ফিরোজ সদরঘাট এসে পৌঁছলো প্রায় সাড়ে দশটায়। টার্মিনাল এলাকা লোকে লোকারণ্য। পা ফেলবার জায়গা নেই। লঞ্চের ভেপু কানের পর্দা ফাটিয়ে ফেলবে। ফেরিওয়ালাদের চেচামেচি, কুলিদের ঠেলাঠেলির সাথে যাত্রীরা নিজ নিজ লাগেজপত্র নিয়ে ব্যস্ত। অনেকে পুরো ফ্যামিলি রওনা দিয়েছে গ্রামের বাড়ি। টিফিন ক্যারিয়ার, পানির পট বাচ্চাদের ফিডার আর বড়ো বড়ো সুটকেস তো আছেই। যেনো আধুনিক কালের কোনো যাযাবর তার কাফেলাসহ রওনা দিয়েছে কোনো এক অজানার পথে। ফিরোজ এই কাফেলা ঠেলে বোগদাদীয়া লঞ্চের কাছে চলে আসলো। যাত্রীদের নিয়ে লঞ্চের খালাসিদের টানাটানির অন্ত নেই। ফিরোজ দোতলায় উঠে এলো। কানায় কানায় ভরে আছে যাত্রী আর মালামাল। পা ফেলবার জায়গা নেই। এরমধ্যে কেউ আবার বিছানা পেতে আরাম করছে লঞ্চের ডেকে। কেউ আবার গ্রুপ করে তাসের আড্ডায় মেতে আছে। কয়েকজন মহিলা ছোট বাচ্চাকে ঘুম পাড়াচ্ছেন। বয়স্ক কয়েকজন দু’হাঁটুর মধ্যে মাথাটা গুজে দিয়ে ঝিমুচ্ছে। মাঝে মাঝে ফেরিওয়ালারা ঘুরে যায়। ফিরোজ সবার দিকে একবার চোখ ঘুরিয়ে আনলো। কেবিন ফাঁকা নেই। বিলাসেও সিট নেই। অবশেষে ডেকের এক কোণায় একটু জায়গা করে নিলো। বড়ো মাপের তোয়ালেটা বিছিয়ে নিলো ডেকের উপর। একপাশে ব্যাগটা রেখে একটু আরাম করে বসলো। লঞ্চ ছাড়তে এখনও কিছু দেরি আছে। ফিরোজ কি করবে ভেবে পাচ্ছে না। অগত্তা পূর্ণিমা ম্যাগাজিনটা বের করলো। পৃষ্ঠা উল্টানো ছাড়া কিছুই হলো না। পাশে বসা বৃদ্ধ লোকটির সাথে একটু ভাব করতে চাইলো। বুড়ো একটু তীক্ষè মেজাজের বলে মনে হলো তার কাছে। বয়স সত্তরের কাছাকাছি। ফিরোজ কয়েকবার তাকালো তার দিকে। এটাকে সে ভালোভাবে নিচ্ছে না। সাথে যুবতী নাতনি আছে বলে হয়তো। ফিরোজ আবার তার দিকে তাকালো।
-ঐ মিয়া কি দেহেন এ মিহি? হ্যা…
-কি দাদু আমাকে বলছেন? আমি ভাবছিলাম আপনাকে আমার দাদুর মতো দেখা যায়। তাই আপনার দিকে চেয়ে থাকতে ভালো লাগছে। ফিরোজ এমন আবেগ মিশ্রিতভাবে বললো যে লোকটি একেবারে দমে গেলো । ফিরোজ পাল্টা প্রশ্ন করলো
-আপনি যাবেন কোথায় দাদু!
-নীলকমল!
-আপনে কই যাইবেন? একটু বিরক্তির সাথেই বললেন বৃদ্ধ।
-আমিও নীলকমল যাবো। বুড়ো আর কথা বাড়ালো না বলে ফিরোজ তাকে আর বিরক্ত করতে চাইলো না। লঞ্চ ছেড়ে দিলো। ইঞ্জিনের অশ্বশক্তি বাড়তে লাগলো ক্রমশঃ। সেই সাথে লঞ্চের ডেকে কম্পন বেড়ে গেলো। ইঞ্জিনের আওয়াজে কান ঝালাপালা। সারেঙ লঞ্চটি ঘুরিয়ে নিলো। বুড়িগঙ্গার ঢেউ কেটে কেটে লঞ্চ সামনের দিকে এগিয়ে চলেছে। ঢাকা শহর ক্রমেই অদৃশ্য হতে লাগলো। শুধুমাত্র উঁচু ভবনের ভিতর থেকে বৈদ্যুতিক বাল্বগুলো তারার মতো আলো বিকিরণ করছে। বুড়িগঙ্গার দু’পাশের বসতি আর নদীর পাড় ঘেঁষা কারখানা থেকে উপচে পড়া আলো বুড়িগঙ্গায় প্রতিফলিত হচ্ছে। বুড়োকে ব্যাগটার দায়িত্ব দিয়ে ফিরোজ নিচ থেকে ছাদে উঠে এলো। বাতাসের ঝাপটায় ঘামে ভেজা শরীরটা মুহূর্তেই ঠান্ডা হয়ে গেলো। দেহে একটা ফুরফুরে আমেজ এসেছে। ছাদের উপর কিছু চেয়ার পাতা আছে। সে একটা চেয়ারে বসলো। পানিতে আকাশের প্রতিবিম্ব দেখা যাচ্ছে। তারারা জ্বলজ্বল করছে। চাঁদটা মাঝে মাঝে মেঘের আঁধারে ঢেকে যাচ্ছে। চাঁদ ও মেঘ যেনো লুকোচুরি খেলছে। সোনালি চাঁদের আলোয় পুরো ছাদটাই আলোকিত হয়ে আছে। বাড়তি আলোর দরকার হয় না। তারপরও পিছনে ও সামনের দিকে কয়েকটি বাল্ব লাগানো আছে।
কয়েকজন তরুণী ছাদে উঠে এলো। তারা ঘামে চুবচুবে। নিজেদের ওড়নার কোণা দিয়েই ঘাম মুচছে। ছাদের বাতাস গায়ে মেখে ঠান্ডা হওয়ার চেষ্টা করছে তারা। হাঁটতে হাঁটতে লঞ্চের পিছনে চলে আসলো তারা। পানির ট্যাঙ্কের কাছে আসতেই ভূত দেখার মতো চমকে উঠলো একজন। ফিরোজ ওখানে বসে হারিয়ে গেছে তার অতীতে। এসব কিছুটা খেয়াল করেনি সে। একজন বলে উঠলো
-এই শাহিন দেখ তো, ফিরোজের মতো লাগছে না?
-ফিরোজ আসবে কোত্থেকে? ও তো শুনেছি হারিয়ে গেছে। অযথা কাউকে বিব্রত করিস না। শাহিন খুব নিচু স্বরে বললো।
-চল জিজ্ঞেস করে দেখি।
-না না, আমি পারবো না। তোর দরকার থাকলে তুই-ই জিজ্ঞেস কর। বললো শাহিন।
শেফালি ফিরোজের কাছে গিয়ে তার নাম ধরে ডাকলো
-এই ফিরোজ। ফিরোজ চমকে উঠে শেফালির দিকে তাকালো। বিস্ময়ে সে থ হয়ে গেছে। একটা অপরিচিত মেয়ে তার নাম ধরে ডাকছে। ফিরোজ ভাবলো হয়তো বা অন্য কোনো ফিরোজকে তারা ডাকছে। সে আবার আকাশে চাঁদ আর মেঘের লুকোচুরি দেখতে লাগলো। শেফালি এবার আত্মবিশ্বাস নিয়ে ডাক দিলো
-এই তোমার নাম ফিরোজ না? মেয়েগুলোর দিকে কিছুক্ষণ ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থেকে বললো
-হ্যা! কিন্তু আপনারা! আপনাদেরকে তো চিনতে পারলাম না। ওরা ফিরোজের আপনি সম্বোধন শুনে হাসতে হাসতে গড়াগড়ি দেওয়ার উপক্রম।
ফিরোজ আরো বেশি ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেলো । ওদের হাসি এখনও থামেনি। এবার ফিরোজ একটু উত্তেজিত হয়ে গেলো ।
-হাসছেন কেনো?
এবার হাসির মাত্রা আরো বেড়ে গেলো । ওদের হাসিতে কেউ যেনো তেল ঢেলে দিয়েছে।
ফিরোজ বিরক্ত হয়ে চলে যাচ্ছিলো।
এবার শেফালি ভিন্ন সুরে ডাক দিলো
-এই ফিরোজ, শোন শোন। এদিকে আয়।
এবার ফিরোজের আর বিস্ময়ের সীমা রইলো না। অপরিচিত মেয়ে, আবার তুই তোকারি। একি সহ্য হয়!
ফিরোজ ঘুরে দাঁড়ালো।
শেফালি তার মুখোমুখি। মুখে চাপা হাসি।
ফিরোজ গালের কাছে বড়ো তিলটার কাছে দৃষ্টি নিক্ষেপ করেই শেফালিকে চিনতে আর ভুল করলো না। এবার বলেই ফেললো
-এখন মন চাচ্ছে তোর গালে কষে একটা চড় বসিয়ে দেই। আমার সাথে এতোক্ষণ এভাবে ফাজলামো করেছিস কেনো।
-কেনো আগে চিনতে পারিসনি বুঝি?
-তা পারলে কি আর চলে যাই।
এই চল বসে গল্প করি। বললো শাহিন।
-ও শাহিন না? শাহিনের দিকে ইশারা করে বললো ফিরোজ
-হ্যা! তুই তো দেখি সবই ভুলে গেছিস। শেফালি মুখে হাসি টেনে বললো।
ওরা সবাই চেয়ারে গোল হয়ে বসলো।
প্রথমে ফিরোজই কথা বললো
-শেফালি একজনকে কিন্তু চিনতে পারলাম না।
তা তোর চেনার কথাও নয়। ও আমাদের সাথে পড়ে। নাম…
-ওকেই বলতে দে। শাহিনকে থামিয়ে দিলো ফিরোজ।
-মোহনা। বাড়ি পুরান ঢাকায়। বাবা সরকারি চাকুরি করেন। আর কিছু? মোহনা মিষ্টি হেসে জবাব দিলো।
-আপাতত না হলেও চলবে।
-আচ্ছা এবার তোর বর্তমান অবস্থা ও অবস্থানটা বলে দে। বললো দীর্ঘদেহী শাহিন। আরমা তো জানি তুই হারিয়ে গেছিস।
-ফিরোজ আহমেদ, ঢাকা ভার্সিটি, মার্কেটিং ফার্স্ট ইয়ার আর গ্রামের বাড়ি যাচ্ছি। মোহনার জন্য ভূমিকাটা একটু বড়ো করতে হলো। তোরা কে কোথায় পড়িস। তা একটু বল না।
-আমরা তিন জনেই সিটি কলেজে আছি। আর্টস এ। কিন্তু আরেক জনের কথা এখন বলবো না।
শেফালির এ কথার মমার্থ কেউই বুঝতে পারলো না। সবাই জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তার দিকে চেয়ে আছে। কিছুক্ষণ নিরব থেকে শেফালি আবার বললো
-ফিরোজ সুইটির কথা কি তোর মনে আছে?
-কেনো হঠাৎ এ প্রশ্ন! সুইটির কথা শুনে ফিরোজের কণ্ঠটা একটু অন্যরকম হয়ে গেলো
-না এমনিতেই জিজ্ঞেস করলাম!
-মনে না থাকার তো কারণ নেই। একসাথে থেকেছি, খেলেছি। ছোটবেলার দিনগুলোকে তো আর ভুলে যাওয়া যায় না।
-ছোটবেলার দিনগুলো কি স্মৃতির পর্দায় ঝড় তোলে না?
-তোলে বৈ কি! তবে সে ঝড় তো ক্ষণস্থায়ী। মেঘনার ভাঙনের মতো। কদিনেই সব লন্ডভন্ড হয়ে যায়।
-ক্ষণস্থায়ী হলেও ক্ষতির ফল ভোগ করতে হয় দীর্ঘদিন।
-তা মানি! আচ্ছা বাদ দে এ প্রসঙ্গে। দেশের অবস্থা কি বল।
-তা বলে লাভ নেই। সে গেলেই দেখতে পারবি। ফিরোজ চল কেবিনে যাই। অনেকক্ষণ হলো এখানে আছি। তোকে একটা সারপ্রাইজ দেবো। বললো শেফালি
ওরা সবাই উঠে এলো।
-চমৎকার সারপ্রাইজ মানে? একটু বুঝিয়ে বল।
-অতো বুঝাবুঝির কাজ নেই। চল।
ওরা সবাই সিঁড়ি ভেঙে নিচে নেমে এলো। যাত্রীদের ভিড় ঠেলে ওরা চলে এলো কেবিনের সামনে। দরজা খোলাই ছিলো। পর্দা নামানো। ভিতরে একটা সিটের উপর আঠারো উনিশ বছরের একজন তরুণী শুয়ে আছে। চুলগুলো বালিশের উপর ছড়ানো। লম্বাটা ঠিক বুঝা যাচ্ছে না। তবে পাঁচ ফিট পাঁচ ইঞ্চির কম হবে না। ঠোঁট দু’টো পাতলা। তাতে হালকা লিপস্টিক লাগানো। টানা ভুরুযুগল যে কোনো মানুষকেই আকৃষ্ট করবে। পরনের জামাটায় সবুজ হলুদে মাখামাখি। প্রিন্ট করা। যেনো গ্রাম বাংলার স্মৃতি বহন করছে। কেবিনে টিউব লাইট জ্বালানো। কোলের উপর ম্যাগাজিন। লঞ্চ বা গাড়িতে যা সবার হাতে থাকে। হয়তো পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে পড়েছে। কপালের তিলটি বাতির আলোতে জ্বলজ্বল করছে। কেবিনটাতে কিসের যেনো একটা মিষ্টি গন্ধ বিরাজমান। যা কোনো ফুল বা বিদেশি পারফিউমের নয়। হয়ত মেয়েটিই তার শরীর থেকে গন্ধ বিলাচ্ছে। নিদ্রারত চোখদু’টো যেনো কাউকে কাছে ডাকছে। এ দৃশ্য মোনালিসাকেও হার মানায়। মেয়েটির হৃদস্পন্দন ওঠানামার সাথে সাথে তার রূপের পরিবর্তনও হচ্ছে। এ মেয়েকে দেখলে হেলেন আর ক্লিওপেট্রাকে না দেখার বেদনা ভুলে থাকা যায়। এই জুলেখাকে দেখলে কেউ আর ইউসুফ থাকতে পারবে না। মদনকুমার হয়ে সপ্তডিঙা ভাসাবে উত্তাল সমুদ্রে। এ সৌন্দর্য দেখলে হয়ত জান্নাতের হুর দেখার তৃষ্ণা কিছুটা মিটবে। এ যে ফিরোজের স্বপ্ন-কল্পনার সেই রাজকুমারী। যার স্বপ্ন দেখে সে পায় বাঁচার আনন্দ। এরকম একটি মেয়ে যে বারবার স্বপ্নে এসে পাশে দাঁড়ায় দুর্যোগে দুর্ভোগে। সাহস আর প্রেরণা যোগায় পথ চলতে। কয়েকবার আত্মহননের কথা চিন্তা করেছিলো ফিরোজ। স্বপ্নপরী তাকে নিভৃত করেছিলো। ‘জীবন থেকে পালিয়ে নয় জীবনকে জয় করার জন্যই মানুষের পৃথিবীতে আগমন। তুমি তো জীবনের কাছে পরাজিত হতে পারো না ফিরোজ।’ এই কী সেই মেয়ে! মেয়েটি গালে এমনভাবে হাত রেখেছে যে তার ঠোঁটের মিষ্টি হাসিটি অর্ধবৃত্তের মতো পড়া যায়। গুচ্ছ গুচ্ছ কেশরাশি ফেনের বাতাসে কখনো কপাল ঢাকছে আবার সরে যাচ্ছে। ফিরোজ কোনো মেয়ের দিকে এভাবে কখনো তাকায়নি। ও জানে না মেয়েটি কে। কতোক্ষণ এভাবে কেটে গেছে ফিরোজ বলতে পারবে না। এই মুহূর্তটির ব্যাখ্যাকার একমাত্র শেফালি। জানালার ফাঁক দিয়ে পুরো মুহূর্তটি সে মনের ক্যামেরায় বন্দি করে রেখেছে। প্রিয় বান্ধবীর জন্য এ মুহূর্তেটির অপেক্ষাই ছিলো শেফালির জীবনের সেরা পাওয়ার একটি। দরজায় একটি ক্যাচ শব্দ করে ওরা তিনজন চলে গেলো। মেয়েটি ধরফড় করে বিছানাতে উঠে বসলো। ওড়নাটা ঠিক করে কড়া দৃষ্টিতে ফিরোজের দিকে তাকালো।
আপনি…। তার কথা আর সামনের দিকে আগালো না; যেনো তার কণ্ঠনালী কেউ চেপে ধরেছে মেয়েটি। কথা বলার শক্তি হারিয়ে ফেলেছে মেয়েটিও। শুধু চোখ দু’টো জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে ফিরোজকে পর্যবেক্ষণ করে চলছে। মনে হয় যুবকটি তার বহুকালের চেনা। অনেক আপনজন। জীবনের কোনো এক স্মৃতির সাথে মিলে যায়। জিন্সের প্যান্টের সাথে সাদা নীলের ট্রাইপ করা গেঞ্জি পরেছে ফিরোজ। চোখে কালো ফ্রেমের চশমা। তার চেহারাতে পৌরুষের ছাপ স্পষ্ট। ফিরোজ অপরাধীর মতো তাকিয়ে আছে মেয়েটির দিকে। কথা বলার ভাষা হারিয়ে ফেলেছে। বাকহীন দু’জন পাঠ করছে একজন আরেকজনকে। ফিরোজ তার চশমাটা খুলে ফেললো। তার কপালের বা দিকের কাটা দাগটা এখন স্পষ্ট। চশমার ফ্রেমটা এতোক্ষণ ওটাকে ঢেকে রেখেছিলো। মেয়েটির আর বিন্দুমাত্র অসুবিধা হলো না ফিরোজকে চিনতে। এ দাগ ছোটবেলায় সে-ই তার নিজ হাতে দিয়েছে ফিরোজকে। একদিন খেলার সময় সে ফিরোজকে ধাক্কা দিয়ে বটির উপর ফেলতেই ওর চোখের নিচটা কেটে যায়। এ স্মৃতিচিহ্ন ভোলবার নয়। সে ধীরে ধীরে বিছানা থেকে ফিরোজের সামনে চলে আসে। অস্ফূট মুখ থেকে বেড়িয়ে এলো বহু পুরনো সেই ডাক
ফিরোজ ভাইয়া! তুমি আমার এতো কাছে!
কেনো সুইটি, আমি কি এতো কাছে আসতে পারি না।
তোমার সাথে এই জীবনে আবার দেখা হবে ভাবতে পারিনি। আমার এখনও স্বপ্নের ঘোর কাটেনি। আমি আমার চোখকে এখনো বিশ্বাস করতে পারছি না যে তুমি আমার সামনে। স্রষ্টাকে অশেষ ধন্যবাদ। এ মুহূর্তটির চেয়ে বেশি কিছু আর এই জীবনে আশা করিনি।
-আমরা দাঁড়িয়ে কথা বলছি কেনো? বসো।
-খালাম্মা, খালুজান কেমন আছেন?
-ভালো। গেলেই দেখতে পাবে। তোমার কথা তো বাড়িতে আলোচনা হয়। তোমার কথা উঠলে, খালাম্মার কথা উঠলে আম্মার চোখের পাতা ভিজে ওঠে। নদী ভাঙার সময় একদিন তোমাকে কলম্বাস, গ্যালিলিও বলেছিলামÑ মনে আছে?
-না থাকার তো কারণ দেখি না।
-তুমি দাঁড়িয়াবান্দার কোর্টটাকে ডলি আপার জামাই যেভাবে মজা করে মুরগীর রান খায় তার সাথে তুলনা করেছিলে। কথাটি মনে হলে আমি আর হাসি ধরে রাখতে পারি না। আবার যখন মনে পড়ে আমি তোমাকে কেনো কলম্বাস বললাম। কলম্বাস তো আমেরিকা আবিস্কার করেছে। আর তুমি সমুদ্র ঝড়ে হয়েছো নিরুদ্দেশ। তখন নিজেকে অপরাধী মনে হয়। ফিরোজ বললো
-আমি তো সমুদ্র যাত্রায় হারিয়ে যাইনি। আমিও তো আমার ঠিকানা খুঁজে পেয়েছি। বলেই ফিরোজ সুইটির হাত দু’টি ধরলো। লজ্জারাঙা সুইটি হাসতে লাগলো ফিরোজের দিকে চেয়ে। ফিরোজও এ হাসিতে যোগ দিলো সমুদ্র তরঙ্গের মতো।
উভয়ের হাসির তরঙ্গ মেলায়নি। এরই মধ্যে শেফালি, শাহিন ও মোহনা কেবিনে চলে এসেছে। ওদের দেখে দু’জনেই লজ্জা পেলো। একটু দুরে সরে বসলো দু’জনেই । সৌজন্যবসত ওদের বসতে বললো ফিরোজ। শেফালির দিকে তাকিয়ে বললো
-কই তোর সার প্রাইজ কোথায়?
-এখনো পাসনি? তাহলে এখন যেভাবে আছিস নব্বই ডিগ্রি বামে চোখ ঘুড়িয়ে নে, তবেই পাবি।
ফিরোজ জানে শেফালি কি বলতে চায়। তবুও সে নব্বই ডিগ্রি বামে চোখে ঘুরালো। স্থির বিন্দুতে সুইটি। ফিরোজ ওর দিকে তাকাতেই বেচারি লজ্জায় লাল হয়ে গেছে।
-তোর বুদ্ধির প্রশংসা না করে পারা যায় না। বললো মোহনা। আমার মন চাচ্ছে তোকে একটা বুদ্ধির প্রশংসা পত্র দিয়ে দিই।
-তোর ব্যাগ ট্যাগ কোথায় ফিরোজ? শেফালি প্রশ্ন করলো।
-ডেকে আছে।
-ডেকে? কেউ নিয়ে যাবে না তো। উদ্বেগের সাথে বললো সুইটি। না নিবে না। ওখানে আমার এক বান্ধবীর কাছে রেখে এসেছি। বললো ফিরোজ। আর চোরে নিয়ে গেলেও কোনো ক্ষতি হবে না। বেচারা লাভ করতে পারবে না। তেমন কিছু নেই ব্যাগে।
-বান্ধবিটা কে? প্রশ্ন করে শেফালি। ফিরোজ মুচকি হেসে জবাব দেয়
-গেলেই দেখতে পাবি। তার দাদাও আছে সাথে।
-বিছানা পেতেছিস বুঝি? বললো শাহিন।
-পেতেছি বৈকি। ভেবেছিলাম রাতটা দিব্যি ঘুমে কাটাবো। কিন্তু তোদের খপ্পরে পড়ে সে আশায় অমাবস্যা নেমে এসেছে।

লঞ্চ চাঁদপুরের নিকটে চলে এসেছে। বাঁক ঘুরে ডাকাতিয়ার প্রবেশ করছে। মোহনায় স্রোত আছে বেশ তবে ঢেউ তেমন একা নেই। বর্ষা হলে এতোক্ষণ যাত্রীদের জিকিরের শব্দ শোনা যেতো। পুরান বাজারের অনেকটা অংশ ভেঙে গেছে। ব্রিটিশ আমল থেকেই ভাঙছে চাঁদপুর। দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম নদীবন্দর এ চাঁদপুর আজ যেনো নদীর বুকে সবটাই বিলীন হতে চলেছে। দেশ স্বাধীনের এতো বছর পরও এর কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। বড়ো বড়ো প্রতিশ্রুতি অনেকে দিয়েছে বহুবার। জনগণ উপকৃত হয়নি মোটেও। অনেক আন্দোলন হয়েছে এ নিয়ে। তা যেনো মেঘনার ঢেউয়ের সাথেই মিলিয়ে গেছে। কতৃপক্ষের কর্ণকুহরে একটা শব্দও ঢোকেনি। জানি না এ নদী ভাঙার সমাধানে কখনও হবে কি না। নাকি চাঁদপুরের সর্বশেষ মাটির টুকরোটি মেঘনার বুকে বিলীন হবার স্বপ্ন দেখবে কোনো ক্ষমতাসীন গোষ্ঠী।
চাঁদপুর ছেড়ে মেঘনার ঢেউ কেটে এগিয়ে চলছে লঞ্চটি। মৌসুমী বাতাস ঠেলে এমভি বোগদাদীয়া চলছে নীলকমলের দিকে। বাপ দাদার বসত-বাটির উপর দিয়ে চলছে লঞ্চ ষ্টিমার নৌকা। জেলেরা জাল ফেলছে। মাছ ধরছে। এ নদীর ভিতর বিলীন হয়েছে কতো জনপদ তার হিসেব পরিসংখ্যান ব্যুরোর কাছে আছে কিনা সন্দেহ। নতুন করে বাঁচার সন্ধানে হয়তো অন্য কোনোখানে চলে গেছে অনেকে। আজ রাস্তার ফকির কতো প্রতাপশালী ব্যক্তি। নদীভাঙনকে কেন্দ্র করে অনেকে রাতারাতি বড়োলোক হয়ে গেছে। নিয়তির নিষ্ঠুর জাতাকলে কতো পরিবার আজ অসহায়। ওয়াপদা বেড়িবাঁধের দু’পাশে কতো গৃহস্থ পরিবার। সেতো ফিরোজ শৈশবেই দেখেছে। এখন হয়তো দেখবে অতি আদরের সন্তানটি আজ লঞ্চে ফেরি করে বেড়াচ্ছে। কিংবা কোনো চায়ের দোকানে বয় এর কাজ করছে অথবা রিক্সা কিংবা ঠেলাগাড়ি ঠেলছে। এ সন্তানরাই একদিন মায়ের কাছে গল্প শুনতো। ‘আমার ছেলে ডাক্তার অইবো। ইঞ্জিনিয়ার অইবো। মাইনষের খেদমত করবো। বড়ো বড়ো চাকরি করবো।’ হায়রে নিয়তি সেই মা হয়তো আজ গতর খাটছে কোনো বেগানা বাড়ি। অনেকে পূর্ব পুরুষদের নাম বলতেও লজ্জা পায়। যারা তাদের পূর্ব পুরুষদের পেয়াদা ছিলো আজ তারা হয়েছে তাদের মনিব। তবুও সইতে হয় সবকিছু।
রাতের আঁধারটাকে ম্লান করে পূর্বাকাশে সুবে সাদিকের লালিমা ফুটে উঠেছে। চাঁদের আলো ধীরে ধীরে ক্ষীণ হয়ে আসছে। দূরের গ্রামগুলো কালো পাহাড়ের মতো দেখা যাচ্ছে। নীলকমল আসতে আর বেশি বাকি নেই। এ স্টেশন ছিলো আট কি নয় মাইল পশ্চিমে। তখন এর নাম ছিলো নীলকমল। ভাঙতে ভাঙতে হাইমচর শেষ করে কালিখোলার কাছাকাছি চলে এসেছে নদী। তবুও নীলকমল নামটি এখনও স্মৃতি আর ঐতিহ্য ধরে রেখেছে। এ নাম যেনো শতাব্দীর পুরনো স্মৃতির কথা সবাইকে মনে করিয়ে দেয়।
ভগ্নপ্রায় হাইমচর বাজারের ভাঙা মসজিদ থেকে মুয়াজ্জিনের আজানের ক্ষীণ সুর ভেসে আসছে। এ সুর মেঘনার তরঙ্গের সাথে মিশে চলে যায় এ মসজিদের আদিস্থলেÑ যা ছিলো মূল হাইমচর বাজারে। রাতের নিস্তব্ধতাকে ম্লান করে প্রতিনিয়ত আজানের এই সুর ধ্বনিত হয় বাস্তুহারা এই জনপদে। তবুও পরম প্রশান্তিতে মেঘনার ঘোলা পানিতে অজু করে মুছল্লিরা চলে যায় মসজিদে।

ফিরোজ সুইটিরা এক এক করে নামলো লঞ্চ থেকে। নেমে কিছুই চিনতে পারছে না ফিরোজ। মাত্র সাত আট বছরে এতো পরিবর্তন! পাঁচজনের দলটি এগিয়ে চললো সামনের দিকে। রাস্তার দু’পাশে সারি সারি রিক্সা দাঁড়ানো। সুইটি এদিক ওদিক তাকাচ্ছে। তার আব্বা নজরুল মাস্টার তাকে রিসিভ করার কথা। কোথাও দেখা যাচ্ছে না তাকে।
হঠাৎ ডানদিক থেকে ছুটে এলেন নজরুল মাস্টার।
-মামণি, পথে কোনো সমস্যা হয়নি তো।
-না আব্বা তেমন কোনো সমস্যা হয়নি। ফিরোজ নজরুল মাস্টারকে চিনতে পারলো। তার প্রামইমারি স্কুলের হেডমাস্টারকে চিনতে ফিরোজের এতোটুকুও ভুল হয়নি। ফিরোজের স্যার হলেও স্কুলের বাইরে খালুজান বলেই সম্বোধন করতো ফিরোজ।
-আসসালামু আলাইকুম খালুজান। কেমন আছেন?
ওয়ালাইকুম সালাম। তুমি…
-জ্বি, আমি ফিরোজ। নজরুল সাহেবের মাথার যেনো বাজ পড়লো। অস্ফূট উচ্চারণ করলেন ‘ফিরোজ!’ সে কেমন আছে তা জিজ্ঞেস করতেও ভুলে গেছেন নজরুল মাস্টার। তার চেহারার পরিবর্তন সকলেই উদ্বেগের সাথে লক্ষ্য করলো। মুহূর্তেই নিজেকে স্বাভাবিক করে জানতে চাইলেন
-তুমি বেঁচে আছো।
-জ্বি।
নজরুল সাহেব সুইটির বান্ধবীদের দিকে তাকিয়ে বললেন
-তোমরা কেমন আছো মা?
সবাই একসাথে বললো
-ভালো।
-আপনার শরীর ভালো তো স্যার। জানতে চাইলো শাহীন।
-আর ভালো কোথায়! চল, রিক্সায় চলো।
-না স্যার আমরা আগে বাড়িতে যাই। আব্বা আম্মা হয়তো আমাদের জন্য উদ্বিগ্ন হয়ে আছেন। বললো শেফালি ও শাহিন। বিকেলে আসবো বলে ফিরোজ আর সুইটির কাছ থেকে বিদায় নিলো ওরা।
ফিরোজ বললো
-আমিও চলি। সুইটি সাথে সাথে না না করে উঠলো।
-তুমি কোথায় যাবে। তাছাড়া তোমাদের নতুন বাড়ি এখন কোথায় তাও তো তুমি জানো না। এখন আমাদের বাড়ি চলো। বিকেলে কাউকে দেবো তোমার সাথে । তাতে পথ চিনতে তোমার কোনো সমস্যা হবে না।
-না, তা লাগবে না। কাউকে জিজ্ঞেস করে যাওয়া যাবে। সমস্যা হবে না। তাছাড়া তোমার রেস্টেরও তো দরকার আছে। সুইটির কণ্ঠে উদ্বেগ ঝরে পরে। মেয়ের এই আদিখ্যেতায় নজরুল মাস্টার বিরক্ত। কিন্তু আদরের এই একরোখা মেয়েটিকে এখন কিছু বলতে গেলে মাইন্ড করবে। সারা পথে আর একটি কথাও তার সাথে বলবে না। তবুও বললেন
-ও যেহেতু যেতে চাচ্ছে না…। তাছাড়া অনেকদিন পর আসলো। আগে নিজের বাড়িতেই যাওয়া দরকার। বিকেলে না হয় আসবে। সুইটির মুখখানি মলিন হয়ে গেলো । সে আর কথা বাড়ালো না। ফিরোজ তাদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে সামনের দিকে পা বাড়ালো।
একটি রিক্সা নিয়ে অচেনা গন্তব্যে পা বাড়ালো ফিরোজ। রিক্সাওয়ালাকে শুধু বললো
-চরভৈরবী চলো। কতো অজানা প্রশ্ন তার মনে উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে। ছোট ছোট ভাইবোন কি তাকে চিনবে? হয়তো নামটি তাদের জানা। অথবা তাকে না ও চিনতে পারে। ফিরোজ মরে গেছে এটাই সবার জানা। রিক্সায় বসে তার এই অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার ঘটনাটাই মনে করছে ফিরোজ।
নদী ভাঙার সময় ফিরোজ শুধু পাড়ে বসে থাকতো। তাদের খেলার মাঠটি যখন ভেঙে নিয়ে যায়-তখন সে আর অশ্রু সম্বরন করতে পারেনি। মনে হয়েছে তার হৃদয়টি কে যেনো টেনে ছিঁড়ে নিয়ে চলে যাচ্ছে। উদাসভাবে তাকিয়ে ছিলো দিগন্তে। নিচে কড়াল স্রোত। উপর থেকে মাটি নিচে তলিয়ে যাচ্ছে। এমন সময় ফিরোজ পাড় ভেঙে পানিতে পড়ে গেলো । পরনে ছিলো একটি হাফ প্যান্ট। পানিতে পরে সে কয়েক মিনিট তলিয়ে ছিলো। পেট ফুলে যখন সে ভেসে উঠলো তখনও তার জ্ঞান ছিলো। কোনো রকম সাঁতরে কিনারে এলো। পারের মাটি খামচে ধরবে তারও উপায় নেই। তখন সে তাদের বাড়ি থেকে দুই মাইল দক্ষিণে। একটি সুপারি গাছ পাড়ে শিকড় রেখে মাথাটি লুটিয়ে দিয়েছে পানিতে। এখানে নদীর স্রোত বাঁক নিয়েছে বলে পাড় ভাঙছে না। ভাটার সময় বলে মাটি থেকে গাছটি এখনও সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে যায়নি। সুপারির পাতাকে সর্বশক্তি দিয়ে আকড়ে ধরে আছে ফিরোজ। পাড়ে উঠে বেহুঁশ হয়ে পড়ে আছে। একটি জেলে নৌকা গুণ টেনে যাচ্ছিলো। সন্ধ্যার লালিমা তখনও মিলায়নি। একজন জেলে ফিরোজের অচেতন দেহটি দেখে ফেলে। সে দৌড়ে আসে তার কাছে। নৌকায় তুলে নেয়। একজন জেলে পেট ঝাঁকিয়ে কিছু পানি বের করে। স্রোতের তোড়ে নৌকা বেশি দূর আগাতে পারে না। এদিকে সারা পাড়া খুঁজে কোথাও ফিরোজকে পাওয়া গেলো না। অনেকেরই ধারনা জন্মেছে সে পানিতে ডুবেছে। কয়েকজন ছুটে গেছে দক্ষিণে। ফিরোজের মা বেহুঁশ প্রায় অবস্থা। পাড়ার ছেলে মেয়েরাও খুব কাঁদছে।
এদিকে দক্ষিণে যারা খুঁজতে বেড়িয়েছে তারা সেই জেলে নৌকাটির কাছে এসে জিজ্ঞেস করলো, একটা ছেলেকে তারা ভেসে যেতে দেখেছে কিনা। একজন জেলে বললো
-হ আমরা একটা পোলা পাইছি। আমাগো নাওয়ের ভিত্তর আছে। বেউস অইয়া পইররা রইছে। দেহেন আপনেরা যারে বিচরাইতাছেন হেয় কিনা।
হাসন আলদার নামের লোকটি নেমে গেলো । সে চিৎকার দিয়ে উঠলো।
-বাবা ফিরোজ, কেমনে পড়লি বাবা; সে হা হুতোশ শুরু করে দিয়েছে। উপর থেকে আরো দু’জন নেমে গেলো নৌকায়। তারা ধরাধরি করে ফিরোজকে পাড়ে তুললো।
হাসন আলদার জেলেদের বললো
-ভাই আল্লাহ আপনেগো বালা করুক। অর অবস্থা বেগতিক। অরে ডাক্তারখানা লইয়া যাই। হাসন আলদার ও হাসু মাঝি দু’জনে ফিরোজকে ধরাধরি করে হাইমচর হাসপাতালে নিয়ে চললো। অপর লোকটিকে পাঠিয়ে দিলো বাড়িতে। খরব পেয়ে সবাই হাসপাতালে চলে আসলো। সে এক করুণ দৃশ্য। ডাক্তার সবাইকে আসতে নিষেধ করছেন। কেবল ফিরোজের মা ও বাবা দু’জনে ভিতরে ঢুকেছেন। মা ফিরোজকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় সমস্ত হাসপাতাল তোলপাড় করে তুলেছেন। ডাক্তার তাদেরকে পাশের একটি কক্ষে এনে রেখেছেন। দু’ঘন্টা পর ফিরোজের জ্ঞান ফিরেছে।
তিনদিন পর হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেলো ফিরোজ। তার বন্ধুদের অনেকেই গেলো তাকে দেখতে। সুইটিও গিয়েছে। পরনে একটি ফ্রক ও হাফ প্যান্ট। মাথার ছেলেদের মতো ছাটা চুল। কয়েকটি রিক্সায় করে তারা বাড়িতে চলে আসলো।
ফিরোজ আবার চলে যায় তার পুরনো খেলার মাঠটির কাছে। এই কয়দিনে তা ভেঙে শেষ হয়ে গেছে। এখন তা বিস্তীর্ণ নদী। উদাস হয়ে সে দিকেই তাকিয়ে আছে সে। ফিরোজের বাবা বাড়ি থেকে তাকে এভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ভীষণ রেগে গেলেন। কিন্তু কাছে গিয়ে তার রাগ মাটি। ছেলের জন্য তার মায়া হলো। ফিরোজের বয়সে তিনিও বাড়িহারা হন একবার। তখন তার বয়স ফিরোজের মতোই। আস্তে আস্তে ফিরোজের কাছে গিয়ে কাঁধে হাত রাখলেন গিয়াস সাহেব। বাবার বুকে মাথা রেখে ফিরোজ চিৎকার করে কাঁদতে শুরু করলো। মাঠের শেষ প্রান্তে নদীর খাড়া পাড়ে গিয়ে প্রতিধ্বনি করে ফিরোজের কান্না। বাবা আমাদের খেলার মাঠটি শেষ হয়ে গেলো । ছেলের কান্না শুনে ফিরোজের মা-ও চলে আসেন নদীর পাড়ে। আজ সারাদিন ফিরোজের বাবা ছেলেকে সময় দেন।
ক’দিন পর ফিরোজের চাচা হাকিম সরকার আসেন ভাইয়ের অবস্থা দেখার জন্য। পত্রিকাতে নদী ভাঙার ভয়াবহতার খবর শুনে চলে আসেন ঢাকা থেকে। হাকিম সাহেব খুবই উদার প্রকৃতির লোক। ঢাকার প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী। ইসলামপুরে কাপড়ের দোকান আছে তার। থাকেন নাজিরা বাজার এলাকায়। নিজের বাড়ি আছে। দোতলা বাড়ি। নিচতলা সম্পূর্ণ ভাড়া আর দোতলায় নিজেরা থাকেন। ফিরোজদের বাড়িটাও ভেঙে যেতে আর হয়তো দশ বারো দিন লাগবে। নিঃসন্তান চাচা ফিরোজের বাবার সাথে আলোচনা করে ফিরোজকে ঢাকা নিয়ে আসেন। জীবনে এই প্রথম ঢাকা আসা। বদ্ধ ঘরে তার একটুও ভালো লাগে না। খোলা আকাশ, নদীর ঢেউ, বিস্তীর্ন মাঠে ছুটে যায় তার মন। যানবাহনের হর্ন, মানুষের কোলাহল, ধোঁয়াটে বাতাস তার একদম সহ্য হয় না। চাচা এখানে তাকে সিক্সে ভর্তি করে দেন। প্রথম প্রথম চাচি ভালো ব্যবহার করলেও এখন তাকে একটা বাড়তি ঝামেলা মনে করছেন। গতো রাত্রে চাচি ফিরোজের চাচার সাথে এ নিয়ে কথা কাটাকাটি করেছে। ফিরোজ তখন ঘুমিয়ে ছিলো।
চাচা সারাদিন থাকেন দোকানে। ফিরোজ স্কুল থেকে ফিরে প্রায় তিনটার সময়। এ সময় চাচি থাকেন বাসায় একা। ফিরোজের চাচি রোমেলা ছাত্রজীবন থেকেই উশৃঙ্খল ধরনের। আর এখন স্বামীর দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে সারাদিন আড্ডায় মেতে থাকেন বন্ধুদের সাথে। ক’জন বন্ধু আছেন তা হয়তো রোমেলা নামের এ ভদ্রমহিলা নিজেও জানে না। একদিন ফিরোজ স্কুল থেকে একটু তাড়াতাড়ি চলে আসে। আজ তার মনটা বেশি ভালো নেই। বার বার বাড়ির কথা মনে পড়ছে। ঘরে ঢোকার সাথে সাথেই ড্রইংরুমে চাচিকে এক চল্লিশোর্ধ ভদ্রলোকের সাথে আপত্তিকর অবস্থায় দেখে তার মনে তোলপাড় শুরু হয়ে যায়। সে প্রেম চিনে না। কিন্তু এটুকু জানে যে, অপরিচিত পুরুষেরে সাথে এভাবে মেলামেশা করা মহিলাদের জন্য অন্যায়। তার এতোটুকু বয়সে সে এরকম কাউকে দেখেনি। মাথাটা নিচু করে নিজের রুমে চলে যায় ফিরোজ। কিছুক্ষণ পর চাচি তার রুমে ঢুকে অগ্নিশর্মা হয়ে বললো
-এই কমজাতের বাচ্চা, চউরা, শোন। ফিরোজ তো ভয়ে এতোটুকু হয়ে গেলো । খরগোশের মতো দুরু দুরু মনে এগিয়ে এলো সিংহীর কাছে। আসতেই গালে টাস করে একটা চড় বসিয়ে চাচি বললো,
-এ জন্য শহরে এসেছিস। স্কুল ফাঁকি দেয়া। এই স্কুল থেকে চলে এলি কেনো? কথা বলছিস না যে? বলেই অপর গালে আরেকটি চড় বসিয়ে দিলো। আরো কয়েকটি থাপ্পর পিঠে। রোমেলা বেগম নিজেই ক্লান্ত হয়ে গেলো।
ফিরোজ বিছানায় শুয়ে বালিশে মুখে গুঁজে অনেকক্ষণ কাঁদলো। এ কান্নার শব্দ চারদেয়াল থেকে আবার ফিরে আসছে তারই দিকে। চাচি কেনো তাকে মারলো তা জানতে পারলে হয়ত দুঃখ কিছুটা হলেও লাঘব হতো। কেনো চাচি তাকে মারলো।
চাচি কিছুক্ষণ পর আবার ঘরে ঢুকলো। কর্কশ গলায় বললো
-এই ভাত খেয়ে যা। আর তোকে মেরেছি এ কথা যদি তুই তোর চাচাকে বলিস তো পিঠের ছাল তুলে ফেলবো। ফিরোজ কোনো প্রতি উত্তর করলো না। ফুঁপিয়ে কাঁদছে।
-কি বলছি বুঝতে পেরেছিস? এক মিনিটের মধ্যে বাথরুমে ঢুকে হাত মুখ ধুয়ে খেতে আয়। বলেই রোমেলা নামের চাচি চলে গেলো। ফিরোজ জানে কথা তামিল না করলে বিপদ আরো ভয়াবহ হবে। সে এক মুহূর্ত দেরি না করে উঠে এলো। সারা শরীরে ব্যথা। হাতমুখ ধুয়ে খেতে বসলো। কিন্তু খেতে পারলো না কিছুই।
সন্ধায় চাচা ফিরে এলেন বাসায়। কোনোদিন চাচা এমন সময় বাসায় আসেন না। চেহারায় শোকের ছায়া। গম্ভীরভাবে ঘরে ঢুকলেন। রোমেলা স্বামীর আগমনে বিরক্ত হলেও চেহারার ভাব দেখে একটু নরম হলেন।
-কি হয়েছে? তোমাকে এমন বিমর্ষ দেখাচ্ছে কেনো? ভিতরে চলো। বহু কষ্টে বাক্য দুটো উচ্চারণ করলো রোমেলা বেগম। খাটের উপর ধপাস করে বসে পড়লেন হাকিম সাহেব। রোমেলার উদ্বেগ যেনো বেড়েই চলছে। স্বামীর ভাব দেখে বিরক্তিও লাগছে তার। কিন্তু চেহারায় তা প্রকাশ হতে দিচ্ছে না।
-শোনো। কাছে এসো। মেরুদন্ডটা একটু খাড়া করলেন হাকিম সাহেব। কতোক্ষণ স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন
-ফিরোজের মা মারা গেছেন!
-মারা গেছেন! কখন! কিভাবে! রোমেলা বেগমের কণ্ঠে উদ্বেগ ঝরে পড়ে।
-তেমন কিছু জানতে পারিনি। হাইমচর বাজারের এক ব্যবসায়ী বিকালের লঞ্চে এসে খবরটি দিয়েছে। ভাবছি ফিরোজকে কিভাবে বলবো কথাটি। হাকিম সাহেব লম্বাভাবে একটা শ্বাস নিলেন।
-কিভাবে বলবে মানে। যা হয়েছে তাই বলবে। না বললে একদিন তো সে জানবেই।
-দেখো কথাটি যতো সহজভাবে বললে, অতো সহজভাবে মৃত্যু সংবাদটি দেয়া যায় না। এতো ছোট ছেলে! এ দুঃখ সইবার মতো বয়স ওর এখনও হয়নি। মারাত্মক শক পাবে।
হাকিম সাহেব ধীরে ধীরে ফিরোজের রুমে ঢুকলেন। ফিরোজ উদাসভাবে জানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে আছে। তিনি মনটাকে আরো শক্ত করলেন। ধীরে ধীরে ফিরোজের কাঁধে স্নেহের হাত রাখলেন। তখনও ফিরোজের চোখ দুটো অশ্রুধোয়া। হাকিম সাহেব তার বুকে ফিরোজকে জড়িয়ে নিয়ে বললেন
-কাঁদছো কেনো বাবা। ফিরোজ বললো না। ওর বর্তমান অবস্থায় চাচা খবরটি দেয়া ঠিক মনে করলেন না। আবার উঠে এলেন নিজের রুমে। পরদিন ধীরে সুস্থে ফিরোজকে নিজের কাছে ডেকে নিলেন। তার কাছে বসিয়ে ভাতিজাকে প্রশ্ন করলেন।
-বলোতো বাবা এই যে গাছ-গাছালি, বন-বনানি পশুপাাখি, মানুষজনÑ সব কি পৃথিবীতে চিরদিন বেঁচে থাকে? ফিরোজ মাথা ঝাঁকিয়ে না জবাব দিলো। যেমন ধরো তোমার দাদা দাদি। তারাও আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন অনেক আগে। আল্লাহ কাউকেই পৃথিবীতে চিরঞ্জীব করে পাঠাননি। হাকিম সাহেব ভাতিজাকে আরো কাছে টেনে দিলেন। গলাটাকে একটু ভারি করে বললেন
-তোমার মা ও আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন ওপারে!
হাকিম সাহেবের কথা শেষ হওয়ার আগেই আকাশফাটা চিৎকার দিয়ে মেঝেতে লুটিয়ে পড়লো ফিরোজ। সমস্ত আকাশটা যেনো তার মাথায় ভেঙে পড়েছে। তার চিৎকারে দালানের সবগুলো ইট ভূমিকম্পের মতো কেঁপে উঠলো। সকালের নিস্তব্ধতাকে ম্লান করে সারা শহর তোলপাড় করে তোললো সে আর্তনাদ। একটার পর একটা দুঃখে কচি মন চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে গেলো । হাকিম সাহেব ভাতিজাকে কোলে তুলে নিলেন। সে অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে। দাঁতে দাঁত লেগে আছে। চিৎকারের শব্দ শুনে নিচতলা থেকে একজন মহিলা ছুটে এলেন। বালতিতে পানি এনে ঢালছেন ফিরোজের মাথায়? ছেলেটির দেহ নিস্তেজ হয়ে আছে। আধঘন্টা পর তার জ্ঞান ফিরলো। জ্ঞান ফিরেই চারদিকে কি যেনো খুঁজছে। মা তুমি কোথায় মা। আমি মা’র কাছে যাবো। আমাকে ছেড়ে দাও। মা…।
ফিরোজ তার হাত পা ছুঁড়তে লাগলো। হাকিম সাহেব কিছুতেই ভাতিজাকে ধরে রাখতে পারছেন না। এতো কিছু ঘটে যাচ্ছে অথচ রোমেলা এখনও তার ঘরে দিব্বি ঘুমুচ্ছে। হায়রে নারী হৃদয়! স্রষ্টা তোকে কি দিয়ে সৃষ্টি করেছে!
ফিরোজ একটু পর পর মা মা বলে এক আকাশফাটা চিৎকার দিয়ে আবার কাঁদতে শুরু করে। হাত পা ছুড়ছে। আর বলছে আমি মার কাছে যাবো। আমাকে মার কাছে নিয়ে চল। মা তুমি কোথায়। এই ছেলে জানে না যে, তার মা কখনো আসবে না তার কাছে। মানুষ বলে ভালো মানুষ তাড়াতাড়ি চলে যায়। ফিরোজের মা বড়ো ভালো মানুষ ছিলো। কেউবা বলে এমন সোনার মানুষ জগতে আর একটাও দেখি নাই।
ক’দিন ফিরোজ স্কুলে গেলো না। তার নিজের রুম আর ছাদ ছাড়া কোথাও যায় না। চাচাও দোকানে না গিয়ে ক’টা দিন বাড়িতেই কাটালেন। ভাতিজাকে চোখে চোখে রাখছেন। ফিরোজ শুধু দিগন্তের দিকে চেয়ে থাকে। আর কল্পনার সাগরে মায়ের ছবি দেখে। কখনো মনে হয় আকাশের ওই মেঘটাতে মায়ের মুখখানি দেখা যায়। কখনো মনে হয় মা পড়ার টেবিলের পাশে দাঁড়িয়ে আছেন। ‘বাবা দুধটুকু খেয়ে নে, এতো রাত পড়লে শরীর খারাপ করবে। নদীর পাড়ে যাসনে বাবা।’ চোখ মেলে তাকাতেই ফিরোজ আর কিচ্ছু দেখে না। শুধু শূন্যতা, শুধুই হাহাকার।
হাকিম সাহেব ভাতিজার কাঁধে হাত রাখেন।
-চলো বাবা একটু বাহিরে থেকে ঘুরে আসি। ফিরোজ না করে না। শুধু উদাস চোখে চেয়ে থাকে চাচার দিকে। চাচার মুখটাতে মায়ের মুখটি ভেসে ওঠে। চাচা ঘোড়ার গাড়িতে চড়ায়। আহসান মঞ্জিলে ঘুরিয়ে আনে। বুড়িগঙ্গার কালো পানি ফিরোজের চোখে মেঘনায় প্রতিচ্ছবি আঁকে। বাংলা বাজার থেকে কয়েকটি এডভেঞ্জার বই কিনে দেন চাচা। ধীরে ধীরে চাচার প্রতি আসক্তি বাড়তে থাকে ফিরোজের। মায়ের অভাব চাচা পূরণ করার চেষ্টা করে।
ক’দিন পর সিক্সের ফাইনাল পরীক্ষা। ফিরোজ মন দিয়ে পড়াশোনা শুরু করে। ভালোমতো পরীক্ষাও দেয়। থার্ড প্লেস করে। চাচা খুব খুশি হন। চাচার আদর ভাতিজার প্রতি বাড়তে থাকে। এতে চাচির হিংসে হয়। সে ফিরোজকে ঠিকমতো খাবার দেয় না। নানা অত্যচার শুরু করে দেয়।
রোমেনা বেগমের বন্ধুদের আনাগোনা এ ক’দিন ছিলো না। প্রিয় বন্ধুদের দর্শন লাভে মন ব্যাকুল হয়ে আছে তার। মনের আনন্দে রিসিভারটা তুলে নেয় হাতে। ইস্কান্দার নামের লোকটির নাম্বারে রিং করে।
ওপাড় থেকে পুরুষালী কণ্ঠ ভেসে আসে। কিছুক্ষণ অন্তরঙ্গ আলাপ করলো। সুযোগ মতো আসতে বললো বাসায়। রোমেলা বেগম মনের আনন্দে আজ দিশেহারা । ওয়ারড্রব থেকে প্রিয় ড্রেসগুলো বের করে। ড্রেসিং টেবিলে বসে নিজের দেহটা দেখে ঘুরে ঘুরে। না, যৌবনে এখনও ভাটা পড়েনি। রোমেলা বেগম নিজে সুঠাম দেহের অধিকারিনী। বয়সও বেশি হয়নি। মাত্র পঁয়ত্রিশ। ভালো করে মেকআপ শুরু করলো। ইস্কান্দারের দেয়া শাড়িটায় তাকে চমৎকার মানিয়েছে। মোটা ঠোঁট দু’টোতে টকটকে লাল লিপষ্টিক লাগিয়ে নিলো। ড্রেসিং টেবিলের সামনে বসে নিজেকে ভালো করে দেখে রোমেলা। মনের অজান্তেই বলে ফেলে বা চমৎকার! অপেক্ষা করাটা প্রত্যেক মানুষের কাছেই বিরক্তিকর। এক ঘন্টা পর আাসলো ইস্কান্দার নামের লোকটি। রোমেলার বিজনেজ পার্টনার। অপরাধ জগতের প্রতাপশালী ব্যক্তি। অপহরণ আর মাদক ব্যবসার সাথে যুক্ত। রোমেলাও আন্ডারওয়াল্ডের অধরা লিজেন্ড। কিন্তু তার এই পরিচয় দু’চারজনের বেশি কেউ জানে না। এক হাতে প্রেয়সীর জন্য দু’টি টকটকে লাল গোলাপ নিয়ে পর্দা টেনে ভিতরে ঢুকলো ইস্কান্দার।
-এতো দেরি করলে যে? রোমেলা বেগমের কন্ঠে হালকা বিরক্তি।
-তা আর বলতে হয়। ট্রাফিক জ্যাম; বুঝলে? মুখে এক টুকরো হাসি টেনে বললো ইস্কান্দার মৃধা। সাথে সাথে নিজের বাগান থেকে আনা লাল গোলাপ দু’টো এগিয়ে ধরে রোমেলার দিকে। রোমেলা বেগম স্বহাস্যে গ্রহণ করে প্রিয় লাল গোলাপ। সাথে সাথেই বন্দি হলো ইস্কান্দারের পেশাীবহুল বাহুতে। রোমেলাও জাপটে ধরে আলিঙ্গন করলো ইস্কান্দারকে। চুমোয় চুমোয় ভরে ওঠে রোমেলার কামুক শরীর। এ যেনো বহুদিনের পাওনা। এরপর…।
রোমেলার নামে একটি চিঠি এসেছে। রেজিস্ট্রিকৃত চিঠি। পিওন বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। অনিচ্ছা সত্ত্বেও ফিরোজকে যেতে হবে চাচির ঘরে। নয় ছয় ভেবে শেষ পর্যন্ত গেলো চাচির ঘরের দিকে। পর্দা ঠেলে ভিতরে এক পা দিতেই সে থমকে দাঁড়ায়। মুহূর্তের মধ্যেই ঘুরে এক দৌড়ে নিজের রুমে চলে আসে ফিরোজ। তার মনের ভিতর কামারের হাপর টানা শুরু হয়ে গেছে। শহরে এসেছে এক বছর হলো। ছোট হলেও সে অনেক কিছুই বুঝে ফেলেছে এর মধ্যে। ছি! এতো বড়ো নষ্টা মহিলা চাচি! ভাবতেও ঘৃণা লাগে। চাচার মতো একজন মহৎপ্রাণ মানুষ এ নষ্টা মহিলার সাথে ঘর করছেন। ভাবতে গিয়ে চাচার জন্য কষ্ট হয় ফিরোজের। সরল মনের মানুষটি সারাদিন পড়ে থাকেন দোকানে। স্বামীর দুর্বলতাকে পুঁজি করে চাচার সাথে প্রতারণা করছে এ মহিলা। এ কিভাবে মেনে নেয়া যায়। রোমেলা সবকিছু ঠিকঠাক করে ফিরোজের রুমে অগ্নীশর্মা হয়ে ঢোকে। তখন প্রায় সন্ধ্যা।
তুই কি আমার ঘরে গিয়েছিলি?
-হ্যাঁ গিয়েছিলাম। ফিরোজের উত্তরটা ঝাঁঝালো ও স্পষ্ট। রোমেলা বেগম ওর উত্তর শুনে অবাক। ফিরোজ কখনও তার সাথে এমনভাবে কথা বলেনি। সব সময় চাচিকে দেখলে তার চেহারায় একটা ভয় ভয় ভাব থাকতো। আজ তাকে এতো স্পষ্টভাবে কথা বলতে দেখে রোমেলা বিস্মিত না হয়ে পারলো না। আর কোনো কথা তাকে জিজ্ঞেস করলো না। এবার সে অন্য পথ খুঁজছে। ফিরোজের এ বাড়িতে থাকা রোমেলার জন্য মঙ্গলজনক নয়। এ হলো তার জীবনের কালসাপ। যে কোনো মূল্যেই হোক তাকে এখান থেকে সরাতে হবে। সরাতে হবে ভিন্নভাবে। আজকের ঘটনা যাতে তার চাচার কাছে ফাঁস করতে না পারে, তার আগেই। এ কালসাপ একমুহূর্তও আর এখানে রাখা সম্ভব নয়। তাহলে রোমেলার জীবন হবে বিপন্ন। নিজ ঘরে পায়চারী করছে রোমেলা। কি করবে ভেবে পাচ্ছে না। চট করে রিসিভার হাতে তুলে নিলো। ইস্কান্দারের নাম্বারটা ডায়াল করছে। লাইনটা পেতে বেশি সময় লাগলো না।
-হ্যালো, ইস্কান্দার সাহেব আছেন,
-জ্বি, আছেন।
-কাইন্ডলি তাকে একটু দিন।
-হ্যালো । কে … রোমেলা! কি হয়েছে।
-হ্যা! শোনো যা সন্দেহ করেছিলাম তা-ই।
-আচ্ছা!
-এখন শোনো। যে কোনো মূল্যেই হোক ওকে এখান থেকে রাত নয়টার আগেই সরাতে হবে। নচেৎ আমার জীবন বিপদের সম্মুখীন হবে।
-কোনো চিন্তা করো না। আমি ব্যবস্থা করছি।
-শোনো, কিডন্যাপ করলে কোনো সমস্যা আছে?
-কোনো কিছুতেই সমস্যা নেই। যা ভালো মনে করো, তাই করো।
-আচ্ছা এবার তুমি চিন্তামুক্ত হও। আমি সব ব্যবস্থা করছি।
-রাখি তাহলে।
রাত আটটার দিকে ইস্কান্দার পাঁচ ছয়জনের একটি দল পাঠিয়ে দিলো ফিরোজকে ধরে আনার জন্য। ওই পুঁচকে ছোড়াকে ধরে আনতে দু’জন লোকই যথেষ্ট। বাড়তি ঝামেলা এড়াতে এতো বড়ো আয়োজন। ড্রাইভারসহ দু’জন গাড়িতে রয়ে গেলো। আর চারজন দু’জন দু’জন কারে উঠে এলো দোতলায়। রোমেলা সিঁড়ির গোড়াতেই দাঁড়িয়ে ছিলো। ওদের আসতে দেখে চোখ দুটো চকচক করে উঠছে। মুখে বিজয়ের হাসি। পরিপূর্ণ বিজয় এখনও আসেনি। রোমেলা তাদেরকে ফিরোজের ঘর দেখিয়ে বাইরের বাতি নিভিয়ে দিলো যাতে কারো চোখে ধরা না পড়ে। চারজন লোক ফিরোজকে পড়ার টেবিল থেকে ধরে নিয়ে আসে। একজন ঝট করে তার চোখ দুটো বেঁধে ফেলে। আরেকজন এক হাতে ওর মুখ চেপে ধরে রাখে।
এক এক করে সবাই গাড়িতে ওঠে। দলনেতা রোমেলাকে বিদায় জানিয়ে বসে ড্রাইভারের পাশের সিটে। একটা ঝাঁকুনি দিয়ে এগিয়ে চললো গাড়িটি। কোন দিকে যাচ্ছে তা ফিরোজ টের পায়নি। তার চোখ এখনো বাঁধা।
রাত দশটার দিকে বাসায় ফিরলেন হাকিম সাহেব। কাপড় ছেড়েই অভ্যেস মতো চলে গেলেন ভাতিজার রুমে। উঁকি দিতেই আতকে উঠলেন! টেবিলের উপর বই খাতা ছড়ানো, চেয়ার উল্টে পড়ে আছে। হাকিম সাহেবের ভিতরটা কেঁপে উঠলো। ফিরোজ গোছালো ছেলে। এমনটি হবার নয়। কোথায় গেলো সে। সব দিন তো এসে দেখে সে টেবিলে।
ফিরোজকে ধরে নিয়ে যাওয়ার কিছুক্ষণ পর রোমেলাও বাইরে বের হয়। আজকে ইস্কান্দার এতোটাই উত্তেজিত ছিলো যে ছিটকানিটা আটকানোর কথাও ভুলে গিয়েছিলো। হাকিম সাহেব নিরীহ মানুষ হলেও পুরান ঢাকায় তার প্রভাব কম নয়। ফিরোজ তার চাচাকে সব বলে দিলে কলঙ্কের আর সীমা থাকতো না। তাই ঝামেলা এড়াবার জন্য ফিরোজকে সরিয়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে রোমেলা।
ঘরে ঢুকে স্বামীর উপস্থিতি টের পেয়ে একটু অগোছালো ভাব নিয়ে গেলো স্বামীর কাছে। গলার স্বরটাকে কান্নার মতো করে বললো
-ফিরোজকে কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না। ও আজ স্কুল থেকে বাড়ি ফেরেনি। আমি সব জায়গা তন্ন তন্ন করে খুঁজে এসেছি। কোথাও তাকে খুঁজে পাইনি। মা মরা ছেলেটি… বলেই মেকি কান্না শুরু করলো রোমেলা। হাকিম সাহেব উত্তেজিতভাবেই জিজ্ঞেস করলেন
-ফিরোজ কোথায়? স্কুল থেকে বাসায় না ফিরলে ওর বই-খাতা এলোমেলো কেনো? হাকিম সাহেবের রক্ত সঞ্চালন দ্রুত থেকে দ্রুততর হতে লাগলো। তিনি সবগুলো ঘর, বাথরুম, কিচেন, বারান্দা, খাটের নিচÑ তন্ন তন্ন করে খুঁজলেন। কোথাও খুঁজে পেলেন না। উদভ্রান্তের মতো ঘরে ছুটোছুটি করছেন। টেলিফোন সেটটি হাতে নিয়ে ফোন করলেন হেডমাস্টারকে। ইতিবাচক কোনো সাড়া পেলেন না। ফিরোজের বন্ধু বলতে কেউ নেই ঢাকা শহরে। হাকিম সাহেবের কয়েকজন বন্ধুর ছেলে পড়ে ফিরোজের সাথে। তাদের বাসায়ও ফোন করলেন। পাওয়া গেলো না সেখানেও।