ফিরোজ ও শামীম এখন হলে থাকে। এফ রহমান হলে। মাঝে মাঝে যাওয়া আসা হয় মিলিদের বাসায়। কখনো কখনো মিলি তার মায়ের সাথে চলে আসে হলে। সাথে মায়ের হাতের রান্না করা খাবার। তৃপ্তির সাথে খায় ফিরোজ ও শামীম। ওরা পড়াশোনায় অধিক মনোযোগী হয়। বাইরে তেমন কোনো আড্ডার বের হয় না। কদাচিৎ যাওয়া হয় টিএসসিতে। মাঝে মাঝে হলের বারান্দায় বসে রাস্তার গাড়িগুলোর দিকে চেয়ে থাকে ফিরোজ। প্রতি সপ্তাহে মিলিদের বাসায় একবার যাওয়া চাই। নইলে মা রাগ করেন। একদিন দেরি হলে পরের দিন চলে আসেন হলে।
মিলি এখন অনেক বড়ো হয়েছে। ইডেন কলেজে পড়ে। বোটানি, ফার্স্ট ইয়ার। ফিরোজের কাছে ওকে বড়ো মনে হয় না। মাঝে মাঝে মিলিকে এটা-ওটা কিনে দেয় ফিরোজ। মিলিকে দেখলে নাহারের কথাই বেশি করে মনে পড়ে ওর। হলের অনেকেই মনে করে ফিরোজ ও মিলি ভাইবোন। কিন্তু শামীমকে দেখলে কেনো যেনো মিলির ভেতরটা ধুকপুক করতে থাকে। পালাতে ইচ্ছে করে। কেমন আছেন শব্দ দু’টোও বলা হয় না। যতো দিন যাচ্ছে ততোই যেনো ব্যবধান তৈরি হচ্ছে। আজ ফিরোজ ক্লাস শেষে তার কয়েকটি প্রশ্নের নোট করার জন্য লাইব্রেরিতে গিয়েছে। ক’দিন পর অনার্স ফাইনাল। শামীম একা রুমে। মিলিদের আজ তাড়াতাড়ি ছুটি হয়ে গেছ। সিঁড়ি ভেঙে দোতলায় উঠে এলো সে। দরজাটা ভেজানো ছিলো। আস্তে করে ধাক্কা দিতেই খুলে গেলো ওটা। ক্যাচ করে একটা শব্দ হতেই শামীম টেবিল হতে মাথাটা তুলে তাকালো দরজার দিকে। দু’জনেই দু’জনকে নিরীক্ষণ করছে। কি আছে এ চাহনির মধ্যে! অনেক দিনইতো মিলি এ ঘরে এসেছে। একই বাসায় থেকেছে কতোদিন। কৈ; কখনো তো এমন হয়নি! আজ কেনো এমন হলো! শামীম হঠাৎ যেনো হুঁশ ফিয়ে পেলো। জড়ানো কণ্ঠে বললো
-কখন এলে মিলি? শামীমের কথায় মিলিও সম্বিৎ ফিরে পায়।
-এ্যা! এইতো। …ফিরোজ ভাইয়া কোথায়?
-ও একটু লাইব্রেরিতে গেছে। এসে পড়বে এখনই। বলে একটি চেয়ার এগিয়ে দেয় শামীম।
মিলি অড়ষ্টভাবে বসলো তাতে।
-খালাম্মা কেমন আছেন? চোখটাকে একটু নিচু করেই জানতে চাইলো শামীম।
-ভালো, তবে কাল থেকে জ্বর।
-জ্বর! খুব বেশি না তো! উৎকণ্ঠা ঝরে পড়ে শামীমের কণ্ঠে।
-একটু বেশিই। ভাইয়াকে বলবেন মা যেতে বলেছেন। আমি এখন উঠি।
-সে কি, উঠবে কেনো? ফিরোজ এখনই এসে পড়বে। একসাথেই যাওয়া যাবে।
উঠতে গিয়েও আর ওঠা হলো না মিলির। একটু পরেই ফিরোজ চলে এসেছে।
-কখন এলে মিলি?
-ও ভাইয়া? বলেই চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালো মিলি। এই তো বিশ-পঁচিশ মিনিট হবে।
-মা ভালো তো?
-না, গতোকাল থেকেই জ্বর। তোমাকে খুব করে যেতে বলেছেন।
ফিরোজের হাসিটা মুহূর্তের মধ্যেই মিলিয়ে গেলো। ক’দিন পড়াশোনার ব্যস্ততার জন্য ওদিকে যাওয়া হয়নি। একটু গোছ-গাছ করে তিন জনেই বেরিয়ে পড়লো মিলিদের বাসার উদ্দেশ্যে।

মা বিছানায় শুয়ে কাতরাচ্ছেন। ওরা সবাই ঘরে ঢুকেছে। ফিরোজ মায়ের মাথার কাছে বসে মাথায় হাত রাখলো। বেশ জ্বর। বালিশের কাছে রাখা থার্মোমিটারটা পরিস্কার করে জিহবার নিচে রাখলো। তাপমাত্রা দেখে বিস্ময়ে হতবাক। একশ চার! শামীমের দিকে কাতর চোখে চেয়ে বললো
-শামীম তুই ডাক্তার নিয়ে আয় তো। আর মিলিকে বললো এক বালতি পানি নিয়ে আসার জন্য। ফিরোজ মায়ের মাথায় পানি ঢালছে। মনে মনে ভাবছে নিজের মায়ের মাথায়ই যেনো পানি ঢালছে। মা কিছুটা আরাম পাচ্ছেন বলে মনে হলো। একটা স্নেহের দৃষ্টি ঘুরে গেলো ফিরোজের কপালে। জ্বর মাথা থেকে নেমে গেছে। মিলি গরম দুধ নিয়ে এসেছে। ফিরোজ মাথাটা একটু উঁচু করে দুধের গ্লাসটা ধরলো মায়ের মুখের কাছে।
ইতোমধ্যে শামীম ডাক্তার নিয়ে ঘরে ঢুকলো। দুধ খাওয়ার পরই মিলির আম্মা বমি শুরু করে দিয়েছেন। দু’দিনের জ্বরে একেবারে কাবু হয়ে গেছেন মা। ডাক্তার নাড়ি ও তাপমাত্রা দেখে প্রেসক্রিপশন লিখে দিয়েছেন। শামীমকে আবার পাঠানো হলো ওষুধ আনতে। ওষুধ খাওয়ার পর রাতে ঘাম দিয়ে জ্বর ছেড়েছে। সেদিন আর হলে ফিরে আসতে পারলো না ওরা। ওখানেই থেকে যেতে হলো।

ক’দিন পর ফিরোজদের অনার্স ফাইনাল পরীক্ষা। পড়াশোনা ছাড়া সকল কাজ এখন বন্ধ। পরীক্ষার জন্য দু’জনই আদাজল খেয়ে প্রস্তুতি নিচ্ছে। পড়াশোনার ফাঁকে ফাঁকে মাঝে মধ্যে যাওয়া হয় লাইব্রেরিতে। দিনে নোট করা হয় আর রাতে ও সকালে পড়াশোনা। তবে বন্ধুদের একটু জ্বালা-যন্ত্রনা ফিরোজকে সহ্য করতে হয় বেশি। সকাল-বিকাল অনেকেই ফিরোজের কাছে আসে নোট নিতে। ও অবশ্য কাউকে নোট দিতে কার্পণ্য করে না। তবে যারা নোট নিতে আসে তারা এর পাশাপাশি গ্যাঁজাতেও ছাড়ে না। এজন্য ফিরোজ ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও রীতিমতো পড়াশোনা করতে পারছে না। তাছাড়া একটা আশঙ্কাও বুকের ভেতর দানা বাঁধতে থাকে। আজকাল স্যারদের সাথে যারা খোলামেলা মিশতে জানে না তাদের টিউটোরিয়াল এ বেশি মার্কস জোটে না। যে মেয়েরা স্যারদের সাথে প্রেমালাপ ও চাইনিজে নীল আলোর নিচে বসতে পারে স্যারদের নজর তারাই কাড়তে পারে বেশি। আর কখননো যদি কোনো ছাত্রের নজরে তা ধরা পড়ে যায়, আর আকার-ইঙ্গিতে যদি তা প্রকাশ পায় কিংবা কেউ যদি একধাপ এগিয়ে গিয়ে স্যারকে এ ধরনের বেহায়াপনার জন্য তিরস্কার করে; তবে তার রক্ষে নেই। সেই ছাত্রের উপর উঠে পড়ে লেগে যান শিক্ষক। নিজের হাতে যতো প্রকার কৌশল আছে সবগুলো প্রয়োগ করেন তিনি। তবে সবাই এই কিসিমের শিক্ষক না। যারা নীতি-নৈতিকার ধার ধারে না তারাই এসব কাজে বেশ পারঙ্গম শুধু শিক্ষক কেনো, ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যেও এই প্রবণতা মহামারীর আকার ধারণ করেছে।
ক’দিন আগে জামান স্যার বন্যাকে নিয়ে গিয়েছিলেন একটা চাইনিজে। স্যার এখনো ব্যাচেলর।
সেদিন ছিলো শামীমের জন্মদিন। ওরা ভেতরে ঢুকতে যাবে এমন সময় জামান স্যারকে দেখতে পায় ওরা। ফিরোজ ও শামীম একটা দূরত্ব বজায় রেখে বসলো যাতে স্যার ওদেরকে দেখতে না পান। ফিরোজের গোটাদেহ রিরি করে ওঠে। এবার ওর সামনে স্পষ্ট হয়ে যায় গতো টিউটিরিয়েল বন্যা কেনো বেশি নম্বর পেয়েছিলো। সেদিন ক্লাসে যখন বন্যা ফার্স্ট হলো সবাই আবাক দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়ে ছিলো। ও ক্লাসে কোনো দিনই ভালো পারফর্ম করতে পারেনি। ফার্স্ট হওয়ার পর অনেকই বন্যার সাথে উপহাসের ভঙ্গিতে কথা বলতো। তবে ফিরোজ কাউকেই গা করেনি। সে অনেককেই বলেছিলো লেখা পড়া করলে ভালো রেজাল্ট করতেই পারেÑএটা তো দোষের নয়। তবে আজকে তার সামনে ভালো রেজাল্ট করার রহস্য উন্মোচিত হয়েছে।

ফিরোজের খাওয়ার নাম গন্ধ নেই। ও এক দৃষ্টিতে চেয়ে আছে বন্যাদের দিকে। এমন আচরণ তারা করছে যে, স্বামী-স্ত্রী। ফিরোজ ঘৃণায় চোখ ফিরিয়ে নিলো। এর সাথে শামীমের ধমক খেয়ে খবারের দিকে মনোযোগী হলো। কিছুক্ষণ পর ওদিকে তাকাতেই ঘৃণায় দম বন্ধ হবার উপক্রম। মনের অজান্তেই মুখ থেকে বেরিয়ে এলো ছি, ছি, মানুষের আচরণ কতো নিচে নামলে এভাবে একজন আরেকজনকে চুমু খেতে পারে। তাও আবার শিক্ষক ছাত্রীর ঠোঁটে। এরা নাকি আবার জাতি গঠনের কারিগর। স্বামী-স্ত্রীও তো প্রকাশ্যে লোকালয়ে এমন আচরণ করে না। ফিরোজ আর ভাবতে পারে না। খাওয়া শেষ করে তাড়াতাড়ি সেখান থেকে বের হয়ে আসলো ওরা। পরদিন ক্লাসে ফিরোজ স্যারের মুখোমুখি হয়ে বললো
-স্যার আপনার সাথে আমার একান্তে কিছু কথা ছিলো।
-ওয়েল কাম। আমার রুমে এসো। মুখে একচিলতে হাসি জামান স্যারের।
ফিরোজ পরের ক্লাস করে জামান স্যারের রুমের দিকে হাঁটা দিলো। সালাম দিয়ে ঢুকে গেলো রুমের ভিতর। সালামের জবাব নিলো কিনা বুঝা গেলো না। ইঙ্গিত পেয়ে স্যারের মুখোমুখি বসলো একটা চেয়ারে। জামান স্যার নিচু হয়ে কি যেনো লিখছিলেন। কিছুক্ষণ পর মুখে এক টুকরো হাসি টেনে মাথাটা একটু উঁচু করে চাইলেন ফিরোজের দিকে। কৌতূহলী হয়ে বললেন
-ও হ্যা। তুমি কি যেনো বলতে চেয়েছিলে। তোমার সমস্যা খুলে বলো।
ফিরোজ একটু সময় নিয়ে গুছিয়ে নিলো কি বলবে। একটু সামনে টেবিলের দিকে ঝুঁকে স্যারের মুখোমুখি হয়ে জানতে চাইলো
-স্যার ছাত্র-ছাত্রী ও শিক্ষকদের মাঝে কেমন সম্পর্ক থাকা উচিত?
হাসিমাখা মুখটা শক খেয়ে কিছুটা এলেকট্রিক সকেটের মতো হয়ে গেলো।
-হঠাৎ এ প্রশ্ন কেনো?
-স্যার আগে বলুন না; তারপর বলছি। ফিরোজের কণ্ঠে কিছুটা অনুনয় ঝরে পরে।
-তাদের মাঝে হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক থাকবে। থাকবে বন্ধুতা, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার সম্পর্ক।

  • খুব খুশি হলাম স্যার। আপনার কথা শুনে আশাতীত খুশি হয়েছি। তবে সম্পর্ক কি বাস্তবে চলে, না কি মুখ থুবড়ে পড়ে যায় ?
    -কেনো, এ রকম কি হয়েছে কখনো ?
    -আমার চেয়ে তো ভালো জবাব আপনিই দিতে পারেন স্যার। কথোপকথনে জামান স্যার কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে আসছিলেন। এবার যেনো সকেট পোড়া গন্ধটা নাকে তীব্রভাবে টের পেলেন। তবুও চেহারাটা স্বাভাবিক রেখে মুখে হাসি টেনে বললেন
    -তুমিই দাও না জবাবটা।
    -স্যার, আপনার প্রথম মন্তব্যটা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকের মতোই হয়েছে। তবে সেটা নীতিবাক্যের মতো বাস্তবে জীবন তার উল্টো। চাইনিজ রেস্টুরেন্টে ছাত্রীর গালে প্রকাশ্যে চুমু খাওয়া শ্রদ্ধা ভালোবাসার রাসায়নিক বিক্রিয়া নিশ্চয়ই নয়।
    অধ্যাপক জামানের আর বুঝতে বাকি থাকে না কিছুই। গতোকালের দৃশ্য তাহলে এ ছোকড়া দেখে ফেলেছে। চুপচাপ স্বভাবের মেধাবী ছাত্র ফিরোজ যে তার স্যারকে মুখোমুখি এভাবে কথাটা বলবে তা কিছুতেই জামান স্যারের বুঝে আসে না। তার কালো মার্কেলের মতো চোখ দু’টো চক্রাকারে ঘুরে আসে সমস্ত ঘরটা। পরে আবার স্থির হয় ফিরোজের শান্ত চোখ দু’টোর উপর। হো হো করে হেসে কনুয়ের উপর ভর করে মুখটা ফিরোজের কাছাকাছি নিয়ে বললেন
    -তুমি তো দেখছি এখনো বাচ্চা ছেলেই রয়ে গেছো। বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র ফিরোজের মুখে এ কথা মানায় না। তুমিতো এখনো সেকেলেই রয়ে গেছো। তোমাদের চরের মানুষের মতো। ওয়েস্টার্ন ওয়ান্ডে স্কুলের ছেলেমেয়েদেরও রাষ্ট্রীয়ভাবে যৌন প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। এতে এনজয়টার পাশাপাশি যৌনবিষয়ে প্র্যাকটিক্যাল ধারণাও জন্মে তাদের। তুমিও বুঝবে। পিএইচডিটা করতে যাও, দেখবে তখন। আর তুমি কিনা এ সামান্য ব্যপারেই…।
    -স্যার; এটা ওয়েস্টার্ন ওয়ান্ড না, এটা বাংলাদেশ। তাদের এই উশৃঙ্খল আচরণের জন্যই আজ তারা এইডস এর মতো মরণব্যাধিতে আক্রান্ত আর ভোগের দিন যখন শেষ হয়ে আসে তখন বৃদ্ধাশ্রমে অসহায়ভাবে কাটাতে থাকে জীবনের বাকি দিনগুলো। সেখানে থাকে না কোনো প্রেম-আনন্দ-সুখ। থাকে শুধুই গ্লানি আর হতাশা। সেজন্য তারা আবার পারিবারিক প্রথার শ্লোগান তুলছে। আর এটা হলো বাঙালি মুসলমানদের দেশ। যেখানে রয়েছে বিশ্বাস, প্রেম, আনন্দ আর জীবনের শেষ সময়ে নাতি-নাতনির সাথে অনাবিল আনন্দে, হাসিতে একটি সুখের জীবন পার করে মৃত্যুর দিকে যাওয়া। তাই ইউরোপের ছকে এদেশকে বিবেচনা করা আপনার মতো একজন শিক্ষকের কাছে আশা করিনি স্যার।
    ফিরোজ এমনভাবে কথাগুলো বললো যে তার শেষ কথাটায় অধ্যাপক জামানের অনিরুদ্ধ ধৈর্য্যরে বাঁধ ভেঙে গেছে। রাগে তার ঠোঁট দু’টো কাঁপছে। একটা পুঁচকে ছেলে যে কিনা এখনো অনার্স পরীক্ষাই দেয়নি সে এসেছে ড. জামানকে জ্ঞান দিতে। এতো বড়ো দুঃসাহস। জামান স্যার বসা থেকে দাঁড়িয়ে গেলেন। কিন্তু ফিরোজের কোনো ভাবান্তর হলো না। সে আগে যেভাবে ছিলো এখনো সেভাবেই বসে আছে। স্যার আঙুলটা বকের ঠোঁটের মতো বাঁকিয়ে বললেন
    -তোমাকে খুব ভালো ছেলে বলেই মনে করতাম। সাহস থাকা ভালো, তবে দুঃসাহস খুব খারাপ জিনিস। আমার প্রিয় ছাত্রদের একজন হিসেবে তোমাকে আজ ক্ষমা করে দিলাম। এই বিষয় নিয়ে কারো সাথে কোনো কথা বলবে না। তবে মনে রেখো উঁই পোকার পাখনা গজালে সে আগুনে পুঁড়েই মরে।
    -স্যার নাম্বারের লোভ দেখিয়ে অসহায় মেয়দের ইজ্জত লুটে মানুষ নামক যে কীট, নিশ্চয়ই তার মরণ আরো করুণ! যদি এ অনৈতিক কর্মকান্ড থেকে বিরত না হন তবে বিষয়টা আমরা চেয়ারম্যান স্যারের কানে তুলবো। প্রয়োজনে আরো অনেক কিছু। আর এক মুহূর্তও দেরি না করে স্যারের রুম থেকে বের হয়ে সিঁড়ি ভেঙে নিচে নেমে এলো ফিরোজ। হনহন করে ছুটে চললো হলের দিকে।
    আজ ফিরোজ অনেকটা বেপরোয়া হয়ে স্যারকে আক্রমণ করেছে। শুধু জামান স্যার কেনো আজ সারা দেশটার একই অবস্থা। ছয় বছরের শিশু থেকে সত্তর বছরের বৃদ্ধাও ধর্ষিত হচ্ছে অহরহ। তার হিসাব কে রাখবে। এখন ধর্ষনের পর আবার হত্যা করে ফেলে রাখে এখানে ওখানে। বেওয়ারিশ লাশ হিসেবে পড়ে থাকে রাস্তার পাশে ডোবা-নালা, খালে-বিলেÑ কারো কারো ভাগ্যে দাফনও জোটে না। কলঙ্কিত মুখটা যে মেয়ে কাউকে দেখাতে চায় না: সবকিছুর মায়া ত্যাগ করে, সবার অজান্তে, ঝুলে থাকে গাছের ডালে কিংবা ফ্যানের সাথে।

ফিরোজ আরো খোঁজ-খবর নিয়ে জেনেছিলো তাদের এক সিনিয়র ছাত্রীর সাথেও জামান স্যারের সম্পর্কের কথা। স্যার একদিন ঘৃণ্য কাজে আহবান জানিয়ে ছিলেন মেয়েটিকে। মেয়েটি সাড়া দেয়নি। ব্যাপারটা শেষ পর্যন্ত চেয়ারম্যান স্যারের কানেও গিয়েছিলো। চেয়ারম্যান স্যার জামান স্যারকে ডেকে নিয়ে তীক্ষ্মভাষায় তিরস্কার করেছিলেন। মেয়েটির ভাগ্যে আর ভালো রেজাল্ট জোটেনি। অথচ তার প্লেস করার কথা ছিলো।
আজ তাই ফিরোজের মনে সংশয়। সেই মেয়েটির অদৃশ্য ছবিই আজ তার মনে জ্বলজ্বল করছে। মেয়েটির মতোই কী পরিণতি হবে ফিরোজের। কথাটা ভাবতেই অন্তরাত্মা কেঁপে ওঠে। পিছনের ইতিহাস তৈলচিত্রের মতো ভাসতে থাকে চোখের সামনে। মনে পড়ে মায়ের কথা। মেঘনার ভাঙনের কথা। ছমির গাজির তামাটে মুখটা মনে পড়ে তার। পরিবারের অসহায় মুখগুলো ওর পানে চেয়ে যেনো করুণভাবে হাসছে। সুইটির মুখটা যেনো ওর দু’হাতের তালুর সাথে মিশে আছে। রোমেলা আর ইস্কান্দারের মুখটা সিনেরিলে ভেসে ওঠার সাথে সাথে ফিরোজের আবেগকাতর মনটা পাথরের মতো শক্ত হয়ে ওঠে। প্রতিশোধের নেশায় হাত দু’টো মুষ্ঠিবদ্ধ হয়। নজরুল মাস্টারের ছবিটা চোখের সামনে আসতেই মনটা আরো প্রত্যয়ী হয়ে ওঠে। শরীরের সকল পেশীগুলো রেসলারের মতো টানটান হয়ে ওঠে। চিৎকারের মতোই মুখ থেকে বেরিয়ে আসে ‘না, আমি পরাজিত হবো না। আমি পরাজিত হবো না।’

শামীম ওর চিৎকার ধ্বনি শুনে বিছানা থেকে লাফ দিয়ে ওঠে।
-কি হয়েছে ফিরোজ। তুই এমনভাবে চিৎকার করছিলি কেনো? ফিরোজ নির্বিকার। তার সমস্ত শরীর কাঁপছে। মুখে কোনো কথা বেরুচ্ছ না। সে নির্বিকারভাবে শামীমের দিকে তাকিয়ে আছে। শামীম ওকে জড়িয়ে ধরে বিছানায় শুইয়ে দিয়েছে। ফিরোজের কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম এ শীতের মধ্যেও চিকচিক করছে। শামীম ফিরোজের মাথাটা ধীরে ধীরে টিপে দিচ্ছে। ক’দিন ধরে ফিরোজ এমনিতেই আনমনা হয়ে থাকে। প্রশ্ন করেও কোনো উত্তর পাওয়া যায় না ওর কাছ থেকে। তবে এটা অন্তত বুঝেছে যে জামান স্যার ওর রেজাল্ট নিয়ে সমস্যা করতে পারে। কিন্তু আজকে ফিরোজের এ চিৎকার ধ্বনির কোনো কিনারা করতে পারেনি শামীম। ফিরোজ ধীরে ধীরে ঘুমের দেশে চলে যাচ্ছে। শামীম আর কোনো প্রশ্ন না করে ওর মাথাটা রেখে দেয় বালিশে। রাতে শুয়ে শুয়ে ফিরোজ স্বপ্ন দেখেÑ তার পিতা সাদা পাজামা-পাঞ্জাবি পরে হলের রুমে বসে আছেন। তার চোখে মুখে একটা বেহেশতি দীপ্তি। ওকে দেখেই একটা ছোট্ট শিশুর মতোই হেসে ফেললেন। বুকের সাথে জড়িয়ে ধরেন। ফিরোজ তার পিতার শরীরের গন্ধ নিতে থাকে মৌমাছির মতো। তার গোটা শরীর আলোড়িত হয় এক অনাবিল ভালোলাগায়। যা কেবল অনুভব করা যায়; কিন্তু প্রকাশ করা যায় না, ছোঁয়া যায় না। তবু তার মন এ সুগন্ধ আকুলি বিকুলি করে খুঁজতে থাকে চারপাশে। তার হাত দু’টো বিছানায় কি যেনো খুঁজতে থাকে। কিন্তু খুঁজে পায় না কিছুই।

ফিরোজের ঘুম ভেঙে যায়। অনেকক্ষণ স্বপ্নের ঘোরে বিছানায় বসে থাকে। মোয়াজ্জিনের আজানের সুর নিস্তব্ধ রজনিতে মোহিনী ঢেউ তুলে সারা শহরে ছড়িয়ে পড়ে। ওর মন অৎানা এক আশঙ্কায় কাঁপছে। কেনো তার এমন লাগছে বুঝতে পারছে না কিছুই।

সকাল থেকেই ফিরোজ পড়ার চেষ্টা করছিলো । কিন্তু কিছুতেই মন বসাতে পারছে না। গতোরাতের আকস্মিক ঘটনা, ভোররাতের স্বপ্ন তাকে সারাক্ষণ আচ্ছন্ন করে রাখে। পেছন থেকে পিয়ন এসে ডাক দেয়। তার সামনে মেলে ধরে একটা হলুদ খাম। ফিরোজ কম্পিত হাতে চিঠিটা তুলে নেয়। খামের উপর নাহারের হাতের লেখা চিনতে পারে ফিরোজ। এই প্রথম নাহার ফিরোজের কাছে চিঠি লিখেছে। ফিরোজ কিছুটা খুশি হলো তবে তা প্রকাশ পেলো না। রুমে ঢুকে খামটা ছিঁড়ে ভেতর থেকে টেনে বের করে আনলো চিঠিটা। মাত্র দুটি লাইন লেখা।
ভাইয়া,
বাবা খুব অসুস্থ। ডাক্তার আমাকে কিছুই বলছেন না। বাবা চাঁদপুর সরকারি হাসপাতালে আছেন। তুমি তাড়াতাড়ি চলে এসো।
ইতি
নাহার!
আর কিছুই লেখেনি। ফিরোজের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠলো। মায়ের মৃত্যু সে দেখতে পায়নি। পিতা মৃত্যুর সাথে লড়ছেন। গতোকালের স্বপ্নে দেখা বাবার ছবিটা চোখের সামনে ভিড় করছে। মাথাটা ঘুরছে। চোখের পানি গড়িয়ে পড়ে ভিজে যায় ওর শার্ট। হাত থেকে খসে পড়ে চিঠিটা। শামীম সব কিছু দেখে। ওর চোখের সামনে কয়েক দিনের ঘটনা দেখে ফিরোজের মনের অবস্থা স্পষ্ট হয়ে উঠে শামীমের কাছে। টেবিলে পড়ে থাকা চিঠিটাতে চোখ বুলায়। কি করবে মুহূর্তে ঠিক করে নেয় শামীম।
-ফিরোজ তৈরি হয়ে নে। সায়েদাবাদ থেকে কোচে যাবো চাঁদপুর। মন খারাপ করিসনে ভাই। আল্লাহ নিশ্চয় আমাদের সাহায্য করবেন। ফিরোজের কাঁধে একটি দায়িত্বশীল হাত রেখে কথাগুলো বললো শামীম। ফিরোজ শুধু অসহায়ের মতো চাইলো শামীমের মুখের দিকে। দু’জনে দ্রুত তৈরি হয়ে চলে এলো সায়েদাবাদ বাস টার্মিলালে।

গাড়ি চলছে। দু’পাশের সবুজ বাগ বাগিচা পেছনে ফেলে গাড়ি চলছে তার নিজস্ব গতিতে। কিভাবে যে তিনটি ঘন্টা কেটে গেলো কিছুই বুঝতে পারলো না ফিরোজ।