পৃথিবীতে ঋতু বৈচিত্র ঘটেl আপন মনে এক এক সময় এক এক ঋতু এসে উপস্থিত হয়l সকলের সব ঋতু পছন্দ নয়l তবুও কিছু করার থাকেনাl মেনে নিতে হয় মাথা পেতেl এক এক ঋতুর সময় এক এক সংগ্রাম করতে হয় বেঁচে থাকার জন্যl তেমনিই মানুষের জীবনেও ঋতু বৈচিত্র দেখা যায়l

আশরাফুল কঠিন পরিস্থিতির স্মুখীনl যেন তার গ্রীষ্মকাল চলছেl দুঃখের তাপে ফেটে গেছে হৃদয়ের উর্বর জমিl সুখের গাছ গুলি আসতে আসতে শুকিয়ে গেছেl একটু ভালোবাসার জলের অভাবে পাতা গুলি ঝরতে শুরু করেছেl

সে প্রতিদিন ঠ্যালা গাড়ি নিয়ে পাশের বাজারে পানের দোকান করেl সেই দোকানের সামান্য আয় দিয়ে সংসার চালানো মুশকিলl সব সময় তার কিছু না কিছুর অভাব লেগেই থাকেl তাই স্ত্রীর কাছে শুনতে হয় অনেক কথাl ছেলে মেয়েরা বার বার অভিযোগ করে স্কুলের টিউশন ফী অনেক বাকি হয়ে গেছেl স্কুলের প্রধান শিক্ষক নাকি বলেছেন কয়েক দিনের মধ্যে টাকা না দিলে তাদের স্কুল থেকে বের করে দেবেl ছোট মেয়েটা একটি নতুন জামার জন্য কয়েক দিন ধরে রাগ করে আছেl তাই বাড়ির ভেতর ঢুকতে তার ভয় করে lঅবশ্যই কোন না কোন অভিযোগের তির তার দিকে ছুড়ে আসবে।আর ছিন্ন ভিন্ন করবে তার হৃদয়কেl

জীবনের সব কিছু যেন ঘন অন্ধকার হয়ে গেছেl ব্যর্থতার চাপে যেন তার মাথা ফেটে যাওয়ার উপক্রমl সে যেন দুঃখের মরুভূমিতে আটকে গেছেl একটু সফলতার জলের জন্য ছটফট করছেl প্রকৃতি তাকে নিয়ে যেন খেলা করছেl তার জীবনে যেন মরিচীকা লেগেছে। প্রতিদিনের মত আজও খুব সকাল সকাল ঠেলা নিয়ে বাজারে যায়l পানের জন্য মসলা তৈরী করছে ঠিক তখন একজন ভদ্রলোক ট্যাক্সি থেকে নেমে তার কাছে যায় আর বলে- আমাকে একটি পান দেন দাদাl
আশরাফুল মাথা উঠিয়ে তার দিকে তাকিয়ে বলে- কি দিয়ে পান খাবেন স্যারl
লোকটি কি দিয়ে পান খাবে তার নির্দেশ দিলl আশরাফুল পান তৈরী করে তাকে দিলl লোকটা পান চিবাতে চিবাতে বলল- আপনাকে চেনা চেনা লাগছেl দাদা আপনার নাম কি?
-আশরাফুলl

  • আপনার কি কোন ডাক নাম আছে?
    -হ্যাঁl আছেl
    -সেটাকি বাবলুl
    আশরাফুল আশ্চর্য হয়ে তার দিকে তাকালোl আর বলল- আপনি কি ভাবে জানলেন একথা?
    -আমি আপনাকে প্রথমে চিনতে পারিনিl আসলে আপনার চেহারার এত অবনতি হয়েছে যে খুব কষ্ট করে চিনতে হলl
    -আপনার নাম কি স্যারl
    -আর আমাকে আপনি ও স্যার বলবেন নাl আমি করিমl আপনার প্রতিবেশী শরীফুদ্দিনের ভাগ্নেl
    -ওহl চিনতে পেরেছিl আসলে তোমার চেহেরার অনেক উন্নতি হয়েছে তাই প্রথমে চিনতে পারিনিl তুমি এখন কি করছ?
    -ফুটবল কোচিং সেন্টার প্রতিষ্ঠা করেছি রাজধানীতেl তবে আপনার কাছে পাওয়া মৌলিক শিক্ষা গুলি না পেলে হয়ত এত দূর পৌঁছাতে পারতাম নাl
    -ও সব কথা বাদ দাও করিমl
    -কেন দাদা? আপনাকে ভুলে গেলে আমার মহা পাপ হবেl
    -পৃথিবীতে সব চেয়ে বড় স্বার্থপর জীব হল মানুষl যতক্ষন পাই ততক্ষণ মনে রাখেl বলে সে কাঁদতে শুরু করে নিঃশব্দেl চোখ দিয়ে জল ঝরে পড়ে মাটিতেl যেন দুঃখের বন্যার বাঁধ কেটেছেl যা তাড়াতাড়ি মেরামত করা সম্ভব নয়l

করিম আশরাফুলকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলে- দাদা আপনার এরকম অবস্থা হল কি ভাবে? প্রথমে কিছুই বলতে চাইনিl সে ভাবে কথা শুনার কে আছে। এতকাল ধরে বলতে চেয়েছি অনেককে। কিন্তু কেউ শুনেনি। তাই সে আজ আর কাউকে বলতে চাইনা সে কথা। কিন্তু করিম নাছোড় বান্দাl সে জানতে চাই সব কিছুl অনেক চেষ্টার পর আশরাফুল বলতে শুরু করে তার কি ভাবে বসন্তকাল গ্রীষ্মকালে পরিণত হলl

আশরাফুলের ডাকনাম বাবলুl সে ছিল তার শহরের সব চেয়ে বড় মাপের ফুটবলারl সে কোন ফুটবল ম্যাচে খেলতে নামলে দর্শকরা একটি শব্দে মাঠ ভরিয়ে দিতl বাবলুদা… বাবলুদা… বলেl আর সে তাদের মনরঞ্জনের জন্য গোলের বন্যা বইয়ে দিতl অনেক তরুণ খেলোয়াড়ের আদর্শ ছিল সেl করিমও ছিল তাদের মধ্যে একজন।সে তেমন খেলতে পারতনা। তাকে হাতে ধরে খেলা শিখিয়ে ছিল বাবলু। তার ছুঁয়ায় অনেক জুনিয়ার খেলোয়াড় অনেক নাম করেছে।

তার একটি স্বপ্ন তাকে সব সময় তাড়া করতl কখন যে তার ক্লাবকে দেশের সেরা করবেl ক্লাবের জন্য সে সারাক্ষন ব্যস্ত থাকেl তার ফল স্বরূপ অনেক বড় বড় ট্রফি এনে দিতে পেরেছেl নিজেও ছিনিয়ে নিয়েছে অনেক ম্যাচের সেরা ও টুর্নামেন্টের সেরা পুরুস্কারl উৎসব মুখর ছিল তার জীবন। তার প্রতিভা দেখে অনেক ক্লাব কিনতে চাই তোl কিন্তু সে একবারও নিজের কথা ভাবেনিl তাই সে তাদের প্রলোভনে পা দেয়নিl তাল গাছের মত দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে স্বপ্ন দেখত আকাশ ছুঁয়ার।

জেলার হয়েও অনেক বার খেলেছেl বাবলুদা বললে সবাই তাকে এক বাক্যে চিনতে পারেl সে অনেক সরকারি অনুষ্ঠানে যেত অথিতি হিসেবেl জেলার এমন কোন বড় স্কুল নেই যে সে স্কুলে অথিতি হিসাবে যায়নিl তার সহকারী অনুষ্ঠান ও খেলার তারিখ মনে রাখতে হিমশিম খেতl

একদিন তার ক্লাবের হয়ে খেলতে যাওয়ার জন্য বাড়ি থেকে বাইকে যাচ্ছিলো এমন সময় তার দুর্ঘটনায় বাম পা ভেঙে যায়l সাথে সাথে হাসপাতালে নিয়ে যায় তাকেl ডাক্তার অনেক পরীক্ষা করার পর জানিয়ে দেয় তাকে উন্নত কোন শহরে নিয়ে যেতে হবে না হলে সে পা পাবে কিন্তু ফুটবল খেলতে পারবেনাl তৎক্ষণাৎ ক্লাব কর্তৃপক্ষ বার বার দুঃখ প্রকাশ করে এই ঘটনার জন্যl পরবর্তী সময়ে কেউ তার পাশে দাঁড়ায়নিl পরে তার পরিবারের লোকজন ক্লাব কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করলে তারা যেন চিনতে পারেনা বাবলুকে। এক কালবৈশাখী ঝড়ে এলো মেল হয়ে যায় তার জীবনের সব কিছু। ধ্বংস স্তুপে পরিণত হয়ে যায় তার জীবনের সকল সুখের রাজপ্রাসাদ। তাকে ঘিরে ধরেছে হতাশার কালো মেঘ। যা অবিরত চোখ দিয়ে ঝরতে থাকে।

সে কোন রকম নিজের সব কৃষি জমি বিক্রি করে পা পেয়েছে কিন্তু ফুটবল খেলতে পারবেনাl কারন ডাক্তার বারণ করেছেl আসতে আসতে বাবলু বিলীন হয়ে গেছে মানুষের মন থেকেl আর পরিণত হয় আশরাফুলেl সবাই ভুলে গেছে তাকেl ভুলে গেছে ক্লাবের কর্তৃপক্ষl যে ক্লাবের জন্য নিজের কথা ভাবেনি কোন দিনl সেই ক্লাব থেকে প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ টাকা দান করে অনেক দুস্থ মানুষের মাঝেl অথচ কেউ একবারও কোনদিন তাকে সাহায্য করার কথা ভাবেনিl আর কেউ ডাকেনা কোন অনুষ্ঠানেl
করিম তার কাহিনী শুনে চোখের জল আর ধরে রাখতে পারেনিl তার মনের ভেতর প্রশ্ন জাগে, যে লোকটির সাথে দেখা করার জন্য লাইন দিত অনেক মানুষ সে আজ পথের ধারে পানের দোকান করছেl করিম মনে মনে ভাবে বাবলুদা এই রকম পরিস্থিতির স্বীকার হয়েছেন জীবনের ঋতু বৈচিত্রের জন্যl তাই সে তাকে ফিরিয়ে আনতে চাই আলোর দিকে। দেখাতে চাই সফলতার পথ। সে তাকে একটি ভিজিটিং কার্ড ধরিয়ে বলল আপনি কালকেই চলে আসেন এই ঠিকানায়l আপনাকে আমার কোচিং সেন্টারের প্রধান প্রশিক্ষক হিসাবে চাইছিl ফিরিয়ে দেব অপনার হারিয়ে যাওয়া স্বপ্নl বলে সে চলে যায়।

আশরাফুল অনেক ভাবে কি করবে। সে কি যাবে না যেমন ছিল তেমনি থাকবে। তৎক্ষণাৎ বুকের ভেতর জ্বলে উঠে প্রতিহিংসার আগুন। যাদের জন্য সে নিজে ফুটবলে পরিনত হয়েছে। যে যেমন পেরেছে খেলেছে তাকে নিয়ে। আর নয় ফুটবল খেলতে না পারলেও খেলাতে তো পারব। আবার সূর্য হয়ে উঠব খেলার জগতে। সেই বাবলু সূর্য। যার আলো গায়ে মেখে আলোকিত হবে ঘন অন্ধকারে ডুবে থাকা খেলোয়াড়েরা।

পরের দিন আশরাফুল চলে যায় করিমের ফুটবল কোচিং সেন্টারে। নিযুক্ত হয় প্রধান প্রশিক্ষক হিসেবে। কয়েক দিনের মধ্যে সকল খেলোয়াড়ের মন জয় করে নেয়। যেন বাবলু নামক সূর্যটা আবার ডানা মেলেছে ফুটবলের আকাশে। আর কিছু দিন পর সে আসতে আসতে বড় ক্লাব প্রশিক্ষকের অফার আসতে থাকে। আর সে আগের মত একটি জায়গায় স্থির থাকেনা গ্রহণ করে সে বড় জায়গা গুলি। তার স্বপ্নের ধ্বংস স্তুপের উপর আবার গড়ে উঠেছে সাফল্যের ইমারত। আর কোন অভিযোগের তির আসেনা তার দিকে। ভালোবাসার আলোয় ভরে গেছে তার হৃদয় ভুবন। তার বড় ছেলে আজ এক নামকরা ক্লাবের অধিনায়ক। আর সেই ক্লাবের সে প্রধান প্রশিক্ষক।

কিছু দিন পর দেশের সর্বোচ্চ পর্যায়ের খেলা হয়। অর্থাৎ দেশের চ্যাম্পিয়ন শিপ খেলা। খেলা শুরু হলে আসতে আসতে পৌঁছে যায় তার দল সফতার উচ্চ শিখরে। তার দল ফাইনালে উঠেছে। আর প্রতিপক্ষ তার খেলোয়াড় জীবনের ক্লাবের বিরুদ্ধে। আজ প্রতিশোধ নেওয়ার পালা। সঠিক সময় খেলা শুরু হয়েছে। বাবলুর আজ স্বপ্ন পূরণের দিন। তার ছেলে তার স্বপ্ন পূরণ করবে এ তার দৃঢ় বিশ্বাস। এক পাশে স্ত্রী আর অন্য পাশে বসে আছে ছোট মেয়েটা অনেক দামি পোশাক পরে। তারা বলছে তোমার স্বপ্ন আজ পূরণ হবেই। কিছুক্ষন যেতেই গোল দেয় তার ছেলে। আজ খুশীতে তার মরে যাওয়ার ইচ্ছা করছে। সময় যত বাড়ছে ততই যেন গোলের ব্যাবধান বাড়ছে। আর তার স্বপ্ন যেন নেচে নেচে বিজয় জয়গান গাইছে। ঠিক সময় তার ক্লাব দেশের সেরা দলে পরিনত হয়।

তার পুরনো দলের কর্তৃপক্ষ ফ্যাল ফ্যাল করে তাকাচ্ছে বাবলুর দিকে। বাবলুর আগের কথা মনে পড়ছে তাদের। সে বলত যে ভাবেই হোক তার দলকে দেশের সেরা করবেই। সে আজ তা করে দেখিয়ে দিল। আজ তার বিজয় পথ রুখবে কে? জীবনের ঋতু বৈচিত্রের ফলে আবার এসে গেছে বসন্ত। তাই শুধু ফুল ফুটে বিজয়ের।