ইস্কান্দার সাহেবের মাইক্রোটি এসে থামলো একটি পরিত্যক্ত দোতলা বাড়ির কাছে। নেমপ্লেটটিও শ্যাওলা পড়ে ঘন সবুজ রঙ ধারণ করেছে। বাইরে থেকে মনে হয় না এখানে কোনো মানুষজন থাকে। গেটের কাছে এসে হর্ন দিতেই দারোয়ান গেটটি খুলে দিলো। গাড়ি ভিতরে ঢুকলো। রাত তখন বারোটা। ফিরোজকে নামানো হলো গাড়ি থেকে। এখনও তার চোখ বাঁধা। পরিত্যক্ত ছোট্ট একটি কক্ষে ঢুকানো হলো তাকে। একটি নিষ্পাপ নিরপরাধ ছেলেকে এতো কষ্ট দেয়ার কোনো মানে হয় না। একজন মহিলার পরকীয়ার খেসারত দিতে হচ্ছে একটি নিষ্পাপ ছেলেকে। ফিরোজের চোখের বাঁধন খুলে দেয়া হলো।
ইস্কান্দার নামের লোকটি পাইপ টানতে টানতে ভিতরে ঢুকছেন। এই পুঁচকে ছেলেটির সামনে দাঁড়াতে তার খুবই লজ্জা লাগছে। তবে প্রেমিকার শত্রু হিসেবে একটু গুরুত্ব দিতে হচ্ছে এই যা। এই ইস্কান্দার মৃধা ঢাকা শহরের একজন বড়ো মাদক ব্যবসায়ী, চোরাকারবারী, নারী ও শিশু পাচারকারী। এ বাড়িটি তার টর্চার গেলো। তার নেটওয়ার্ক শহরতলি পর্যন্ত ছড়ানো। থানায় অনেক মামলা ঝুলে আছে তার নামে। কিন্তু পুলিশ তাকে আজো ধরতে পারেনি। ধরবেও না কখনো। মাসে মাসে মাশোয়ারা চলে যায় সোর্সের মাধ্যমে। ইস্কান্দার ধীরে ধীরে ফিরোজের কাছে চলে আসলো। আস্তে করে ডাকলো
-কি বাবু কেমন আছো? কি দরকার ছিলো চাচিকে বিরক্ত করা। এ অন্ধকার কুঠরিতে তো আসার কথা নয় তোমার। ফিরোজ কোনো কথা বলে না। ঘাড়টা সোজা। নির্লিপ্ত চোখ। ওর সাহস দেখে ইস্কান্দার মৃধা অবাক না হয়ে পারে না। আরেকটু এগিয়ে গিয়ে মাথার চুল ধরে একটা হেঁচকা টান মেরে তাকে বসা থেকে দাঁড় করিয়ে ফেলে।
ফিরোজের মুখ থেকে একটা উহু শব্দ বের হয়। বহু অত্যাচার সয়ে সয়ে তার দেহ পোড় খাওয়া সৈনিকের মতো হয়ে গেছে। চোখ থেকে দু’ফোঁটা অশ্রু গন্ড বেয়ে গড়িয়ে পড়লো পায়ের কাছে। এখন তার মাথা সোজা। ইস্কান্দারকে দেখেই চিনে ফেলেছে ফিরোজ। তার লম্পট মার্কা চেহারার সাথে আসল চেহারাটাও এবার মিলিয়ে নিলো সে। সে জানে এই শয়তানের কাছে কোনো অনুনয় কিংবা ভাবাবেগ চলবে না। অত্যাচার সওয়ার জন্য মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে নিয়েছে সে। ফিরোজ আল্লাহর কাছে সাহস প্রার্থনা করে। আর দেখতে চায় এদের আসল চেহারাটা।
এ পুঁচকে ছেলেটার ভাব দেখে ইস্কান্দার মৃধার গায়ে আগুন ধরে যায়। চেলাদের দিকে চেয়ে ইস্কান্দার বলে
-এ বদমায়েশের বাচ্চাকে ভালোমতো বেঁধে রাখ। আমার নির্দেশ ছাড়া দানাপানি দিবি না। বলেই খট খট শব্দ করে চলে গেলো ঘর থেকে।
-শুনুন! মা বাবা তুলে গালি দেবেন না। খুবই নম্রভাবে শব্দ কটি উচ্চারণ করলো ফিরোজ। শব্দগুচ্ছটি ইস্কান্দারের মাথায় দুর্মুজের মতো আঘাত করলো। এই পুঁচকে ছেলে তাকে শব্দপ্রয়োগ শেখায়। তার সাথে অতীতে এমন আচরণ আর কেউ করেনি। ঘুরে দাঁড়িয়েছে ইস্কান্দার। সমস্ত শক্তি প্রয়োগ করে কষে একটা চড় বসিয়ে দেয় ফিরোজের গালে। সে অজ্ঞান হয়ে পড়ে থাকে মেঝে। ইস্কান্দার মৃধা রাগে ফুসতে ফুসতে চলে যায় রুম থেকে।
হাকিম সাহেব পত্রিকাতে ছবিসহ বিজ্ঞপ্তি দিলেন। পুরস্কার ঘোষণা করলেন এক লক্ষ টাকা। ভাতিজাকে পাবার জন্য সব রকমের ব্যবস্থাই করেছেন তিনি। সারা এলাকা মাইকিং করা হলো। কোথাও কোনো খোঁজ-খবর পাওয়া গেলো না। একটা ছেলেকে সারা ঢাকা শহর খুঁজেও পাওয়া যাচ্ছে না। দেশে চলে যায়নি তো! দেশেও লোক পাঠানো হলো।
খবর পেয়ে পরের দিন পাগল বেশে ফিরোজের বাবা চলে আসেন ঢাকায়। ছোট ভাই কি তার সাথে প্রতারণা করছে? না, তা কেনো হবে। আবার ফিরোজের বাবার মনে সন্দেহ দানা বাঁধতে থাকে। ক’দিন হাকিম সাহেবের উপর বিরাট একটা ধকল গেছে। তিনদিন তার পেটে বলতে গেলে কিছুই পড়েনি। পুরুষ মানুষ যে এতোটাই শোকাহত হয় তা হাকিম সাহেবকে না দেখলে বোঝাই যাবে না। চেহারা মন মানসিকতা, স্বাস্থ্যÑ সর্বোপরি ক’দিন না ঘুমানোর ফলে তার শরীরের একেবারে করুণ অবস্থা। ফিরোজের বাবা ঢাকায় এসে ভাইয়ের অবস্থা দেখে তার মনের সন্দেহ মুহূর্তেই দূরে চলে যায়। একে অপরকে জড়িয়ে একেবারে ছোটদের মতো হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করেন। এ অবস্থা দেখে সবারই চোখে পানি এসে যায়। পানি আসে না শুধু রোমেলার চোখে। সপ্তাহখানেক দুই ভাই ঢাকার অলিতে গলিতে, আনাচে কানাচে খোঁজাখুঁজি করেন। কোথাও না পেয়ে ফিরোজের বাবা দেশে চলে যান। স্ত্রীর শোকে তিনি একেবারে ভেঙে পড়েছিলেন আর পুত্রশোকে বাজপড়া কলাগাছের মতো তার অবস্থা। ছেলে হারানোর ব্যথায় পুরনো ক্ষতে নতুন করে কষ্টক্ষরণ শুরু হয়েছে। একজন গন্তব্যহীন, উদ্দেশ্যহীন পথিকের মতোই অবস্থা গিয়াস উদ্দিন সাহেবের। জীবনের যে জাল তিনি যৌবনের প্রারম্ভে ছড়িয়ে ছিলেন। আজ তা পানির তলায় লুকানো ঝোপে আটকা পড়ে আছে। কেবল রশিটাই তার হাতে ধরা। ব্যর্থতার গ্লানি মোছাবার মতো কী আছে আজ তার কাছে!
আজ তিনদিন হলো ফিরোজ ইস্কান্দার মৃধার আস্তানাতে বন্দি। গতো দুই দিন ফিরোজকে কোনো খাবার দেয়নি ঐ নরপিশাচরা। তার গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। ছোট্ট দেহটা নিস্তেজ পড়ে আছে মেঝে। মায়ের মৃত্যুর পর এমনিতেই বেঁচে থাকাটা তার কাছে অর্থহীন মনে হয়েছে। এখন ভাবছে মরে গেলে মায়ের সাথে দেখা হবে তাড়াতাড়ি। তাই এই বন্দিজীবন, এই মৃত্যুপুরী মায়ের কাছে পৌঁছানোর একটি মাধ্যম বলে নিজের মনকে প্রবোধ দিচ্ছে ফিরোজ। চোখ দু’টো ঝাপসা হয়ে আসে। তখন আবার এই বন্দিদশা থেকে মুক্তি পেতে চায়। একটি প্রতিশোধ¯পৃহা কিশোর মনে জেগে ওঠে। প্রশান্ত মনে আল্লাহকে ডাকে। আল্লাহ আমাকে এ বন্দীদশা থেকে মুক্তি দাও। আমাকে তুমি বাঁচাও। আমাকে বাঁচাও খোদা। ফুপিয়ে কেঁদে ওঠে ফিরোজ। তার চোখ থেকে এখন আর অশ্রু ঝরে না। চোখের পানি নিঃশেষ হয়ে গেছে। তার মনে পড়ে যায় রবীন্দ্রনাথের কবিতাÑ ‘বিপদে মোরে রক্ষা করো/ এ নহে মোর প্রার্থনা/ বিপদে আমি না যেন করি ভয়/ দুঃখ তাপে ব্যথিত চিতে নাইবা দিলে সান্তনা/ দুঃখ যেন করিতে পারি জয়।’
মনের শক্তি বৃদ্ধি পায় ফিরোজের। আরো কষ্ট সহ্য করার প্রত্যয় ব্যক্ত করে মনে। তৃতীয় দিন তার সামনে হাজির করা হয় এক গ্লাস পানি আর বাসি কিছু রুটিকলা। ফিরোজ এক নিঃশ্বাসে সবটুকু পানি পান করে। পানি পান করে সে খুবই ক্লান্তি অনুভব করে। গায়ে একটুও শক্তি নেই। মনের শক্তিই তাকে বাঁচিয়ে রাখে। সে জানে তার কোনো অপরাধ নেই। শুধু দু’টো স্পষ্ট কথা সে বলেছে। আর এক নষ্টা মহিলার কুকীর্তি দেখে ফেলেছে। এই তার অপরাধ। ক্ষুধা নিবারনের জন্য কয়েক টুকুরো রুটি ও একটি কলা খেলো সে। ইস্কান্দার মৃধা দরজা ঠেলে ভিতরে প্রবেশ করে। স্বাভাবিকভাবে দাঁড়ায় ফিরোজের সামনে।
শান্তকণ্ঠে বলে
-আমি তোকে এতো কষ্ট দিতাম না। কিন্তু তুই আমার অস্তিত্বে আঘাত দিয়েছিস। এ জন্য তোকে আরো অনেক কষ্ট সহ্য করতে হবে। তবে তোর মরণ খুব নিকটে। কথাটি বলেই পা বাড়ায় ইস্কান্দার।
ফিরোজ শান্তভাবে তার কথাগুলো শোনে। ভিতরে কোনো পরিবর্তন নেই। ক্লান্ত দেহে রবীন্দ্রনাথের আরেকটি কবিতার দু’টি চরণ শক্তি সঞ্চয় করে আবৃত্তি করে ‘মৃত্যুকে যে এড়িয়ে চলে মৃত্যু তারেই টানে/ মৃত্যুকে যে বুক পেতে নেয় বাঁচতে তারাই জানে।’ চরণটি সমস্ত ঘরে সুর মূর্ছনা ছড়িয়ে দেয়। বৃদ্ধ পরিচারক অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে থাকে। এ পিচ্ছি ছোকড়াটিকে ভালো করে দেখে। এতো প্রত্যয়ী ছেলে সে জীবনে এখনও দেখেনি। এ ঘরে অনেক বন্দিকে সে আসতে দেখেছে। তার মধ্যে নামকরা ডাকাতও ছিলো। কিন্তু জীবনের শেষ সময়ে এমন কথা যে কেউ বলতে পারে তা ফিরোজকে না দেখলে হয়তো সে বিশ্বাস করতে পারতো না। কি মোহিনী শক্তি রয়েছে এ ছেলের ভিতরে। জীবনের ষাটটি বছর পার করে এসেছে জগলু নামের এই লোকটি। ফিরোজের কথার প্রতিধ্বনি জগলু তার আত্মার ভিতর শুনতে পায়। ফিরোজের কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করে
-সাহেব যে বলে গেলো তোমার মরণ খুব নিকটে। ভয় লাগে না তোমার?
কিসের ভয়! কাকে ভয় করবো। এই ইস্কান্দার মৃধা নিজেও জানে না তার মরণও অতি নিকটে। কখন তার মরণ হবে সে নিজেও জানে না। যদি জানতো তাহলে সে এতো অপরাধ করতো না। হয়তো সে আমার মৃত্যুর হুকুমও দিয়ে যাবার সময় পাবে না। মানুষের জীবন মরণের যিনি মালিক তাকেই তো ভয় পাওয়া উচিত। জগলু নামের লোকটি আর কোনো কথা বলার সাহস পেলো না। ফিরোজ যা বলেছে ঠিকই বলেছে। কতোজনকেই তো মরতে দেখেছে জগলু। জীবনের কী গ্যারান্টি আছে? জগলুর মন ফিরোজের প্রতি শ্রদ্ধায় ভরে ওঠে। আর কোনো কথা না বলে সে চলে যায়। পাছে কেউ সন্দেহ করলে উভয়েরই বিপদ হতে পারে!
ফিরোজ খাওয়ার পর ঘুমিয়ে পড়লো। গভীর ঘুম তাকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছে। এ ক’দিন সে ঘুমাতে পারেনি। আজ পেটে কিছু দানাপানি পড়াতে কাজাসহ গভীর ঘুম নেমে এলো চোখে।
স্বপ্ন দেখছে ফিরোজ। মা জড়িয়ে ধরে আছেন তাকে। এতোদিন কোথায় ছিলি বাবা! ফিরোজ নির্বিকার। মা দু’গালে চুমু খাচ্ছেন। মাথায় হাত বুলাচ্ছেন। আমার সোনা শুকিয়ে কেমন হয়ে গেছে! মায়ের কোল থেকে নেমে ফিরোজ ছুট দেয় মেঘনার পাড়ে। উদাসভাবে চেয়ে থাকে অস্তমুখি সূর্যের দিকে। মা পিছন থেকে এসে একটা হাত রাখে ফিরোজের কাঁধে। ফিরোজ পিছনে ফিরে তাকাতেই তার ঘুম ভেঙে যায়। স্বপ্ন-বাস্তবতায় কেটে যায় আরো কিছু সময়। আবার ঘুমের রাজ্যে চলে যায় ক্লান্ত দেহটি।
পরের দিন সকালে জগলুর ডাকে ফিরোজ স্বপ্নজাল ছিন্ন করে উঠে বসে। তার সামনে পঁচাগলা খাবারের পাশে কিছু তাজা ফল ও গরম রুটি-ভাজি সাজানো। এগুলো গোপনে নিয়ে এসেছে জগলু। ফিরোজের জন্য। ফিরোজ তার রুমের সাথে ছোট্ট বাথরুম থেকে হাতমুখ ধুয়ে চলে আসে। পরম তৃপ্তিতে রুটিভাজি খেয়ে আপেলে কামড় বসায় সে। পানি পান করে কৃতজ্ঞ চোখে চাইলো এই নরকপুরীর খাস পাহারাদারের দিকে। প্রত্যেক মানুষের ভিতর যে আরেকটা মানুষ বাস করে ফিরোজ তা উপলদ্ধি করতে পারলো এই বৃদ্ধকে দেখে। পানিটা সে বাথরুম থেকেই পায় এই বৃদ্ধের জন্য। কিন্তু প্রথম দুই দিন বাথরুমের পানির লাইন বন্ধ ছিলো। পরের দিনগুলো তার এভাবেই কাটে।
আজ ফিরোজ দুপুরে খাওয়ার পর ঘুমিয়ে আছে। আবার সেই তৃতীয় দিনের স্বপ্নটাই দেখলো। আজ আর তার নদীর পাড়ে যাওয়া হলো না। তার আগেই ইস্কান্দার মৃধার বুটের আঘাতে কোমর ধরে উঠে বসলো। ইস্কান্দারের সাথে রয়েছে তার তিনজন চেলা। আর ডানে রয়েছে রোমেলা।
ফিরোজ চাচিকে দেখে অবাক হলো না। ইস্কান্দার আর রোমেলার মধ্যে লিঙ্গ ছাড়া অন্য কোনো পার্থক্য নেই। এ মহিলার জন্যেই আজ তার এ অবস্থা। শুধু একবার চাচি নামের এ মহিলাটির দিকে তাকিয়ে দ্বিতীয়বার আর ফিরোজ তার দিকে তাকানোর প্রয়োজন বোধ করেনি। তার মন চাচ্ছে এ মহিলার মুখে থু থু ছিটিয়ে দিতে। এ নষ্টা কুচক্রি মহিলার দিকে তাকানোও পাপ।
-কেমন আছো ফিরোজ। নারী কণ্ঠ হলেও পুরুষালি শোনায় রোমেলার কণ্ঠ।
ফিরোজ কোনো উত্তর দেয় না।
-এই কমজাতের বাচ্চা উত্তর দিলি না কেনো? ইস্কান্দারের কণ্ঠ পিতলের কলসির মতো ঝনঝন করে উঠলো।
-কিডন্যাপ করে কাউকে বন্দি করে রাখলেই বুঝি সে কমজাতের বাচ্চা হয়ে যায়! খুব স্বাভাবিকভাবেই বললো ফিরোজ। কিন্তু উত্তরটি বিষাক্ত তীরের মতোই বিঁধল ইস্কান্দারের বুকে।
ইস্কান্দার মৃধার সমস্ত শরীর রাগে ও উত্তেজনায় কেঁপে উঠলো। মন চায় ওর মাথাটা গুড়ো করে দিতে। দাঁতে দাঁত চেপে রাগটা একটু হজম করলো। রোমেলা হাজার হলেও তার চাচি। তার সামনে অত্যাচার করা ইস্কান্দার ভালো মনে করলো না। একটু স্বাভাবিক হয়ে বললো
-তোর কোনো বিশেষ আকাঙ্খা আছে? থাকলে বলÑ পূরণ করা হবে। এরপর আর সময় পাবি না। কারণ আজই তোর শেষ দিন।
কোনো আকাঙ্খা মানুষ মানুষের কাছ থেকে আশা করে। কোনো অমানুষ তা কখনো পূরণ করতে পারে না। তাই তোমার কাছে কোনো কিছু আশা করা সমীচীন মনে করি না। ইস্কান্দারের ধৈর্যের বাঁধ আর আর তাকে আটকাতে পারলো না। চটাশ করে একটা চড় বসালো ফিরোজের নরম গালে। ফিরোজ মেঝেতে লুটিয়ে পড়লো। আর এক মুহূূর্র্তও বিলম্ব না করে সেখান থেকে দ্রুতপদে চলে গেলো ইস্কান্দার। সঙ্গে রোমেলা। রোমেলার ইচ্ছা ছিলো ছেলেটাকে আটকে রেখে বসে আনা কিন্তু তার আচরণে মতো পাল্টাতে বাধ্য হলো।
ইস্কান্দার মৃধার চেম্বারে গোল হয়ে বসলো সবাই । মৃধার চেহারার রক্তিমতা এখনো কাটেনি। সমস্ত শরীর ক্রোধে কাঁপছে। এতোটুকুন ছেলে অধীন কর্মচারির সামনে অপমান করলো! এ সহ্য করার নয়। তার হাতে অনেক গুণীজন শহীদ হয়েছে। কিন্তু মুখ খোলার সাহস পর্যন্ত কেউ করেনি। আর এ পুঁচকে ছেলেটি কিনা সবার সামনে তাকে অপমান করলো! মদের বোতলটি এক চুমুকে উজার করে চাইলো সবার দিকে। আজ রাতে তিন নম্বর স্পটে কাজ ফিনিস করতে হবে। আর কোনো কথা না বলে চলে গেলো ইস্কান্দার। রোমেলা কিছু বলতে যাচ্ছিলো কিন্তু মৃধার চেহারার দিকে তাকিয়ে তা বলার আর সাহস করলো না। ক্রোধের মশালটি এখন রোমেলার চাইতে ইস্কান্দারের মনেই জ্বলছে বেশি।
আড়ালে থেকে জগলু নির্দেশটা শুনতে পায়। তার বুকের ভিতরটা ছ্যাৎ করে ওঠে।
তাড়াতাড়ি সেখান থেকে ছুটে চলে আসে সে। ফিরোজের গলা ধরে শিশুর মতো কাঁদতে লাগলো। তার কান্নার মানে ফিরোজ বুঝতে পারলো না। তবে এটুকু বুঝতে বাকি রইলো না। তার মৃত্যু খুবই নিকটে। জগলু নিজেকে কিছুটা সামলে নিয়ে বললোÑ খোকা আজ রাত্রে ওরা তোমাকে মেরে ফেলবে। তুমি এখান থেকে চলে যাও। আমি সব ব্যবস্থা করছি।
ফিরোজ নির্বিকার। জগলুর মুখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো। কচিমনে মৃত্যুর ভয় কিছুটা হলেও উঁকি দিলো। গন্ড বেয়ে অশ্রুধারা গড়িয়ে পড়ছে। সেদিনের স্বপ্নটা আবার চোখের সামনে ভাসছে। মনে হচ্ছে যেনো মেঘনার পানি তাকে কোথাও টেনে নিয়ে যাচ্ছে। চারিদিকে নিঃসীম অন্ধকার। সে শুধু ধীরে ধীরে পানির নিচে তলিয়ে যাচ্ছে। একটু বাঁচার চেষ্টা করলো না। কাউকে বাঁচাবার জন্য বললো না। নিরবে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে চললো। পানিগুলো নদীর তলদেশে তাকে একটা নুড়ির উপর বসিয়ে দিলো। ফিরোজ নতুন এক জগতের সন্ধান পেলো। আরো প্রত্যয়ী হলো সে। অবশ্যই তাকে মৃত্যুঞ্জয়ী হতে হবে। জগলু কাঁধ ধরে একটা মৃদু ঝাঁকুনি দিয়ে বললো -বাবা এমন উদাসভাবে কি ভাবছো! সময় যে নেই। ফিরোজ চোখের পানি মুছে চাইলো জগলুর দিকে।
-মৃত্যুকে এতো ভয় পাওয়ার কি আছে। মৃত্যুকে তো একবার না একবার আলিঙ্গন করতে হবেই।
-চলো বাবা। আর দেরি করা চলবে না। ওরা হয়তো কিছুক্ষণের মধ্যেই এসে পড়বে।
ফিরোজ এবার মুখ খুললো।
-কোথায় যাবো পালিয়ে। মৃত্যু যে আমাকে খুঁজছে। ওকে কষ্ট দিয়ে লাভ কি বলো।
-বাবা এখন তর্কের সময় নয়। তোমার জীবনের যে অনেক মূল্য। তোমাকে বাঁচানো যে আমার কর্তব্য।
-না চাচা, এ তোমার কর্তব্য নয়। তুমি যার কর্মচারি তার শত্রুকে সাহায্য করা বিশ্বাসঘাতকতা করার সামিল।
-বাবা আমি তোমার সাথে কথায় পারবো না। আল্লাহ তোমার মাঝে যে কি লুকিয়ে রেখেছেন তার তালাশ করা এ মূর্খের সাধ্যাতীত। তুমি আজ না বলো নাÑ বলেই জগলু ওর হাত দু’টি ধরে ফেললো। ফিরোজ অত্যন্ত নরম সুরে বললো
-চাচা মৃত্যু যদি আমার ভাগ্যলিপিতে থেকে থাকে তবে কেউই তা ঠেকাতে পারবে না। আর আমার ভাগ্যে মৃত্যু যদি লেখা না থাকে তবে সারা পৃথিবীর মানুষ চেষ্টা করেও আমার মৃত্যু ঘটাতে পারবে না।
জগলু শান্ত হয়ে গেলো। ওকে আর টলানো যাবে না। এতোটুকুন বাচ্ছা ছেলে কথা বলে যেনো বয়সী ও হিসেবি মানুষের মতো। তবে আর মনে এখন এ ধারনা জন্মেছে যে, মৃধা তার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। বারান্দায় বুটের শব্দ পেয়ে জগলু একটু দূরত্ব বজায় রেখে দাঁড়িয়ে রইলো। ওরা এসে একটি কুটিল হাসি ছড়িয়ে দিলো চারিদিকে। ফিরোজ ওদের দিকে একবার চোখ তুলে তাকিয়ে আবার চোখ নামিয়ে নিলো। ওদের সাথে এবার ইস্কান্দার মৃধা আসেনি। যারা এসেছে তাদের মধ্য নেতাগোছের লোকটি অচেনা। সে ভুরু নাচিয়ে ফিরোজের সামনে এসে দাঁড়ালো। বুটের তলা দিয়ে ফিরোজের পায়ের আঙুলগুলোতে একটা চাপ দিতেই ফিরোজ ককিয়ে উঠলো। পা-টা টেনে নিয়ে লাঙলের ফলার মতো তীক্ষè দৃষ্টিতে লোকটির দিকে তাকালো। তবে কিছু বললো না। এবার লোকটি রিভলবারের বাট দিয়ে কাঁধের উপর শাঁ করে একটা আঘাত করলো। ফিরোজ পড়ে গেলো মেঝেতে। আঘাতটা হজম করতে কিছু সময় লাগলো। মুহূর্তপর উঠে দাঁড়িয়ে লোকটিরে মুখোমুখি হলো। সে দাঁড়ানোতে আহত বাঘের ক্ষীপ্রতা ছিলো। লোকটি আর কিছুই বললো না ওকে। কাঁধের উপর আলতো ঝাঁকুনি দিয়ে বললো
-বাঘের বাচ্চাই বটে। তবে দুঃখ হচ্ছে বাঘ আর হতে পারবে না। এরপর চোখটা ঘুরিয়ে সঙ্গীদের দিকে তাকিয়ে নির্দেশের সুরে বললো
-ভালোমতো বেঁধে গাড়িতে তোলো। বেশি দেরি করা চলবে না।
কথা বলা শেষ হলে ত্রস্ত বেগে ঘর থেকে বের হয়ে এলো নেতাগোছের লোকটি। হাত পা বাঁধা অবস্থায় ফিরোজকে গাড়িতে উঠানো হলো। গাড়ি চলছে। ডানদিকে পাঁচ মিনিট চলে বা দিকে বাঁক নিলো। গতি আগের চেয়ে বাড়লো কিছুটা। মনে হলো কোনো প্রশস্ত রাস্তায় গাড়িটি উঠে পড়েছে। মিনিট বিশেক চলার পর গাড়ির গতি নেমে এলো। রাস্তায় তেমন একটা গাড়ির আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে না। নেতাগোছের লোকটি এসে ফিরোজের চোখের বাঁধন খুলে দিলো। ফিরোজ নির্বিকার চারদিকটা একবার দেখে নিলো। ভিতরের বাতি নিভানো। বাইরে দু’পাশে আলোর সারি মনে হলো তার কাছে। মাঝখানে নদী হতে পারে। কোন নদী তা আন্দাজ করতে চেষ্টা করছে। চাচার সাথে ঘুরে ঘুরে ঢাকা শহর মোটামুটি তার চেনা এখন। এটা গাবতলি ব্রিজ হতে পারে। কী করবে তারা, গুলি করবে! করুক। মৃত্যুভয় তার এখন নেই। সে সম্পূর্ণ প্রস্তুত। তার বয়স যেনো কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। পরিচিতজনদের মৃত্যুদৃশ্য স্মরণ করার চেষ্টা করছে। সবশেষ তার মায়ের মৃত্যুর কথা মনে হতে চোখের পাতা ভিজে এলো। সেতো তার মায়ের মৃত্যু দেখেনি। হয়ত মায়ের মৃত্যুটা অনেক করুণ ছিলো।
-মৃত্যুকে খুব ভয় করে বুঝি? একটা কুটিল হাসি হেসে বললো নেতাগোছের লোকটি।
-না ভয় লাগে না। মৃত্যু তো হবে একদিন। তাকে ভয় পাওয়ার কী আাছে। নির্ভীক উত্তর দিলো ফিরোজ।
-তবে কাঁদছিলে কেনো?
-মায়ের কথা মনে পড়াতে কাঁদছি।
-তোমার মা বুঝি বেঁচে নেই? যাক তবে মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হও। এখানে বেশি দেরি করা নিরাপদ নয়। পাছে কেউ আবার সন্দেহ করবে। তোমার চোখটা খোলাই থাকলো। এর চেয়ে বেশি মায়া দেখাতে পারলাম না বলে দুঃখিত। দুঃখিত হওয়ার আরেকটি কারণ আছে। তোমার মতো এতো ছোট ছেলেকে আমি কখনো মারিনি। বসের নির্দেশ অমান্য করা যায় না। নেতা মতো লোকটি আর কিছু না বলে সঙ্গীদের দিকে মনোযোগী হলো। নির্দেশের সুরে বললো
-এই তাড়াতাড়ি কাজ শেষ কর।
একজন গাড়ি নষ্ট হয়েছে এমন একটা ভাব নিয়ে গাড়ির সামনের ঢাকনাটা খুলে পরীক্ষা নিরীক্ষা করছে। আ অন্যরা হাত পা বাঁধা অবস্থায় ফিরোজকে ব্রিজের উপর থেকে নদীতে ফেলে দিলো। গাড়ির ভিতর থেকে ডুবন্ত দৃশ্যটা দেখে গাড়ি ছুটালো আমিন বাজারের দিকে। তারপর আবার ইউ টার্ণ নিয়ে ছুটে চললো গন্তব্যের দিকে।