ভোর ছয়টায় এসে চট্টগ্রাম পৌঁছলো ওরা। একটি হোটেলে উঠে গোসল সেরে শামীম ফিরোজকে ফ্রেস হয়ে নিতে বললো। একটু ঘুমিয়ে নিয়ে একসাথেই বেরিয়ে পড়বো। ফিরোজ জানালা দিয়ে তাকিয়ে বাহিরের গাড়িগুলোর আসা-যাওয়া দেখছে। চট্টগ্রামও ঢাকার মতো ব্যস্ত নগরী। উঁচুউঁচু বাড়িগুলোর অনেক জানালাই বন্ধ। এই শহরেই কোনো একটি বাড়িতে আছে সুইটি। ফিরোজের স্বপ্নপরী, রাজকন্যা। একটা দিন মানুষের জীবনে কতো পরিবর্তন নিয়ে আসে। একটি ঘটনা মানুষের জীবন কতোভাবে পাল্টে দিতে পারে। ফিরোজ প্রতিজ্ঞা করেছিলো যোগ্যতার সনদ নিয়েই নজরুল মাস্টারের সামনে হাজির হবে সে। চেয়েছিলো চাকুরির বেতনটা হাতে পেয়ে দেখা করতে যাবে সুইটিদের বাড়িতে। কিন্তু এই রৌদ্রোজ্জ্বল আকাশে হঠাৎ এসিড বৃষ্টি হয়ে যে সবকিছু ক্ষত-বিক্ষত করে দেবে- তা কে ভেবেছিলো। দু’ঘন্টা ঘুম দিয়ে শামীম উঠে দেখে ফিরোজ এখনো বারান্দায় দাঁড়িয়ে।
-কিরে তুই এখনো এখানে দাঁড়িয়ে? গোসল ও তো করিসনি। নয়টা বাজলো প্রায়। রেডি হয়ে নে।
ফিরোজ চোখ ফিরে চাইলো শামীমের দিকে। মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি। সারারাত না ঘুমানোর ফলে চোখের নিচে কালি পড়ে আছে। গতোকাল দুপুরেও খায়নি। রাতে কুমিল্লা এসে হোটেলে একটি নান আর একটু সবজি খেয়েছিলো। ফিরোজ হাত মুখ ধুয়ে প্যান্ট শার্ট চেঞ্জ করে নিলো। গোসল করার ইচ্ছে নেই ওর। হোটেলে নাস্তা সেরে সুইটির দেয়া ঠিকানা ছুটলো ওরা। বাসাটা কাছেই। রিক্্রাওয়ালা চিনতে পেরেছে। তিনতলা বাড়িটার সামনে এসে নামলো ফিরোজ ও শামীম দারোয়ানকে জিজ্ঞেস করতেই বলে দিলো দোতলায় যেতে। ভিতরে মহিলা ও ছেলেমেয়ের কন্ঠ শোনা যাচ্ছে। শামীম কলিংবেল চাপ দিতে বিশ একুশ বছরের একটা মেয়ে দরজা খুলে সামনে দাঁড়ালো। দু’জন সুদর্শন যুবককে সামনে দেখে মেয়েটি তার ওড়না ঠিক করে কি বলবে বুঝতে পারছে না। দরজার পাল্লাটাতে হাত রেখে বললো
-আপনারা! ঠিক চিনতে পারলাম না। ভিতর থেকে একজন বয়স্ক মহিলা চেচিয়ে বললেন
-কে রে রিমি! শামীম গলা খাকারি দিয়ে বললো
-আমরা ঢাকা থেকে এসেছি। রিমি সুইটির বিষয়টি জানতো। চিঠিটা সেই পোস্ট করেছে। শামীমের দিকে তাকিয়ে বললো
-আপনি ফিরোজ ভাইয়া না!
-না আমি শামীম আর ও ফিরোজ।
-স্যরি ভাইয়া আমি ঠিক আপনাদের চিনতে পারিনি। আসুন, ভিতরে আসুন।
কাঁদতে কাঁদতে সুইটির চোখ দু’টি ফুলে গেছে। কলিংবেলের শব্দে চমকিত হয়ে গেছে কানাডা প্রবাসী দৈত্যের মতো সেই মোটা লোকটা চলে এলো কিনা। দরজাটা বন্ধ। রিমি ফিরোজ ও শামীমকে ড্রইংরুমে বসতে বলে চলে গেলো সুইটির রুমে। কান্নাধোয়া মুখটা তুলে চাইলো রিমির দিকে। কতোগুলো প্রশ্নের দৃষ্টি ছুড়ে দিলো রিমির দিকে। রিমিও বুঝতে পারে তার বিধ্বস্ত এই বোনটির কষ্টের ভাষা।
-আপু ফিরোজ ভাইয়া …। রিমির কথা শেষ হবার আগেই বিছানা থেকে লাফিয়ে পড়লো সুইটি।
-কোথায় সে?
-ড্রইংরুমে।
সুইটি যেভাবে ছিলো সেভাবেই দৌড়ে চলে গেলো ড্রয়িংরুমের দিকে। ফিরোজকে জড়িয়ে ধরে কান্নার নদীটি প্রবাহিত করে দিলো বিপুল বেগে। ফিরোজ তার একটি হাত সুইটির মাথায় রেখে বললো
-আমি আর তোমার কান্না দেখতে চাই না। আমি নিজেকে যোগ্য করে তোমার সামনে হাজির হয়েছি। আশা করি খালুজান আমাকে নিরাশ করবেন না। গতোকাল রাতে সুইটির মা-ও এসেছেন এ বাড়িতে। কান্নার শব্দ শুনে তিনি ড্রয়িংরুমে আসলেন। ওরা চারজনই দাঁড়িয়ে ছিলো। দরজা সরানোর শব্দে সামনে তাকাতেই ফিরোজ সুইটির মা’কে পা ছুঁয়ে সালাম করলো। আনন্দ-অবাক-বিস্ময়ে সুইটির মা কি বলবেন তা বুঝে উঠতে পারলেন না। ফিরোজকে দেখে তিনি যেমন আনন্দিত হয়েছেন আবার এ অবস্থায় স্বামী নজরুল মাস্টার ওর সাথে এই বিয়ে বাড়িতে কী আচরণ করেন তা নিয়েও কঠিন ভাবনায় শঙ্কিত। আবার নতুন আত্মীয়বাড়ির লোকজন যদি ফিরোজ ও সুইটির এই নিষ্পাপ সম্পর্কটাকে অন্যভাবে দেখে তবে এই মেয়েটির ভাগ্যে যে কি ঘটবে তা কেবল খোদাতালাই বলতে পারেন। সকল ভাবনার জাল ছিঁড়ে বর্তমানে ফিরে আসেন সুইটির মা। ফিরোজকে কদমবুচি অবস্থা থেকে টেনে তুলে বললেন
-বাবা তুমি কেমন আছো? ফিরোজ তার শুকনো মুখটাতে একচিলতে হাসি নিয়ে বললো
-ভালো, খালাম্মা। সুইটির মা সবাইকে বসতে বলে ফিরোজের খোঁজ খবর নিচ্ছেন। কিছু কেনাকাটার জন্য সুইটির খালু নজরুল মাস্টারকে সঙ্গে করে নাস্তার পরপরই বাইরে গেছেন। অনুষ্ঠান ছোট হলেও আয়োজনের কমতি রাখা চলবে না। এমনিতেই চাটগাঁওয়ালার ভোজন রসিক মানুষ।
ভিতরে ঢুকেই মাস্টার সাহেব জরুরি কিছু কথা-বার্তা বলার জন্য স্ত্রীকে খুঁজলেন। রান্নাঘর, শোবার ঘর কোথাও না পেয়ে জানলেন ড্রইংরুমে আছেন। ড্রয়িং রুমে ঢুকেই ফিরোজকে দেখে মাথায় বাজ পড়ার মতো অবস্থা তার। বিয়ে বাড়িতে কোথা থেকে হাজির হলো এই আপদ। ক্রোধে তার সারা শরীর কাঁপতে লাগলো। সবাই বসা অবস্থা থেকে দাঁড়িয়ে গেলো। একটা থমথমে অবস্থা ঘরটায়। প্রবল ঝড় আসার আগে যেরকম অবস্থা থাকে আকাশের এই ঘরটির অবস্থা এখন সেরকম।
-তুমি কোথা থেকে এসেছো এখানে? কেনো এসেছো? আজ ওর বিয়ে। কোন মতলব নিয়ে ঢুকেছো এ বাড়িতে? ফিরোজ কোনো প্রশ্নের উত্তর দিলো না। মাথাটি নিচু করে তার এই অহংকারী, রাগী নিজের সিদ্ধান্তে সর্বদা অবিচল থাকা স্যারের বর্শার মতো প্রতিটি অপমানজনক কথা বুক পেতে সয়ে গেলো। আর অফুরান চোখের নদী থেকে সারাজীবন যে অশ্রুধারা প্রবাহিত করেছে তার শেষ অধ্যায়ের দুটি প্রবাহমান ধারা বইয়ে দিতে চাইলো নজরুল মাস্টারের দিকে। যে সনদ সে অর্জন করেছে তা দিয়ে যে অনায়াসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টারির চাকুরি পাবেÑ তা আর এই প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষককে বোঝাতে গেলো না। ফিরোজ কম্পিত হাতে যথার্থ সম্মান রেখে তার এপয়েন্টমেন্ট লেটারটি বাড়িয়ে ধরলো নজরুল মাস্টারের দিকে।
-কি এটা?
-আপনি যে উপদেশ দিয়ে আমাকে আপনার বাড়ি থেকে পাঁচ বছর আগে অপমান করে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন তার যোগ্যতাপত্র। নজরুল মাস্টার খামটি খুললেন। নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছেন না। দুই হাজার ডলার বেতন। ডলারের হিসাবটি মনে মনে কষে বিস্ময়ে হতবাক। সেই সাথে অন্যান্য সুবিধা তো আছেই। কিন্তু আজ যে বিয়ে! তার কি হবে? তিনি নিজের কথার নড়চড় করতে পারবেন না। যে ছেলেটির সাথে সুইটির বিয়ে ঠিক হয়েছে তার কানাডাতে ব্যবসা আছে। মাসে পাঁচ লাখ টাকার মতো আয় করে। বিদ্যায় সে ফিরোজের ধারে কাছেও ঘেঁষতে পারবে না। সারা জীবনে কথার নড়চড় করেননি মাস্টার সাহেব। আজও না। তাছাড়া এখানে তার ভায়রার মান-সম্মান জড়িত। চট্টগ্রামে তার যে পরিচিতি, সম্মান, গ্রহণযোগ্যতা আছে-তা ধূলায় লুটাতে দেয়া যাবে না। খামটি তিনি ফিরোজের হাতে ফেরৎ দিলেন। মুখে স্বভাবজাত গাম্ভীর্য ধরে রেখে বললেন
-যোগ্যতার মাপকাঠিতে তুমি ঊত্তীর্ণ হয়েছো। তোমার প্রচেষ্টা, মনোবল তোমাকে সাফল্য অর্জনে সহায়তা করেছে। কিন্তু আমি পাকা কথা দিয়ে ফেলেছি। তাছাড়া এখানে আমার ভায়রার মান-সম্মান জড়িত। জোহরের পরপরই বরপক্ষ এখানে আসবে। নিয়োগপত্র অনুযায়ী আগামীকাল তোমাকে চাকরিতে যোগদান করতে হবে। তাও আবার সিঙ্গাপুর। এখন আর তোমার সময় নষ্ট করা ঠিক হবেনা। তাই তুমি সময় নষ্ট না করে এক্ষুনি রওয়ানা দাও। আগের মতো অপমানজনক কথা না বললেও অপমানের আর কম রাখেননি নজরুল মাস্টার। তার শেষ কথাটি বলার সাথে সাথে হাউমাউ করে সুইটি লুটিয়ে পড়লো তার মায়ের কোলে। গতোকাল এসেই আদরের মেয়েটির চোখে পানি আর অন্তরের ধুকপুক শুনে তিনি এ বিয়েতে এমনিতেই কিছুটা অমত আছেন। আর এখন ফিরোজকে পেয়ে দু’টি মানুষের জীবন যাতে নষ্ট না হয় তার চেষ্টাটাই করছেন। মেয়েটিকে বুকে রেখে স্বামীর দিকে কঠোর দৃষ্টি দিয়ে বললেন
-সারা জীবন তুমি আমাকে কষ্ট দিয়েছো। এখন মেয়েটার জীবন বিপন্ন করেছো। তুমি না ওর পিতা ! তুমি কেমন বাবা! কোন মায়া-মমতা-ভালোবাসা কি তোমার হৃদয়ে নেই। মেয়েটির মুখের দিকে একবার চোখ তুলে চাও । দেখো একবার।
-যাই বলো, আমার কথার নড়চড় হবে না। আমি কারো কাছে ছোট হতে পারবো না।
-তোমার ছোট হওয়া লাগবে না। আমিই ছোট হবো। আমি নিজে গিয়ে মাপ চেয়ে আসবো তাদের কাছে।
-আমার ধৈর্যের বাঁধ ভাঙবে না বলেদিলাম। বিয়ে এখানেই হবে।
-আমি তোমার এ সিদ্বান্ত মানি না বাবা। চিৎকার করে উঠলো সুইটি। নজরুল মাস্টার ঠাস করে একটি চড় বসিয়ে দিলো সুইটির গালে। ও ঘুরে পরে গেলো সোফাটার উপর। ফিরোজ ওর একটা হাত ধরে তুলতে গেলো সুইটিকে। খবরদার! তুমি আমার মেয়ের গায়ে হাত দেবে না । তুমি এখুনি বিদায় হও এখান থেকে। আর কোনোদিন আমার সামনে আসবে না।
-খালুজান আপনি আমার প্রতি এতোটা কঠোর হবেন না । আপনার পায়ে পড়ি । বিশ্বাস করুণ, আপনার নির্দেশ মানতে গিয়ে আমি গত পাঁচটি বছর একবারের জন্যও সুইটির সাথে দেখা করিনি । জীবনের ঘাত প্রতিঘাত পার হয়ে নিজেকে যোগ্যরূপে গড়ে তুলতে চেষ্টা করেছি। বড়ো আশা নিয়ে, স্বপ্ন নিয়ে চাকুরিতে যোগ দিতে চেয়েছিলাম। ইচ্ছে ছিলো প্রথম বেতনের টাকায় মিষ্টি নিয়ে আপনার সাথে দেখা করতে যাবো। কিন্তু আমার পায়ের তলার যে শুষ্ক মরুভূমি, চোখের পানি যে তাকে ভিজাতে পারে না। জীবনের প্রতিটা কাজেই যেনো এই মরুভূমিই সামনে এসে দেখা দেয়। মরুদ্যানের দেখা আর পাই না। ভেবেছিলাম আপনার, খালাম্মার মুখের দিকে চেয়ে মা-বাবার অভাব ভুলে থাকবো।
মাস্টার সাহেবের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যাচ্ছে। সুইটির খালুও বাজার থেকে এসে শোরগোলের শব্দ পেয়ে এঘরে চলে এসেছেন। বেলা বাড়ার সাথে সাথে তাদের আত্মীয় স্বজনও আসতে লাগলো রিমিদের বাসায়। কথা বলতে বলতে ফিরোজ লুটিয়ে পড়লো নজরুল মাস্টারের পায়ে ।
-খালুজান আমি অনেক আসা নিয়ে এ বাড়িতে এসেছি । আপনি আমাকে নিরাশ করবেন না। নজরুল মাস্টার তার পা দু’টো সরিয়ে নিলেন। তুমি আর নাটক করো না। বিয়েটা আত্মীয় বাড়িতে হচ্ছে। এদের সম্মানের কথাটা চিন্তা করাও তোমার মতো একটা শিক্ষিত ছেলের কাছে আশা করি। জীবনটা সিনেমার মতো নয়। ইচ্ছা করলেই সবকিছু করা যায় না। মেহমান আসতে আর বেশি বাকি নাই। তুমি বের হও এখানে থেকে। বলেই ফিরোজের হাতটি ধরে দরজার দিতে এগিয়ে গেলেন। শামীম তাদের এই বাকযুদ্ধে কি বলবে ভেবে পেলো না। খালাম্মা আর ফিরোজ যা বলেছে এর চেয়ে বেশি আর কিই বা বলার আছে। আশার শেষে সূর্যটি যখন অস্তমিত হলো তখন আর সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা যায় না। মাস্টার সাহেব ফিরোজকে যখন টেনে বের করে দিচ্ছেন তখন সুইটি দৌড়ে এসে চিৎকার করে বললো
-ফিরোজ তুমি যেও না, আমাকেও সঙ্গে নিয়ে যাও। নজরুল মাস্টার কষে একটা ক্রোধের চড় বসিয়ে দিলো সুইটির গালে। দুর্বল শরীরটি আর তা হজম করতে পারলো না। লুটিয়ে পড়ে মূর্ছা গেলো। সে দৃশ্য দেখার আর সুযোগ পেলো না ফিরোজ। অপমান, লাঞ্ছনার সাথে বের করে দিলো তাকে। রাত দশটা বাসায় এসে পৌঁছলো শামীম ও ফিরোজ। সকাল সাতটায় ফিরোজের চেক আউট। ফিরোজ ও শামীমের চট্টগ্রাম যাওয়ার বিষয়টি মিলি ছাড়া কেউ যানে না। মিলি ও নাহার ওর সবকিছুই গুছিয়ে রেখেছে। দরজা খুলে ফিরোজের চেহারা দেখে আৎকে উঠলো মিলি ও নাহার। একি অবস্থা প্রিয় ভাইটির! ফিরোজ যে শূন্য হাতে চট্টগ্রাম থেকে ফিরে এসেছে তা আর বুঝতে বাকি রইলো না মিলির। ফিরোজ তার ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিলো। এক অপ্রতিরোধ্য কান্না যা সারাটা পথ জমে ছিলো তা বের হয়ে এলো পাথর ফাটা ঝর্ণার মতো। মিলি, নাহার, শামীম দরজায় অনবরত নক করতে লাগলো। কিন্তু দরজা খুলছে না ফিরোজ। কোনো অঘটন ঘটিয়ে ফেলবে না তো ফিরোজ! একটি শঙ্কা শামীমের মনে। সে সবাইকে সরিয়ে দিয়ে দরজার সাথে মুখ নিয়ে বললো ফিরোজ আমি একা। দরজা খোল বন্ধু। জরুরি কথা আছে। শামীম পিছনে দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলো ঘড়ির কাঁটা একটা ছুঁই ছুঁই করছে। চারটি মানুষ শুধু জেগে আছে। মিলির আম্মার প্রেসার বেড়ে যাওয়াতে আটটার দিকে ঘুমিয়ে পড়েছেন। সাব্বির গেছে গ্রামের বাড়ি। কাল সকালে সরাসরি এয়ার পোর্ট এসে পৌঁছাবে। শামীমের ডাক, করাঘাত আর অনুরোধে ফিরোজ দরজা খুলে দিলো। শামীম একপাশে বসে মাথায় আঙুল চালালো ফিরোজের চুলগুলোতে। ব্যাচেলর জীবনে যে রকমটি করতো ওরা।

-কালকে তোর ফ্লাইট। সকাল সাতটায় চেক আউট। গোসল সেরে সেভ করে কয়টা খেয়ে একটু বিশ্রাম নে। আমি পাঁচটায় তোকে ডেকে দেবো। মিলি নাহার ওরা কেউ খায়নি এখনো। ওঠ। শামীম উঠাতে চেষ্টা করে ফিরোজকে। এর মধ্যে নাহার মিলি চলে আসে ফিরোজের ঘরে। দু’জন বসে ফিরোজের দু’পাশে। তিন জনে জোর করে তুলে ফেলে তাকে। দু’টি ফুটফুটে নব্য পরিণীতার দিকে চেয়ে ফিরোজ তার কষ্টটাকে চাপা দিয়ে একটু হাসার চেষ্টা করলো। দু’টি বোনের আনন্দের দিনে অশ্রু আর ওদের দেখাতে চাইলো না সে। ফিরোজ উঠে বসলো বিছানায়। বাথরুমে গরম পানি দেয়া হয়েছে। মিলির কাজ এটা। কিসের অপ্রাপ্তি তার জীবনে। মা হারানোর পর দু’জন মায়ের ভালোবাসাতো পেয়েছে সে। সৎমা যেমন হয় তার এই মা-টি তো তেমন নয়। কখনো নিজের চাওয়া পাওয়ার কথা চিন্তা করেনি। সেরকমটি হলে তো নাহারের পড়াশোনা হতো না। দু’টি বোনের এতো ভালোবাসা, শামীমের মতো বন্ধু যার আছে, তার আর দুঃখ কিসের। ইস্কান্দার মৃধার কথা আর রোমেলার নাম মনে পড়াতে তাদের বর্তমান অবস্থা চিন্তা করলো সে। সব পাপেরই প্রায়শ্চিত্ব আছে। পালানোর এক সপ্তাহ পর মৃধার সহযোগী হিসেবে রোমেলা ধরা পড়ে তার এক আত্মীয়ের বাড়ি থেকে। পরিবারের কেউ তার খোঁজ নেয় না। দশ বছর জেল হয়েছে তার। গোসল করতে করতে জীবনের প্রাপ্তি আর অপ্রাপ্তির টালি করছিলো ফিরোজ। কি করছে এখন সুইটি। আজ তো তার আক্দ হলো। সেকি বর হিসেবে এই ছেলেকে কবুল করবে? এই অনুগত মেয়েটি তার পিতার সামনে যে দুঃসাহস দেখিয়েছে এটা ভাবতে গেলেও ফিরোজের কষ্ট হয়। আমি কিছুই করতে পারলাম না। একটা একাকি জীবনের ভার বয়ে বেড়াতে হবে সারা জীবন।

এই কোম্পানির চাকরিটি বেশিদিন করবে না বলে মনস্থির করে ফেলেছে ফিরোজ। দুই হাজার ডলারের কাছে তার মগজ বিক্রি করবে না সে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতাটাকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে সে। সার্কুলার হলেই এপ্লাই করবে। চরের মানুষের জন্য, নদীভাঙা মানুষের জন্য কিছু একটা করতে হবে। নিজের লাভের চাইতে মানুষের কল্যাণের দিকটাতেই তার আগ্রহ বেশি। চট্টগ্রাম থেকে ফেরার পথে ভেবেছিলো চাকরিতে জয়েন করবে না সে। এই অপূর্ণ জীবনে আর চাকরি করে কী হবে। এখন মনে হচ্ছে অনেক কিছুই তার করার আছে। এই একাকী জীবনের বোঝা টানতে হলে কিছু না কিছুতে ডুবে থাকতে হবে।

বোনদের সামনে কান্নামাখা, বেদনা বিধুর মুখটা আর দেখাতে চাইলো না সে। বাথরুম থেকে বের হয়ে খাবার টেবিল বসলো সবাই। নাহার ভাত মেখে ভাইয়ের পাশে বসলো। ফিরোজ ভাত নিতে যাবে এমন সময় নাহার এক লোকমা ভাত নিয়ে তুলে ধরলো ফিরোজের মুখে। বিস্ময় ভরা চোখে দেখলো আদরের এই বোনটিকে। ওর হাত থেকে দু’দিনের অভূক্ত মুখটি তুলে নিলো ভাতের লোকমাটি। জড়িয়ে ধরে আদর করে মাথায় স্নেহের হাত বুলিয়ে দিলো। মিলিও এগিয়ে এলো আরেক লোকমা ভাত নিয়ে।
-কি কম্পিটিশন শুরু হয়ে গেলো নাকি? এদিকে যে একজন নতুন বর আছে তার মুখেও দাও এক দুই লোকমা।
শামীমের কথায় সবাই হো হো করে হেসে দিলো। শামীমও উঠে গিয়ে ফিরোজের মুখে এক নলা ভাত তুলে দিতে দিতে বললো।
-দোস্ত তুই সব সময়ই হিট।
খুব সকালেই ঘুম থেকে উঠে শামীম সবাইকে ঘুম থেকে ডেকে তুললো। আগে থেকেই গাড়ি রেডি করা ছিলো। সকালের রাস্তা ফাঁকা থাকাতে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই পৌঁছতে পারলো ওরা। বিদায়ের পালা। সবার চোখে পানি। মিলি কাঁদতে কাঁদতে চোখ ফুলিয়ে ফেলেছে। নাহারের অবস্থাও ওর মতোই। দুই হাতে দুই বোনকে জড়িয়ে রেখে নিজেকে সামলাতে পারলো না ফিরোজও। জীবনের দীর্ঘ সফরের সঙ্গী শামীমের কাঁধে মাথাটি রেখে শিশুর মতো কান্নায় ভেঙে পড়লো দু’বন্ধু। সাব্বিরের হাতে প্রিয় বোন নাহারের হাতটি তুলে দিয়ে বললো
-আমার এই এতিম বোনটিকে কখনো কষ্ট দিও না ভাই।
মায়ের বুকে মাথা রেখে প্রথমবার হাইমচর যাবার মুহূর্তটি কথা মনে করলো ফিরোজ। জীবনের কঠিন সময়গুলোতে এই মমতাময়ী নারীর স্পর্শ ফিরোজকে পথ চলতে সহায়তা করেছে।
-মা আমাকে ক্ষমা করে দিয়েন।
ফিরোজের কাতর মুখটি দেখে মা আঁচলে ওর চোখ মুছে দিয়েছেন। মাইকে ঘোষনা আসছে। আর সময় নেই হাতে।
ফিরোজ এক এক করে শামীম, সাব্বির, মিলি, নাহার, মায়ের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ভিতরে ঢুকে গেলো।
লাগেজটি স্ক্যানিং মেশিনে দিয়ে চলে গেলো ওপাশে। এই মেশিনটি যদি তার হৃদয়টি স্ক্যান করতে পারতো! তবে দেখতে পেতো কি এক বেদনা নিয়ে জীবনের প্রথম চাকরিটি শুরু করতে যাচ্ছে ফিরোজ।

বিমান আকাশে উড়ছে। জানালা দিয়ে ইট পাথরের দালানগুলোকে খুবই ক্ষুদ্র দেখাচ্ছে। কতো দূর চট্টগ্রাম! কতো দূর হাইমচর! নদীতে ভাসতে ভাসতে ঢাকা, বাতাসে ভাসতে ভাসতে সিঙ্গাপুর- এই একাকি ভ্রমণের সঙ্গী হলো না কেউ। উদাস দৃষ্টি খোঁজে উদার আকাশ। মানুষের মনের আকাশ উদার হয় না কেনো কোথায় আছে সুইটি! তার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ার মুহূর্তটিতে মনে হয়েছে সে তো একা নয়। কিন্তু মানুষের অহমিকা আর সমাজ যে হৃদয়ের বন্ধনের চেয়ে বড়ো -গতকালই তা আরো কাঠিনভাবে বুঝতে পেরেছে ফিরোজ। দু’দিনের নির্ঘুম চোখ দু’টি বিমানের আরামদায়ক ভ্রমণে ক্রমশঃ বুজে আসলো। আর সেই স্বপ্নপরী হঠাৎ এসে বসে পরলো ফিরোজের পাশের শূন্য আসনটায়। ঘুমের ভিতর চোখ মেলে তাকাতেই দেখলো, ফাঁকা।