লঞ্চ ছাড়তে এখনো কিছু দেরি আছে। লঞ্চের নিচতলার ডেকে ইলিশ মাছ উঠানো হয়েছে। ইলিশ মাছের ঝুড়িতে মাছে বরফে একাকার। জেলেরা কতো কষ্ট করে এ মাছ ধরে অথচ নিজেরা তা খেতে পারে না। চালান পাঠিয়ে দেয় চাঁদপুর ও ঢাকায়। স্থানীয় আড়তদাররা কম দামে মাছ কিনে ঢাকা-চাঁদপুর-চট্টগ্রামে পাঠিয়ে দেয়। জেলেরা ঠকে। এ মাছ ধরতে তাদের কতো পরিশ্রম করতে হয়। ডাকাতের ভয়। মাঝে মাঝে জলদস্যুরা জাল কেটে নিয়ে যায়। কখনো কখনো খোপের ভেতর মজুদ করা মাছ নিয়ে যায়। মাঝি বা মালিককে ধরে নিয়ে পণবন্দি করে রাখে। কখনো আবার জলদস্যুদের সাথে জেলেদের লড়াই বাধে নদীতে। তখন নদীর পরিবেশ থাকে থমথমে। তবুও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে জেলেরা নদীতে যায় মাছ ধরতে। বউ ছেলে-মেয়ের মুখে দু’মুঠো ভাত যোগান দেওয়ার জন্য চলে নিরন্তর ঢেউয়ের সাথে, তুফানের সাথে, জলডাকাতের সাথে সংগ্রাম।

ফিরোজ ও শামীম দোতলার ডেকে একটা চাদর বিছিয়ে জায়গা করে নেয়। এতে রাতে আরাম করে ঘুমানো যাবে। কেবিনের ভাড়া অনেক বেশি। বিলাসে সারা রাত চেয়ারে বসে থাকা খুবই কষ্টের ব্যাপার। তাই অল্প খরচে ডেকে শুয়ে যাওয়াটাই আরামের। তাছাড়া ফিরোজের কাছে টাকাকড়িও তেমন একটা নেই। হাসপাতালের বিল ও অন্যান্য খরচ শামীমই দিয়েছে। ও সঙ্গে করে যা এনেছিলো তাও শেষের পথে।
ফিরোজ বসে বসে মাছ উঠানো দেখছে। শামীম কৌতূহলি হয়ে অনেক প্রশ্ন করছে। সে এই প্রথম লঞ্চে চড়েছে। তার উপর একসাথে এতো ইলিশ কোনোদিনই সে দেখেনি। চাঁদটা ধীরে ধীরে পুবপাশের সুপারি বাগানের ফাঁক দিয়ে মুখ তুলছে। আস্তে আস্তে তার আলো বাড়তে থাকে। রূপালি ইলিশে চাঁদের আলোটা পড়াতে মাছগুলো চকচক করছে। শামীমের ইচ্ছে হয় হাত দিয়ে মাছগুলো ছুঁয়ে দেখতে। এক সময়ে তার ইচ্ছটা ব্যক্ত করে ফিরোজের কাছে।
-ফিরোজ, ওই মাছগুলো হাত দিয়ে ছুঁয়ে দেখলে জেলেরা কিছু বলবে?
-কেনো, তোর ছুঁইতে ইচ্ছে করছে নাকি?
-খুব ইচ্ছে করছে। চল না একটু নিচে যাই। আমি এতো ইলিশ কোনোদিন দেখিনি।
ফিরোজ ও শামীম দোতলার সিঁড়ি ভেঙে নিচে নেমে আসে। লঞ্চের সাথে লাগানো ডিঙিটাতে লাফিয়ে পড়ে শামীম। জেলেদের একজন চেচিয়ে ওঠে।
-আরে করেন কি? নাওডা তো ডুইব্বা যাইবো গা! কি চান?
-না আমি মাছ দেখতে এসেছি।
শামীমের কথা শুনে বৃদ্ধ জেলে বিড়ি ধরানো মুখের ফাঁক দিয়ে একটু হাসে। বলে
-দেহেন, দেহেন।
-শামীম দু’হাত দিয়ে মাছগুলো নেড়ে চেড়ে দেখে। নাকে ধরে তাজা ইলিশের গন্ধ নেয়। ফিরোজ তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। বৃদ্ধ জেলে ফিরোজের দিকে বার বার চায়। দ্বিধান্বিত কণ্ঠে প্রশ্ন করে
-তুমি সরকার বাড়ির না?
-জ্বি। ফিরোজ সংক্ষিপ্ত জবাব দেয়।
বৃদ্ধ একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে আবার বলে
-তোমার বাপ বড় বালা মানুষ আছিলো। তোমার মা ও। তোমার মা একদিন আমার অসুখ্যা মাইডারে অনেক ফল-ফাকরা লইয়া দেখতে গেছিলো। অহনও আমার মায়াডা তোমার মা’র নাম লয়। বৃদ্ধ ফিরোজের পিতা মাতার কথা বলতে গিয়ে আনমনা হয়ে যায়।
ওদিকে শামীম একহালি টাটকা ইলিশ নিয়ে নিয়েছে। টাকা বের করতে গেলো বৃদ্ধ চেচিয়ে বলে
-আরো রাহো, তোমাগো তন ট্যাহা নেওন লাগবো না। ইয়াজল দেহ গেসুদ্দিন সরকারের বড়ো পোলা। তুমি কার তন টেহা রাখতে চাও?
ইয়াজল মুখটা ঘুরিয়ে চায় ফিরোজের দিকে। চিনতে চেষ্টা করে। ইয়াজল চিনতে পারে। মুখে ইলিশের পিঠের মতো একটা উজ্জ্বল হাসি টেনে বলে
-আপনের নাম ফিরোজ না?
ফিরোজ অবাক হয়। হাঁ সূচক মাথা নাড়ে। চিনতে চেষ্টা করে ফিরোজও। চতুর্থ শ্রেণির সেকেন্ড বয় ইয়াজলকে চিনতে আর ফিরোজের ভুল হয় না। ফিরোজ ফার্স্ট বয় আর ইয়াজল সেকেন্ড। বাড়ি ভাঙার কারণে আর ইয়াজলের পড়াশোনা হয় না। নদীই হয়ে ওঠে তার ঠিকানা। এরকম ইয়াজলদের সংখ্যা গোটা হাইমচরে কম নয়।
-দোস্ত! এ কী চেহারা তোর। বলেই জড়িয়ে ধরে বুকে। ফিরোজের আন্তরিকতা ইয়াজলকে মুগ্ধ করে। পরস্পর পরস্পরের দিকে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ।
লঞ্চের সাইরেন খুব জোরে বেজে ওঠে। লঞ্চ ছাড়তে আর বেশি দেরি নেই।
শামীম টাকা দেয়ার অনেক চেষ্টা করেও বিফল হলো। বৃদ্ধ কিছুতেই টাকা নিবেন না। সুন্দর করে চারটি বড়ো সাইজের ইলিশ পলিথিনে বরফ দিয়ে প্যাকেট করে দিয়েছে ইয়াজল।
লঞ্চের ইঞ্জিন গর্জে ওঠে। জেলেদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ওরা আবার লঞ্চের দোতলায় চলে আসে।
ছেড়ে দিয়েছে লঞ্চ। সার্চ লাইটের আলোতে নদীর পানি ঝিলমিল করছে। পাড় থেকে কিছু দূর পিছনে এসে এখন উত্তর দিকে চলতে শুরু করেছে আড়াইতলা লঞ্চটা। যারা এখনো বিছানা পাতেনি তারা ডেকে জায়গা খুঁজছে আরাম করার জন্য। এই লঞ্চে যাত্রী তেমন বেশি নেই। সাড়ে সাতটার লঞ্চে অনেকেই চলে গেছে। তাই কিছুটা আয়েশ করেই যাওয়া যাবে।
ফিরোজ জানালার কাছে নদীর দিকে চেয়ে আছে। শামীম ব্যাগটা ঘাড়ের কাছে রেখে কাত হয়ে একটা ম্যাগাজিন পড়ছে। ফিরোজ শুয়ে আছে উপরের দিকে চেয়ে। স্মৃতিতে ছেলেবেলার মায়ের ছবিটা ভেসে ওঠে। মায়ের চেহারাটা এখনো ভালোভাবে তার মনে পড়ে। ছোটবেলার সেই আনন্দের দিনগুলো এখন শুধু অতীত। মা ফিরোজকে বেশি ভালোবাসতেন। বাবা ভালোবাসতেন মেহরাজকে। অথচ কি উল্টোটাই না ঘটলো। মায়ের মৃত্যু ফিরোজ দেখতে পারলো না আর বাবার মৃত্যুর সময় উপস্থিত ছিলো না মেহরাজ।

শামীম খেয়াল করলো ফিরোজ আবার কল্পনাকাতর হয়ে যাচ্ছে। এটা যে আনন্দের নয় এটাও বুঝলো। একটু পর তার চোখ থেকে টপটপ করে অশ্রু ঝরবে তাও ওর অজানা নয়। শামীম প্রিয় বন্ধুটির চোখে এ মুহূর্তে অশ্রু দেখতে চাচ্ছে না। শোয়া থেকে উঠে ফিরোজের কাছে গিয়ে বসলো সে। ফিরোজকে একটা ধাক্কা দিয়ে বললো
-চল চা খেয়ে আসি। আমার ভীষণ ঘুম পাচ্ছে।
-এ্যা, ও তুই। কিছুক্ষণ নিরব থেকে ফিরোজ বললোÑ ঘুম আসলে ঘুমা।
-না চল, নিচ থেকে চা খেয়ে আসি। বলে শামীম ফিরোজকে টান দিয়ে তুলে ফেললো।
অনিচ্ছা সত্ত্বেও ফিরোজকে যেতে হলো শামীমের সাথে।
নিচতলার একপাশে ছোটখাট একটা চায়ের স্টল। সেখানে চা-বিস্কিুট খেয়ে ওরা আবার দোতলায় চলে আসে। রাত ক্রমেই গভীর হচ্ছে। এতোক্ষণ দোতলার ডেকে যারা জেগেছিলো ক্রমেই তারা ঢুকে পড়েছে ঘুমের রাজ্যে। কয়েক জায়গার তাসের আড্ডা জমিয়েছে কিছু যাত্রী। তাদের চোখে কোনো ঘুম নেই। শামীম ঘন ঘন হাই তুলছে। ফিরোজ এটা লক্ষ্য করলো। লাইটের আলো চোখে খাড়াভাবে পড়ছে ওর। শামীম তার বা হাতটা কপালে তুলে চোখ বোজার চেষ্টা করছে কতোক্ষণ ধরে। ফিরোজ ডেকের মাঝ বরাবর ছাদ ও পিলারের সাথে সাঁটানো সুইচটা অফ করে দিলে আলোটা চলে যায়। তবে পাশের লাইটের ক্ষীণ আলো এদিকে আসলেও তা ঘুমানোর জন্য কোনো সমস্যা হবে না। সুইচ অফ হতেই ওপাশের কোণায় তাশের আড্ডার একটা লোক খেকিয়ে উঠলো।
-লাইট বন্ধ করছেন ক্যা? এ্যা, দেখতে আছেন না খেলতে আছি। লাইট জ্বালান।
ফিরোজ আবার সুইচটা অন করে দিলো। কোনো প্রতিবাদ করলো না। ও জানে ওদের সাথে কথা বাড়িয়ে কোনো লাভ হবে না। অগত্যা ব্যাগ থেকে তোয়ালে বের করে লাইটের এ পাশটায় সিলিং এর সাথে মুড়ে ছিলো। এখন আর আলোটা চোখে পড়ছে না। এভাবেই কেটে যায় বাকি রাত।
জগলুর মনটা আজ ভালো নেই। ইস্কান্দার মৃধার হাজতখানার সেই অকুতোভয় ছেলেটির মুখচ্ছবি হৃদয় পটে আজ বারবার ভেসে উঠছে। এমন নির্ভীক ছেলে এই জীবনে সে আর দ্বিতীয়টি দেখেনি। আহা! কী রোশনাই চেহারা, কী ব্যক্তিত্ব আর বুদ্ধির ছটা ছেলেটির ভিতর। এতোটুকুন বয়সেই কতো পরিপুষ্ট। ছেলেটি বেঁচে থাকলে আজ একটা সুপুরুষ হয়ে যেতো। একদিন আলাপচারিতায় জগলু জেনেছিলো ফিরোমের মা নেই। চাচার বাসায় থাকে। চাচিটা বেশি ভালো ছিলো না। রোমেলা যে তার চাচি এটা জেনেছিলো আরো পরে। এর বেশি কিছু সে জানতে পারেনি। সেই সময়ও পায়নি। এরকম কতো কিশোরইতো ছিলো মৃধার বন্দিখানায়। কতো মায়ের বুক খালি করেছে এই নরপশু ইস্কান্দার মৃধা। ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শিশু আর নারী পাচার করে মৃধাচক্র। জগলু সরল মানুষ এর ভেদতত্ব পুরোপুরি বুঝতে পারেনি কোনোদিন। তবুও মনটা আকুপাকু করতো এ বাচ্চাদের মুক্তি দেয়ার জন্য। মৃধার এ শিশু পাচারের ব্যবসাটা তার ঘনিষ্ঠ দু’একজন ছাড়া কেউ জানতো না।
জগলু মাঝে মাঝেই ফিরোজকে স্বপ্নে দেখে। তার শিশুকন্ঠ থেকে চিৎকার ধ্বনি স্বপ্নের পরিবেশকে মাতাল করে তোলে। জায়নামাজে বসে কতোবার ছেলেটার জন্য দোয়া করেছেÑ সে হিসাব তার কাছে নেই। নিজের সন্তান হারানোর মতো বেদনাই তার মনে উদয় হয়েছে বারবার। কতোবার ভেবেছে চাকরিটা আর করবে না। মৃধার মুখোশটা সবার কাছে উম্মোচন করে দেবে। কিন্তু নিমকের দাম বলে কথা।

দুইদিন আগে বারোজন শিশু পাচার করেছে ভারতে। মৃধার সে কী আনন্দ। জগলুকে দশ হাজার টাকার একটা বান্ডিল দিয়েছিলো বকশিস। সে নেয়নি। তওবা করেছে আর কোনোদিন শিশুপাচার থেকে কোনো টাকা নেবে না। ইস্কান্দার একটু অবাক হয়ে জানতে চেয়েছিলো । জগলু উত্তরে বলেছিলো
-একা মানুষ। অতো টাকা দিয়ে কি করবো। মৃধা আর কোনো কথা বাড়ায়নি। আজকে ফিরোজের সেই বাঁচাও বাঁচাও চিৎকার ধ্বনিটা বারবার জগলুর মনে প্রতিধ্বনি করছে।

ফিরোজ কী বেঁচে আছে! বেঁচে থাকার তো কথা নয়। কী জানি। আল্লাহর মহিমার তো কোনো শেষ নেই। হয়তো বেঁচে থাকবে ফিরোজ। এই ‘বাঁচাও’ ‘বাঁচাও’ চিৎকার ধ্বনি কি ফিরোজের নাকি পাচার হয়ে যাওয়া নিষ্পাপ শিশুদেরÑ জগলু ভাবতে থাকে। কিভাবে বাঁচাবে এদের। তার তো কোনো শক্তি নেই, সাহস নেই। শুধু মনে প্রাণে চায় এই নিষ্পাপ শিশুগুলো তাদের মায়ের কোলে ফিরে যাক। আনেক চিন্তা করেও সে কোনা কিনারা করতে পারলো না। অবশেষে আঁধারের মাঝে হঠাৎ আলোর ঝলকানি দেখা দিলো তার মনে। থানায় খবর দিলেইতো হয়। কতোবার তো খবরের কাগজে ইস্কান্দার মৃধাকে ধরিয়ে দেবার সংবাদ দেখেছে। পুলিশ হন্যে হয়ে খুঁজছে তাকে। হঠাৎ ঝড়ে ডুবে যাওয়া নৌকার মতোই জগলুর আশার দীপটাও দপ করে নিভে গেলো।
পুলিশ তো প্রায়ই আসে এখানে। মদের পেয়ালায় চুমুক দিয়ে মাঝে মাঝেই তো তারা এখানে আসর জমায়। যাওয়ার সময় উষ্ণ হ্যান্ডসেক করে বিদায় নেয়। টাকার মোটা বান্ডিল দেখে চোখগুলো কুতকুত করে পুলিশের। খাকি পোশাকের ভিতরে মানবিক বোধ জলহস্তির মতো টাকার নদীতে ডুবে থাকে। সিংহের গর্জন আর চিতার ক্ষীপ্রতা থাকে না তাদের হৃদয়ে। পুলিশকে খবর দেয়া মানে নির্ঘাৎ নিজের জীবন বিপন্ন করা। হায়রে পুলিশ!

এভাবে নয় ছয় ভাবতে ভাবতে আরো কয়েকটা দিন কেটে গেলো। এর মধ্যে ফিরোজকে স্বপ্নে দেখলো আরো একবার। ছেলেটা বেশ বড়ো হয়েছে। ওর কাছে এসে বলেছে
-চাচা মানুষের জেল খানাটা বেশি বড়ো না আল্লারটা বেশি বড়ো। যারা শত শত মানুষকে কষ্ট দেয় তাদেরকে আল্লাহই ততো বেশি শান্তি দেবেন?
জগলু নিরুত্তর। কোনো উত্তর সে খুঁজে পায়নি।

নতুন বাসায় জগলুর আজ দ্বিতীয় দিন। সে থাকে টিনশেডে। আর মালিক থাকে বিল্ডিং এর দোতলায়। একই দিনে তিনতলায় নতুন এক ভদ্রলোক উঠেছেন। তার ফ্যামিলিও ছোট বলা যায়। জুমার নামাজ পড়তে যাওয়ার সময় পরিচয় হয়। কি করে তাও জগলুর জানা নেই। একবার জিজ্ঞেস করেছিলো। লোকটি এড়িয়ে গেছেন। পরের দিন লোকটার পকেটে একটা ওয়ারল্যাসের মতোন দেখতে পেলো জগলু। সেও তখন মৃধার বন্দিখানা থেকে ফিরছিলো। চোখ দু’টো লাল। তার প্রতিবেশী লোকাটারও চোখ দু’টো ফোলা ফোলা। মাথার চুল উশকো-খুশকো। মনে হয় সারারাত ঘুমাতে পারেনি। লোকটি উদ্বিগ্ন গতোকালের কেসটি নিয়ে। গতোকাল বারোজন শিশুসহ একটা পাচারকারী দল ধরা পড়েছে। কিন্তু দুর্ভাগ্য ক্রিমিনালরা কেউ ধরা পড়েনি। জগলু গেট পার হওয়ার সময় সরাসরি প্রশ্ন করে লোকটিকে
-স্যার আপনি কি গোয়েন্দা বিভাগের লোক?
-চৌকষ গোয়েন্দা অফিসার কবির সাহেব বৃদ্ধের প্রশ্ন শুনে অবাক ও বিস্মিত না হয়ে পারলো না। কিন্তু বৃদ্ধের প্রশ্নে কোনোরকম দুরভিসন্ধি নেইÑ এটাও বুঝতে পারলেন মুখটাকে ঘুরিয়ে পাল্টা প্রশ্ন করলেন
-চিনলেন কি করে?
-আগেই কিছুটা আন্দাজ করেছিলাম। আপনার পকেটের ওয়ারল্যাস আর হাঁটা দেখে বুঝতে পেরেছি। জগলুর কথা বলার ঢং আর বুদ্ধি দেখে গোয়েন্দা অফিসার কবির পুলকিত হলো। আর এ কয়দিনে নিজেদের মধ্যে যে দু’একটা কথা হয়েছে তাতে আন্তরিকতার প্রকাশটাই প্রাধান্য পেয়েছে বেশি।
-স্যার, রাতে ডিউটি ছিলো বুঝি?
হ্যা! গতোকাল রাতে বারোজন শিশু উদ্ধার করতে হানা দিয়েছি বেশ কয়েক জায়গায়। শিশুদেরকে উদ্ধার করা গেছে। কিন্তু ক্রিমিনালদের কাউকেই ধরা যায়নি। রাতে হানাও দিয়েছিলাম কয়েক জায়গায়। এই চক্রের বড়ো ক্রিমিনালটাকে ধরাই এখন আমাদের লক্ষ্য। কিন্তু এর কেশের নাগাল আজ পর্যন্ত পেলাম না।
খবরের কাগজ নিয়ে একটা ছেলে ভিতরে ঢুকলো। প্রথম পাতায় ছাপা হয়েছে ক’দিন আগে পাচার হওয়া বারোজন ছেলেমেয়ের ছবি, তাদের উদ্ধার কাহিনি। পাশেই আরেকটা বক্সনিউজে ইস্কান্দার মৃধার রোমহর্ষক কাহিনি। জগলুর আর বুঝতে বাকি রইলো না কিছুই। সে মনে মনে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করলো এতোগুলো বাচ্ছার জীবন রক্ষা পেলো বলে। তার মনটা আনন্দে ভরে উঠলো তার প্রতিবেশী গোয়েন্দা অফিসার এর সাথে যুক্ত বলে।

-এই দেখুন, কল্পনা করা যায় এই মাছুম বাচ্চাদের বিদেশে পাচার করা কতো নিষ্ঠুর মানসিকাতার কাজ। ওই শয়তানদেরও তো ছেলেমেয়ে আছে। পারবে তাদের সন্তানদের পাচার করতে।
-নেই, ওর কোনো ছেলেমেয়ে নেই। এর চেয়েও নিষ্ঠুর কাজ সে করতে পারে। শিশুদের পানিতে জীবন্ত ফেলে দিতে পারে বস্তায় ভরে। না খাইয়ে মেরে ফেলতে পারে। অমানসিক নির্যাতন করতে পারে। ঘর ভাঙতে পারে, সুখের সংসার ভাঙতে পারেÑ সব পারে। এমন কিছু নেই যা পারে না এই ইস্কান্দার মৃধা।

জগলুর কথা শুনে কতোটা বিমুঢ়ের মতো দাঁড়িয়ে রইলেন গোয়েন্দা কর্মকর্তা। তার মুখে কোনো কথা সরছে না। মেঘ না চাইতেই বৃষ্টির মতোন অযাচিত সাফল্য যেনো নিজের হাতের মুঠোয়। অনেক অজানা অধ্যায়ের পাতা যেনো বৃদ্ধের মুখস্থ। আনন্দের প্রজাপতি ডানা মেলছে কবিরের মনের আকাশে। চোখ দু’টো তুলে প্রশ্ন করলেন
-আপনি এতোসব জানলেন কি করে?
-আমি সব জানি। সব। দীর্ঘ পঁচিশ বছর তার সাথে আছি। এখানে আর কোনো কথা নয়। আপনি কাপড়-চোপড় পাল্টান তার পর নাস্তা সেরে নেন। এর পর সব বলবো। আমি আপনার মতোন একজন মানুষই খুঁজছিলামÑ যার কাছে সব বলা যায়। আমি চাই এই শয়তানটা ধরা পড়–ক। তার শাস্তি হোক।
-আগে ধরিয়ে দেননি কেনো?
-কার কাছে দেবো? বৃদ্ধের কণ্ঠে উষ্মা।
-কেনো, পুলিশের কাছে তো বলতে পারতেন।
কিছুটা তাচ্ছিল্যের হাসি জগলুর মুখে।
-পুলিশ তো সবই জানে। আপনাদের গোয়েন্দা বিভাগেরও অজানা থাকার কথা নয়। মদের আসরে তো পুলিশও থাকে মৃধার আস্তানায়। মাশোয়ারা নেয়। আপনাদের পরিকল্পনা হয়েতো ফাঁসও করে দেয়। তাই আমি কাউকেই জানাতে সাহস করিনি।
-আজ কেনো জানালেন? আমি তো মৃধার দলের লোকও হতে পারি। গোয়েন্দা অফিসার কিছুটা বাজিয়ে নিতে চাইছেন জগলুকে।
-এই লাইনে দীর্ঘ পঁচিশ বছর ধরে আছি। মানুষ চিনতে ভুল করি না। আপনাকে প্রথম দিনই সন্দেহ হয়েছিলো। কয়েকদিন আপনাকে লক্ষ্য করেছি। তবেই না আজ সব খুলে বলার সুযোগ পেলাম।
গোয়েন্দা অফিসার একটু হেসে বললেন
-গোয়েন্দাদের উপর তো দেখি গোয়েন্দাগিরি শুরু করে দিয়েছেন চাচা। গোয়েন্দা অফিসার সামছুল কবির দশ বছর ধরে চাকরি করছেন। এখনো মাঝারি ধরনের ভাড়া বাসাতেই থাকেন। অথচ তার নি¤œপদে যারা আছেন। তারাও ঢাকায় অনেক বাড়ি বা ফ্ল্যাটের মালিক হয়ে গেছেন। কিন্তু কবির নিজে সৎ ও কর্তব্যপরায়ণ মানুষ। কোনোকিছুতে ফাঁকি দেয়া তার চাকুরি জীবনে ঘটেনি। তবে বিনিময়ে সম্মান ও ভালোবাসা পেয়েছেন অনেক। তাই আর কিছু না থাকলেও আত্মতৃপ্তি তার আছে। স্ত্রী পুত্র পরিজনের ভালোবাসা আছে।

জগলুর সহযোগিতায় ইস্কান্দার মৃধা ধরা পড়েছে। তার বিরুদ্ধে মোট বিশটি মামলা আছে। তার মধ্যে হত্যা ধর্ষণ, নারী ও শিশু পাচার ও নির্যাতন, চোরা চালান, মাদক দ্রব্য, জমি দখল ইত্যাদি প্রধান। তার বন্দিশালা থেকে সতেরজন যুবতীকে উদ্ধার করা হয়েছে। এদেকে দিয়ে সে দেহ ব্যবসা করতো। চাকরি দেয়ার নাম করে অসহায় এইসব সুন্দরী মেয়েদের সে এ কাজে ব্যবহার করতো। ইস্কান্দার মৃধাকে ধরার জন্য সামছুল কবিরকে প্রমোশনের পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় পুরস্কার দেয়া হয়। জগলুর সহযোগিতার জন্য তাকে এক লক্ষ টাকা পুরস্কার দেয়া হয়। আইনি লড়াই শেষে ইস্কান্দার মৃধাকে যাবজ্জীবন করাদন্ডে দন্ডিত করা হয় আর তার নামে বেনামে যাবতীয় সম্পত্তি ক্রোকের নির্দেশ দেয় আদালত। আজকেই তাকে কেন্দ্রিয় কারাগারে পাঠানো হবে। গোয়েন্দা বিভাগ তার সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের খুঁজে বের করার চেষ্টা করছে। তার ঘনিষ্ট সহচরদের মধ্য থেকে পাঁচ জনকে এরই মধ্যে গ্রেফতার করা হয়েছে। ওদের শান্তিও মৃধার মতোই হবে।
ইস্কান্দার মৃধার নানা কাহিনি প্রতিদিনই পত্রিকায় ফলাও করে প্রচার করা হচ্ছে। এরকম একজন ক্রিমিনাল দলবলসহ ধরা পড়াতে নগরীর সবাই খুশি। শুধু একজন খুশি হতে পারেনি; সে রোমেলা বেগম। রোমেলা গ্রেফতারের ভয়ে আতঙ্কগ্রন্থ। ইস্কান্দারের গ্রেফতারের খবরটা পাওয়ার পর থেকেই সে আর বাইরে বের হচ্ছে না। ফিরোজ নিখোঁজ হবার পর থেকেই রোমেলার সাথে হাকিম সাহেবের সম্পর্কটা সিথিল। দেখা সাক্ষাৎও খুব একটা হয় না। বিছানাও আলাদা। ফিরোজের বাবার মৃত্যুর পর হাকিম সাহেব দেশ থেকে আসার পর ওর ফিরে আসার খবরটি পায় রোমেলা। মৃধা গ্রেফতার হওয়াতে রোমেলার ভাগ্যাকাশে ঘন মেঘের ঘনঘটা। গ্রেফতার আতঙ্ক থেকে উদ্ধার পাওয়ার কোনো রাস্তা আর তার সামনে খোলা নেই। এর থেকে মৃত্যুই যেনো অনেক ভালো। নিজের ভবিষ্যৎ চিন্তায় সে ব্যাকুল হয়ে আছে।
অতীতের সকল কথাই আজ তার চোখের সামনে সাদা মেঘের ভেলার মতো ভেসে বেড়াতে লাগলো।

পরকীয়ার যৌবনভরা কাশফুলের ফিনফিনে শরীর আর মন কোনোটাই তার এখন নেই। যৌবনের উচ্ছলতা, উদ্দামতা নেই, কাম, সুখÑ সবই যেনো শ্রাবণের শান্ত নদীর মতো নিরব, নিথর। বিশাল জলরাশির মধ্যে একটুকরো খড়কুটোও তার জন্য অবশিষ্ট নেই যাকে অবলম্বন করে বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখতে পারে!
রোমেলার ফোন নম্বর ও ঠিকানা ইস্কাদারের ওখানে আছে। যে কোনো মুহূর্তে পুলিশও তার বাসায় হানা দিতে পারে। একবার ধরা পড়লে রোমেলার ভাগ্যও মৃধার ভাগ্যের সুতোয় বাঁধা পড়বেÑ এতে কোনো সন্দেহ নেই। মান-সম্মান আর কেলেঙ্কারির কোনো সীমা থাকবে না। কেলেঙ্কারির কথাটা মনে হওয়াতে সারা শরীর কেঁপে উঠলো ভয়ে।
টেলিফোনটা হঠাৎ বেজে উঠলো। এক অজানা আশঙ্কায় অন্তরটা কেঁপে উঠলো। নিশ্চয় থানা থেকে! শব্দটা যেনো শত সহস্রগুন বৃদ্ধি পেয়ে গোটা বাড়িকে কাঁপিয়ে তুললো। কম্পিত কণ্ঠে রিসিভারটা হাতে নিলো রোমেলা। কয়েকবার হ্যালো বলতে চেষ্টা করলো, কিন্তু তার কণ্ঠ থেকে কোনো শব্দ বের হচ্ছে না। ওপার থেকে ভেসে এলো
-রোমেলা আধঘন্টার মধ্যে সটকে পড়ো। পুলিশ তোমার বাসায় যাচ্ছে। দেরি করো না। আমরাও বিপদের মধ্যে আছি। রাখি। বলে ওপারে রিসিভার রেখে দিলো ।
রোমেলা কি করবে কিছুই আলাপ করতে পারলো না। নিজের করণীয় স্থির করতে পারছে না সে। কোনোমতে পরনের শাড়িটা পাল্টে দরকারি কিছু জিনিসপত্র, টাকা-পয়সা, গয়নাগাটি একটা ব্যাগে গুছিয়ে নিলো। হাকিম সাহেব এখন বাড়ি নেই। শূন্যবাড়িতে রোমেলা একা। প্রিয় ঘরটি একবার দেখে নিলো ভালো করে। নিজের ভিতরটা হাহাকার করে উঠলো। চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ছে পানি। কতোদিন পরে তার চোখ দিয়ে পানি ঝরছে রোমেলা নিজেও তা জানে না। জানবেই বা কেমন করে। এ মহিলা কোন দিন কেঁদেছে তা নিজেও মনে করতে পারবে না। এরই মধ্যে বিশ মিনিটের মতো সময় কেটে গেছে। হাতে আর একদম সময় নেই। তাড়াতাড়ি ঘর থেকে বের হয়ে পা বাড়ালো অজানার পথে।