারদিকে মেহমান। ফিরোজ আর বেশিক্ষণ সেখানে থাকতে পারলো না। মহা ধুমধামের সাথেই শেষ হয়ে গেলো মিলি-শামীমের বিয়েটি।
বিয়ের দু’দিন পর নতুন জামাই নিয়ে বেড়াতে এসেছে মিলি। বিকেলে নাস্তার পর মিলি ও শামীমের সাথে নূর জাহান বেগম কথা বলে মিলির মায়ের ঘরে ডাকলো ওদেরকে। শামীমকে বললো ফিরোজকে ডেকে আনতে।
একটা সোফায় শামীম ও ফিরোজের মাঝখানে বসলো মিলি। মা বসেছেন খাটে। কেউ কথা বলছে না। ফিরোজ ছাড়া সবার মুখেই চাপা হাসি। মিলি শামীমকে খোঁচাচ্ছে। আবার মিলি ইশারা করছে তার মাকে। খোঁচাখুঁচি ও চোখাচোখির এই রহস্যের গিট খুলতে পারছে না ফিরোজ।
পরে মিলিই চাইলো ফিরোজের দিকে। ওর হাত দু’খানি ধরে বললÑ
ভাইয়া তুমি তো কখনো ভাইয়ের অভাব আমাকে বুঝতে দাওনি। আমার শেষ ইচ্ছেটাও তুমি পূরণ করেছো। তোমার কাছে আরেকটি জিনিস চাওয়ার ছিলো আমাদের।
ফিরোজ ওর চাওয়াটি বুঝতে পারে না। চাওয়ার মধ্যে তো আনন্দ থাকে। কিন্তু এখানে সে রকমটি বোঝা গেলো না। বললো
-আগে শুনি তুমি কি চাও? আমার কাছে।
-আমরা নাহারকে আমাদের কাছে রেখে দিতে চাই।
-রেখে দিতে চাও মানে? ফিরোজের চোখে বিস্ময়!
এবার মুখ খুললেন মিলির মা।
-নাহারকে আমার কাছে রেখে দিতে চাই বাবা।
ফিরোজ মায়ের কথা ঠিক বুঝতে পারলো না। এর দিকে ওর দিকে তাকাতে লাগলো।
-নাহারকে আমরা সাব্বির ভাইয়ের বউ করে রেখে দিতে চাই ভাইয়া। কিছুটা হাসি নিয়ে আবদারের সুরে বললো মিলি।
-হোয়াট! ফিরোজ বসা থেকে দাঁড়িয়ে গেলো। সবার মুখের দিকে চোখ দু’টি ঘুরিয়ে আনলো একবার। তোমরা আমাকে করুণা করতে চাইছো? এই বুঝলে আমাকে এতোদিন। ঘরহীন, বাড়িহীন, ঠিকানাহীন এই মেয়েকে তোমরা চাচ্ছো বউ করে আনতে? উত্তেজনায় ফিরোজের ঠোঁট কাঁপছে। শামীম উঠে দাঁড়ালো প্রিয় বন্ধুটিকে শান্ত করতে। ফিরোজ আরো কিছু বলতে চাইলো। শামীমের হাত ফিরোজ মুখ থেকে আর কোনো কথা বের হতে দিলো না। এবার খাট থেকে নেমে কথা বললেন মিলির মা।
-বাবা! নাহারের বর হবার কোনো যোগ্যতা সাব্বিরের নেই। বয়সে সাব্বির তোমারও দু-এক বছরের বড়ো হবে। ও একটা ডিগ্রি পাস ছেলে। তুমিও বড়ো চাকুরি পেয়েছো, মেহরাজ ডাক্তার হয়ে বের হবে। নাহারও পড়াশোনা করছে। আর বাড়ির কথা বলছো, এটাতো দু’দিন বাদে তোমারও হবে। আমি নাহারের চেয়ে এমন আপনজন আর কোথায় পাবো বাবা! তুমি যদি এ প্রস্তাবটি কবুল করো তাহলে আমাদের প্রতিই তোমার করুণা করা হবে। নূর জাহান বেগমের শেষ কথাটি বলতে গিয়ে চোখের পাতা ভিজে উঠে।
ফিরোজ কিছুটা শান্ত হয়। জড়িয়ে ধরে মা’কে।
-আমাকে মাফ করবেন মা। আমি আপনাকে কষ্ট দিতে চাইনি। বর হিসেবে সাব্বির কতোটা উপযুক্ত তা আমি জানি। সে কেনো পড়াশোনা শেষ না করে বিদেশ গেলো তা আমার ভালোভাবে জানাও নেই। শুধু পারিবারিক বিষয়টাই জানি। এ কয়দিনে নিরহংকার অমায়িক সাব্বিরকে দেখে, বিদেশ ফেরৎ অন্য ছেলেদের সাথে আমি তুলনা করে মিলাতে পারিনি। কিন্তু আমি বলছি সাব্বিার তো যে কোনো শিক্ষিত সুন্দরী ধনাঢ্য বাড়িতে বিয়ে করতে পারে। এই অজপাড়াগাঁয়ের নদী ভাঙা পিতা-মাতাহীন অনাথ মেয়েকে কেনো আপনারা বউ করতে চাইছেন।
-তুমি অনাথ বলছো কেনো? আমি কি ওর মা নই? ফিরোজ এই মহিলার মাতৃহৃদয় বোঝে। নাহার এই ঘরের বউ হয়ে আসবে এটা স্বপ্নেও কল্পনা করেনি ফিরোজ। কি বলবে সে?
মিলি ফিরোজের দু’টি হাত ধরে বললো
-ভাইয়া দেখো, তোমার চোখে পানি। তুমি সারা জীবন কেদেঁছো। তোমাকে আর চোখের পানি ফেলতে দেবো না। মিলি ওর মেহেদীরাঙা হাত দু’টি দিয়ে ফিরোজের চোখের পানি মুছে সোফায় বসিয়ে দিলো। হাঁটু গেড়ে নববধূ ফিরোজের কোলে মাথাটি রেখে চাইলো ওর মুখের দিকে।
-বলো ভাইয়া তুমি রাজি?
-কিন্তু সাব্বির, নাহার ওদেরও তো মতামত দরকার।
Ñ ওদের নিয়ে তোমার ভাবতে হবে না। তুমি নিজের মতটা বলো।
ফিরোজের মুখে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠলো। মিলি আনন্দে নাচতে লাগলো ফিরোজকে ধরে।

আরেকটা ঘরে নাহার আর মেহরাজের চেচামেচি শোনা যাচ্ছে। সুযোগ পেলেই মেহরাজ নাহারকে নানান ছুতায় খ্যাপায়। দু’জনের মিলতেও বেশি সময় লাগে না। আবার ঝগড়া করতেও কারণ লাগে না। খট খট আওয়াজ করে চলে আসলো মিলির মায়ের ঘরে। ফিরোজের সামনে গিয়ে বললোÑ ভাইয়া তুমি মেঝো ভাইয়াকে কিছু বলবে?
আরও কিছু বলতে যাচ্ছিলো তার আগেই মিলি নাহারকে জড়িয়ে ধরে নাচা শুরু করে দিয়েছে। নাহার তার কারণ খুঁজে না পেয়ে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকালো লাগলো সবার দিকে।

ফিরোজের হাতে বেশি সময় নেই। সবার পিড়াপিড়িতে ফিরোজের জয়েন করার আগেই নাহারের বিয়ের কাজটা শেষ করতে চাইছে মিলি ও তার মা। শামীমদের বাড়িটাই কনের বাড়ি হয়েছে। হাকিম সরকার কোনোভাবেই মেনে নিতে পারেননি এই সিদ্ধান্ত। ফিরোজের যুক্তিতে পরে রাজি হয়েছেন। হাকিম সাহেব নিজে উপস্থিত থেকে কনে সমর্পনের কাজটি করেছেন। বাড়ি থেকে ফিরোজের সৎ মা আয়েশা আক্তার ফিরোজের ছোট ভাইবোনদের নিয়ে এসেছেন বিয়েতে।
একসাথে দু’টি বিয়ের ধকল সামলাতে সামলাতে ফিরোজ নিজের দিকে নজর দিতে পারেনি। শুধু অফিশিয়াল ফরমালিটিজ শেষ করতে পেরেছে মাত্র। আগামীকাল জানা যাবে ফিরোজ কোথায় জয়েন করবে। এরমধ্যে পাসপোর্ট হয়ে গেছে। বিমান টিকেট অফিস করে রাখবে। জরুরি কিছু কেনাকাটা আজকের মধ্যেই সারতে হবে।
হলের সবার সাথে একবার দেখা করতে গিয়ে সুইটির একটা রেজিস্টার্ড চিঠি পায় ও। গতোকাল এসেছে চিঠিটা। ভাঁজ খুলতেই ওর হাতের গোটা গোটা অক্ষরের ভিতর সুইটির মায়াবী চেহারাটা ভেসে ওঠে চোখের সামনে। চিঠিটা খুব দীর্ঘ নয়। বক্তব্য যা তা হলোÑ ‘বাবা চট্টগ্রামের খালুর মাধ্যমে কানাডা প্রবাসী এক ছেলের সাথে ওর বিয়ে ঠিক করে ফেলেছেন। ওই ছেলে দুই সপ্তাহের জন্য এসেছে দেশে। বাড়ি চট্টগ্রাম। খালুর পরিচিত। বাবা চট্টগ্রাম এলে খালাতো বোনকে সঙ্গে করে আমাদের একটা চাইনিজে দুপুরের খাবার নাম করে নিয়ে গেছে। বিয়েটা সেরে আবার চলে যাবে। এরপর অনুষ্ঠান করে নিয়ে যাবে কানাডা। এখানে বিয়ে হওয়া আমার মৃত্যুর সামিল।’ শেষের অংশ পড়তে ফিরোজের খুব কষ্ট হয়েছে। কি লিখেছে তার পাঠোদ্ধার করা কষ্টসাধ্য ব্যাপার। চোখের পানিতে লেখা লেপ্টে গেছে। কান্না করতে করতেই লিখেছে চিঠিটা। ফিরোজের ভাগ্যের গ্লাসটি হাত থেকে পড়ে চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে গেলো। চিঠিটা হাতে করে কতোক্ষণ হতভম্ভের মতো দাঁড়িয়ে রইলো ফিরোজ। গোটা আকাশ ঘুরছে।

কিছুক্ষণ পর নিজেকে সামলে নিয়ে শামীমকে একটা ফোন করার জন্য ফোন ফ্যাক্সের দোকানে ঢুকলো। শামীম বাড়িতে নেই। মিলিদের বাসায় ফোন করে পাওয়া গেলো ওকে।
-শামীম আমি নীলক্ষেতে। বলেই আর কিছু বলতে পারলো না। কান্নায় ওর কন্ঠ জড়িয়ে যায়। সুইটির চিঠি পেয়েছি। নীলক্ষেতের দোকানের নামটা বলে রিসিভার রেখে দিলো। শামীম রিসিভার রেখে দিয়ে বের হয়ে আসলো নীলক্ষেতের উদ্দেশ্যে। ফিরোজ কি করবে ভেবে পায় না। সুইটিকে ঘর থেকে বের হতে দিচ্ছে না।
সবকিছু সিনেমার ঘটনার মতো মনে হয় ওর কাছে। সুইটির বাবা নিশ্চয়ই এখন চট্টগ্রামে। খালাম্মা ও ওর বোনরা হয়তো এর মধ্যে রওয়ানা দিয়েছে ওখানে। অনুষ্ঠানটি যে একেবারে পরিবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ তাও লিখেছে সুইটি। ‘ওই মোটা ছেলেটাকে যখন খালু আমাদের সাথে খেতে বসিয়েছেন তখন আমার মন চাইছিলো ওখান থেকে উঠে যেতে। খালুর সম্মানের কথা চিন্তা করে সেই কাজটিও করতে পারিনি। পরে যখন ওর মা আর ভাইবোনদের নিয়ে খালুদের আগ্রাবাদের বাসায় আসলো তখন আর আমার বুঝতে বাকি থাকলো না কিছুই।’ ওর খালাতো বোন রিমি সবকিছুই ওকে এসে বলেছে। সুইটি আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলো একবার। এর চেয়ে মরে যাওয়াও ভালো। পরে ফিরোজের কাছে চিঠি লেখার সিদ্ধান্তটি নিয়েই ওর জন্য অপেক্ষা করছে।

-কিরে তোকে এরকম লাগছে কেনো? ফিরোজের ফোনটি পেয়েই শামীম চলে আসলো উল্কা বেগে। সুইটির চিঠিটা কম্পিত হাতে দিলো শামীমকে। শেষের দিকে লেখাগুলো এতোটাই জড়িয়ে গেছে যে শামীম বারবার পড়ে তার মর্মটাই উদ্ধার করতে পেরেছে মাত্র। চিঠি থেকে মুখ তুলে চাইলো ফিরোজের দিকে। যে বন্ধুটি সারাক্ষণ মানুষের চিন্তায় অধির। যে অন্যের ভাঙা জোড়া লাগাতেই ব্যস্তÑ তার ভাগ্যটা এরকম কেনো? শামীম স্তব্ধের মতো কতোক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললো
-তারিখ দেখে তো মনে হচ্ছে বিয়েটা কাল। আর তো দেরি করা ঠিক হবে না। রাতের গাড়িতেই যেতে হবে। যাতে সকাল সকাল সুইটির খালার বাসায় পৌঁছানো যায়। চল আগে বাসাই যাই। যেতে যেতে পরিকল্পনা করা যাবে।
দু’বন্ধু রওয়ানা দিলো মিলিদের বাসার উদ্দেশ্যে। বাসায় এসে অল্প সময়ের মধ্যে তৈরি হয়ে ওরা বের হয়ে পড়েছে চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে।