ফিরোজ ও শামীম নিচে খোঁজ নিয়ে দ্রুত সিঁড়ি ভেঙে দোতলায় উঠে আসে। রুমের ভেতর একটা সিটকে ঘিরে ছোটখাট একটা জটলা। সবার মুখ নিচের দিকে। মেয়েরা কাঁদছে। কাঁদছে ফিরোজের ছোট মা। ছোট ভাই-বোন। কেউ কোনো কথা বলছে না। কান্নার গমকে সারা হাসপাতাল হাহাকার করে ওঠে। শোকের সরোদ বাজিয়ে চলেছে যেনো কেউ। তার সুর তরঙ্গ ছড়িয়ে পড়েছে প্রতিটি রোগীর বিছানায়। নাহারের চোখ থেকে শ্রাবণের খালের মতো দু’টি অশ্রুধারা গড়িয়ে পড়ছে খাটে শোয়া গিয়াসউদ্দিন সরকারের লাশের উপর। সে হাঁটু গেড়ে কতোক্ষণ ধরে কাঁদছে তা বুঝা যায় না। তবে গালে লবণের চরের মতো দাগ পড়ে আছে। ফিরোজ নির্বিকারভাবে শোয়া মানুষটির দিকে অপলক তাকিয়ে আছে। নাহার তার পিতার লাশ হতে মাথাটা তুলে তাকালো ফিরোজের দিকে। ভাই বোনের চার চোখের মিলন হলো। নাহার এখন আর কাঁদছে না। চোখের সব পানি যেনো নিঃশেষ হয়ে গেছে তার। কণ্ঠের সব শব্দ যেনো অবরুদ্ধ হয়ে গেছে। হাত দু’টো তার শিথিল। এতোটুকুন মেয়ে দেখলে এখন মনে হয় মাঝ বয়সী কোনো নারী। তিনদিন না খাওয়া, না ঘুমানোর ফলে চেহারাটা মৃত মানুষের মতো হয়ে আছে। পিতার মাথাটা নিচে রেখে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালো নাহার। এরপর ‘ভাইয়া’ বলে এক বিকট চিৎকার দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লো ফিরোজের বুকে। বাঁধভাঙা নদীর মতোই প্রতিটি দরজা জানলা দিয়ে সেই চিৎকারের আওয়াজ ছড়িয়ে পড়লো চারদিকে।
হায়রে ভাগ্য! ছোটবেলা মা মারা গেলো। মায়ের ছবিটাও বেচারির ঠিক মতো মনে নেই। কৈশোরে চলে গেলেন বাবা। নিয়তির কি নিষ্ঠুর পরিহাস! বোনের চিৎকার গুমোট আবহাওয়ায় থমথমে পরিবেশে হঠাৎ মেঘের গর্জনের মতো চারদিক তোলপাড় করে তোলে। তেমনি হাসপাতালের চারদিকটা থরথর করে কেঁপে ওঠে। ভূমিকম্পের মতো যেনো গোটা চাঁদপুর শহরটাই নড়ে ওঠে। দুই ভাইবোন একে অপরকে জড়িয়ে কাঁদছে। ফিরোজের মা-ও জড়িয়ে ধরেছে ফিরোজকে পেয়ে। বহুকালের পুঞ্জিভূত অশ্রু আজ যেনো প্রবল বৃষ্টির মতোই ঝরছে। কাঁদছে চারপাশে আত্মীয়-অনাত্মীয়Ñ সবাই। এ মাছুম ছেলে-মেয়ের কান্নায় কার না কান্না আসে। এ পরিবেশে পাষাণেরও চোখ ফেটে অশ্রু বের হয়।
শামীম শান্তনার ভাষা হারিয়ে ফেলে। কি করবে ঠিক বুঝতে পারছে না। মনে মনে শান্তনার ভাষা খুঁজছে। দু’জন এমনভাবে কাঁদছে যে একটু পর সেন্স হারিয়ে ফেলবে। শামীম তার করণীয় স্থির করে ফেলে। তার মতো শক্ত মানুষের চোখেও পানি। তবুও পরিস্থিতি আয়ত্বে আনা দরকার। শামীম ফিরোজ ও নাহারের কাছে এগিয়ে গেলো। নাহারের কথা সে আগেও শুনেছে ফিরোজের কাছে। কিন্তু বেচারিকে এই প্রথম দেখা। তাই কিভাবে শান্ত করবে তাই ভাবছিলো মনে মনে।
-ফিরোজ কাঁদিস না ভাই। একটু ধৈর্য ধর। চাচাকে তো বাড়িতে নিয়ে যেতে হবে। তোমরা যদি ভেঙে পড়ো তবে ছোটদের শান্তনা দেবে কে? শামীম ফিরোজের বা হাতটা ধরে একটু আড়ালে নিয়ে গেলো।
-ফিরোজ, এ রকম পরিস্থিতি আমার হলে তোর মতোই হতো আমার অবস্থা। তবুও তোকে এতো ভেঙে পড়লে চলবে না বন্ধু। লাশ এখান থেকে নেওয়া দরকার। হাসপাতালের ঝামেলা মিটানো দরকার। জানাজা-দাফনের ব্যাপার আছে। তার আগে চাচাজানের লাশ বাড়িতে নেওয়া দরকার। একটু শক্ত হ বন্ধু। চল ডাক্তারের সাথে কথা বলে আসি। ফিরোজ শামীমের দিকে তাকালো। বাস্তবতাটা উপলব্ধি করতে চেষ্টা করলো। ফিরোজ শামীমের মুখের দিকে চায় কান্না ধোয়া মুখটি তুলে। হাতের উল্টো পিঠে চোখদু’টো মুছে বললো
-চল।
ওরা ডাক্তারের সাথে কথা বলে, হাসপাতালের বিল মিটালো। লাশ বুঝে নিয়ে চলে আসলো চাঁদপুর নদীর ঘাটে। হাইমচর যাওয়ার কোনো লঞ্চ নেই। এখন নৌকা ভাড়া করতে হবে। বহু কষ্টে একটা ইঞ্জিনঅলা নৌকা ভাড়া করা গেলো। লাশসহ সবাইকে নিয়ে মেঘনার পানি কেটে নৌকা চলছে হাইমচরের দিকে। পাড়ে শত শত শূন্য বাড়ি। কিছু কিছু শূন্য ভিটা উদোম শিশু গমের সময় গ্রামের বাড়িতে যেভাবে উঠোনে শুয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে সেভাবে তাকিয়ে আছে। কেউবা আধভাঙা ভিটার উপর টিনের চাল দাঁড় করিয়ে তার ভিতর বসবাস করছে। মেঘনার ভাঙনে হয়তো অনেকেই চলে গেছে দূর দেশে। কেউবা রয়ে গেছে বংশলতিকার টানে। এভাবে আর কতোদিন! মানুষের বাড়ির উপর এখন নদী। নদীর পানি কেটে তিরতির করে ছুটে চলছে নৌকা। সূর্যটা তার তেজকে ক্রমেই ম্লান করে ওপাড়ের চরে মুখ লুকাচ্ছে।
ফিরোজের মনে ভবিষ্যতের ভাবনা। এতো বড়ো সংসার কে দেখবে। এতোদিন বাবার রথের উপর নির্ভর করতো এই বিরাট সংসারটা। এখন এদের দেখবে কে। ভিটে-মাটি জমি-জিরাতÑ সবতো নদীর পেটে। সম্পদের মাঝে এখন আছে মাত্র দু’খান ঘর। আর চর থেকে আসে বছরে দু’বার কিছু ধান। ফিরোজ কোনো কিনারা করতে পারে না। শুধু ভাবনার দোক্কাঘুড়ি মনের আকাশে ঘুরপাক খায় অবিরত। কল্পনার জাল বোনা হয়। জালের বিস্তৃতি ঘটে। কিন্তু মাকড়সার জালের মতোই তা ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় সামান্য ঝাপটায়।
সূর্যটা এখন গোল হয়ে আছে। স্কুলে পড়ার সময় বাবা একটা টকটকে লাল বল কিনে দিয়েছিলেন ফিরোজকে। ঢাকা থেকে সকালের লঞ্চে বাড়িতে গিয়ে দেখেন ফিরোজ তখনও ঘুমে। বাবার ডাক শুনে তাকাতেই দেখে তার মাথার কাছে বাবা টকটকে লাল একটা বল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছন।
সূর্যটা দেখতে এখন ঠিক সেই বলটির মতো। বাবা বলটি হাতে দিয়ে বলেছিলেন
-কিরে পছন্দ হয়েছে?
ফিরোজ বাবার গলা জড়িয়ে বলেছিলো
-খু-উ-ব।
ওর চোখ থেকে দু’ফোটা অশ্রু গড়িয়ে পড়লো। সূর্যটার দিকে আর তাকাতে পারছে না। নৌকাটা আগের চেয়ে একটু বেশি গতিতে চলছে। সূর্যটার রঙ এখন রক্তবর্ণ। অর্ধেক ডুবে গেছে পানিতে। আরেকটু পর বাকি অর্ধেকও ডুবে যাবে। সূর্যটা ডুবে গেলো মেঘনার শান্ত পানিতে। নৌকা চলছে উত্তর থেকে দক্ষিণে। যেখানটায় ডুবে গেছে সূর্যটা সেখানটা এখন লালে লাল হয়ে আছে। মনে হয় কোনো শিল্পীর রঙের কৌটাগুলো পানিতে পড়ে গেছে। আর মেঘনা গিলে খেয়েছে রঙের কৌটাগুলো। হতেও পারে। মেঘনাতো কতো মানুষের আস্ত বাড়ি-ঘর, জমি, মাঠ, বাগান গিলে খেয়েছে। আর এতো হলো শিল্পীর রঙের কৌটা! এ আর গিলে খাওয়া এমন কি! সারা পানিই লাল। সে লালে ফিরোজের চোখ দু’টোও লাল হয়ে উঠেছে। এখন মনে হচ্ছে পূর্ব-পশ্চিমে মার্বেলের একটা লাল পথ। সে পথে কারো কোনো চলাফেরা, আসা যাওয়া নেই। কোন সে পথিক, যার যাবার জন্য এই রক্তরঙা পথটি তৈরি করা হয়েছে! ফিরোজ কফিনে রাখা লাশটির দিকে তাকালো।
নৌকা চলছে এখন হাইমচরকে পিছনে রেখে। আর একটু পরেই চরভেরবী। সেখান থেকে কিছুদুর হেঁটে যেতে হবে। নদীর পাড় থেকে বাড়ি পর্যন্ত ভালো রাস্তা নেই। থাকলে ভ্যানে করে লাশ নেয়া যেতো বাড়িতে। বেশি রাত হয়ে গেলো জানাজা দাফনের সমস্যা হবে। যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব আত্মীয় স্বজনকে খবর দিতে হবে।

বাড়িতে লাশ আনা হলে নারী ও শিশুদের কান্নার রোল পড়ে যায়। কাঁদুক! মন-প্রাণ উজাড় করে কাঁদুক। আরতো কান্নার কোনো সুযোগ পাবে না। জীবনের পরম পাওয়া আজই তারা পেয়ে যাক। রাত ক্রমে বেড়েই চলছে। আশ-পাশের মানুষ ও আত্মীয়রা হাজির হয়েছে আঙ্গিনায়। তাদের এতোদিনের সুখ-দুখের ভাগীদার সরকার সাহেবের নিস্পৃহ দেহখানা শেষবারের মতো দেখে যায় সবাই। গমকে গমকে শুধু একটা কান্নার রোল রাতের নিস্তব্ধতাকে মাতাল করে তোলে। কয়েকজন হাফেজে কোরআন লাশের চারপাশে বসে কোরআন তেলাওয়াত করছেন।
রাত এগারটার দিকে জানাজা শুরু হয়। এতো রাতে জানাজায় এতো মানুষ: বিশ্বাসই করা যায় না। সরকার সাহেবের যে এতো ভক্ত, অনুরক্ত আছে তা এ জানাজা না দেখলে বুঝা যেতো না। এ মধ্যরাতে যারা জানাজায় এসেছেন তারা নিশ্চয় ভালোবাসার টানে, আত্মার টানেই এসেছেন। নিস্তব্ধ গোরস্থান যেনো প্রাণহীন মানুষ পেয়ে নতুন করে প্রাণ পেলো। মধ্যরাতে এতো জন-মানুষের আর্তি কোনোদিন এই গোরস্তানবাসী শোনেনি। সবাই গিয়াসউদ্দিন সরকার ও কবরবাসীর জন্য হাত তুলে দোয়া করলো। ইলিশ মাছের দাঁড়ার মতো কবরের দাঁড়াটা করে দিয়েছে কোদালিরা। পরম ভালোবাসার টানে কোদালিরা সরকার সাহেবের কবরটাকে পরিপাটি করার কাজে ব্যস্ত। বারবার তারা মনে করছে সরকার সাহেব বুঝি তাদের প্রশংসা করছেন। কি জানি হয়ত মৃত বলে শব্দটা কান পর্যন্ত পৌঁছেনি। জীবিত থাকতে কামলাদের কাজ মনের মতো হলে বারবার প্রশংসা করতেন সরকার সাহেব। বকশিস দিতেন। কিছু বরই গাছের ভালপালা কবরটার উপরে দেয়া হলো। তার সাথে কিছু তুষ ও মরিচের গুড়াও ছিটিয়ে দেয়া হলো কবরের উপর। কবরের উপর মরিচের গুড়া কেনো ছিটিয়ে দেয়া হয় এটা ফিরোজ জেনেছে তার দাদির কাছ থেকে। গ্রামে শিয়াল, কুকুর, বাগডাশের উৎপাত কম নয়। এই জানোয়ারগুলো যাতে কবর খুঁড়তে না পারে সেজন্য এই ব্যবস্থা। কবর খুঁড়তে গেলেই মরিচের গুড়া ও তুষ নাকের ভিতর ঢোকে। জানোয়ারগুলো তখন কবর খোঁড়া বাদ দিয়ে ভয়ে পালায়। যুগ যুগ ধরে গ্রামে এই প্রথা চলে এসেছে। সামাজিক রেওয়াজ।

সব কাজ শেষ হলে আরেকবার সরকার সাহেবের জন্য দোয়া করা হয়। সবাই দোয়া করে তিনি যেনো জান্নাতবাসী হোন। আল্লাহ যেনো তাদের দোয়া কবুল করে নেন। দরদর করে সবার চোখ থেকে পানি ঝরছে। মোনাজাত শেষে অনেকেই জামার কোণা দিয়ে চোখ দু’টো মুছে নেয়। কলেমা শাহাদাৎ, দরুদশরিফ পড়তে পড়তে সবাই চলে যায় যার যার মতো। ফিরোজ, শামীম, নাহার, জুয়েল ও বাড়ির অন্যান্য আত্মীয়রা আসে আরো পরে।

চারদিন হলো ফিরোজের বাবা মারা গেছেন। খতমে কোরানের আয়োজন করা হলো বাড়িতে। পাড়া পড়শিকে দাওয়াত করা হলো জিয়াফত অনুষ্ঠানে। দাওয়াত খেতে আসলো আত্মীয়-অনাত্মীয় অনেকেই। সবার মুখখানাই বিষাদে মাখা। প্রিয়জন হারাবার বেদনা সবার মনে। সন্ধ্যার কিছু পর এই অনুষ্ঠান শেষ হলো। ফিরোজের চাচা হাকিম সরকার এসেছেন গতোকাল। খবর পেয়েই পাগলের বেশে ছুটে আসেন পরদিন। এসেই জিয়াফতের আয়োজনে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। খরচ-পাতি চাচাই দিয়েছেন।
এশার নামাজের পর হাকিম সরকার, ফিরোজের ছোট মা, ওর এক ফুফা, ফিরোজ, নাহার, শামীমকে নিয়ে একটা পারিবারিক বৈঠকে বসেন। ওদের সংসারের সামনের দিনগুলো কিভাবে চলবে, খরচপাতি কিভাবে আসবেÑ এটাই ছিলো বৈঠকের বিষয়। চাচা একটা ছোট্ট ভূমিকা দিয়ে তিনি শুরু করেন
-ভাবী কিছু মনে নেবেন না। ফিরোজ তোমাকেও বলছি। ভাইজানের এ অকাল মৃত্যু আমাদের কারুরই পক্ষে ছিলো না। সবই আল্লাহর ইচ্ছা। আমাদের করার কিছু নেই। তার জন্য মাগফেরাত কামনা করা ছাড়া আমাদের তার প্রতি আর কোনো কর্তব্য নেই। তবে ভাইজানের রেখে যাওয়া সংসারের দায়ভার আমাদের কিছুটা হলেও বহন করতে হবে। ফিরোজ অনার্স দেবে ক’দিন পরই। এই মুহূর্তে এ দূর্ঘটনা তার উপরে একটা বিরাট দু:সহ বেদনাই বটে। তার উপর সংসার চালাবার মতোন কোনো সম্বল ভাইজান রেখে যাননি। ফিরোজের দিকে চেয়ে বললেন
-তুমি কি কিছু ভেবেছে ফিরোজ!
কতোক্ষণ নিচের দিকে তাকিয়ে ফিরোজ কিছু চিন্তা করলো। তারপর ধীরে ধীরে মাথাটা তুলে বললো
-চাচাজান আব্বা মারা যাওয়ার পর এ চিন্তাটাই আমার মাথার ঘুরপাক খাচ্ছে সারাক্ষণ। কিন্তু কোনো কিনারা করতে পারিনি। একসময়ে ভাবি পড়ালেখা ছেড়ে দিয়ে কোনো চাকরিতে ঢুকে পড়ি। তারপর আবার ভাবি ইন্টারমিডিয়েট পাশ দিয়ে কী চাকরি পাবো। আবার ভাবি গ্রামে এসেই কিছু একটা করি। কিন্তু কোনো সিদ্ধান্তে আসতে পারছি না।
সরকার সাহেব ফিরোজের ছোট মায়ের দিকে চেয়ে বললেন
-ভাবী আপনি কিছু ভেবেছেন?
ফিরোজের মা কতোক্ষণ সবার দিকে চাইলেন। তারপর হু হু করে কান্নার ভেঙে পড়েন। মুখে আর কোনো কথা ফুটলো না তার। নাহারও আর তার চোখের পানি ধরে রাখতে পারেনি। হাকিম সাহেব ওদের কান্না থামাতে বিফল হলেন। ফিরোজও চেষ্টা করলো। কতোক্ষণ পর কান্না থামলে। সরকার সাহেব সবার দিকে আবার চাইলেন।
-ভাবি কিছু মনে নেবেন না। ফিরোজের কোনো চাকুরি না পাওয়া পর্যন্ত ওদের পড়াশোনা ও সংসারের খরচ আল্লাহর উপর ভরসা করে নিজের উপর নিয়ে নিলাম। এটাও নিজেরই একটা সংসার বলে মনে করবো আজ থেকে। বেচে থাকতে ভাইজানের কোনো ঋণই আমি শোধ করতে পারিনি। ছাত্র জীবনে চাঁদপুরে কলেজ ও হোস্টেলের খরচ, ঢাকার ব্যবসাÑ সবই হয়েছে ভাইজানের টাকায়। সারাজীবন তার কথা মতো চলেছি। শুধু নিজের ইচ্ছায় বিয়ে করে ভাইজানের বিরাগ-ভাজন হয়েছি আমি। মৃত্যুর সময় তার মুখখানা দেখার ভাগ্যও আমার নসিবে জুটলো না। মা-হারা, বাপহারা এই ভাইটাকে একা ফেলে চলে গেলেন নিরবে। কারো কাছে এক পয়সার ঋণও করে যাননি বরং সবাইকে ঋণী করে শূন্য হাতে চলে গেলেন ফেরেশতার মতো আমার ভাইটি। বলেই শিশুদের মতো কাঁদতে শুরু করে দিয়েছেন হাকিম সাহেব।
দেবরের কথা শেষ হওয়ার আগেই এক অনিরুদ্ধ কান্নায় ফিরোজের মা লুটিয়ে পড়লেন। কৃতজ্ঞতায় দেবরের হাত দু’টো ধরে কাঁদতে থাকেন। মুখ দিয়ে কোনো কথাই বের হচ্ছে না। চোখের জলই যেনো সকল কথা বলছে। বড় ভাইয়ের বউ হলেও হাকিম সাহেবের অনেক ছোট তার এই ভাবী। ভাবীর মাথায় হাত রেখে কান্না থামাতে অনুরোধ করেন। ফিরোজের ইশারায় নাহার মা’কে ধরে একটা চেয়ারে বসিয়ে দেয়।
হাকিম সাহেব নিজেকে গুছিয়ে নিয়ে বলেন,
-ভাবী আমি আর বেশি দেরি করতে পারবো না। সাড়ে আটটায় লঞ্চ ধরতে হবে। প্রায় আটটা বাজতে চললো। আর দেরি করতে গেলে লঞ্চ পাবো না।
-সে কি! কাল সকালে গেলে হয় না? কান্না জড়ানো কণ্ঠে বললো ফিরোজের মা।
-না ভাবী। এ মুহূর্তে দু’দিন বেশি থাকতে পারলে আমার আত্মাই অধিক শান্তি পেতো। ভাইজানের কবরের পাশে নামাজের পর একটু দোয়া করতে পারতাম। কিছু জরুরি কাজ রেখে এসেছি। ওগুলো গিয়ে করতে হবে।
-তাহলে আমি আপনার খাবার দেই টেবিলে। আঁচলে মুখ ঢেকে কথাটা বলেই চলে গেলো ভেতর বাড়ি। জবাবের জন্য আর অপেক্ষা করলেন না।
খাওয়া শেষ করে কিছু টাকা ফিরোজের মায়ের হাতে গুজে দিয়ে রিকসায় চেপে বসলেন হাকিম সরকার। চলন্ত রিক্সার দিকে কয়েকজোড়া চোখ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলো। রিক্সাটা অদৃশ্য হলে বাড়িতে চলে গেলো সবাই।
খাওয়া শেষে ফিরোজে তার মায়ের সাথে কতোক্ষণ কথা বললো। আজ কোনো উপায়ন্তর না দেখেই চাচার দয়া বিনা বাক্যে গ্রহণ করেছে ওরা। ফিরোজের মা দেবরের এই দয়া দাক্ষিণ্য গ্রহণ করতে মোটেও রাজি ছিলেন না। কিন্তু এ ছাড়া কোনো উপায় যে তার নেই। তবুও নিজেকে সান্তনা দিচ্ছেনÑ অপর কারো কাছ থেকে তো আর সাহায্য নিচ্ছে না। আপন দেবর। স্বামীর ছোট ভাইয়ের কাছ থেকে। স্বামী যে হাকিম সাহেবকে কোলে পিঠে করে মানুষ করেছেন। সেতো এর কোনো ঋণ শোধ করেনি। সৎমা হলেও আয়েশা আক্তার আপন মায়ের মতোই ফিরোজের ভাইবোনদের নিজের সন্তানের চেয়ে কম ভালোবাসেন না। ফিরোজের কণ্ঠে অনুনয়
-মা, আপনি কোনো চিন্তা করবেন না। আমার পরীক্ষাটা শেষ হোক। তারপর কিছু একটা করবো। তখন চাচার সাহায্যের আর দরকার হবে না।
মা বাধা দিয়ে বলেন,
-না বাবা! আগে তোমার পড়ালেখা শেষ করো। আমার গয়না-গাটি যা আছে তা দিয়েও অনেকদিন চলবে। বিপদের জন্যেই ওগুলো আগলে রেখেছিলাম। হঠাৎ ফিরোজের হৃদয়টা মোচড় দিয়ে উঠলো। তাহলে কি মা জানতেন বাবা বাঁচবে না। তবে তাকে বললেন না কেনো বাবার অসুখের কথা। ওরা কষ্ট পাবে বলে। না কি নীলকষ্টের বোঝা একাই বাবা বহন করতে চেয়েছেন। ফিরোজের চেহরাটা ফ্যাকাশে হয়ে গেলো। সেদিন ডাক্তারের সাথে কথা বলার সময় ডাক্তার মুখ খুলতে কাচুমাচু করেছিলেন। তবে কি মা তাকে নিষেধ করছেন! ব্যাপারটা ফিরোজের কাছে ঘোলাটে মনে হলো। ফিরোজ ভাবনার আরো গভীরে চলে যায়।
-কি ভাবছো বাবা?
ফিরোজ চমকে উঠলো। মুখে কোনো কথা জোগায় না। চোখ দু’টো সামনের দিকে প্রসারিত করে মায়ের চোখের দিকে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ। উদ্বেগভরা কণ্ঠে জানতে চায়
-মা! আবাŸার কি অসুখ ছিলো।
ফিরোজের প্রশ্ন শুনে মা চমকে গেলেন। সহসা কোনো উত্তর বের হয় না মুখ থেকে। ফিরোজ হঠাৎ এ প্রশ্ন করলো কেনো। ওতো ডাক্তারের কাছে জিজ্ঞেস করছিলো। স্বামীর কথাটি মনে করার চেষ্টা করেন আয়েশা। ‘ফিরোজ খুব মেধাবী ছেলে। ওর সাথে কথা বলার সময় লুকোচুরি খেলবে না। ও ঠিক বুঝে যাবে।’
-কেনো, ডাক্তার তোমাকে বলেনি!
-মা আপনি কিছু লুকাচ্ছেন। আমি সংসারের বড়ো ছেলে। সবকিছু আমার জানা দরকার। দয়া করে আল্লার দিকে…।
-মা ফিরোজের মুখ চাপা দিয়ে ধরেন। শিশুর মতো কান্নায় ভেঙে পড়েন। দীর্ঘ ছয় মাস কাউকে কিছুই বুঝতে দেননি তিনি। দুঃসহ যন্ত্রনার বোঝা একাই বহন করছেন। কিছুই বুঝতে দেননি কাউকে।
ফিরোজকে মা জানতেন না। ছোটবেলা থেকেই ও নিখোঁজ। দেখা হলো হঠাৎ করে একবার। এ কথা তাই ওকে জানানো সমীচিন মনে করেননি। কিন্তু আজ ফিরোজের চোখের দিকে তাকিয়ে নিজেকে খুব অপরাধী মনে হলো। আঁচলে চোখ মুছে চাইলো সৎ ছেলের প্রতি। এখন তাকে নিজের নাড়ি দেয়া ধন বলেই মনে হলো মায়ের কাছে।
-বাবা আমি তোমার কাছে কিছুই গোপন করবো না। তবে তুমি ছোটদের কিছু বলো না। তোমার বাবার ব্লাড ক্যান্সার হয়েছিলো। আট মাস ধরে…।
-বাবা! বলেই ফিরোজ আবার কান্নায় ভেঙে পড়লো। মায়ের কথা আর শেষ হলো না। আমাকে কেনো জানতে দিলেন না!
-তুমি কি করতে পারতে বাবা। তাছাড়া তোমার বাবা তোমাকে জানাতে নিষেধ করেছেন।
ফিরোজ আর কোনো প্রশ্ন করতে পারলো না। বাঁধভাঙা কান্না আবার উথলে ওঠে। বাবা তার নিজের জীবন নিয়ে চলে গেলেন। সন্তানদের ভালো চেয়ে তাদেরকে কোনো কিছু করার সুযোগ না দিয়ে চলে গেলেন। কেনো এই নিরব প্রস্থান! ‘ওহ! যদি কিছু একটা করতে পারতাম! যদি আগে জানতে পারতাম। বাবা তুমি চির ঋণী করে চলে গেলে।’ স্বগত মুখ থেকে বের হয়ে আসে ফিরোজের। মা ফিরোজের মাথায় স্নেহের হাত রেখে বলেন
-বাবা রাত অনেক হয়েছে। তুমি ঘুমোতে যাও। শামীম বোধ হয় একা একা তোমার অপেক্ষা করছে। ফিরোজ চোখ মুছতে মুছতে চলে যায় তার রুমে। দেখতে দেখতে আরো দু’দিন কেটে গেলো। ফিরোজের পরীক্ষায় আর মাত্র সপ্তাহখানেক বাকি। সংসারের কাজকর্ম মোটামুটি গোছানো শেষ। ভাই-বোনদের সাথে মন খুলে কথা বলেছে এই কয়দিন। তাদেরকে সান্তনা দিতে গিয়ে অনেক মিথ্যে আশ্বাসও দিয়েছে। মেহরাজ এসেছে গতোরাতে। চট্টগ্রাম মেডিক্যালে পড়ে। ওর কাছে সময়মতো খবর পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। তাই আসতে দেরি হয়েছে ওর। ওকে ম্যানেজ করতে গতোরাতে ফিরোজের অনেক বেগ পেতে হয়েছে। বেচারা ছোটবেলা থেকেই বাবার খুব প্রিয়। বাবাকে ছাড়া কোথাও থাকতে পারতো না। চট্টগ্রাম যাওয়ার সময় বাবার গলা ধরে খুব কেঁদেছে। গতোকাল এসেই ছুটে চলে গেছে বাবার কবরের কাছে। কবরের মাটি দু’হাতে খামচে ধরে কেঁদেছে অনেকক্ষণ। ফিরোজ অনেক কষ্টে সেখান থেকে ওকে ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়। সারারাত ধরে কেঁদেছে। এখনো মুখে কিছুই দিচ্ছে না। চোখ দু’টো ফোলা ফোলা।
ফিরোজ প্রথম মায়ের কাছেই পারলো কথাটা।
-মা আমি সন্ধায় লঞ্চে ঢাকা চলে যেতে চাই। সামনের সপ্তায় পরীক্ষা শুরু হবে।
-সে কি বাবা, মাত্র এক সপ্তাহ! তাহলে তো তোমার আরো আগেই যাওয়া দরকার ছিলো। তোমার ভাই-বোনদের বুঝিয়ে বলো। তুমি চলে গেলো ওরা আরো বেশি মনমরা হয়ে যাবে। একটু সান্তনার সুরেই বললেন মা।
-আমি ওদের বলেছি মা। এখন আপনার অনুমতি পেলেই হলো।
-আমি তো বলেছি বাবা। আর পরীক্ষা শেষ হলে কিছুদিন বাড়িতে থেকে যেও।
-বিকেলে সবাই মিলে বাবার কবরটা একবার জিয়ারত করে আসতে চাই। আপনি যাবেন আমাদের সাথে?
বাবার কবরের কথাটা শোনামাত্রই মায়ের মুখটা মলিন হয়ে গেলো। দু’ফোঁটা অশ্রু চোখ থেকে গড়িয়ে পড়লো গালে। চোখের পানিটা মুছে বললেন
-হ্যাঁ বাবা, আমিও যাবো তোমাদের সাথে।
বিকেলের দিকে মা, ভাইবোন বন্ধু শামীম সহ ফিরোজ যায় তার বাবার কবর জেয়ারত করতে। মাছের পিঠের মতো তুষ ছিটানো কবরটা আগের মতোই আছে। শুধু কয়েক জায়গায় পিঁপড়া মাটি খুঁড়ে মিহি সুজির মতো স্তুপ করে রেখেছে।
নাহার কয়েকটি ফুলগাছ লাগিয়ে দিয়েছিলো তিন চার দিন আগে। গাছগুলো মনে হয় তাজা হয়ে উঠছে। কবরের চারদিকে সবাই দাঁড়ায়। মনে মনে দোয়া কালাম পড়ে। ফিরোজ দু’হাত তুলে মোনাজাত করে। পিতার মাগফেরাত কামনা করে আল্লাহর কাছে। তিনি যেনো পিতার কবরের আজাব মাফ করে দেন। তাকে যেনো জান্নাতবাসী করেন। ওর গাল বেয়ে দু’টি ক্ষীণ অশ্রুধারা গড়িয়ে পড়ে কবরে। সবাই কাঁদছে। এক সময় ফিরোজ মোনাজাত শেষ করে। পকেট থেকে রুমাল বের করে চোখ দু’টো মুছে নেয়। সূর্যটা ক্রমে ফিকে হয়ে পশ্চিমে সেজদা লুটাতে চলেছে। আলোটা ক্রমেই ক্ষীন হয়ে আসছে। ফিরোজ মায়ের দিকে চেয়ে বললো।
-চলুন মা। বেলা শেষ হয়ে এলো। সন্ধার আগেই ফেরা দরকার।
ফিরোজ বাড়িতে গিয়ে কিছুক্ষণ পর তার ব্যাগ গোছাতে গিয়ে কিছুই আর খুঁজে পেলো না। আলনাতে কোনো কাপড় নেই, টেবিলে বই-খাতাও নেই। পরে ব্যাগের চেইন টান দিতে গিয়ে দেখে জিনিসপত্র সবই পরিপাটি করে গুছিয়ে রাখা হয়েছে ব্যাগে। হঠাৎ মিলির মুখটা ভেসে ওঠে ফিরোজের হৃদয়ে। দুই জায়গায় একইরকম দু’টি বোন পেয়েছে সে। মনে মনে ফিরোজ ভাবছে ওর মতো সুখি মানুষ বোধহয় পৃথিবীতে দ্বিতীয়টি নেই। এতোদিন পর বন্ধুর মুখে হাসি দেখে শামীম প্রশ্ন করে
-কি রে হাসছিস যে,
-নাহারের কাজ দেখে। বলার আগেই সবকিছু সুন্দর করে গুছিয়ে রেখেছে, তাই হাসছি। মিলির কথাও মনে পড়েছে সেই সাথে। দু’জনের মাঝে কতো মিল, তাই না?
-তোর বোন না। গোছালো তো হবেই।
ফিরোজ মিলি ও নাহারের সাথে কোথায় যেনো মিল আছে তা খুঁজে বের করার চেষ্টা করছে। চেহারাতে মিল খোঁজায় চেষ্টা করে। না, চেহারাতে কোনো মিল নেই। স্বভাবে: হাঁ, স্বভাবে দু’জনের মাঝে যথেষ্ট মিল আছে। মিলিকে গ্রামে একদিন নিয়ে আসতে হবে।
-কি করে আবার কি ভাবছিস । শামীম শুধায়।
-না, তেমন কিছু না। মিলির সাথে নাহারের একটা মিল খোঁজার চেষ্টা করছি। একটু হেসে ফেললো ফিরোজ।
মিলির নাম শোনাতে শামীমের মনে ক্ষণিকের জন্য আনন্দের ঢেউ খেলে যায়। হলের সেই চাহনিটা আবার মনে পড়ে শামীমের। ভিতরে ভিতরে পুলকিত হয়ে জিজ্ঞেস করে।
-হঠাৎ মিলির কথা বারবার মনে হবার কারণ?
-এমনিতেই। তুচ্ছ ব্যাপার নিয়ে আমি অনেক কিছুই ভাবি। এটা আমার একটা বদভ্যাস।
-না, বল না, তুচ্ছ ব্যাপারটা কি?
ব্যাগ গোছানো নিয়ে। নাহার ও মিলির সাথে অদ্ভূত মিল খুঁজে পেলাম। মিলিকে কোনো কিছু বলতে হয় না। বলার আগে সবই বুঝতে পারে। নাহারের ক্ষেত্রেও একই কথা।
-ও আচ্ছা, শামীম যেনো কিছুটা তৃপ্তি পায়।
নাহার দরজা ঠেলে রুমের ভিতরে প্রবেশ করছে। হাতে ভাতের বোল। মেহরাজ জগ আর গ্লাস নিয়ে আসে। টেবিলে খাবার সাজাতে সাজাতে নাহার বললো
-ভাইয়া, হাত মুখ ধুয়ে আসো। খাবার তৈরি।
ফিরোজ নাহারের মথায় হাত রেখে বললো
-তুইতো সব কাজেই চালুরে বোন। এতো কাজ শিখলি কবে?
-চালু কোথায়। মা তো বলেন আমি নাকি আলসে। ছোট ভাইয়াও তাই বলে।
-ওই আমি আবার তোকে কি বল্লাম। চার মাসের মধ্যে তো তোর সাথে আমার দেখাই নেই। নাহারের চুলের বেণিটাতে একটা টান দিয়ে বললো মেহরাজ।
শামীম ফিরোজের ভাইবোনের ঝগড়া দেখে না হেসে পারলো না। ও ফিরোজকে বললো
-ফিরোজ ওদের ঝগড়াটা কিন্তু এ্যাকসিলেন্ট। আরো কিছুক্ষণ চললে মন্দ হতো না।
এরই মাঝে তারা খেতে শুরু করেছে। খাওয়া শেষ করে হালকা কাপড় পড়ে নিলো ওরা। রাতে জার্নিটা যাতে আরামদায়ক হয়। মায়ের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে রিক্সায় চেপে বসলো। উঁচু-নিচু কাঁচা রাস্তায় ধীর গতিতে লঞ্চঘাটের দিকে এগিয়ে চলছে রিক্সাটা।