হায় নিয়তি! এই কী মানুষের জীবনের মূল্য! সামান্য যৌন-লালসার কাছে বিনিময় হয় নিষ্পাপ জীবনের! অহংকার, অহমিকা, প্রণয়ের আকাঙ্খা পূরণ হয় কচি প্রাণ বলি দিয়ে! পাপী মনে জন্মে না আপনজন হারাবার ব্যথা। মায়া- মমতা-বন্ধন বন্দি হয় ছিপি আঁটা বোতলে। লোলুপতা জাগ্রত করে প্রতিহিংসা। ফুটন্ত গোলাপ বিনষ্ট করে হিংসুটেরা, মালি শুধু চেয়ে চেয়ে কুটিল হাসে। শত ধীক্কার সে মালিকে! রোমেলা, ইস্কান্দার মানবরূপী হায়েনার দল দিকে দিকে জেগে ওঠে মানুষের রক্তে পিপাসা মেটাতে। জলকবর রচিত হয় এই কিশোরের দেহ দিয়ে। জাহেলিয়াত আবির্ভূত হয় আধুনিক রূপে। তারপরও কিছু মানবিক বোধ অবশিষ্ট থাকে পৃথিবীতে। বানের পানির কারণে প্রবল স্রোত তুরাগে। তুরাগের ঢেউ কি মায়াবী আঁচল হবে ফিরোজের জন্য! বলতে কি পারে না তোদের হিংস্রতা আমি ঢেউয়ের আঁচল দিয়ে ঢেকে দেবো! তোরা যা ডুবাতে চাইবি আমি তা ভাসিয়ে রাখবো। তোদের দেয়া ক্ষত আমি ধুইয়ে দেবো পবিত্রতায়।
তুরাগের ঢেউয়ের ফণা মেঘনার মতো বিষাক্ত নয়। গাড়িতে থাকতেই ফিরোজ বুঝতে পেরেছে হয় তাকে গুলি করে নদীতে ফেলে দেবে অথবা হাত পা বাঁধা অবস্থায় ছুঁড়ে দেবে স্রোতে। ছোটবেলায় ওরা দলবলে মেঘনায় খেলা করতো ঘন্টার পর ঘন্টা। সাঁতারকেটে অনেক দূর চলে যেতো। হাতের আঙুল দিয়ে পায়ের বুড়ে আঙুল ধরে সাঁতার কাটার অভিজ্ঞতা ফিরোজের আছে। নদীতে ফেলে দেয়ার পর সে দম ধরে রাখলো সাধ্য মতো। কতোক্ষণ পর ভেসে উঠলো পানির উপর। মনের সাহস দেহের শক্তির উপর জয়ী হয়। ফিরোজ সাহসী ছেলে। স্রোতের কারণে এরমধ্যে সে ব্রিজ থেকে বেশ দক্ষিণে চলে এসেছে। হাত পা বাঁধা অবস্থায় কতোক্ষণ সাঁতরাতে চেষ্টা করলো। ক্ষয়ে যাওয়া চাঁদের ক্ষীণ আলোয় তীরটি দেখা যায়। দুর্বল শরীরে আর সাঁতরাবার শক্তি থাকে না। চোখ দু’টি বুঁজে আসে। তুরাগের ছোট ছোট ঢেউগুলো আলতো দুলুনিতে তাক পৌঁছে দিয়ে যায় কিনারে। অবচেতন দেহটি পড়ে থাকে তুরাগের পাড়ে।
ছমির গাজি ফজরের ওজু করার জন্য ঘাটে আসলো। স্বভাবগত সার্চ লাইটের মতো নদীর চারিদিকে চোখ জোড়া ঘুড়িয়ে আনলো একবার। দশ বারো গজ দক্ষিণে তার চোখ দু’টো আটকে গেলো। মেসওয়াকটি মুখ থেকে বের করে এগিয়ে গেলো ওদিকে। আবছা আলোয় কী যেনো একটা অর্ধেক ডাঙায় অর্ধেক পানিতে ভাসছে।
সে আর স্থির থাকতে পারলো না। দ্রুত পৌঁছে গেলো সেখানে। হাত-পা বাঁধা অবস্থায় তেরো চৌদ্দ বছরের একটি ছেলে! উৎকণ্ঠায় তার শরীর কাঁপতে লাগলো। কোলে তুলে ডাঙায় উঠালো ছেলেটিকে। হাত পায়ের বাঁধন খুলে কান পাতল বুকে। প্রাণের স্পন্দন আছে এখনো। কালো মেঘের ভিতর থেকে যেনো ভরা চাঁদ ভেসে উঠলো গাজির মনের আকাশে। তাড়াতাড়ি ওকে কাঁধে তুলে রওনা দিয়েছে আমিন বাজারের দিকে। হাকডাক দিয়ে আরো দু’জন মানুষকে ডেকে আনলো তার কাছে। তিনজনে ধরাধরি করে নিয়ে গেলো আমিন বাজারের একটা ছোট্ট ক্লিনিকে। ডাক্তার পাওয়া গেলো না। কয়েকজন নার্স পেটের পানি বের করতে চেষ্টা করছে প্রাণপন। এখনও অচেতন ছোট্ট দেহটি। ডাক্তারকে ঘুম থেকে জাগানো হলো।

প্রায় দুই ঘন্টা পর ছেলেটির চেতন ফিরেছে। বৃদ্ধ ছমির গাজির চোখ দু’টো আনন্দে চকচক করছে। আবার জ্ঞান হারিয়েছে ছেলেটি। এই অবস্থাটি খুবই খারাপ। জ্ঞান ফিরতে প্রায় একঘন্টার মতো লাগলো ফিরোজের। এই একঘন্টায় বৃদ্ধের উপর দিয়ে উৎকণ্ঠার ঝড় বয়ে গেছে। অর্ধচেতন অবস্থায় ফিরোজের মনে হলো সে মায়ের কোলে শুয়ে আছে। চারিদিকে ঝড় বইছে। ঝড়ের সময় ফিরোজ মায়ের আঁচলের নিচে মুখ লুকিয়ে কানে আঙুল দিয়ে থাকতো। যাতে বজ্রপাতের আওয়াজ কানে না ঢোকে। চারিদিকে তুমুল বজ্রপাত। ফিরোজ ভয়ে মা’কে জড়িয়ে ধরে আছে।
শেষ বর্ষার নরম রোদ ক্লিনিকের পর্দা ঠেলে ঢুকে পড়েছে ফিরোজের গায়ে। খুব আরাম পাচ্ছিলো সে। ঘুমের ঘোরে ইস্কান্দারের চেলাগুলোকে দেখতে পেলো পিস্তল উঁচিয়ে তার দিকে আসছে। মুখে ক্রুর হাসি। ফিরোাজ চিৎকার দিয়ে উঠলো। ছমির গাজি ফিরোজের হাত চেপে ধরলো। আঙুল চালাতে লাগলো মাথার চুলগুলোতে। ফিরোজ আবার ঘুমিয়ে পড়েছে। স্যালাইনের ফোঁটাগুলো মিনিটে যাচ্ছে পঞ্চাশবার। ছেলেটির রোশনাই চেহারা ভোরের রোদে ক্রমেই উজ্জ্বল হচ্ছিলো।
মোট পাঁচদিন লাগলো ফিরোজের সুস্থ হতে। তাকে সুস্থ করে তুলতে বৃদ্ধ ছমির গাজি ও তার স্ত্রী সেবা-যতেœর কমতি রাখেনি। সুস্থ হলে গাজি তার বাড়িতে নিয়ে আসলো ফিরোজকে। জমানো টাকাগুলোর প্রায় সবটাই চলে গেলো ক্লিনিকের বিল শোধ করতে। এতে তার মোটেও আফসোস নেই। বৃদ্ধ সব ঘটনা জানতে চাইলো। ফিরোজ বৃদ্ধের কাছে সব ঘটনা খুলে বললো। নিঃসন্তান গাজি দম্পতি ফিরোজকে তাদের কাছেই থাকার আকুতি জানালো। ফিরোজও রয়ে গেলো তাদের কাছেই। যাবেই বা কোথায়! সে পণ করেছে কখনো চাচার বাসায় যাবে না। গ্রামেও যাবে না। যেখানে মা নেই সেখানে কার কাছে যাবে? তাছাড়া ফিরোজ বেঁচে আছে, এটা জানতে পারলে রোমেলা তাকে মেরে ফেলার জন্য আবারো তৎপর হবে। তার চেয়ে বরং এখানে থেকেই সবকিছুর বদলা নেবে বলে ঠিক করেছে সে। তার আগে নিজেকে গড়ে তুলতে হবে।

ছমির গাজি খুবই দরিদ্র লোক। নিঃসন্তান এই পরিবারটির সাত কুলে কেউ নেই। একটি দায়িত্ববোধও জেগে উঠেছে ফিরোজের মনে। যিনি তার জীবন বাঁচিয়েছেন তাকে ফেলে যাওয়াও ঠিক নয়। গাবতলিতে কুলির কাজ, ইটভাঙা ইত্যাদি কাজ করেই সংসার চলে ছমির গাজির। ক’দিন তার উপর খুবই ধকল গেছে। বয়সের ভারে কাজও আগের মতো করতে পারে না বৃদ্ধ। তবুও অদম্য গাজি। ফিরোজের জন্য বারান্দাটি ঠিকঠাক করে সেখানেই থাকার জায়গা করে দিয়েছেন।
Ñফিরোজ এখন মোটামুটি সুস্থ। আজ বিকেলে গ্রামটা একটু ভালো মতো ঘুরে দেখতে বের হয়েছে। বেশি দূর যাওয়া হলো না। কাছে থেকেই ঘুরে দেখেছে। তার ছোট্ট বারান্দায় এসে চৌকিতে শুয়ে পড়লো। মাথাটা ঝিমঝিম করছে। ছমির গাজির স্ত্রীকে খালা ডাকে ফিরোজ। একবার ভেবেছিলো চাচি বলে ডাকবে। কিন্তু চাচি শব্দটা আসলে রোমেলার ভয়াল চেহারাটা ভেসে ওঠে ফিরোজের চোখে। তার চেয়ে খালা, এটাই ভালো।
ভবিষ্যতে কি করা যায় তা নিয়েই ভাবছে শুয়ে শুয়ে। খালা তার পালা মুরগীর ডিম সিদ্ধ করে নিয়ে এসেছেন ফিরোজের জন্য। পরম মমতায় ফিরোজের কাছে বসে খাইয়ে দিয়েছেন। মায়ের মমতা যেনো এই মহিলার মধ্যে ফিরোজ দেখেছে। খাওয়া শেষে শাড়ির আঁচল দিয়ে মুখটি মুছে দেয় খালা। মায়ের হাতে খেলে গামছা বা টাওয়েল দিয়ে মুখ মুছেনি ফিরোজ। মা তার শাড়ির আঁচল দিয়ে মুখ মুছে দিতেন। খালার মুখের দিকে কতোক্ষণ চেয়ে থাকে ফিরোজ। যেনো তার মা সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। বৃদ্ধের উপর কয়দিন আর বসে বসে খাওয়া যায়। তাছাড়া তার তো পড়ালেখা করতে হবে। পড়ার খরচ যোগান দেবে কে? এসব চিন্তাই তার মনে ঘুরপাক খাচ্ছে।
বৃদ্ধ ছমির গাজি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লো। সে কাজে যেতে পারছে না। জমানো সামান্য টাকা দু’দিনেই ফুরিয়ে গেলো । আগামী দিনগুলো কি করে কাটবে সে চিন্তাতেই বেচারা অস্থির। ফিরোজের চিন্তাই বেশি করে করছে। ছেলেটার খাওয়া দাওয়ায় যাতে কষ্ট না হয়। তা নিয়েই স্ত্রীর সাথে আলাপ করছে ঘরের ভিতরে বসে। সবকিছু ফিরোজ বারান্দায় বসে শুনতে পায়। বৃদ্ধের হু হু কান্নার শব্দে আনচান করে উঠলো ফিরোজের মন। বৃদ্ধের ঘাড়ে এতোদিন ধরে খাচ্ছে বলে নিজেকে তিরস্কার করছে ফিরোজ। প্রত্যুপকারের একটা সুযোগ পেলো বলে নিজের মনকে সান্ত্বনা দিলো আবার।
সকালবেলা ঘুম থেকে উঠেই ফিরোজ চলে গেলো গাবতলি বাসষ্ট্যান্ডে। নির্দ্বিধায় মানুষের মালপত্র টেনে চলেছে সে। ধীরে ধীরে ছমির গাজির কর্মস্থলে ঢুকে পড়ে। এর আগে গোপনে সে বৃদ্ধের কর্মস্থলটা দেখে গেছে। নদীর পাড়ে শীপ থেকে যারা মালামাল উঠানামা করছে তাদের কাছ থেকে কাজ চাইলো ফিরোজ। কিন্তু কেউ এই কিশোরের দিকে দৃষ্টিপাত করলো না। অবশেষে ছমির গাজির নাম বলাতে কয়েকজন তাকে গুরুত্ব দিলো। ছমির গাজির আলাদা একটা প্রভাব আছে কুলি মহলে। কিন্তু ফিরোজের চেহারায় আভিজাত্যের ছাপ স্পষ্ট। সেজন্য কেউ তাকে কাজ দিতে চাইলো না। তাছাড়া এতো ছোট ছেলে এই পরিশ্রমের কাজ করবে
-তা কল্পনাও করা যায় না। একজন বললো
-বাবা তুমি তো এই কাম করতে পারবা না। কিন্তু ফিরোজ নাছোরবান্দা। সে বলে
-যে কোনো কাজই আমি করতে পারবো, দিয়ে দেখুন না। একজন প্রস্তাব করলো এই সময় সবাই কিছু কিছু টাকা দিয়ে ওস্তাদকে সাহায্য করার জন্য। কিন্তু ফিরোজ তা প্রত্যাখ্যান করলো। অবশেষে নিরুপায় হয়ে তাকে ছোট ছোট কাজগুলো করতে দিলো।

ফিরোজ চাল ডাল ও কিছু তরকারি নিয়ে বাড়িতে গেলে বৃদ্ধ বৃদ্ধা দু’জনের কেঁদে ফেললেন। ছমির গাজি চোখের পানি মুছে বললো।
-আমাকে উপহাস করছো বাবা!
কেনো চাচা উপহাস করবে কেনো। আমি কি আপনার যোগ্য ছেলে নই। চেয়ে দেখুন একজন কর্মঠ ছেলে আপনার সামনে। মুখে হাসি টেনে বললো ফিরোজ।
তবুও বৃদ্ধ বললো
-আর কখনো তুমি এ কাজ করতে যেয়ো না। তোমার হাতের কোমলতা কলমের জন্য। তোমার চোখ পড়ার জন্য। কালকে থেকে তুমি স্কুলে যাবে। পরদিন স্ত্রীর গহনা বিক্রি করা কিছু টাকা ফিরোজের হাতে দিলো। বললো
-বাবা তুমি স্কুলে ভর্তি হয়ে আসো। আমি তো আর তোমার সাথে যেতে পারছি না। ফিরোজ কিছুতেই টাকা নিতে রাজি হয়নি। কিন্তু চাচা চাচির মনের অবস্থা সে জানে। বৃদ্ধ টাকাগুলো ফিরোজের পকেটে রেখে দিলো। সে কোনো প্রতিবাদ করলো না। ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকলো অসীম আকাশের মতো উদার এই দু’টি বৃদ্ধ মানববৃক্ষের প্রতি।
ফিরোজ ক্লাস সেভেনে ভর্তি হলো মিরপুর আমিন বাজারের মফিদ-ই-আম স্কুলে। ক্লাস করছে নিয়মিত। বৃদ্ধ ছমির গাজি সুস্থ হয়ে কাজে যোগ দিলো। ফিরোজ লেখা পড়ার পাশাপাশি বাড়তি আয়ের জন্য গাবতলিতে বোঝা টানার কাজ করে মাঝে মাঝে। এতে সে বিন্দুমাত্রও কুণ্ঠিত হয় না। বৃদ্ধের সংসারের বোঝা মাথায় তুলে নেয় কিছুটা। কিন্তু বৃদ্ধ মোটেও তার এই উপার্জন গ্রহণ করতে রাজি নয়।
এভাবেই চলে যাচ্ছিলো ফিরোজের জীবন। সাফল্যের সিঁড়ি বেয়ে ক্লাস টেনে প্রথম হয় ফিরোজ। সবাই বিস্ময়ে হতবাক। একটা কুলির ছেলে প্রথম হয়ে গেছে! ক্লাসের অনেকেই এটা মেনে নিতে পারেনি। সবাই জানতো সে কুলি ছমির গাজির ছেলে। এমনিতেই অনেকে তাকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করতো। কিন্তু এখন তা প্রসারিত হলো উপহাসে। সবখানে তার উপর উৎপাত শুরু করে দিলো উশৃঙ্খল ছাত্ররা। রাস্তায় বের হলে কেউ কেউ অকথ্য ভাষায় গালি দিতো। কেউ বলতো, ওই ব্যাটা কুলির পো। আবার একধাপ এগিয়ে কেউ বলতোÑ আমার বোঝাটা গাড়িতে উঠিয়ে দে তো। কেউ ব্যঙ্গবিদ্রুপ করে বলতোÑ ব্যবসাতো ভালোই চলছে, দুইটা মাল ছাড় না ব্যাটা। আরো কতো কি।
Ñফিরোজ দাঁতে দাঁত চেপে কথাগুলো শুনে চলে যেতো। এমনিতেই এটা নিজের এলাকা না। তার উপর পরীক্ষার আগে হাঙ্গামা বাধিয়ে নিজের জীবনটা আর গন্তব্যহীন জাহাজে উঠাতে চাইলো না সে। নিয়ম অনুযায়ী ফার্স্ট বয় ক্যাপ্টেন হওয়ার কথা। স্বয়ং প্রধান শিক্ষক ক্লাসে এসে ক্যাপ্টেন হিসেবে ফিরোজের নাম ঘোষণা করলেন। সারা ক্লাসে হৈ চৈ শুরু হয়ে গেছে। প্রধান শিক্ষক তাদের থামাতে ব্যর্থ হলেন। শামীম তার স্থান ছেড়ে স্যারের পাশে এসে দাঁড়ালেন। সে সবাইকে থামতে বললো। ডানপিঠে শামীমকে ক্লাসের সবাই কিছুটা সমীহ করে চলতো। তাছাড়া সে অত্যন্ত প্রভাবশালী পরিবারের ছেলে। সবাই তার কথা না শুনলেও অনেকেই থেমে গেলো। শামীম সংক্ষেপে বললো
-তোমাদের নিয়ে খুব দুঃখ হচ্ছে। তোমরা ফিরোজের বিরুদ্ধে নয় বরং প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে, এই স্কুলের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ শুরু করে দিয়েছো। ভাবতে অবাক লাগে স্যারের সামনে এমন আচরণ কোনো ক্লাসে দেখা যায়নি। তোমরা স্কুলের ঐতিহ্যে কালিমা লেপন করেছো। বক্তৃতায় ফার্স্ট হওয়া শামীম এমন একটা পরিবেশে তৈরি করেছে যে পুরো ক্লাস এখন নিস্তব্ধ। দম নিয়ে শামীম আবার শুুরু করলো
-এটা মানি যে আমাদের ব্যাচে কিছু উশৃঙ্খল ছাত্র রয়েছে। তবুও হেড স্যারের সামনে এ আচরণ বরদাশত করার মতো নয়। কথাগুলো বলে শামীম প্রধান শিক্ষকের পায়ে ধরে ক্ষমা প্রার্থনা করে বললো
-স্যার আমরা অপরাধ করেছি। আমাদের ক্ষমা করে দিন। সকলের পক্ষ থেকে আমি আপনার কাছে ক্ষমা চাচ্ছি। আমরাতো আপনার সন্তানতুল্য। প্রধান শিক্ষক শামীমকে বুকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেললেন। সেখান থেকে ফিরে এসে ফিরোজের পাশে দাঁড়ালো শামীম। ফিরোজকে বুকে জড়িয়ে অভিবাদন জানিয়ে বললো
-আমিই প্রথম ফিরোজকে ক্যাপ্টেন হিসেবে মেনে নিলাম। সাধারণ ছাত্ররা করতালিতে সারা ক্লাস মুখরিত করে তুললো। সেদিন আর ক্লাস হয়নি। শামীম ফিরোজকে সঙ্গে করে তার বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে গেলো।

ফিরোজ ঘরে বসে বই পড়ছে। শূন্য বাড়ি। ফিরোজের এই সাফল্যটি বৃদ্ধ ছমির গাজি দেখে যেতে পারেনি। বছর খানেক আগেই মারা গেছেন তিনি। সেই শোকে স্ত্রীও ছমাস পর স্বামীর পথ ধরেছে। শূন্য বাড়িতে ফিরোজ একা। পাশের বাড়িতেই খাওয়াদাওয়া চলে। দু’টি টিউশনি করে যা পায় তা দিয়েই পড়ার খরচ চলে যায় তার। তেমন কোনো সমস্যা হয় না। বাহিরে শামীমের ডাক শুনে ফিরোজ চমকে গেলো। তাড়াতাড়ি বাহিরে চলে আসলো ফিরোজ। শামীমকে দেখে কি করবে ভেবে পেলো না। বড়োলোকের ছেলে। কোথায় বসতে বলবে। কেমন আছো কথাটা জিজ্ঞেস করতেও ভুলে যায় ফিরোজ। অবশেষে শামীমই কথা বললো
-কেমন আছো ফিরোজ?
-ভালো। তুমি কেমন আছো? ভিতরে এসো।
এখন বসবো না। চলো বাইরে হাঁটতে হাঁটতে কথা বলি।
ফিরোজ কিছু না বলে বেরিয়ে পড়লো। পথে শামীম ফিরোজের সব কথা জেনে নিলো। দুঃখে ওর অন্তরটা ফেটে যাচ্ছে। নিজেকেও খুব অপরাধী ভাবতে লাগলো শামীম। এতোদিন একসঙ্গে পড়েছি অথচ ওর সাথে ভালোমতো দু’টি কথাও তো কখনও বলা হয়নি। সন্ধ্যা হওয়াতে শামীম বিদায় নিয়ে চলে গেলো সেদিনের মতো।
পরদিন শামীম তার আম্মার সাথে ফিরোজের ব্যাপারে সব আলাপ করে ওকে নিজের বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার জন্য আসলো। বললো
-ফিরোজ আজ তোমাকে আমাদের বাড়িতে যেতে হবে। আম্মা তোমাকে যেতে বলেছেন।
ফিরোজের ভিতরটা মোচড় দিয়ে উঠলো। শামীম কি তাহলে আমার অসহায়ত্বের কথা ওর মার কাছে বলে দিয়েছে। ছি! আমি এতো নীচ হলাম কেনো। আমি তো নিজের জীবনের সঙ্গে যুদ্ধ করতে চাই। অপরের সাহায্য সহযোগিতা যে আমাকে ছোট করে রাখবে! শামীমের ধাক্কায় ফিরোজের চিন্তাজাল আর বিস্তার লাভ করতে পারে না। শামীমের দিকে চেয়ে বললো
-কেনো যেতে বলছেন?
-তা শুনে কাজ নেই। বাড়িতে গেলেই শুনতে পারবে।
ফিরোজ আসল কারণটা জানতে চায়। কি জন্য হঠাৎ আমার প্রয়োজন পড়লো। জানলে একটু নিশ্চিন্ত হতে পারতাম।
-পরীক্ষার আগ পর্যন্ত আমাদের বাড়িতেই তোমাকে থাকতে হবে। এ অবস্থায় তোমার এখানে থাকা চলবে না। এটা মায়ের নির্দেশ। নির্লিপ্ত নয়নে ফিরোজ শামীমের দিকে কতোক্ষণ তাকিয়ে থাকলো। তারপর বললো
-তোমার এই প্রস্তাবের জন্য আন্তরিক ধন্যবাদ। তবে আমাকে আর ঋণী করো না। এমনিতেই আমি অনেকের কাছে ঋণী হয়ে আছি। ঋণ শোধাবার সাধ্য যে আমার নেই। আমাকে আর দয়া কোরো না!
-এটা আবার দয়া হলো নাকি? বন্ধুর কাছে কি তোমার কোনো অধিকার নেই? এতে দয়ার কি দেখলে? তাছাড়া আমরা দু’জন একসাথে পড়াশোনা করলে তো আমার লাভ বেশি। মনে করো আমি তোমার কাছে পড়বো। এতে দু’জনেই ভালো রেজাল্ট করতে পারবো।
তোমার প্রয়োজন হলে তুমি চলে এসো আমার কাছে।
আচ্ছা, ঠিক আছে। মাঝে মাঝে আমি এখানে এসে একবেলা থেকে যাবো। এখন চলো। শামীম ফিরোজের হাত ধরে টানাটানি শুরু করে দিলো। কিছু বলতে চাইলো ফিরোজ। কিন্তু শামীম মুখ চাপা দিলো। ফিরোজকে নিতে ব্যর্থ চেষ্টা করে শামীম রাগ করে চলে যাচ্ছিলো। ফিরোজ তার হাত ধরে বললো
-বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করেছো, এটাই আমার জন্য বড়ো পাওয়া। মাঝে মাঝে এসো। এতেই আমি খুশি হবো। এর চেয়ে বেশি কিছু চাই না।
এভাবেই ফিরোজ ও শামীমের মধ্যে সম্পর্ক গভীর থেকে গভীরতর হয়। দু’টি কিশোরের বন্ধুত্ব ভ্রাতৃত্বে রূপ নেয়। দু’জনের আসা যাওয়া চলে উদয় অস্তাচলে। বাড়িতে ভালো খাবার রান্না হলে শামীম ফিরোজের জন্য নিয়ে আসে। টেস্ট পরীক্ষার পর শামীম একদিন এসে হাজির হয় ফিরোজের বাড়িতে। আজ তাকে নিয়ে যেতে এসেছে শামীম। মা পাঠিয়েছেন তাকে। শামীম কোনো মতেই ম্যানেজ করতে পারেনি ফিরোজকে।
সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত। ছেলের দেরি দেখে শামীমের মা চলে আসেন গাড়ি নিয়ে। ফিরোজের নির্জন পর্ণ কুটিরে শামীমের মা’কে দেখে ফিরোজ বিস্ময়ভরা চোখে তাকিয়ে আছে। শামীমের মা’কে দেখে মনে হলো যেনো তারই মা আল্লাহর দেয়া কোনো তোহফা নিয়ে বেহেশত থেকে নাজিল হয়েছেন তার সামনে। হৃদয়ের প্রতিটি তন্ত্রীতে যেনো সুখের সুর বেজে উঠেছে। মা যেনো মায়াবী আঁচল দিয়ে ছেলেকে বরণ করতে এসেছেন। আয় বাবা আমার বুকে আয়। আমাকে চিনতে পারিসনি। আমি তোর মা। ফিরোজ কল্পনার মধ্যেই অস্ফুট ‘মা’ বলে উঠলো। শামীমের মা তো অবাক।

শামীম একা। তার একটি যমজ ভাই ছিলো। চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা আসার সময় রোড এক্সিডেন্টে মারা যায় সে। তাও পাঁচ বছর হলো। ফিরোজকে দেখে তার মা ডাক শুনে শামীমের মা যেনো তার হারানো ছেলেকে ফিরে পেয়েছেন। মা আসাতে ফিরোজ আর শামীমদের বাড়িতে না গিয়ে পারলো না।
গাড়ি চলছে শামীমদের বাড়ির দিকে। ফিরোজ মায়ের ডানদিকে আর বা দিকে বসেছে শামীম। যেনো একই মায়ের দু’টি সন্তান। শামীমদের বাড়িতে থেকেই এসএসসি পরীক্ষা দেয় ফিরোজ। এসএসসির পর দু’জনই ভর্তি হয় তেজগাঁও কলেজে। একরুমের একটা বাসা নিয়ে ফিরোজ চলে আসে এখানে। তার আগে এক বন্ধুর সহায়তায় দু’টি টিউশনি ঠিক করে নেয় ও। শামীমের বাড়ি যদিও বেশি দূরে নয়, তাছাড়া ওদের গাড়িও আছে তবুও বন্ধুত্বের টানে শামীম চলে আসে ফিরোজের কাছেই। এক রুমে থাকা কষ্ট হয় বলে মিলিদের বাড়িতে দু’রুমের একটি ছোট্ট বাসা নেয় ওরা। শামীমের বাবা থাকেন আমেরিকায়। শামীম ফিরোজের কাছে চলে আসাতে মা-ও বাবার সাথে আমেরিকায় চলে এসেছেন বেশ কিছুদিন হলো।