হঠাৎ রিক্সা ব্রেক কষাতে ফিরোজ পড়ে যাচ্ছিল প্রায়। দু’পাশের হুড ধরে কোনোরকম আত্মরক্ষা হলো তার। তবুও ব্যাগটি পড়ে গেছে নিচে। রিক্সাওয়ালা কিছুই বুঝে উঠতে পারেনি। ফিরোজও ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে রিক্সাওয়ালা দিকে। অবাক বিস্ময়ে চোখ ঘোরাতে লাগলো চারদিকে। একটি লম্বা ঘুম থেকে যেনো জেগে উঠলো কেবল। এখানে কিভাবে এলো তাই মনে করার চেষ্টা করছে সে। নিজের জীবন কাহিনি রোমন্থন করে সে কোথায় এসেছে তাও মনে করতে পারছে না। চারদিকে একবার তাকিয়ে কিছুই চিনলো না ও। সে এখানে এলো কি করে তাও মনে নেই। ‘স্বপ্নের ঘোড়া মুহূর্তে মাইল পেরোয়’ কথাটিই সত্যি হয়েছে এখানে। স্মৃতির ক্যানভাস থেকে মুখ তুলে চাইলো রিক্সাওয়ালার দিকে। তার দু’চোখ চিকমিক করছে অশ্রুকণা। পকেট থেকে রুমাল বের করে চোখ মুছে রিক্সাওয়ালাকে বললো
-আমি এখানে কি করে এলাম?
-আপনে না কইলেন গেসুদ্দিন সরকারের বাড়িত যাইবেন। এইডাই গেসুদ্দিন সরকারের বাড়ি। বললো রিক্সাওয়ালা।

ফিরোজের এবার যেনো ঘোর কাটলো। মুখে মৃদু হাসি মেনে বললো কিছু মনে করবেন না, আমি কল্পনায় ডুবে গিয়েছিলাম। অনেক বছর পর দেশে আসলাম তো।
-আমি বোজতে পারছি। রিক্সাওয়ালা হে হে করে হাসে। সরকার সাব আপনের কি অয়।
‘বাবা’ বলেই ফিরোজ ভাড়া মিটিয়ে ব্যাগ ট্যাগ নিয়ে বাড়ির দিকে হাঁটা দিলো।
গিয়াস উদ্দিন সরকার উঠানেই বসা ছিলেন। উৎসুক্য দৃষ্টি আগন্তুক যুবকের দিকে। নিজের ছেলেকে চিনতে পারছেন না তিনি। এ দিকে ফিরোজেরও একই অবস্থা। একি তার প্রিয়তম পিতার অবস্থা! ছিন্ন বসন। রোগাটে দেহ। বাড়িতে নেই আগের সেই জৌলুস। চোখ দু’টো ভিতরে ঢুকে গেছে। পিতা-পুত্র একজন আরেক জনের দিকে এগিয়ে এলো। কতোক্ষণ নির্বিকার তাকিয়ে রইলো একে অন্যের মুখের দিকে। ‘বাবা’ বলেই পিতার বুকে ঝাপিয়ে পড়লো ফিরোজ। গগনবিদারী কান্নায় আকাশ পাতাল একাকার করে তোললো পিতাপুত্র। একজন আরেকজনকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছে। পুঞ্জিভূত মেঘমালা হতে অঝোর ধারায় অশ্রুর বারিবর্ষণ হতে লাগলো দুজনের চোখ থেকে। বাবা আমার এতোদিন কোথায় ছিলি। একটা চিঠিও তো দিতে পারতি। তবুও তো বুঝতে পারতাম তুই বেঁচে আছিস। সরকার সাহেবের কথা আটকে যেতে চায়। ফিরোজ বাকরুদ্ধ। শুধুই কাঁদছে। মনে হয় কতোকাল পর কেউ যেনো চোখের ছিপি খুলে দিয়েছে। সহস্র বছরের শোক যেনো চোখের জলেই ভাসিয়ে দেবে আজ। বছরের পর বছর ছেলের শোকে সরকার সাহেব ভগ্ন মন আর রুগ্ন দেহ নিয়ে বেঁচে আছেন। মৃত্যুই যেনো ছেলের সাথে, প্রিয়তম স্ত্রীর সাথে সাক্ষাতের একমাত্র উপায়। স্ত্রীকে হারিয়ে শোকার্ত সরকার সাহেব পুত্র শোকে হয়েছেন উদাসীন। ব্যবসায়ে লোকসান দিতে দিতে কেবল চরের ফসলের উপর নির্ভর করে বেঁচে আছেন। কান্না শুনে ঘর থেকে বের হয়ে আসে সবাই। পিতার বুক থেকে মাথা তোলে ফিরোজ। মেহরাজ ও নাহারকে দেখে চিনতে পারে সে। ফিরোজ যখন নিরুদ্দেশ হয় মেহরাজের তখন নয় আর নাহারের আট। মেহরাজ আর নাহারের চেহারা প্রায় কাছাকাছি। অনেকেই তাদেরকে যমজ ভেবে ভুল করে। কান্নাধোয়া চোখে কতোক্ষণ তাকিয়ে থাকে নাহারের দিকে। নাহার তার ভাইকে চিনতে পারে। ভাইয়া বলে ঝাপিয়ে পড়ে ফিরোজের বুকে। মেহরাজকে আর চিনতে বাকি থাকে না ফিরোজের। একই মায়ের নাড়িছেড়া তিন ধন একাকার হয়ে কাঁদছে। ভাইকে ফিরে পেয়ে যেনো তারা আকাশের চাঁদ হাতে পেলো। তাদের কান্না শুনে আশপাশের সবাই চলে আসে ফিরোজদের উঠোনে। এই মিলনের দৃশ্য দেখে কেউই আর চোখের পানি ধরে রাখতে পারে না। কেউ বলছে ‘আল্লার মাল আল্লায় ফিরাইয়া দিছে।’ ‘আহা অগো মা যদি আইজ বাইচ্চা থাকতো!’ গিয়াস উদ্দিন সাহেব চোখ মুছে সবাইকে বললেনÑ
ছেলেটাকে একটু বিশ্রাম নিতে দাও। তোমরা আরেকটু পরে এসো। সবাই চলে গেলে নাহার ভাইকে নিয়ে ঘরে ঢুকলো। ফিরোজের সৎমা কি করবেন কোনো কুলকিনারা করতে পারলেন না। নাহারই বুদ্ধি করে মা’কে পরিচয় করিয়ে দিলো। সেইসাথে বৈমাত্রেয় ভাই তুহিন ও বোন তুলিকে। ফিরোজের সৎ মা চলে গেলো রান্না ঘরে। ফিরোজ তিন বছরের তুলিকে কোলে তুলে নিলো। আর তুহিনকে বসালো পাশে। তার ব্যাগ থেকে কিছু প্যাকেট বের করে দিলো নাহারের হাতে। বোনকে বললো
-মা’কে ডেকে নিয়ে আয় তো। মা কাছে আসলে ফিরোজ পা ছুঁয়ে সালাম করলো।
-মাফ করবেন মা! বেয়াদবী হয়ে গেছে! আপনাকে আমি চিনতে পারিনি। নাহার কি বলেছে আমি খেয়ালও করিনি তখন।
-চিনবেই বা কি করে বাবা; তুমিতো আমাকে কখনো দেখনি। স্নেহমাখা কণ্ঠে বললো ফিরোজের ছোট মা। ফিরোজ খাবারের প্যাকেটগুলো মায়ের হাতে তুলে দিলো।
-তুমি হাত মুখ ধুয়ে এসো বাবা। আমি তোমার নাস্তা রেডি করে ফেলেছি। মনে হয় সারারাত পিছু খাওনি। ফিরোজ বললো
-এখন না। আরেকটু পরে সবাই একসাথে বসেই খাবো। খাওয়া শেষ হলে সবাই এসে বসলো ফিরোজের কাছাকাছি। ফিরোজের আব্বা বললেন
-বাবা এবার তোর সব কথা খুলে বল। আমাকে শান্ত কর।
ফিরোজ চাচার বাড়িতে থাকা অবস্থায় চাচির দুর্ব্যবহার। মায়ের মৃত্যু সংবাদ। চাচার বাড়ি থেকে কিভাবে কিডন্যাপ করা হয় সেখান তার উপর অত্যাচার, মেরে ফেলার চক্রান্ত, উদ্ধার, ছমির গাজির পরিবারের অপরিসীম দয়া। স্কুল, কলেজ জীবন থেকে বর্তমান অবস্থা সংক্ষেপে বর্ণনা করলো। ছেলের কথাশুনে মাঝে মাঝে ফিরোজের বাবা কান্নায় ভেঙে পড়েন। কখনো উত্তেজিত হয়ে রোমেলাকে মেরে ফেলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। খানিক ফুসে ওঠেন রাগে। খানিক উত্তেজিত হয়ে যান। কখনো মেয়েদের মতো বিলাপ করতে থাকেনÑ হায় খোদা তুমি আমাকে কেনো এ কষ্ট দিলে না। এতো আমার প্রাপ্য ছিলো। আমি কেনো ওকে ঢাকা পাঠাতে গেলাম। আমার এই মাছুম বাচ্চাটার উপর আমি অন্যায় করেছি অত্যাচার করেছি। তুমি আমাকে শাস্তি দাওÑ বলে নিজের মাথা ঠুকতে থাকেন খাটের সাথে। ফিরোজ বাবার মুখ চেপে ধরে
-বাবা এমন কথা বলো না। এসব আমার তকদিরে ছিলো। ছোট বোন নাহার কেঁদে বুক ভাসিয়ে ফেলেছে। ওর ফর্সা মুখটি দ্বিতীয়বারের কান্নায় লাল হয়ে গেছে। কাঁদিস না বোন। আমিতো বেঁচে আছি। এই দেখ আমি কতো ভালো আছি। কথাগুলো বলতে গিয়ে ফিরোজের গলা ধরে আসে। পানি এসে যায় চোখে। সে নিজেকে সামলাবার চেষ্টা করে। তবুও অপ্রতিরোধ্য গতিতে নোনা পানি গড়িয়ে পড়ে গন্ড বেয়ে। এই নিষ্ঠুরতার কাহিনি শুনে ফিরোজের সৎমাও চোখে পানি ধরে রাখতে পারলেন না। বাবা হার্টফেল করেছেন। ফিরোজ তাড়াতাড়ি মেহরাজকে সঙ্গে করে বাইরে নিয়ে আসলো বাবাকে। নাহার মাথায় পানি ঢালছে। ছোট মা গায়ে বাতাস করছেন। দশমিনিট পরে ফিরোজের বাবা সংজ্ঞা ফিরে পেয়েছেন। ধীরে ধীরে উঠে বসলেন বিছানায়। ফিরোজ মাথার চুলগুলোতে বিলি কাটছে।
হাকিম সাহেবের সাথে গিয়াস উদ্দিন সাহেবের কোনো যোগাযোগ নেই। ফিরোজের হারিয়ে যাওয়ার জন্য চাচার গাফিলতিকেই দায়ী করেছেন বাবা। বাড়ি ভাঙার সময় জমি কিনে দিতে চেয়েছিলেন চাচা। ফিরোজের বাবা ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। গ্রামে আসতেও নিষেধ করে দিয়েছেন।
-তোকে সন্তানের মতো মানুষ করেছি। আর তুই আমার সন্তানকে মেরে ফেলেছিস! পাষন্ড! তুই আমার মরা মুখও দেখবি না। এরপরও হাকিম সাহেব ভাইয়ের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করেছিলেন। টাকা-পয়সাও পাঠিয়েছেন। কিন্তু ফিরোজের বাবা ফিরিয়ে দিয়েছেন। এখন চাচার সাথে ফিরোজের বাবার যোগাযোগ একেবারেই নেই।
সবাইকে বিদায় করে নাহার ভাইকে বললো বিশ্রাম নিতে। একটি রুমে নাহার এরমধ্যেই পরিস্কার চাদর বালিশ বিছিয়ে দিয়েছে। একটি ফুলতোলা হাতপাখায় ফিরোজের নাম লেখা। ভাইকে পাতপাখা দিয়ে জোরে জোরে বাতাস করছে নাহার। যদিও এখন বাতাস না হলেও চলে। নাহার পাশে বসে সবার অবস্থা সবিস্তারে বর্ণনা করে চলেছে। মেহরাজ হাইমচর কলেজে এবার ভর্তি হয়েছে। নাহার পড়ে গার্লসে। নাইনে। মায়ের মৃত্যুর পর বাবার বিয়েটা সবাই জোর করেই করিয়ে দিয়েছেন। বাবা মোটেও রাজি ছিলেন না। এতো বড়ো সংসার দেখার জন্যও তো একজন দায়িত্বশীল মানুষ লাগে। এই ঘটকালিটা চেয়ারম্যান চাচা নিজেই করেছেন। মা খুব ভালো মানুষ। নাহারের কথা শুনতে শুনতে একসময় ঘুমিয়ে পড়ে ফিরোজ।

বিকেলবেলা ফিরোজ হাঁটতে হাঁটতে সুইটিদের বাড়ির দিকে গেলো । বহুদিন পর তাকে পেয়ে ঘিরে ধরলো সবাই। ফিরোজকে পেয়ে সবাই আনন্দে আত্মহারা। এ বাড়ির সবাই জানতো ফিরোজ হারিয়ে গেছে। কিন্তু তার হারিয়ে যাওয়ার রহস্য সবার অজানা। অজানা প্রশ্নই উঁকি-ঝুঁকি দিচ্ছে সবার মনে। কোথায় ছিলো এতো দিন, কেমন ছিলো, কেনোই বা দেশে আসলো না। এসবই আকুলি বিকুলি করছিলো সবার মনে। কিছু কিছু বিষয় অবশ্য এর মধ্যেই তারা জেনে নিয়েছে সুইটির কাছ থেকে। তবুও ফিরোজের মুখ থেকে শুনতে চায় সবাই। কারো প্রশ্ন সমান্তরাল, কারোটা তীর্যক, কেউ কেউ উলম্বভাবে প্রশ্নবানে জর্জরিত করতে থাকলো ফিরোজকে। ফিরোজ সম্ভব মতো ওদের প্রশ্নের উত্তর দিতে লাগলো। দম ফেলার সময় পাচ্ছে না সে। অবশেষে সুইটির মা রাগত স্বরে বললো
-তোরা কি ওকে মেরে ফেলবি নাকি? ছেলেটা এসেছে একটু বিশ্রাম তো নিতে দিবি আগে। কথাগুলো বলে ওকে ঘরের ভিতর নিয়ে গেলো সুইটির আম্মা।
ফিরোজ এমনটাই আশা করছিলো। সুইটি এর মধ্যে ট্রেতে করে বিভিন্ন নাস্তা সাজিয়ে নিয়ে এলো। একটু পর শেফালি, শাহিন, মোহনা এসে হাজির হলো। ঘরে ঢুকেই শেফালি বললো, বাহ! চমৎকার আয়োজন। একেবারে জামাই আদর।
-এই, সব তুই খেয়ে ফেলিস না কিন্তু। আমাদের জন্যও কিছু রাখিস। বললো শাহিন। আমার আবার হাঁটলে ক্ষুধা বেড়ে যায়। বলেই ক্ষেতে শুরু করে দিয়েছে শেফালি। সুইটির দিকে মুচকি হেসে বললো
-অনুমতি নিতে পারলাম না বলে দুঃখিত ভাবি সাহেবা। কষে একটা কিল বসিয়ে দিলো শেফালির পিঠে। লজ্জাটা হজম করে ফিরোজের দিকে চেয়ে বললো
-খেতে শুরু করো ভাইয়া। কি ভাইয়া টাইয়া শুরু করেছিস। যেনো অচেনা কেউ। ভেংচি কেটে বললো শেফালি। বাঙালিদের মধ্যে এখনো বড়োকে সম্মান করার রীতি আছে। তুই তো আর রীতিনীতির ধার ধারিস না।
-রাখতো রীতি। তাই বলে খেলার সাথীদেরকে হুজুর হুজুর করতে হবে?
Ñ‘আচ্ছা, ঝগড়া করে সময় কাটাবি, নাকি ঘুরতে বের হবি?। শাহীনের কথায় দমে যায় শেফালি।
খাওয়া শেষ করে নদীর পারে ঘুরতে বের হলো সবাই।

নদীতট অনেক দূর পর্যন্ত বিস্তৃত। শান্ত নদী। যেনো তটের সাথে দিগন্তের মিতালি। সূর্যটা ডোবার প্রস্তুতি নিচ্ছে। কতোদিন পর ফিরোজ মেঘনায় সূর্যডোবা দেখছে। এক দৃষ্টিতে চেয়ে আছে সূর্যটার দিকে। ডুবন্ত সূর্যের আলো শান্ত পানিতে যেনো একটি রঙিন পথ তৈরি করেছে। পথটি গিয়ে মিশেছে ওপাড়ে চরের সাথে । আহা এই পথ ধরে যদি ওপারে যাওয়া যেতো। সুইটিও তার সাথে সূর্য ডোবা দেখছে। আস্তে করে শেফালি, মোহনা ও শাহিন পিছু হটে একটা আধশোয়া নারিকেল গাছের গোড়ায় মুখ লুকালো। সূর্যটাও ধীরে ধীরে মুখ লুকাচ্ছে নতুন চরের কাশবনে। একটা লাল আভা ছড়িয়ে পড়েছে চারদিকে। লাল পথটি এখন আর নেই। পুরো নদীটাই লাল আভায় হাসছে। ভারি চমৎকার সে দৃশ্য। নারিকেল গাছের আড়াল থেকে জুম করে দু’জনকে বন্দি করলো শাহিন। ক্যামেরার আলোতে পাশে তাকালো সঙ্গিনীদের দিকে। চমকে গেলো ফিরোজ। সুইটি ছাড়া কেউ নেই তার পাশে। সুইটিও লজ্জা পেলো। দু’হাতে মুখ লুকালো। ওপাশে ওরা তিনজন মিটমিট করে হাসছে। আবীরের লালিমা যেনো মেহেদী রাঙা হয়ে ওদের অভিবাদন জানায়। এক ঝাঁক পাখি মাথার উপর চক্কর দিয়ে চলে গেলো। নিরবতা ভেঙে ফিরোজই প্রথম কথা বললো,
-ওরা গেলো কোথায় সুইটি।
-কি জানি, কিছুইতো বলে যায়নি। চট করে কোথায় কেটে পড়লো।
কেউ দেখে ফেলার ভয়ে সুইটি পা বাড়ালো শেফালিদের খুঁজতে। ফিরোজ পথ আগলে দাঁড়ানো ওর সামনে। উভয়ে একেবারে সামনা-সামনি। এক দৃষ্টিতে চেয়ে আছে একজন আরেক জনের দিকে। কেউ কথা বলছে না। তবে দুই জোড়া চোখ যেনো উভয়কে পড়ে নিচ্ছে। সুইটির ঠোঁট দুটো কিছু বলার জন্য কম্পমান। কিন্তু মুখে কোনো কথা আসছে না। এ যে প্রথম অনুভূতি। হৃদয় দিয়ে প্রথম ভালোবাসা। এ যে শ্বাশ্বত প্রেম। নিখাঁদ হৃদয়ের অনন্ত উচ্ছ্বাস। মাদকতাহীন দৃষ্টিপাত। ফিরোজ সুইটির হাত স্পর্শ করলো। সারা গায়ে এক অজানা কম্পন, অন্যরকম শিহরণ। হৃদয়ের তারে এ কিসের শানাই বাজছে। এতোকাল কেনো এ সুর মুর্ছনা ছড়ায়নি। এ অদৃশ্য জগতে তো সুইটি কখনো উঁকি দিয়ে দেখেনি। কতো ছেলে মেয়েকেইতো এরকম দেখেছে ওরা। কই, এমন অনুভূতি তো হয়নি কখনো। অব্যক্ত কথাগুলো দু’জন দু’জনের চোখের দিকে তাকিয়ে পড়ে নিচ্ছিলো। শেফালিদের দল আচমকা বের হয়ে এলো নারিকেল গাছের আড়াল থেকে। প্রিয় বান্ধবির জন্য এ মুহূর্তটির অপেক্ষাই করছিলো শেফালি। আজ যেনো প্রিয় বান্ধবীর শুভ লগ্ন এসেছে। ওদের কাছে এসে আস্তে আবার ক্লিক করলো শাহীনের ক্যামেরা। ওরা যেনো সম্বিৎ ফিরে পেলো। উভয়ের হাত খসে পড়লো পাশে?
-তোরা কোথায় গিয়েছিলি! স্ইুটি লজ্জাবতীর পাতার মতো মুখ ঢেকে বললো শেফালিকে।
-সৌন্দর্য উপভোগ করতে।
-সৌন্দর্য! কিসের সৌন্দর্য! যেনো কোনো কিছু মিস করেছে এভাবেই বললো সুইটি। ‘গোধূলিবেলায় প্রিয়ার হাতে হাত, চোখে চোখ রেখে নিরবে কথা কয়/ মৌসুমী হাওয়া, ধীরে বয়ে যায়, প্রাণে প্রাণে কথা কয়।’ সবাই হাসতে হাসতে লুটিয়ে পড়ছে। সুইটি একটা ঘা বসিয়ে দিলো শেফালির পিঠে। হাসিতে নতুন মাত্রা যোগ হলো এতে। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসায় বাড়ির পথ ধরলো সবাই।

পরদিন তারা ঠিক করলো নদীর মাঝখানে যে নতুন চর জেগেছে ওখানে নৌকা নিয়ে বেড়াতে যাবে। নৌকা আগে থেকেই ঠিক করা ছিলো। সবাই এসে চেপে বসলো নৌকায়। মৃদু ঢেউ কেটে নৌকা এগিয়ে চলছে চরের দিকে। মাত্র বিশ মিনিটের পথ। মাঝে মাঝে দোল খাচ্ছে নৌকা। মৃদুমন্দ বাতাস বইছে। একজন আরেকজনকে পানি ছিটিয়ে দিচ্ছে। হাসিতে গড়াগড়ি দেয়ার উপক্রম। আনন্দ উচ্ছ্বাসে ভাসছে ওরা। পানির ছিটায় নিজেকে রক্ষা করতে গিয়ে নৌকার ব্যালান্স আর ঠিক রাখা যায় না। মাঝি চেচিয়ে বলে
-নাওতো ডুইব্বা যাইবো, সাবধানে বহেন। নৌকা এসে ভিড়লো চরের মাঝ দিয়ে বয়ে যাওয়া ছোট্ট একটি খালের কাছে। সবাই লাফিয়ে নামলো নৌকা থেকে। চর নয় যেনো কোনো শিল্পীর আঁকা ছবি। দু’পাশে বহমান নদী। মাঝখানে চর। নল খাগড়ার বনে কাশ ফুল বাতাসে দুলছে। মাঝে মাঝে দু’একটি ছনের ঘর চোখে পড়ছে। বালিহাঁস বনের মাঝে লুকোচুরি খেলছে। বাবুই পাখির কিচিরমিচির ডাক নির্জন চরকে কোলাহলে পরিপূর্ণ করে রেখেছে। সাদাবকের ঝাঁক আর মাছরাঙা চরের মাঝে ঝিলের মতো জায়গাটায় মাছের জন্য ধ্যান ধরে বসে আছে। মাঝে মাঝে ছোট ছোট খাল। হেমন্তের এই সময়টায় পানিও বেশি নেই। যেখানে পানি বেশি সেখানে ঘাটলা বানানো। চরের মানুষ রান্না ও খাওয়ার পানি সেখান থেকে সংগ্রহ করে। কেউ কেউ মৌসুমী ফসল বুনেছে জঙ্গল পরিস্কার করে। সর্ষে ফুলের ঘ্রাণ চারদিকে। হলুদ আর হলুদ। কেবল ফুল ফুটেছে মাত্র। সৌরভে মাখামাখি। বাহ কআে চমৎকার চর। মোহনা আনন্দে আত্মহারা। বললোÑ এই এটা তো একটা ট্যুরিস্ট স্পট হতে পারে।
-আরে তুই আরেকটু সামনে আগা। দেখবি কেমন লাগে। বললো শেফালি। মোহনা তার ক্যামেরায় বন্দি করছে এসব ছবি। সুইটি ও ফিরোজ পাশাপাশি হাঁটছে। বুনোলতার পা জড়িয়ে পড়ে গেলো সে। ‘বুনোলতায় পা জড়িয়ে পড়ে গেলে!/ এই ধরো অনভ্যস্ত হাত/ তোমার হাতের কোমল স্পর্শে আমাকে অভ্যস্ত করে তোলো।’ সুইটি ফিরোজের একটি হাত ধরে উঠে দাঁড়ালো। শেফালি, শাহিন ও মোহনা ঘুরে দাঁড়ালো। এই কি রে! আমাদের ফিরোজ তো দেখি কবি হয়ে গেছে! সুইটির হাতটি তখনো ফিরোজের হাতে ধরা। জুতা ঠিক করার অযুহাতে সুইটি হাতটি ছাড়িয়ে নেয়। বল না পুরো কবিতাটি। শুনতে তো ভালোই লাগছিলো। ফিরোজ পুরো কবিতাটি শোনালো। আবার চলতে শুরু করেছে ওরা। কাদায় কখনো পা ঢুকে যাচ্ছে। ফিরোজ কি একটা বুনোফুল তুলে সুইটির কানে গুঁজে দিলো। উভয়েই হাসছে। অনেক দূর এগিয়ে গেছে শেফালিদের দলটি । পায়ে হোঁচট খাওয়াতে সুইটির হাঁটতে কষ্ট হচ্ছে। একটা খালের পাড়ে এসে বসলো দু’জন। বালিহাঁস খালে ডানা ঝাপটাচ্ছে। জোড়ায় জোড়ায় হাঁসগুলো পানিতে জলকেলি করছে। কতো প্রেম এদের মাঝে! ফিরোজ সুইটির হাত দু’টো তুলে নিলো। সুইটি বাধা দিলো না। মনে মনে এটাই চেয়েছিলো সে। এই লজ্জাবতী মেয়েরা নিজের চাওয়াটি কখনো মুখ ফুটে বলতে পারে না। – ‘কেমন লাগছে সুইটি’। আবেগ ভরা জিজ্ঞাসা ফিরোজের।
-পৃথিবীর সবচেয়ে ভালোলাগা যাকে বলে। ভ্রমর কালো চোখ তুলে তাকিয়ে বললো ও।
-কি দেখছো অমন করে চেয়ে?
-তোমাকে।
-আমাকে! কেনো; আমাকে অমন করে দেখার মতো তো কিছু নেই।’
-অনেক কিছুই আছে ফিরোজ ভাইয়া। পৃথিবীর সব সৌন্দর্য যে ঐ চোখের মাঝে। যার দিকে তাকালে পৃথিবীর সব সৌন্দর্যের নেশা কাটে। হৃদয়ের আবেগ কূল পায়। পুঞ্জিভূত আকাঙ্খা মেটে গভীর ভালোলাগায়। হৃদয় পায় তার ঠিকানা। মনীষীরা বলেন চোখ নাকি কখনো বুড়ো হয় না।
-তোমার চোখও অনেক সুন্দর। যার দিকে তাকিয়ে জীবন পার করে দেয়া যায়। নজরুল, নার্গিস সম্পর্কে বলেছিলেনÑ নার্গিসের চোখের দিকে তাকিয়ে নাকি তিনি নার্গিসের অন্তর দেখতে পেয়েছিলেন। আমিও তোমার অন্তর দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু ভয় হচ্ছে ক্ষণকালের এই ঠিকানায় ভাড়াটে বাড়ির মতো উচ্ছেদ হই কি না। বর্ষার টলটলে বিল যেমন চৈত্রের ফাটামাঠ হয়ে যায়। পূর্ণিমা চাঁদ যখন ক্ষয়ে ক্ষয়ে অমাবস্যা ডেকে আনে তখন ভয় হয় আমার জীবনেও অমাবস্যার অন্ধকার নেমে আসে কিনা।
-নতুন বাড়ির জন্য অপেক্ষা করবো। মাঠ ফেটে গেলে আষাঢ়ের দিন গুনবো আর অমাবস্যার রাত শেষে প্রহর গুনবো সূর্যোদয়ের।
-যদি না আসে সে প্রহর!
-নাইবা পেলাম! তবু সান্তনা তো খুঁজে পাবো। প্রশান্তি নিয়ে মরতে পারবো।
-না না। অমন কথা বোলো না। জিঞ্জিরে আবদ্ধ পরাজিত যোদ্ধার জন্য প্রতিক্ষা করে লাভ কী!
-পলায়নপর যোদ্ধার মুখ দেখার চেয়ে বন্দী যোদ্ধার জন্য চিরদিন অপেক্ষা করাও আমি শ্রেয় মনে করি।
-সব মানলাম। কিন্তু খড়কুটোহীন এ জীবন যে তোমার প্রেমের ভার সইবে না।
-জলযান যতো ভারিই হোক না কেনো নদী তো তাকে ডুবিয়ে দেয় না।
-হঠাৎ প্রবল ঝড় আসলে তুমি কি করবে?
-বিচক্ষণ মাঝির পরিচয় দেবো।
-আমি যে চাই তোমার তরীর যাত্রী হতে। কিন্তু ভয় পাই। পুরুষ হিসেবে না; একজন ব্যর্থ প্রেমিক হিসেবে। সারা জীবন তোমাকে পাওয়ার স্বপ্নই দেখেছি। বিপদেও তোমার নিস্পাপ মুখটি আমার চোখের সামনে আশার বাতিঘর হিসেবে সর্বদা পথ দেখাতো। তোমার সাথে শেষ দিনটির স্মৃতি নিয়ে একা একা হাঁটতাম তুরাগের পাড়ে। তোমার স্মৃতি আমাকে সামনে চলার পথ দেখাতো। যে স্বপ্নের পরী আমাকে সাহস যোগাতো লঞ্চের কেবিনে তাকে দেখে আমি অন্য গ্রহের আগন্তুক হয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু তুমি যে আমাকে এতো ভালোবাস তা জানতাম না। তোমার চোখ যে এখনো আমাকে খুঁজছে এটা আমি এখনো বিশ্বাস করতে পারছি না। ছেলেবেলার স্মৃতিকে তো আর জীবনের ছকে ফেলা যায় না। কেউই করে না। কিন্তু তুমি যে আমার মতোই রয়েছো।… কিছু বলো।
-কি বলবো ফিরোজ ভাইয়া! অনেক কিছুই তো বলার আছে। ভাষা যে খুঁজে পাই না। হৃদয়ে অনেক কথা পুঞ্জিভূত মেঘমালার মতো জমা হয়ে আছে। কিন্তু কথার বারিবর্ষণ যে হতে চায় না। আমি তো যৌবনের মাঝে শৈশবের ছবিটিই দেখি। মনে মনে ভাবি এইতো খেলার মাঠ। নদী ভাঙছে। শোঁ শোঁ আওয়াজ। মাটির চাকাগুলো ধ্রিম ধ্রিম শব্দ করে পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে। যে মাটি মেঘনা ভেঙে নিয়েছিলো সে মাটিতেই তো বসে আছি। সেই মাটিই তো আমাদের নতুন রূপে বরণ করছে। কিন্তু জোয়ারের উচ্ছল ঢেউয়ের মতো সেই মেয়েটি শ্রাবণের নদীর মতোই স্থির এখন। কিন্তু তুমি সেই ভাবুকটিই রয়ে গেছো। কতোক্ষণ চুপচাপ থেকে সুইটিই বললো
-জানো ফিরোজ ভাইয়া আমার মনে হয় মেঘনা আমাদের প্রেমের উপহার স্বরূপ দিয়েছে এ নতুন চর।
-তুমি কি এখনো আমাকে ভাইয়া বলেই ডাকবে?
একটা মিষ্টি হাসি দিয়ে সুইটি চাইলো ফিরোজের দিকে। সেই স্থিরচিত্রের ভিতরই যেনো তার উত্তর লুকায়িত আছে।
-আমাদের বাসরটা এখানে হলে কেমন হয়? দুষ্টুমি করে জিজ্ঞেস করলো ফিরোজ।
বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে সুইটি চাইলো ফিরোজের দিকে। রাঙা মরিচের মতো তার চেহারা। ফিরোজও আচমকা বোকার মতো এমন একটা কথা বলে লজ্জায় নত হয়ে রইলো। কার্তিকের সরপড়া পানির নেকাব সরিয়ে পানকৌড়ির মতো মাথাটি তুললো সুইটি। চাইলো চারদিকে।
-আগে বিয়েটা কর, তারপর বাসরের স্বপ্ন দেখ। দলবলে ফিরে এসে বললো শেফালি।
শেফালির কথায় পানকৌড়ির মতো আবার লজ্জায় নিমজ্জিত হলো সুইটি। ডুবন্ত সূর্যটা তাতে রঙতুলির পোচ দিয়ে আরেকটু রঙিন করে তুললো তাকে। শাহিনের ক্যামেরা এই রোমান্টিক মুহূর্তটি হাতছাড়া করলো না। দু’জনে সংলাপে এতোটাই বিভোর ছিলো যে এ চরে যে অন্য কেউ আছে একথাটাও ওদের স্মরণে ছিলো না। মোহনা আর শাহিন আরো কিছু ছবি তুললো দু’জনের। গ্রুপ ছবিও তোললো অনেক। ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি আকাশে উড়ে বেড়াচ্ছে। সূর্যটা আজ অনেক কাছ থেকে দেখা যাচ্ছে। এটা কুয়াকাটার চাইতে কম সুন্দর নয়। কোনো সৌখিন ধনাঢ্য ব্যক্তি এগিয়ে এলে এটাও একটা পর্যটন কেন্দ্র হতে পারে। নদীর পশ্চিম অংশটা পূর্ব অংশের চাইতে অনেক বড়ো। ওপাশে সূর্য ডুবছে। পরিস্কার আকাশ। সূর্যটা যেনো সবাইকে সন্ধ্যাভিবাদন জানিয়ে বিদায় নিচ্ছে। কোনো শিল্পী যেনো তার সমস্ত রং ঢেলে দিয়েছে মেঘনায়। স্রষ্টার কতো চমৎকার সৃষ্টি। প্রতিদিন যেনো সূর্যটা নতুন কোনো রূপ নিয়ে অস্ত যায়। কালকের সূর্যাস্তের চাইতে আজকের সূর্যাস্তটি যেনো আরো আকর্ষণীয়। আরো মুগ্ধকর। সৃষ্টির আদি হতে আজ অবধি কতো গান, কবিতা, গল্প রচিত হয়েছে সন্ধ্যার এই মুহূর্তকে ঘিরে। তবুও তার রূপসৌন্দর্য বর্ণনা আজও শেষ হয়নি। সূর্য ডোবা দেখে সবাই নৌকায় এসে উঠেছে। মাঝি নৌকা ছেড়ে দিয়েছে। সামান্য ঢেউ তুলে মেঘনার শান্ত পানি কেটে ছোট্ট নৌকাটি চলছে তীরের দিকে। মুগ্ধ দৃষ্টিতে ফিরোজ তাকিয়ে আছে সুইটির দিকে। নৌকা এসে তীরে ভিড়লো। সবাইকে বিদায় জানিয়ে ফিরোজ চেপে বসলো রিক্সায়।

এদিকে নজরুল মাষ্টার সন্ধ্যার পর মেয়েকে বাড়িতে না দেখতে পেয়ে রাগে তেলে বেগুনে জ্বলছেন। বকাঝকা করতে লাগলেন সবাইকে। ক্রোধে ঠোঁট কাঁপছে। ভ্রুযুগল নাচিয়ে গেলেন স্ত্রীর কাছে। আঙুলটা স্ত্রীর চোখের কাছে নিয়ে বলেন
-মেয়ের খোঁজ খবর কিছু রাখো? সে কোথায় ঘুরে বেড়ায়, কি করে, কখনো জিজ্ঞেস করেছো?
-আমার মেয়ে খারাপ কিছু করে না। কোথায় যায় তার খবরও আমি রাখি। ফিরোজ সুইটি ও শেফালিদের নিয়ে চরে বেড়াতে গেছে এটাও আমার জানা। স্ত্রীর কথা শুনে নজরুল সাহেবের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যাওয়ার উপক্রম। এরইমধ্যে সুইটি বাড়িতে এসে ঢুকলো। মাস্টার সাহেব তার আদরের মেয়েকে অনাদরে জিজ্ঞেস করেন
-কোথায় গিয়েছিলে?
সুইটি নিরুত্তর। মাস্টার সাহেব আবার ধমক দিয়ে বলেন
-আমার মান সম্মান বুঝি আর রাখবে না। ঐ ছোটলোকের বাচ্চাটাকে আর যদি এ বাড়িতে আসতে দেখি তাহলে ওর ঠ্যাং ভেঙে হাতে ধরিয়ে দেবো। হারিয়ে গিয়েছিলো ওটাই ভালো ছিলো। সুইটির মা আর চুপ থাকতে পারলেন না
-মুখে যা আসে তাই বলো না। নিজের মেয়েকে বকো। তাই বলে ফিরোজ ফিরে এসেছে; এটাকে তুমি কটাক্ষ করতে পারো না। তুমি না তার শিক্ষক! জানো তার বাবা তাকে পেয়ে কি পরিমাণ খুশি হয়েছেন! তার পরিবারে কি পরিমাণ আনন্দের বন্যা বইছে! যদি তোমার ছেলে এভাবে ফিরে আসতো।
মাস্টার সাহেব উত্তেজনার ফণাটি এবার নিচে নামালেন। সুইটির দিকে মুখ তুলে বললেন
-তোকে বলে দিচ্ছি, ওর সাথে যদি আর কখনো তোকে দেখি, তবে এ বাড়ির দরজা তোর জন্য চিরদিনের মতো বন্ধ হবে। কথাগুলো বলে মাস্টার সাহেব বাড়ি থেকে বের হলেন। ইতোপূর্বে কখনোই আদরের এই মেয়েটির সাথে এরূপ আচরণ করেননি নজরুল মাস্টার। সুইটি তার রুমে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিলো। বালিশে মুখ লুকিয়ে অনেকক্ষণ কাঁদলো। তার মনে একটাই প্রশ্ন সে তো কোনো অপরাধ করেনি। নিষ্পাপ ভালোবাসার মধ্যে যদি কোনো পাপ থাকে তবে সে পাপের জন্য বাড়ি বিসর্জন দিতে সে মোটেও কুণ্ঠিত হবে না। ভালোবাসার সমাধি যদি ত্যাগে রচিত হয় তবে তার প্রেরণা যুগে যুগে অমলিন হয়ে রইবে। কান্না করতে করতে হেচকি উঠে গেছে তার। মা অনেকক্ষণ ধরে করাঘাত করছেন। কিন্তু দরজা খুলছে না সে। অবশেষে মায়ের শত অনুনয়ে দরজা খুলতে বাধ্য হলো সুইটি। দরজা খুলেই মায়ের বুকে ঝাঁপিয়ে পরে শিশুর মতো। তার কান্না এবার প্রবল থেকে প্রবলতর হলো। অন্তত বাবার কাছ থেকে এরকমটি আশা করেনি সে। মা তাকে সান্তনা দেয়ার ভাষা হারিয়ে ফেলেছেন। অন্তরের অব্যক্ত ভাষা দিয়ে মেয়েকে শান্তনা দিতে চেষ্টা করছেন মা। মা’য়ের এই শান্তনার ভাষাটি হয়তো বুঝতে পারে মেয়ে। তার বুকে যাবতীয় বেদনা বিসর্জন দিয়ে তার কোলে মাথাটি রেখে ঘুমিয়ে পড়লো না খেয়ে।

আজ বিকেলটা কিভাবে কাটানো যায় তার পরিকল্পনা করতেই ফিরোজ সুইটিদের বাড়ির দিকে আসছিলো। আঙ্গিনাতে আসতেই মাস্টার সাহেবের মুখোমুখি হলো সে। ফিরোজ ভদ্রভাবে সালাম দিয়ে ভেতরে ঢুকে বসলো সুইটির আম্মার কাছে। একটি পিঠার থালা এগিয়ে দিয়ে কথা বলছেন সুইটির আম্মা।
-নাও বাবা মুখে দাও। ফিরোজ একটি পুলিপিঠা নিয়ে একটা কামড় দিয়েছে কেবল। এসময় মাস্টার সাহেব আচমকা আবির্ভূত হলেন সেখানে। ফিরোজ উঠে দাঁড়ালো। ভূমিকা ছাড়াই শুরু করলেন
-দেখো বাবা ফিরোজ। তুমি ভালো ছেলে ও ভালো ছাত্রÑ এতে আমার কোনো সন্দেহ নেই। তোমার বাবা এককালে বড়োলোক ছিলেন তাও সকলেরই জানা। বর্তমানে তোমাদের দৈন্যদশাও কারো অজানা নয়। তুমি সুইটিকে ভালো মতোই চেনো এবং জানো। আমার মান সম্মান যেটুকু আছে তা এ শেষ বয়সে যদি তোমার কারণে বিলীন হয়ে যায় তবে তা তুমি রক্ষা করতে চেষ্টা করবে। মাস্টার সাহেব কিছুক্ষণ থেমে আবার বললেন, তুমি আমার প্রিয় ছাত্রদের তালিকায় শীর্ষে রয়েছো। আশা করি নিজের কোনো আচরণের জন্য সেখান থেকে নিজেকে নামাবে না। আমাকে ভুল বুঝবে না। সমাজ সামাজিকতা নীতি-নৈতিকতা সবকিছু সামনে রেখে জগৎ সংসারে পথ চলবে। আমি চাই তুমি এখনই এখান থেকে চলে যাও!
ফিরোজ কতোক্ষণ স্তম্ভিতের ন্যায় সেখানে দাঁড়িয়ে রইলো। পিঠার অংশটুকু এখনো সে গিলতে পারেনি। তার চোখ থেকে অশ্রুর বন্যা বইছে। অপমানে নিজেকে লুকাবার জায়গাটুকু পর্যন্ত তার নেই। মনে হচ্ছে পায়ের তলা থেকে মাটি সরে যাচ্ছে। মন ভাঙার কষ্ট যেনো ঘর ভাঙার কষ্টের চাইতেও বেশি। জীবনে অনেক কষ্ট করেছে ফিরোজ। কিন্তু এমন অপমান কেউ করেছে বলে মনে পড়ে না তার।
ঘটনার এই আকস্মিকতায় সুইটির মা-ও বাকহীন হয়ে আছেন। এক মুহূর্ত সেখানে না দাঁড়িয়ে পাশ কেটে বের হয়ে এলো উঠোনে। সুইটিদের বাড়ির মানুষ উঠোনে দাঁড়ানো। ফিরোজ জানে না এই কথাগুলো তারা শুনেছে কি না। কারো দিকে না তাকিয়ে ফিরোজ চলে এলো রাস্তায়। সামনে খালি রাস্তা। রৌদ্রোজ্জ্বল বিকেলটা যেনো অন্ধকারে ছেয়ে যাচ্ছে। গাছের পাতাগুলো নড়ছে না। গাছে গাছে পাখিরা ডাকছে না। ফুটন্ত ফুলগুলো বোঁটা থেকে খসে পড়ছে। ফিরোজের চলার গতি দ্রুত থেকে দ্রুততর হচ্ছে। বেলা ক্রমেই ডুবে যাচ্ছে।
ফিরোজের প্রেমের আকাশ নিরাশার কালো মেঘে ছেয়ে যাচ্ছে। মরুতে বাঁধা স্বপ্নঘর সাইমুম ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে। তরী তীরে এসে ডুবে গেছে মেঘনায়। হায়রে প্রেম। কেনোই বা এসেছিলে অকালে কাঁদাতে? শৈশবের নিষ্পাপ স্মৃতিটাই তো ভালো ছিলো। সেটাকেই অবলম্বন করে কাটিয়ে দেয়া যেতো বাকি জীবন । তবে কেনো মিছে এ দু’দিনের সংলাপ! এ কয়টা দিন যদি জীর্ণ বইয়ের পাতার মতো হারিয়ে যেতো জীবন থেকে! গভীর রাতের নিস্তব্ধ প্রহরের স্বপ্নের মতো কি এটাকে মনে করা যায় না! ফিরোজের মনে এসব প্রশ্নই তোলপাড় করছে। তীরবিদ্ধ যোদ্ধার মতো আত্মরক্ষার জন্য ছুটছে ফিরোজ। পলায়নপর মনোবৃত্তি তার নেই। কিন্তু অপমান থেকে মুখটি লুকাবার আশ্রয়টিও যে আর নেই। ফিরোজ কার বুকে মুখটি লুকিয়ে তার কান্নাধোয় চোখ দু’টো মুছবে!
সুইটিরা ছয় বোন। তারপর একটি ভাই। বাড়িভাঙার একবছর আগে ওর ভাইটির জন্ম। সুইটির মা নিজের ছেলের মতো আদর করতো ফিরোজকে। একদিন না দেখলে পরদিন চলে আসতো ফিরোজকে দেখতে। ফিরোজের মা আর সুইটির মা ছিলো দূরসম্পর্কের মামাতো বোন। কিন্তু তাদের মধ্যে আপন বোনের মতো মিল ছিলো। সামান্য শাক রান্না হলেও এবাড়ি ওবাড়ি চালাচালি হতো। সেই বাড়ি থেকে এভাবে অপমানিত হয়ে চলে আসতে হলো আজ। সুইটির মা’কে দেখলে তো নিজের মায়ের স্মৃতি ভুলে থাকা যায়। সুইটিকে দেখার সাথে সাথে মায়ের এই আদরটুকু নেয়ার জন্যও ফিরোজ যেতো ওবাড়ি। নাহলে তো শেফালিদের বাড়িতেই যেতে বলতো সুইটিকে।

বাড়িতে পৌঁছে বিছানায় গা-টা এলিয়ে দিয়েছে ফিরোজ। সুইটির বাবার কথাগুলো বার বার প্রতিধ্বনিত হচ্ছে তার মনে। প্রত্যেকটি শব্দ তীরের ফলার মতো বিদ্ধ হচ্ছে তার বুকে। রক্তের একটা ক্ষীণ ধারা বইছে যেখান থেকে। হায়রে দারিদ্র! তোর জন্যে মানুষ মানুষকে ঘৃণা করে। অথচ লুটেরার দল মাখা উঁচিয়ে সমাজে দাঁড়িয়ে আছে। সবাই তাদের সালাম জানায়। ফিরোজদের দোকানের কর্মচারিও এখন হাইমচর বাজারের বড়ো ব্যবসায়ী। আর নীতি নৈতিকতা! শত ধিক্কার মারে তাকে। আমি কি অর্থের পিছে ছুটবো? না। তা হবে কেনো। আমি হৃদয় দিয়ে কাছে টানতে চাই সবাইকে। সবাইকে আপন করে পেতে চাই ভালোবাসা দিয়ে। একটা সুখের পৃথিবী দেখতে চাই আমি।

ফিরোজ ডুকরে কেঁদে উঠলো। অশ্রুধারা গন্ড বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে। বালিশ ভিজে যাচ্ছে। অপমান, ঘৃণা আর ক্ষোভ তার বাহু দুটোকে সতেজ করে তোলে। সে উঠে বসে। আঙ্গুল দিয়ে চোখের পানি মুছে নেয়। অশান্ত মনটাকে শান্ত করে শরীরের সবটুকু শক্তি কেন্দ্রীভূত করে দাঁড়ালো। জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখছে সন্ধ্যার আকাশ। ঘুটঘুটে অন্ধকার। আজ চাঁদ উঠতে কিছু দেরি হবে। পরশু পূর্ণিমা হয়ে গেছে।
সুইটি পাশের রুম থেকে তার বাবার কথা সবই শুনেছে। বাবার প্রত্যেকটি কথাই তার মনে সূচের মতোই বিঁধেছে। কিন্তু কোনো প্রতিবাদ তো সে করতে পারলো না। তার মনের সকল শক্তি দিয়ে এর বিপক্ষে তো সে দাঁড়াতে পারলো না। ফিরোজকে কতোই না ভালোবাসতো তার বাবা। অথচ আজ তার প্রিয় ছাত্রকে অনেক অপমান সয়ে চলে যেতে হলো। এ দুঃখ ঢাকার কোনো পথ নেই। চিরজীবন ফিরোজ তার স্যারের কথা মনে রাখবে। তবে যে করেই হোক সুইটিকে ফিরোজের সাথে একবার দেখা করতেই হবে। সুইটি তাদের বাড়ির কাজের ছেলেটিকে একটা চিরকুট লিখে পাঠালে ফিরোজের কাছে। আগামীকাল শেফালিদের বাড়িতে আসার অনুনয় ছিলো তাতে। হৃদয়ের সবটুকু আকুতি দিয়ে ফিরোজকে আসার আহবান জানালো সুইটি।
পরদিন সন্ধ্যায় মলিন মুখে বসে আছে শেফালিদের বাড়িতে। ফিরোজের অপেক্ষার প্রহর গুণছে। বারবার দরজার দিকে তাকাচ্ছে সে। ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছে ঘন ঘন। তার মনটা ছটফট করছে চড়–ই পাখির মতো। কি বলবে ফিরোজের কাছে। কি দিয়ে শুরু করবে। কথা বলার শক্তি পাবে তো। বাবা যা বলেছেন সবকিছুর জন্য মাফ চাইবে। সুইটি মনে মনে সব কথা গুছাতে লাগলো। আসার সময়তো হয়ে গেছে। ফিরোজ আসবে তো! কথাটা মনে হতেই হৃদয়টা ভিতরটা মোচড় দিয়ে উঠলো। না তাকে আসতেই হবে। আমি তো আর কোনো অন্যায় করিনি। আমি তো তার সাথে খারাপ আচরণ করিনি। আমার সাথে রাগ করবে কেনো? আমার ভালোবাসার প্রত্যেকটা ফুল দিয়ে যার জন্যে মালা গাঁথলাম। এ মালা যে করেই হোক তাকে পরাতে হবে। তাকে আমার পেতে হবে। মাঝ দরিয়ার আমি তরী ডুবতে দেবো না।
ফিরোজ এখনো আসছে না কেনো? আমার প্রিয়, তুমি একবার আমার কথা ভাবো। তুমি শুধু একবার আসো। যদি দেখা না হতো, তাহলেই তো ভালো হতো। আমার সুপ্ত প্রেম জাগিয়ে তবে কেনো চলে যাবে।
তোমার প্রতিক্ষায় আমি তো জীবনের প্রত্যেকটি রাত জেগে কাটাতে পারবো। তুমি শুধু একবার আমার চোখে চোখ রেখে বলে যাও Ñ তুমি শুধু আমার জন্যেই অপেক্ষা করবে। আমার সকল শব্দ একত্র করে বলবো তোমার স্মৃতি বয়ে জীবনের বাকি পথ পাড়ি দিতে পারবো আমি।
সুইটির চোখ দিয়ে অবিরাম অশ্রু বইছে। ফিরোজ বুঝি আর আসবে না। পূর্ণিমা হয়েছে পরশু। বাইরে ঘুটঘুটে অন্ধকার। শেফালির দিকে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে আছে। শেফালি তাকে শান্তনা দেয়। ফিরোজ নিশ্চয়ই আসবে। চাঁদ উঠলো অনেক দেরি করে। রাত আটটা বেজে গেছে। এখনো তো আসলো না। একখন্ড মেঘ চাঁদটাকে ঢেকে দিচ্ছে। সুইটি বের হলো বাইরে। শেফালি ওর সাথে যেতে চেয়েছিলো। সুইটি ওকে থামিয়ে দিয়েছে। পথ চলছে একা। মাঝে মাঝে আকাশের দিকে তাকাচ্ছে। চাঁদটা মেঘকে কাটিয়ে উঠতে পারছে না। পাখির বিরহ ডাক কানে বাজছে। জোনাক পোকাগুলো থেমে থেমে জ্বলছে। বুনোলতায় মাঝে মাঝে পা আটকে যাচ্ছে। উদভ্রান্তের মতো পথ চলছে সে। মনে হয় মনজিলবিহীন কোনো এক পথিক মরুতে পথ হারিয়ে চলছে একা একা। ওয়েসিস নেই কোথাও। পথ যেনো আর শেষ হয় না। দেখা যায় না কোনো জনমানব।
সামনে ছায়ার মতো কি যেনো একটা এগিয়ে আসছে। ছায়াটি ক্রমেই নিকটস্থ হচ্ছে। অস্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হচ্ছে ছায়াটি। চাঁদটা এখনো মেঘের আড়াল থেকে বের হয়ে আসতে পারছে না। তাই মানব মূর্তিটা চেনা যাচ্ছে না। সুইটির কাছে এসে থেমে গেলো ছায়াটি। জুয়েল। ফিরোজের পুরনো বন্ধু। সুইটির অনেক দিনের পরিচিত। একসময় পাশের গ্রামেই বাড়ি ছিলো ওদের। কেউ কোনো কথা বলছে না। গতোকালই জুয়েলের সাথে বাজারে দেখা হয় ফিরোজের। সব কথা বন্ধুকে খুলে বলে।
অবশেষে জুয়েলই কথা বললো
-কাঁদছো কেনো বোন। এ চোখে যে জল মানায় না। আমি তোমাদের সব কথাই জানতে পেরেছি। কিছুক্ষণ থেমে আবার বললো
-আমি তোমার জন্যে কোনো শুভ সংবাদ নিয়ে আসতে পারিনি বোন। ক্ষমা করো। ফিরোজ চলে গেছে সন্ধ্যার লঞ্চে।
কথাটা শোনার সাথে সাথে চেপে রাখা কান্নার শব্দ চিৎকারে রূপ নিলো। দু’হাতে মুখটি চেপে মাটিতে বসে পড়লো। জুয়েল কিংকর্তব্যবিমূঢ়। কাঁদুক। আরো বেশি করে কাঁদুক। মনটা উজাড় করে কাঁদুক। পৃথিবী কাঁদুক। কেঁদেকেটে মনটা হালকা করুক। জুয়েলের চোখেও পানি। জোরে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো। জুয়েল সুইটির মাথায় হাত রাখলো। বললো
-কেঁদো না বোন। ওঠো। পকেট থেকে ফিরোজের দেয়া চিঠিটা বের করে বললো
-এই নাও ফিরোজের চিঠি। তোমাদের বাড়িতে না পেয়ে ভাবলাম শেফালিদের বাড়িতেই হয়তো এখনো অপেক্ষা করছো। ফিরোজকে লঞ্চে উঠিয়ে দিয়ে তবেই আমি এ দিকে আসলাম। কিছুক্ষণ থেমে আবার বললো
-চলো তোমাকে বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে আসি। সুইটি কম্পিত হাতে চিঠিটা নিলো। উভয়েই হাঁটছে। জুয়েল সুইটিকে বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে চলে গেলো।
সুইটি তার ঘরের দিকে হাঁটা দিলো। মা পিছন থেকে ডাক দিলেন। মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে মা আৎকে উঠলেন
-এ কি মা, তোর এ অবস্থা কেনো! সুইটি চিৎকার দিয়ে মায়ের বুকে লুটিয়ে পড়লো। মা মেয়ে জড়াজড়ি হয়ে কাঁদছে। মাস্টার সাহেবের স্ত্রীর নারীমন পড়ে নিচ্ছিলো মেয়ের বেদনাহত হৃদয়টি। মেয়ের ব্যথায় নিজেও ব্যথিত। একেই বলে নারী। স্বজাতির দুঃখ বেদনা, প্রেম-ভালোবাসা অনুভব করার ক্ষমতা তাদেরই আছে। নিজের আদরের মেয়েটা দু’দিনে কি হয়ে গেছে! মনে হয় বেদনার এক দীর্ঘ ঝড় ওর উপর দিয়ে বয়ে গেছে। মা মেয়ের কান্না থামাতে আপ্রাণ চেষ্টা করছেন। কাঁদতে কাঁদতে সুইটির হিক্কা উঠে গেছে। মা বললেন
-মা তুই একটু হাত মুখ ধুয়ে আয়। আমি তোর জন্য কটা খাবার নিয়ে আসি। সুইটি মায়ের কাছ থেকে ছাড়া পেয়ে তার নিজের ঘরে চলে গেলো। জামার ভিতর থেকে চিঠিটা বের করে খাটে বসলো। আস্তে আস্তে খামটা ছিঁড়ে ভেতর থেকে চিঠিটা ধীরে ধীরে টেনে বের করলো। ভাঁজ খুলে চোখের সামনে মেলে ধরলো চিঠিটি। প্রতিটি শব্দ যেনো কাঁদতে চাইছে। কান্নার শব্দগুলো বাড়তে চাইছে ক্রমশঃ।
প্রিয়…
শুভেচ্ছা নিও। জানি হয়তো তুমি এখনো আমার অপেক্ষায় আছো। আমি আসতে পারিনি বলে ক্ষমা চাইছি। আমাকে ভুল বুঝো না। পৃথিবীতে প্রত্যেক মানুষই কিছু না কিছু কর্তব্য নিয়ে জন্মায়। তোমার পিতা পিতার কর্তব্য পালন করেছেন। আমি তো তার কর্তব্যের বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারি না। আমি যদি তোমার পিতার কাঙ্খিত করে নিজেকে গড়ে তুলতে পারি তবে হয়ত তোমার সাক্ষাৎ প্রার্থী হবো। তুমি সে দিনটির প্রতিক্ষায় থাকবে কি না, জানি না। আর অপেক্ষা যদি নাই করো, তবে আমাকে অকৃতজ্ঞ পাবে না। তোমার মঙ্গল কামনাই করবো দূর থেকে।
আমি স্যারের কথায় অপমানিত হইনি তবে লাঞ্ছিত হয়েছি। জীবনে অনেক কষ্ট পেয়েছি। কষ্টও কম করিনি। কিন্তু এতোটা অপমান বোধহয় আমাকে কেউ করেনি। এতোটা লাঞ্ছিত তিনি আমাকে না করলেও পারতেন। গুরুজনের প্রতি শ্রদ্ধা আমার আছে। তাই নিজেকে গড়ার একটা সুযোগ পেলাম। তবে এই অপমান আমাকে প্রত্যয়ের সিঁড়িতে উঠিয়ে দিয়েছে কয়েক ধাপ।
আমি চলে যাচ্ছি। তুমি কোনো রাগ করো না প্রিয়তম। তোমার স্মৃতি আমার সাথে থাকবে। স্মৃতিগুলো আমার সাথে কথা বলবে আর সামনে চলার প্রেরণা যোগাবে। প্রিয় মাঝ গাঙে তুফান দেখে মাঝি যদি ভয় পায় তুমি কি তাকে সাহস যোগাতে পারবে না? বলবে না তাকে ঝড় যতো প্রবলই হোক না কেনো, ঊর্মী যতো উত্তালই হোক না কেনো, তরী যতো ছোটই হোক না কেনো তোমাকে গন্তব্যে পৌঁছুতেই হবে মাঝি। তুমি শুধু এ প্রেরণাই আমাকে দিও।
আমি হয়তো তোমার আকাশে সন্ধ্যা তারার মতো প্রতিদিন উদিত হতে পারলাম না। তবে হ্যালিরের মতো উদিত হবো। তুমি কি তার প্রতীক্ষা করবে না? প্রিয় আমি তো চেয়ে ছিলাম তোমাকে সহসা কাছে পেতে। হলোইবা কিছু দেরি। তাতে ক্ষতি কি। হয়ত এই দীর্ঘতা আমাদের বন্ধনকে স্থায়ী করবে।
প্রিয় তুমি আর কাঁদবে না। তুমি হাসবে। পুষ্পের হাসিটিই হাসবে। তোমার হাসির প্রতিধ্বনি আমার কাছে পৌঁছুবে সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো। তুমি হয়তো আমাকে অনেকদিন দেখবে না। তবে আমাদের দেখা অবশ্যই হবে। যাবার মুহূর্তে তোমাকে দেখতে খুব ইচ্ছে ছিলো। দেখার এ অদম্য স্পৃহা চাপা রেখেই চলে গেলাম। তুমি যখন চিঠি পড়বে আমি তখন লঞ্চে থাকবো। ছাদে গিয়ে তারার সাথে কথা বলবো। তোমার সেই কেবিনটার সামনে দাঁড়িয়ে থেকে উপলদ্ধি করবো তোমাকে।
অনেক লিখলাম। হাতে যে সময় নেই। লিখতেই যে ইচ্ছে করছে। অলেখা কথাগুলো হৃদয় দিয়ে পড়ে নিও। তোমার চিরসুখ কামনা করে বিদায় নিলাম।
তোমার…
সুইটি ফিরোজের চিঠি পড়ে প্রথমে কাঁদছিলোই। কিন্তু ফিরোজের মানা শুনে হাসতে চেষ্টা করছে। চিঠি পড়া শেষ হলে চিঠিটা বুকে চেপে ধরে ফিরোজকে অনুভব করার চেষ্টা করছে। যেভাবেই হোক প্রেমের অঙ্কুরিত কুঁড়িকে অবশ্যই ফোটতে হবে। তাকে ঝরতে দেয়া যাবে না। কোমল হাতে তার পরিচর্যা করতে হবে। ধীরে ধীরে বাড়তে দিতে হবে। হ্যালিরের মতো দীর্ঘ প্রতিক্ষার প্রহর গুনবো। হৃদয়ের সুতো দিয়ে তার জন্যে স্বপ্নের রঙিন জাল বুনবো। বাবুই পাখির মতো স্বযতনে বাসা বুনবো বাসরের। তবু আমার প্রেমের বিন্দুমাত্র অপমান হতে দেবো না। সুইটি ভাবছে আর কল্পনায় রঙিন স্বপ্নজাল বুনছে।
লঞ্চে উঠেই ফিরোজ একটা সিঙ্গেল কেবিন নিয়ে নিয়েছে। অন্য সময় হলে সে কেবিন নিতো না। এতে অনর্থক কিছু অর্থ অপচয় ছাড়া বাড়তি কিছুই পাওয়ার নেই। তনু নিলো। কাত হয়ে শুয়ে শুয়ে ক’দিনের স্মৃতিগুলোই রোমন্থন করছিলো সে। চোখের কোণে ক’ফোঁটা অশ্রু জমা হলো তার। সুইটির সাথে শেষ দেখা হলো না। আহা বেচারী! শুধু শুধুই কিছু কষ্ট পেলো। কেনোইবা আবেগের বশে এতো দূর এগিয়ে গেলাম। না গেলেও তো চলতো। তবে তাকে কেনো এতো কষ্ট দেয়া। ওর সাথে শেষ দেখাটা হওয়া দরকার ছিলো। কিছু কথা বলতে পারলে হয়তো মনটা হালকা হতো। কতেঠ অপরাধী আমি। কেনোই বা মরুভূমিতে নৌকা চালাতে গেলাম ! নদীর বুকে জেগে ওঠা ঐ ছোট্ট চরটা যদি আবার নদীতে বিলীন হয়ে যেতো। তাহলে তো দু’দিনের স্মৃতিগুলো ডুবে যেতো অতল গহিনে।
ফিরোজের দু’চোখ ঝাঁপসা হয়ে আসে। হৃদয়ের কিছু কথা চিঠিতে লিখে আসতে পেরেছেÑ এটাই তার শান্তনা। ও কি চিঠিটা পেয়েছে! পাবে নিশ্চয়ই। জুয়েল তার পুরনো বন্ধু। মনে মনে খোদার কাছে প্রার্থনা করলোÑ নিরবে চলে আসাতে সে যেনো ভুল না বোঝে।
ফিরোজ শোয়া থেকে উঠে বসে। আবার ছাদে চলে যায়। যেখানটায় প্রথম শেফালিদের সাথে দেখা হয়েছিলো তার। সেই কেবিনের কাছে চলে আসে। রেলিং ধরে চেয়ে থাকে ভেতরে। কিছুই দেখা যায় না। জানালার ভারি পর্দা টানানো। দরজাটা বন্ধ। কল্পনায় সেদিনের আধশোয়া সুইটিকে উপলব্ধি করছে সে। সেই স্বপ্নপরীর দেখা, নিঃশ্বাসের শব্দ, বুকের ওঠানামা, সেই চুল, অপলক চেয়ে থাকা…। হঠাৎ দরজার পাল্লায় ক্যাচ করে একটা শব্দ হলো। কল্পনায় ছেদ পড়লো ফিরোজের। একটা মেয়ে বের হয়ে আসলো ভিতর থেকে। ফিরোজ আর সেখানে দাঁড়াতে পারলো না। নিজের কেবিনে চলে আসলো। বুঁদ হয়ে পড়ে রইলো জীবনবেলার এই বিকিকিনিতে।