জানালার ফাঁক দিয়ে ভোরের সোনালি রোদ ঝলমলিয়ে দিয়েছে ফিরোজদের ছোট্ট কামরাটি। সারারাত শামীমের সেবা করতে করতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছে, তা টের পায়নি ফিরোজ। মায়া মমতা স্রষ্টার এক অলৌকিক সৃষ্টি। দুনিয়ার এ বিচিত্র জায়গায় মানুষ একাকিত্ব মেনে নিতে পারে না বলেই বন্ধুর প্রয়োজন। ফিরোজ ও শামীমের মাঝে গড়ে উঠেছে তাই ঘনিষ্টতা বন্ধুত্ব। দু’জনের মাঝে এতো নিবিড় সম্পর্ক যে একজনকে ছাড়া আরেকজন অচল। একজনের কোনো একটা আঁচড় লাগলেও, ব্যথিত হয় দু’জনেই। এই বন্ধন ছিঁড়ে কখনও কেউ ছিটকে যেতে চায় না। পৃথিবীতে প্রেম ভালোবাসা আছে বলেই মানুষ বেঁচে থাকার রঙিন স্বপ্ন দেখে। তা না হলে মানুষ এক মুহূর্তও বেঁচে থাকতে পারতো না। দরজার কড়া নাড়ার শব্দে ফিরোজের ঘুম ভেঙে যায়। প্রতিদিনের মতো আজ তাড়াতাড়ি উঠতে পারেনি কেউ। তাই পাশের ফ্ল্যাটের সাব্বিরের মা দরজাতে নক করেছেন হয়তো।
ফিরোজ শামীমের মাথাটা বালিশে নামিয়ে রেখে দরজা খুলে দেয়। সাব্বিরের মা ঘরে ঢুকে শামীমের অবস্থা দেখে চমকে ওঠেন। উদ্বেগভরা কণ্ঠে একবার ফিরোজের দিকে তাকিয়ে শামীমের মাথায় হাত রাখলেন। গায়ে ভীষণ জ্বর।
-কি হয়েছে ফিরোজ! শামীমের মাথা কাটলো কিভাবে?
ফিরোজ চেয়ারটা একটু এগিয়ে দিয়ে বললো- কালকে কলেজে একটু গন্ডগোল হয়েছে। এতে শামীম মাথায় আঘাত পায়।
-তোমরা মারামারি করেছো?
ফিরোজ পুরো ঘটনাই বলতে যাচ্ছিলো কিন্তু শামীমের এতোক্ষণে ঘুম ভেঙেছে তাই আর সবটা বলা হলো না। সাব্বিরের মা চলে গেছেন। কিছুক্ষণ পর এক গ্লাস দুধ এনে শামীমের সামনে রাখলেন। পরম স্নেহে নিজ হাতে খাইয়ে দিলেন শামীমকে। খালি গ্লাসটি টেবিলে রেখে ফিরোজের দিকে তাকিয়ে বললেন
-রাত্রে আমাকে ডাকোনি কেনো? আমাদের পাশে তোমরা এতোদিন ধরে থাকো, এতে সংকোচের কি আছে? আমাদের এখনো আপন ভাবতে পারোনি, তাই না? তুমি একটু দোকানে যাও কিছু ফলমূল নিয়ে এসো। আর আমি মিলিকে পাঠিয়ে দিচ্ছি ও শামীমের পাশে থাকবে। এখানে কিছু টাকা আছে। এই নাও।
ফিরোজ কিছুতেই টাকা নিতে রাজি হয়নি। কিন্তু সাব্বিরের মা এক প্রকার জোর করেই টাকাটা ফিরোজের হাতে গুজে দিলেন। মিলি সবেমাত্র স্কুলের ইউনিফর্ম ত্যাগ করেছ। ইন্টারমিডিয়েটে ভর্তি হয়েছে কয়েকদিন হলো। ফুট ফুটে চেহারা। মায়াবী চোখ। ঠোঁট দুটো পাতলা, তাতে গোলাপি লিপস্টিক লাগানো। হালকা নীল রংয়ের সালোয়ার কামিজ পরেছে ও। দেখতে ভারি চমৎকার লাগছে। এর আগেও মিলি ফিরোজদের কামরায় এসেছে। সেটা পড়া বুঝে নেয়ার জন্য। ফিরোজ মিলিকে ছোটবোনের মতোই জানে। শামীম এখন ঘুমিয়ে আছে। মা মিলিকে শামীমের ঘরে বসিয়ে রেখে রান্না ঘরের দিকে চলে গেছেন।
মিলি নিচ থেকে তার চোখ দুটো উঠিয়ে শামীমের সমস্ত শরীরটা একবার ভালো করে দেখে নিলো। এর আগে কখনও মিলি শামীমকে এভাবে দেখেনি। হঠাৎ চোখের সামনে পড়ে গেলো মাথা নিচু করে পাশ কেটে চলে যেতো। সেই মিলি আজ শামীমকে সেবা করতে এসেছে। বার বার মিলির চোখ দুটো চলে যায় শামীমের কপালের বা পাশের তিলটির দিকে। এ তিলটি শামীমের সৌন্দর্য বহুগুণ বৃদ্ধি করেছে।
শামীম চোখ বন্ধ থাকা অবস্থায় ককিয়ে উঠলো।
-পানি, পানি, এক গ্লাস পানি দে ফিরোজ! মিলি গ্লাসে পানি ঢেলে শামীমের কাছে গিয়ে বললো
-এই নিন।
শামীম আবার যেনে মূর্ছা গেছে। কয়েক মিনিট পর আবার পানি চাইলো। আস্তে আস্তে হাত নাড়িয়ে ফিরোজকে খুঁজতে লাগলো। মিলি তার পাশেই গ্লাস হাতে দাঁড়ানো।
-এই নিন পানি। শামীম শরীরটাকে বহু কষ্টে ঘুরিয়ে আনলো। চোখ তুলে তাকালো মিলির দিকে। সে ভুল দেখছে না তো! মিলিকে দেখে বললো
-তুমি এখানে! ফিরোজ কোথায়?
-আগে পানি খেয়ে নিন। তারপর বলছি। ফিরোজ ভাইয়া বাইরে গেছেন। আর আম্মা আমাকে এখানে রেখে গেছেন আপনার দেখাশোনার জন্য।
শামীম পানি খেয়ে গ্লাসটা ফেরত দিলো। মিলির কথায় হতভম্ব হয়ে গেছে শামীম। যে মিলি একবার কোনোভাবে দেখা হয়ে গেলে নিজেকে লুকোবার জন্য ব্যাকুল হয়ে যায় সে এসেছে শামীমের সেবা করতে। এ যে কিছুতেই বিশ্বাস হচ্ছে না। শামীমের যদি এ অবস্থা না হতো তাহলে মিলি কষ্মিনকালেও সাতসকালে এ দোর গোরায় পা বাড়াতো না।
-আচ্ছা তুমি কি সত্যিই আমাকে সেবা করার জন্য এসেছো? একজন অসুস্থ মানুষের সেবা করা তো প্রত্যেক মানুষের নৈতিক দায়িত্ব। এ দায়িত্ববোধ না থাকলে তো মানুষের মধ্যে মমত্ববোধ থাকতো না।
তুমি ঠিকই বলেছ। অসুস্থ হলে মানুষ নিজেকে চিনতেও ভুলে যায়। তখন বড়ো ছোট চেনা তার জন্য দুর্বোধ্য হয়। আর তা যদি কল্পনাতীত হয় তাহলে তো কোনো কথাই নেই।
-আমি আপনার সেবা করতে আসবো, এটা কল্পনাতীত কেনো বলছেন? একজন মানুষের প্রতি কি অন্য কোনো মানুষের কোনো দায়িত্ব নেই? তাহলে তো মানুষ স্বার্থপর ছাড়া আর কিছু নয়।
-না তা বলছি না। তবে তুমি এভাবে সাতসকালে আসবে তা ভাবতে পারিনি।
-এর আগেতো আর কখনও অসুস্থ হয়ে পড়েননি, তাই। ফিরোজ দোকান থেকে ফিরেছে। ঘরে ঢুকতে গিয়েই হকচকিয়ে গেলো। শামীম সুস্থ মানুষের মতোই মিলির সাথে গল্প করছে। ফিরোজ ফলের প্যাকেটটি টেবিলের উপর রেখে বাথরুমের দিকে চলে গেলো । কিছুক্ষণ পর হাত মুখ ধুয়ে শামীমের সামনে একটি চেয়ার টেনে বসলো। এরমধ্যে মিলির আম্মা নাশতার ট্রে হাতে ঘরে ঢুকেছেন। এদিকে হুকুমের অপেক্ষায় না থেকে মিলি আপেল কেটে ওদের সামনে রেখে বললো
-আপনারা খেতে থাকুন। আমি একটু ও ঘর থেকে আসি। ফিরোজ চেচিয়ে বললো
-আরে কোথায় যাও। শোন, তোমাকে আপেলই বা কাটতে বললো কে, আবার না খেয়েই বা চলে যেতে বললো কে? বসো আমাদের সাথে দু’টুকরো খাও। ফিরোজ তাকে আর কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়ে বললো, তোমার রোগীর সেবা করো। আমি একটু বাইরে যাচ্ছি।
-আপনি আমাকে জোর করে বসিয়ে রেখে নিজে না খেয়েই চলে যাচ্ছেন। এটা আবার কেমন কথা। ঠিক আছে এই আমি খেলাম বলে ফিরোজ এক টুকরো আপেল গালে পুড়ে দিলো। শামীমের মুখে এক টুকরা গুজে দিয়ে বসলো ওর মাথার কাছে।
-কিরে মিলি এসে তো দেখছি তোকে পুরো সুস্থ করে দিয়েছে।
-ঘুম থেকে ওঠার পর শরীরটা হাল্কা লাগছে। জ্বরও কমে আসছে। তবে শরীরের ব্যথাটা সারতে মনে হয় আরো দু’দিন লাগবে। তুই গল্প কর। আমি একটু বাইরে থেকে আসি। মিলির দিকে তাকিয়ে বললো- আপু তুমি একটু থাকো।
ফিরোজ কাপড় চোপড় পাল্টিয়ে আবার বের হয়ে পড়লো। ক’দিন টিউশনিতে যায়নি। তার মধ্যে আবার এ ঝামেলায় জড়িয়ে যাওয়া। টাকা পয়সাও দরকার। বাড়ি যাওয়ার প্ল্যানটা আপাতত স্থগিত। বাড়ি ভাড়ার টাকা বকেয়া রয়ে গেছে। এ সপ্তাহের মধ্যেই পরিশোধ করতে হবে। হাতে একটি টাকাও নেই।
ফিরোজ হেঁটেই চললো। রাজধানীর পথ। কতো গলি, বাড়ি-ঘর, দোকান-পাট। যান- বাহনের ভিড়। চারদিকে কোলাহল। ফুটপাতও মানুষের বাড়িঘর হয়ে গেছে। এর মাঝেই বেঁচে থাকার স্বপ্ন সবার মনে। ভাবতে গিয়েও কষ্ট লাগে।
ক’দিনের মধ্যেই শামীম পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠেছে। শরীরের দুর্বলতা এখনো ভালো করে কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি। আজ সকালে ডাক্তারের কাছে গিয়েছিলো। ডাক্তার বলেছেন আরো ক’দিন রেস্টে থাকতে। বিকেলে হাঁটতে হাঁটতে বাড়ির পাশের বাগানটায় এসে একটি কাঁঠাল গাছের শিকড়ে পাশাপাশি বসলো দু’জন। বাগানতো নয় কয়েকটি গাছের সমাবেশ। সূর্যটা ওপাশের চারতলা বাড়িটার জন্য দেখা যাচ্ছে না। বিকেলের সোনালি রোদের আভা ছড়িয়ে পড়েছে চারদিকে। হঠাৎ কোথা থেকে যেনো এক ঝাঁক পাখি গাছের ডালে এসে বসেছে। বাবুই পাখি। কিচির-মিচির ডাকে একটা সুরেলা পরিবেশের সৃষ্টি করেছে। মিলিও বাগানের দিকে হাঁটতে হাঁটতে এক সময় ফিরোজের কাছে এসে জিজ্ঞেস করলো
-কেমন আছেন ফিরোজ ভাইয়া।
-ও মিলি বসো। কলেজ থেকে কখন এলে?
-না বসবো না। শামীম ভাইয়া আপনি পুরোপুরি সুস্থ হয়ে গেছেন?
-হাঁ মোটামুটি সুস্থ।
সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে। পাখির কোলাহল আরো বেড়ে গেলো। মোয়াজ্জিনের স্বর্গীয় আজানের সুর ভেসে এলো পাশের মসজিদ থেকে। শতাব্দীর পর শতাব্দী আজানের এই মোহনীয় ধ্বনি সন্ধ্যার প্রকৃতির সাথে একাকার হয়ে যায়। এই মধুর সুর নিয়ে কতো কবিতা কতো গান রচিত হয়েছে। নামাজি মানুষ এই আজানের সুর শুনে ব্যাকুল হন। ‘কী যে এক আকর্ষণে ছুটে যাই মুগ্ধ মনে কী নিশিথে কী দিবসে মসজিদের পানে’ কায়কোবাদের কবিতার লাইন কয়টি মনে পড়ে ফিরোজের। কি মনে করে আজ ফিরোজ বলছে
-চল শামীম মসজিদ থেকে নামাজ পড়ে আসি। ফিরোজের কথায় অন্যদিন হলে শামীম তাজ্জব হয়ে যেত। কিন্তু আজ নিজের মনের ভেতর থেকেও যেনো একটা সাড়া পাচ্ছে। তাই সে ও যেতে রাজি হয়। আসলে তারা আজকের মতো এতো নিবিড়ভাবে আজানের ধ্বনি শোনেনি। তারা মিলিকে একটু এগিয়ে দিয়ে ছুটে গেলো মসজিদের দিকে।
শামীম খবরের কাগজটি দেখে আনন্দের সাথে চমকে উঠলো। একদমে সমস্ত সার্কুলারটি পড়ে ফেললো।
-ফিরোজ; ফিরোজ; দেখে যা ঢাকা ইউনিভার্সিটির সার্কুলার হয়েছে। আগামী মাসের পনের তারিখ ভর্তি পরীক্ষা। ফিরোজ শামীমের হাত থেকে খবরের কাগজটি হাতে নিয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়তে লাগলো।
পড়া শেষ হলে হাসি মাখা মুখ নিয়ে শামীমকে জাপটে ধরলো। প্রিপারেশনের ঘাটতি রাখা যাবে না। এখন ভর্তি পরীক্ষাই হলো সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা। কমার্স ফেকাল্টির ভর্তি পরীক্ষা সবচেয়ে কঠিন। ঢাকায় চান্স না পেতে যেতে হবে রাজশাহী না হলে চট্টগ্রাম। ওরা কেউই ঢাকার বাইরে যেতে নারাজ। হাতে বেশি সময়ও নেই। কোচিং এ ভর্তি হয়নি ভেবে কিছুটা আফসোস শামীমের। ফিরোজ বললো
-টেনশনের কিছু নেই। কোচিং এর নোট সংগ্রহ করে নিলেই হবে। আমরা একটা রুটিন করে নেই। দুই মাসে দেখবি সব পড়া হয়ে গেছে।
পনের তারিখ চলে এলো। দু’জনেই ভালোমতো পরীক্ষা দিলো। কয়েকদিন স্বাধীন মতো ঘুরলো দু’জনে রেজাল্ট বের হতে বেশি দেরি নেই। দু’জনের মন আনচান করতে লাগলো। যে কোনো অপেক্ষার প্রহরই ভোরের নাগাল পেতে সময় লাগে। রেজাল্টের অপেক্ষা মনের ধুকপুক বাড়িয়ে দেয়। চান্স না পেলে লজ্জ্বায় মুখ দেখানো যাবে না কাউকে।
আজ রেজাল্ট বের হবে। ওরা সকাল সকালই নাস্তা সেরে ঢাকা ভার্সিটিতে চলে এলো। ইতোমধ্যে আরো অনেক ছেলে-মেয়ে চলে এসেছে। সকলের মনই চঞ্চল। বাণিজ্য ভবনের সামনে দাঁড়াতেই বিরাট জটলা। সবাই ঠেলাঠেলি করছে। কারো দিকে তাকাবার কোনো ফুরসত নেই। শামীম একটু জায়গা করে নিয়ে রেজাল্ট বোর্ডের নিকট নজর দিতেই ফিরোজের নাম্বারটা দেখে তার চোখ চকচক করে উঠলো। পরক্ষণে তারটাও পেয়ে গেলো। তবে সিরিয়্যাল একটু পিছনে। এজন্য কোনো সমস্যা হবে না। নির্ধারিত আসনের মধ্যেই আছে। ফিরোজ মেধা তালিকায় তার নাম দেখে বিশ্বাস করতে পারছে না। এ কেমন করে হয়। সে খোদাকে ধন্যবাদ না জানিয়ে পারলো না।
দুই কেজি মিষ্টি কিনে বাসায় ফিরলো ওরা। ফিরোজ সাব্বিরের মা’কে ডেকে আনলো। সাথে মিলিও আসলো। এরই মধ্যে শামীম প্লেটে মিষ্টি সাজিয়ে ফেলেছে। সাব্বিরের মা কিছুই বুঝে উঠতে না পেরে বললো
-কিসের মিষ্টি? কি উপলক্ষে? আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না।
-আগে খেয়ে নিন পড়ে বলছি।
মিলি বললো
-আগে বলে দিন ভাইয়া। এতে মনে প্রশান্তি আসবে। নইলে পেটে কারণ খুঁজতে গিয়ে মিষ্টি নাড়িভুঁড়ির সাথে প্যাঁচ খাবে। তার কথায় একচোট হেসে নিলো সবাই। শামীম বললো
-আমরা ঢাকা ভার্সিটিতে চান্স পেয়েছি। মিলি হাততালি দিয়ে হৈ চৈ শুরু করে দিয়েছে। সে দৌড় দিয়ে বাইরে চলে গেলো । এক মুহূর্তে তার প্রিয় গোলাপ টব থেকে দু’টো গোলাপ তুলে দু’জনের হাতে ধরিয়ে দিলো। আপনাদের সাফল্যের জন্য ছোট বোনের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক উপহার। সবাই আবার একসাথে হেসে উঠলো। ফিরোজ বললো
-এবার থামো। নাও আমি তোমাকে একটি মিষ্টি খাইয়ে দিচ্ছি বলেই মিলির মুখে মিষ্টি পুরে দিলো ফিরোজ। আর শামীম খাইয়ে দিলো মিলির মা’কে।
ওদের আচরণ দেখে সাব্বিরের মার চোখে পানি এসে গেলো। কোনোমতেই তিনি নিজেকে সম্বরন করতে পারলেন না। তিনি উঠে এসে সবাইকে আদর করলেন। কান্নাজড়িত কণ্ঠে বললেন
-আমার সাব্বির অনেক দূরে থাকে। মেয়েটা সব সময় মন মরা হয়ে থাকে। এখন থেকে তোমরাই আমার সাব্বির। আজ থেকে তোমরা ভাইবোন। বুয়াকে কাল থেকে আসতে মানা করে দিও। আমিই তোমাদেরকে নিজ হাতে রান্না করে খাওয়াবো। সাব্বিরের মায়ের কথায় ফিরোজ ও শামীম কি বলবে বুঝে উঠতে পারলো না। অবাক হয়ে মিলির মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো।
আজ ওরা খুব তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে উঠেছে। গোসল নাস্তা সেরে দু’জনেই ভালো কাপড় চোপড় পরে নিলো। ফাইলের মধ্যে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র গুছিয়ে গেলো সাব্বিরের মায়ের রুমে। সালাম দিয়ে বললো
-খালাম্মা আমরা আজ ভর্তি হতে যাচ্ছি। আপনি দোয়া করবেন। সাব্বিরের মা দু’জনকেই মাথায় হাত বুলিয়ে আল্লাহর কাছে দোয়া করলেন। সেখান থেকে বিদায় নিয়ে তারা ক্যাম্পাসের উদ্দেশ্যে রওনা দিলো।
ফিরোজ মার্কেটিং এ আর শামীম ভর্তি হলো ম্যানেজমেন্টে। ভর্তির সকল আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে দুই বন্ধু রিক্সায় করে ঘুরলো অনেকক্ষণ। আজ দুপুরে ওরা বাইরে খেলো। পুরনো বন্ধুদের অনেকের সাথেই দেখা হলো। দু’জনে খুবই ক্লান্ত। এই ক’দিন জীবনের উপর বলা যায় একটা ধকল গেছে। বিকেলের সূর্য মৃদু লালিমা ছড়াচ্ছে। আজকের সূর্যটা ফিরোজের কাছে খুবই চমৎকার লাগলো। দৃশ্যটা তন্ময় হয়ে দেখছে সে। আকাশে ভাসমান মেঘখন্ড। পাখিরা উড়ছে। সূর্যটা ধীরে ধীরে পশ্চিমে ডুবে যাচ্ছে। হৃদয়ের প্রত্যেকটা তারে কে যেনো নতুন সুর তুলছে। আজকের সন্ধ্যাটা তার কাছে অন্যদিনের সন্ধ্যার চেয়ে আলাদা মনে হচ্ছে। এটা কি জীবনের কোনো পরিবর্তন!। হয়তো বা।
ফিরোজ ও শামীম হাত মুখ ধুয়ে ছাদে উঠলো। তখন সূর্য ডুবে গেছে। কিন্তু লালিমা এখনও মিলায়নি। ছাদে দু’টি চেয়ার সব সময়ই থাকে। ওরা দু’জন তাতে বসলো। প্রথমে কথা বললো ফিরোজই
-আমি আজ গ্রামের বাড়ি যেতে চাই। তুই কি বলিস শামীম?
-আজ যেতে চাইলে আমি কোনো আপত্তি করবো না। বললো শামীম। এখন গ্রামে গিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র হিসেবে পরিচয় দিতে পারবি তুই।
শামীমের দিকে ফিরোজ অনেকক্ষণ এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। দ্বাদশী চাঁদের আলোয় শামীমের মিষ্টি মুখটি দেখতে ফিরোজের কোনো সমস্যা হচ্ছে না। এখন মনে হচ্ছে শামীমের কথায় গ্রামে যাওয়ার প্রোগ্রামটি স্থগিত রাখাতে লাভ হয়েছে বেশি। নাহলে হয়তো বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধা তালিকায় নাম থাকতো না।
আমারও কোনো আপত্তি থাকবে না ভাইয়া! শামীমের কথা মিলিয়ে যাওয়ার আগেই মুখে হাসি টেনে বললো মিলি।
এতোক্ষণ ছাদের গেটের আড়ালে দু’বন্ধুর একান্ত মুহূূর্তটি উপভোগ করেছে সে। বন্ধুদের মধ্যে যে এতো ভালোবাসা থাকতে পারে এটা মিলি ফিরোজ ও শামীমকে না দেখলে বিশ্বাস করতো না। গল্প-উপন্যাসে পড়লেও বাস্তবে মিলি এরকম সম্পর্ক দেখেনি। ভাইয়ে ভাইয়ে এরকম শত্রুতা মিলি দেখেছে তার চাচাতো ভাইদের মাঝে।
তুমি কখন এলে? ফিরোজ কৌতূহলবসত জানতে চাইলো মিলির কাছে।
-এই তো পঁচিশ মিনিট হবে। এসেই শুনলাম আপনারা আজ ভর্তি হয়ে এসেছেন।
ফিরোজ বললো, চল আমি নিচ থেকে আরেকটা চেয়ার নিয়ে আসি।
-তা আর লাগবে না। একটা মোড়া আমি সঙ্গে করেই নিয়ে এসেছি। কোণিক অবস্থায় বসে বললো মিলি। আপনার কি কি লাগবে ভাইয়া বলুন, আমি সব কিছু গুছিয়ে রাখবো।
তোমার কিছুই করতে হবে না। আমিই গুছিয়ে নেবো যাওয়ার আগে। তিনজন আরো ঘন্টাখানেক গল্পগুজব করলো। মিলি এখন ফিরোজ শামীমের অনেক কথাই জানে। নিজের জীবনে ফিরোজ একজন আইডল। ফিরোজ যদি এতো কষ্ট করে এতোদূর আসতে পারে তবে মিলি কেনো পারবে না।
-ফিরোজ চল রাত বেড়ে যাচ্ছে। তোর আবার যাওয়ার সময় হয়ে যাবে। বললো শামীম।
ওরা তিন জনেই নিচে নেমে এলো। ফিরোজ শামীমকে নিয়ে কিছু কিছু টুকটাক জিনিসপত্র কেনার জন্য বের হয়েছে। ফিরোজ শামীমকে বললো ওর সাথে যাওয়ার জন্য। সে যেতে নারাজ। তা ছাড়া শামীমও এই ফাঁকে বাড়িতে কয়েকটা দিন কাটিয়ে আসতে পারবে।
এদিকে মিলি ফিরোজের প্রয়োজনীয় সবকিছু তার ব্যাগে গুছিয়ে রেখেছে। টুথ ব্রাস থেকে শুরু করে জুতার পলিশÑ কিছুই বাদ রাখেনি। ফিরোজের কালো সু-জোড়া ব্রাস করে চকচকে করে রেখেছে। সবকিছুতে রয়েছে ভালোবাসার ছাপ। কৃত্তিমতার লেশমাত্র নেই এতে। মমতার সাথে আন্তরিকতায় তারা যেনো একটি ডালের তিনটি ফুল। কোনো রক্তের বাঁধন না থাকলেও মানুষের মধ্যে ভালোবাসা এতো নিবিড় হয় তা এদেরকে না দেখলে কেউ বিশ্বাস করতে পারবে না।
ফিরোজ ও শামীম ঘরে ঢোকার সাথে সাথেই মিলি চেয়ার থেকে লাফিয়ে উঠলো। বললো
-ভাইয়া এতো দেরি করলেন কেনো? আমি আপনাদের জন্য অনেকক্ষণ ধরে অপেক্ষা করছি। আপনার হাতে কতো সময় আছে?
-বেশি সময় নেই। লঞ্চ ছাড়বে এগারোটায়। নটা বাজে প্রায়। একটু আগে যেতে হবে। না হলে সোবার জন্য জায়গা পাওয়া যাবে না।
-আপনি খেতে চলুন। আম্মা সব রেডি করে বসে আছেন।
-তুমি যাও, আমি ব্যাগ ট্যাগ একটু গুছিয়ে আসি।
-সবকিছু গুছিয়ে রেখেছি। এখন চলুন।
-কখন করলে। …তোমার সবকিছুতেই বাড়াবাড়ি। ফিরোজের কণ্ঠে উষ্মা ঝরে পড়লো। পরক্ষণেই একটু মিষ্টি হেসে মিলির মাথায় স্নেহের হাত বুলিয়ে বললো
-চলো।
খাবার সেরে ফিরোজ মিলির আম্মার কাছে বিদায় নিলো। মিলিকে কাছে ডাকলো। কিন্তু তাকে খুঁজে পাওয়া গেলো না কোথাও। অবশেষে পড়ার ঘরে ঢুকে দেখে রুম অন্ধকার। যা থাকার কথা নয়। লাইট জ্বালতেই মিলির অশ্রুধোয়া মুখের দিকে তাকিয়ে ফিরোজ অশ্রু সম্বরন করতে পারলো না। এক মায়ার টানে ধীরে ধীরে চলে এলো মিলির কাছে। তার দু’হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি স্পর্শ করলো মিলির অশ্রুধোয়া চোখ দু’টো। ক্ষণকালের মধ্যে যেনো বর্ষায় উথলে উঠা জোয়ারের পানি শ্রাবণের মতো শান্ত হয়ে গেলো। ফিরোজ তার মাথায় হাত রাখতেই মিলি লুটিয়ে পড়লো ফিরোজের বুকে। বিদেশ যাবার সময় মিলি সাব্বিরের বুকে এভাবেই ঝাপিয়ে পড়েছিলো। বহুকাল পরে যেনো মিলি তার অশ্রুধোয়া চোখ দু’টোতে সাব্বিরের হাতের স্পর্শ পেলো। ফিরোজের বুকে মাথা রেখে মিলি যেনো সারা জীবনের ভাই হারানোর সঞ্চিত বেদনা ভুলে গেলো।
-সাব্বিরের মা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না। তার অশ্রু গন্ড বেয়ে চিবুক ছুঁয়েছে। চোখের অশ্রু মুছে দু’টি সন্তানকে বুকে টেনে নিলেন। মাতৃত্বের বন্ধনে ফিরোজের মাতৃহারা হৃদয়টি কানায় কানায় ভরে উঠলো। ফিরোজের আর কী পাওয়ার আছে! সারা জীবন মায়ের স্মৃতিকে সম্বল করে সে বেঁচে থাকতে চেয়েছে। সাব্বিরের মায়ের এই ভালোবাসার বন্ধন যেনো মায়ের বেহেশত থেকে পাঠানো। আজ তার সকল পাওয়া যেনো পূর্ণ হলো। সে যেনো তার মায়ের গন্ধ পেলো তার চারপাশে। তার মুখ থেকে অস্ফুট মা ধ্বনি উচ্চারিত হয়ে তা যেনো সমস্ত বাড়ি প্রতিধ্বনিত করে চলেছে। একি স্বপ্ন না বাস্তব। ফিরোজ চিন্তা করতে পারছে না। ফিরোজ চলে গেলো আট বছর পিছনে। কতোক্ষণ সাব্বিরের মায়ের বুকে মাথা রেখে ছিলো ফিরোজের মনে নেই। শামীমের ডাকে অবচেতন অবস্থা থেকে বাস্তবে ফিরে আসে ফিরোজ। অশ্রু ভেজা চোখে তাকায় সাব্বিরের মায়ের দিকে।
আসি মা! তার কণ্ঠ জড়িয়ে যায়। সাব্বিরের মা ফিরোজের মাথায় হাত বুলিয়ে দেন। মিলির কান্নাধোয়া মুখখানা জোয়ারের পানিতে ধোয়া নতুন চরের মতো।
অপ্রত্যাশিত এই মায়াবি পরিবেশে ফিরোজ আর বেশিক্ষণ থাকতে পারলো না। ব্যাগটি কাঁধে নিয়ে পা বাড়ালো গেটের দিকে। মূল গেইট পার উঠে বসলো রিক্সায়। পিছনের দিকে চেয়ে আছে মা, মিলি ও শামীম। রিক্সা সামনের দিকে এগিয়ে চলছে। রিক্সা থেকে নেমে উঠে পড়লো সদরঘাটের বাসে।