ডোমার থেকে প্রতিদিনই সন্ধ্যার পুর্ব বাড়ি ফিরে তাহসিন। আজো ফিরছে। ষ্টানে বাস না থাকায় একটু এগিয়ে রিক্সার অপেক্ষা করছে। সহজে কোন রিক্সাও চোখে পড়ল না। ক্রমে একটা সুন্দর হর্ষচিত্ত মনকে তীলে তীলে ভর্ষ করতে হল তাকে । এছাড়া কোন উপায় নেই। রাগ, অভিমান, ক্ষোপ সব কিছু ব্যর্থতার বসভূত।

হঠাৎ ক্ষীর্ণ আশার আলো নিয়ে একটা আগমনি রিক্সা চোখে পড়ল। রিক্সাটি শ্লথ গতিতে কোন মৃত্য পথযাত্রি কে বহন করতে করতে এগিয়ে আসছে।

রিক্সা কাছাকাছি হতে নাহতে তাহসিনের মনটা বিগড়ে গেল। একজন বরখা পরিহিত ভদ্র মহিলা বসে আছে তাতে। নিশ্চয় রিক্সা ওয়ালা তাকে রিক্সায় তুলবে না। কারন একদিকে অন্ধকার অন্যদিকে যাত্রী পারিপাশ্বিকতায় ব্যবধান। তবুও তাহসিন মতলব চালিয়ে রিক্সাটিকে দাঁড় করল। তারপর…

সুর্যমনি ততখনে পাটে বসেছে। অন্ধকার ঘনিয়ে পাতলা চাদরের মতো পৃথিবীকে ঢেকে নিয়েছে। নিয়ম মাফিক রিক্সা যাত্রীকে নিয়ে এগিয়ে চলছে। হঠাৎ রিক্সার থমকানো গতি। সামনে ভাংগা ব্রীজ। নির্মান কাজ চলছে। পথের এক পাশে সর্বচ্চো গতি সীমা ১৫ কি মি। নির্দেশনামা ফলকটি বেধে দেয়া আছে। ফলকটি অবশ্য বাস ট্রাক কিংবা যন্ত্রযানের ক্ষেত্রে প্রয়োজ্য। তবুও রিক্সাওয়ালা তা মেনে পায়ে হেটে সতর্কতা অবলম্বন করল। যাত্রীরা দুজন বসে আছে।

রাস্তার খাপ ছাড়া ইটের পিঠে ধাক্কা লেগে পাশা পাশি দোলা খাচ্ছে। মুখে কোন কথা নেই। দুজনের মুখ দুদিকে। যেন ঝগরাটে দম্পতি নিরব নিঝুম পৃথিবীর সাথে অভিমান করে বসে আছে।

প্রকৃতির গায়ে শিরশির বাতাস। কনকনে শীত। কাকের ডানার মতো অন্ধকার। আশে পাশে কয়েকটি জোনাকি ছাড়া আর কিছুই দেখা যায় না।

মুবিনার হৃদয় আকাশে একটা পরিচিত চিন্তা টিপ টিপ করে জ্বলে উঠল।অন্ধকার রাতে বাড়ি ফিরলে বাবা নিশ্চয় রাগ করবে। উপায় নেই যান্ত্রিক বিড়ম্বনা। তার উপরন্ত তাহসিনের সাথে একই রিক্সায়। সব মিলে বকনিটা বোধহয় কপালে লেখাই পরল।

মুবিনা। ওকে চিনতে এচটুও দেরী হল না তাহসিনের। কোথা হতে আসছে ও। কেমন আছে? এরি মধ্যে অনেক গুলো আগ্রহ জমে গেল হৃদয়ের কোনে। বহু দিন ধরে মুবিনার সাথে কথা হয়নি। জানা হয়নি ওর ভাল মন্দ। জানার প্রবল আগ্রহ গুলো হৃদয়ে নাড়া দেয়।

কিন্তু বিবেকের দ্বারে হোচট খায় তাহসিন। কত দিন পর পাশাপাশি বসেছে তারা। কই সে তো কথা বলছে না ? মানুষ বদলানোর কত ভঙ্গিমা।

রিক্সা ততক্ষনে অনেক দুরে এসেছে। ভাঙ্গা ব্রীজ পিচনে ফেলে তারা এখন বোড়াগাড়ি হয়ে পাঙ্গার রাস্তায়। দু” ধারে ইউক্যালিফটাসের গাছ। বাতাসে ঝড় ঝড় করছে। দুরে চৌপথীস্থ বিজলী বাতির ফিকে আলো চোখে পড়ল। কচ্ছপ গতিতে এগিয়ে চলছে রিক্সা। সবে মাত্র পূর্ব গগনে হাসি ফুটিয়ে উদিয়মান শশী উকি দিল। এক সময় রিক্সা মোড় নিতে মুবিনার গায়ের ওড়নাটি বাতাসে উড়ে এসে তাহসিনের
মুখে পড়ল। চিন্তার সাগরে ঢিল পড়ল তাহসিনের। নির্বাক সে। বহু দিন পর মুবিনার ওরনার গন্ধটা বেশ বিমোহিত। চোখ ফিরাল মুবিনার প্রতি। যত তাড়াতাড়ি মুবিনা পরিহিত ওরনাটা গুছিয়ে নিজের অসর্তকতার জন্য লজ্জা সংবরন করে ছোট একটা শব্দে মুখ খুলল…
“সরি “
“নো ম্যানসন। “

এরি মধ্যে দুজন দুজনার চোখে চোখ রাখল। অন্ধকারে কেউ কিছু দেখতে পেল না। কি এক বিব্রতকর লজ্জায় আবার তারা পূর্নাবৃত্তি মুখ ফিরে নিল।

রিক্সা এখন চৌপথীর আলোর ধারে প্রবেশ করতে চলেছে। এবার বহুদিনের মরিচীকা পড়া মুখ গুলোতে দর্শনার্থীদের চোখ পড়ে পূর্বাপর মায়ার জাল বিস্তার করবে। কিন্তু সব শেষ। রিক্সা আলোর ধারে আসার পূর্বেই বিদ্যুতচূত্য চৌপথী কোলাহল চঞ্চলতায় পীঠে পীঠে আছাড় খাচ্ছে। অন্ধকারে রিক্সা পরিস্কার। সুতারাং কিছুই হল না।

সকালের ঘুমটা ছোট বোন সাদিয়ার ডাকে ভেঙ্গে গেল তাহসিনের। তিরস্কার মিশ্রিত আদরের ডাক সাদিয়ার কন্ঠে-
“ভাইয়া, ঘুমিয়ে থাকবি নাকি? এই নে তোর শখের খাবার চাল ভাজা আর পিয়াজ কুচি।

প্লেট রেখে ডেকে বেড়িয়ে যায় সাদিয়া। ঘুম
ভাঙ্গলে উঠে বসল তাহসিন। জীবনের প্রতি বড়ই বিষ্ময় হয় তার। যতদিন যাচ্ছে মিশমিশে অন্ধকার যেন দিনদিন ভুতের ছায়ার মত ঘিরে বসেছে জীবনটাকে। ছোট বেলার সে অভ্যাস আজ কেমন তিরস্কারের দোলায় দেহ মন দুলে দেয়। প্রতিদিন এমনি কত আস্ফোলন বাবা-মা ভাই বোনের। প্রিয়জনদের কত পরিবর্তন। মুবিনার সেদিনের কি প্রহসন চাহনী। সমাজের কি করুণ চাহিদা। সব আমুল পরিবর্তনে জীবনটা গড়িয়ে যায় নিঃসঙ্গ একাকীকত্বের পানে। তাহসিন বসে বসে ভাবে।

ডোমারে অপ্রত্যাশিত ভাবেই তুহিনের সাথে তাহসিনের সাক্ষাৎ হল। সে কেনা কাটা করছে। তাহসিন কেনা কাটা করছেনা। তবে একটা পত্রিকার জন্য ভীর ঠেলে গ্রীন হাউজের দিকে যেতেই তুহিনের সাথে দেখা হয়। তুহিনেন হাতে শপিং ব্যাগ । মুখে ফাল্গুনি হাসি। চোখে বিজয়ের স্বপ্ন। তাহসিনের সহপাঠী বন্ধু তুহিন। খুব একটা ভাল ছাত্র ছিল না তুহিন। কিন্ত ভাল ছিল তার ভাগ্য। লেখা পড়া শেষ করে এক কলেজে ঢুকেছে। সাথে সাথে বিল ও হয়েছে।বিয়ে করেনি। চাকুরীজীবি মেয়ে খূজছিল। কর্মের সুবাদে অনেক দিন দেখা হয়নি তুহিনের সাথে তাহসিনের।
“আরে দোস্ত তুই? “
“হ্যাঁ, কেমন আছিস দোস্ত?”
“বেশ ভালই। তবে তুই কেমন আছিস?”
“ভাল নেই দোস্ত। সমাজের আর্বজনা হয়ে বেঁচে আছি।”
“কেন চাকুরী পাসনি বলে মনে হতাসা পুষে রেখেছিস? জীবনটার মুল্য দিতে পারছিস না।”
“পারব কি করে বন্ধু। পড়া কপাল। চৈত্রের দুপুরে কি বৃষ্টির আশা করা যায়?”
“তাহসিন, আল্লাহর উপর ভরসা রাখ। চেষ্টা কর। আল্লাহ কারো কর্মকে বিনষ্ট করেন না। “
“কবে চেষ্টা করা ত্যাগ করেছি। চেষ্টা করতে করতে নিজের মনকে পুড়ে কয়লা বানিয়েছি। চোখ দুটোকে রক্ত জবা। জীবন টাকে নিঃস একা বানিয়ে ফেলেছি। আর বাকিটা কি?
থাক, তোর বিয়ের খবর কি? তাই বল, তুহিন? “
“বিয়ে! বিয়ে তো হচ্ছে। পত্র পাবে নিশ্চয়।”
“তাহলে কি বউ নিয়ে সুখি হতে যাচ্ছিস ? “
“দোয়া করিস দোস্ত। খুব ব্যস্ত। হাতে আর একটুও সময় নেই। ঐযে মুবিনা আসছে। ওর সাথে কথা বল। আজকের মত আসি।
অন্যদিন -“

মুবিনাকে দেখে তুহিন ব্যস্ত হয়ে পরে। ওর সামনে দাঁড়াতে কেমন যেন বিব্রত বোধ করে। ভীতু ছেলের মত লজ্জায় মুখটা ফ্যাকাসে বিবর্ন ধারন করে। কিছু বুঝে উঠতে পারেনা তাহসিন।
তুহিন তাড়া নিয়ে জনভীরে ঢুকে। তাহসিন
তন্ময় চোখে দাঁড়িয়ে থাকে তুহিনের গমন পথে। দুর থেকে মুবিনা পাশ কেটে এড়িয়ে যায়। সে বড়ই ধূর্ত মেয়ে। সবাই ব্যস্ত। কে কোথায় হাড়িয়ে যায় বলতে পারেনা তাহসিন। পাথরের মত দাঁড়িয়ে সর্বস্ব হাড়ানো মানুষের মত নিরবতার হাত ধরে। এক সময় রিক্সাওয়ালার তাড়া খেয়ে সব হাড়িয়ে ফেলে।

একটা স্বচ্ছ জীবনে খুব প্রয়োজন তাহসিনের। এ জীবনের সন্ধানে সে ছুটে বেড়ায় অফিসে, ফার্মে, ষ্টেশনে, খনিতে, কারখানাতে। যেখানে আহ্বান থাকে সেখানে ছুটে যায়। ফিরে আসে বিষন্ন মন আর রিক্ত হস্তে। নিয়তির কলম ভাগ্যের শুন্য পাতায় লেখা হয়না। ব্যর্থতা এসে পা চেপে বসে। গ্লানীতে মুছে যায় স্বপ্ন। নিঃশ্বাষে চাপে হতাশা। সরে যায় পায়ের তলার মাটি। তবুও তাহসিন মাটির বুকে দাঁড়াতে চায়। বাঁচতে চায় স্বপ্ন আশা নিয়ে।

চারিদিক মেঘাচ্ছন্ন আকাশ।প্রকৃতির রুপ উগ্র । প্যান্ট শার্ট পড়ে তাহসিন বের হল।সামনে এসে দাড়াল সাদিয়া।
“ভাইয়া কোথায় যাচ্ছিস? “
“তুই জানিস না সাদিয়া? কোথায় আমার দিগন্তের সীমানাটা। “
“আজো ইনটারভিউ আছে? “
“আছে বৈকি।”
“কিন্ত বেরুবে কিকরে? বাইরের প্রকৃতি যে প্রতিকুল অবস্থা। বৃষ্টি হতে পারে। “
“আমাকে যেতেই হবে সাদিয়া। পৃথিবীর মাটিতে বর্ণার ঢল নামলেও আমার মরুভুমি বুকটা, আজো একফোটা বৃষ্টিতে সিক্ত হলনা। “
“ভাইয়া, তোর এই হতাশাবাদী কথা গুলো গেল না। আল্লাহর উপর বিশ্বাস রাখ। মনে শান্তি পাবে। তোর এই সব কথা শুনলে আমার হাসি পায়, জান?”
“হাসবে তো সাদিয়া। ক’ জনের মুখে বা হাসি জুটে, বল।”
“কটাক্ষ করছিস? তুই ভাবছিস, আমি তোর দুঃখটা বুঝি না, বোধ হয়।”
“বুঝবেনা কেন? না বুঝলে বোন হওয়ার সার্থকতা তোর কোথায়?”
“ভাবীর একটা কথা জিজ্ঞেস করব ভাইয়া? “
“জানি, কি জিজ্ঞেস করবে। কিন্তু আমার হাতে মোটেও সে সময় নেই, সাদিয়া। “
“তোমার খুব একটা সময় নষ্ট করবনা।”
“প্লীচ, আমার হাতে গুনা সময় টুকু নষ্ট করিস না তো সাদিয়া।”
“ভাইয়া, তোমার মুবিনার কি এখন কোনখোজ খবর রাখ ? না-“
“ওর ঘৃর্ণা, অবজ্ঞা আর বঞ্চনা আমাকে দুরে ঠেলে দিয়েছে। জন্ম দিয়েছে আমার নতুন পৃথিবীর। শিখিয়েছে স্বার্থবাদিতা। থাক, ওসব ছাই চাঁপা আগুন জ্বালিয়ে কি লাভ?”
“এক সময় বাবা মায়ের কথা উপেক্ষা করে ওকে বহুবার আনতে গিয়েছিলে। ওর জন্যে কত গঞ্জনা নিরবে হজম করলে। সব ভুলে হঠাৎ পরিবর্তণ হয়ে গেলে। “
“পরিরর্তণ হতে পারিনি। কিন্তু এ সমাজ অনেক আগে পরিবর্তণ হয়েছে, সাদিয়া। আমাকে সমাজ মুখি হতে দাও। “
“তুই কি তোর অতীত ভুলে যেতে চাস্ ? “
“যা চাই না, তা সহজে পেয়ে যাই, সাদিয়া। আর যা চাই, তা তো কোনদিন পাইনা।”
“অভিমান ছাড়। প্রেম আর জীবন দুটো জমজ বোন। এক হাতে দুটুকে পাওয়া যায়না। জীবন আর মনের চাওয়া-পাওয়ার মধ্যে অনেক তফাৎ। “
“তোমরা মেয়েরা একই পৃথিবীর মানুষ, সাদিয়া। সান্তনা দিতে জান। কষ্টের ভাগ নিতে কখনো শিখনি। “
“ভুল বললে, ভাইয়া।”
“ভুল। ভুল তো আমার জীবনটাই সাদিয়া। আর এ ভুলের পিছনে ছুটে আজ অনেক কষ্ট পাচ্ছি। বিয়ে করেও একাকী নিঃসঙ্গ সুর্যের মত উপ্তপ্ত জীবন নিয়ে গড়িয়ে যাচ্ছি।”
“তোর কষ্ট হচ্ছে। তাইনা? “
“হ্যাঁ রে, মনটা কে খুব শক্ত করে বেধেছি। “
“সরি, ভাইয়া। জানলে এসব কখনো জিজ্ঞেস করতাম না। “
“না রে। সময় নেই চলি। “
“আল্লাহ হাফেজ।”

বাড়িতে আত্নীয় স্বজনের প্রচন্ড ভীর। চারিদিক ঝড়ে পড়ছে কথার কলকাকুলি। মুবিনা ঘরে বসে ভাবছে। চোখের সামনে খোলা জানালাটা।
দৃষ্টি পড়ল বাইরে। একটা বৃক্ষডালে একটি কবুতর একাকী বসে প্রহর গুনছে। প্রতিজ্ঞা করছে জীবনের সাথে কিংবা নিঃসঙ্গতার হাত ধরে। মুবিনার ভাবনা ঘিরে বসল সেই পাখিটি কে ঘিরে। আবেগের দরজা খুলে গেল।তাহসিনের চাকুরী না পাওয়ার অপারগতা কি জীবনের বৈরী। চাওয়া পাওয়ার দেয়াল। মুবিনা সাত পাঁচ ভাবতে পারেনা…

হ্নদয় চঞ্চলতায় খালাতো বোন শামিমাকে নিয়ে ঘরের বাইরে আসল । কিছু জানায় না শামিমা কে। ওর হাত চেপে চলতে থাকে একটা পরিচিত পথে। বেশি দুর যেতে পারে না। দেখা হয় তাহসিনের সাথে। সে একটা ব্যাগ কাধে নিয়ে কোথায় যেন যাচ্ছে। চেহারাটা কি বিবর্ণ।চেনাই যায় না। তার পরও মুবিনার চিনতে একটুও সময় লাগলনা।
“আসসালামু আলাইকুম।”
“ওয়া আলাইকুমুসসালাম। মুবিনা, তুমি?”
“হ্যাঁ. কোথায় যাচ্ছ তাহসিন ? “
“সিলেটে।”
“ইনটার ভিউ আছে নাকি ? “
“না, জয়েন্ট করছি।”
“চাকুরী পেয়েছ, কই আমাকে জানাওনি তো?”
“প্রয়োজন মনে করিনি।”
“কেন তাহসিন? আমার জন্য তোমার পুকুরের জল হঠাৎ শুকে গেল ? “
“অনেক চেষ্টা করেছি। ধরে রাখতে পারিনি, মুবিনা। তোমাকে একমুঠো সুখ দিবার প্রত্যয়ে ঝিনুকের মত পুকুরের সব কিনারায় চষে বেড়িয়েছি। রিক্ত হাতে কোনকিছুই সঞ্চয় করতে পারিনি। শুধু তোমার গঞ্জনার চাদরে কতবার ক্লান্তির ঘাম মুছেছি। তবুও পারিনি।”
“ভুলতে পারবে কি তাহসিন?”
“জানি না। কাফনে জরানোর পরেও হয়ত তোমাকে ছোঁয়ার স্বাদ অপুর্ণই থাকবে। তোমাকে না ভুলার অপারগতা আমার চোখের জল ঝরাবে। হ্নদয়ের ক্ষত গর্তগুলো দগ্ধ হয়েই জ্বলবে।
“তাহসিন, ভুল ছিল আমার। নিরর্থক অতীত ভুলে আজ আমরা কি পারিনা? দু’জন দু’জনের হাত ধরতে । “
“না মুবিনা, তা আর হয়না। আজ তুমি নতুন পথের যাত্রী। নতুন একটা হাত ধরবে। নতুন মুখ দেখবে। নুতুনত্বের স্বাদই আলাদা। সেখানে আমার হাত ধরা তোমার শোভা পায়না । “
“কার হাত ধরা আমার শোভা পায়। কার হাত ধরলে আমি সুখি হব। দেড়িতে হলেও বুঝেছি
তাহসিন। অনেক বছর ধরে যে পরিচিত হাত টি ধরে পাশাপাশি হাঁটলাম। তা ছেড়ে কি করে একটা নতুন হাত ধরি, বল?
“তাতেই প্রকৃত সুখি হবে, মুবিনা।”
“কোথায় প্রকৃত সুখ? জানি তাহসিন।
এতদিন অন্ধ মোহে বাবা মায়ের আস্কারায় যে পুকুরে সুখের সাঁতারে নেমেছি। বন্ধুদের পাল্লায় বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে সঙ্গ নেশায় মেতে উঠেছি। কখন ভাবিনি তা ক্ষনস্থায়ী। ডাঙ্গায় উঠে দেখি আমার পরিধানের পোষাকটি বৃষ্টিতে নস্যাৎ।হেলায় হাড়াতে বসেছি মনের সুখ। দেহের আব্রু। এ দুর্দশায় সুখ কোথায়? তা হয়তো দেড়িতে হলেও চিনেছি।”
“কিন্তু তা আর হয়না মুনিনা।”
“কেন হয়না তাহসিন? দশ বছর পুর্বে যে পুকুরে পদ্ম ফুটেছিল। যেখানে কি তার এতটুকু ও অস্তিত্ব নেই। নতুন করে জন্ম নেয়ার। “

” মুবিনা, তোমার ও আমার মাঝে তৈরী হয়েছে বিভেদের দেয়াল। সম্পর্কের মধ্যে জমেছে মরিচীকা। আমি গ্রামে স্কুল প্রতিষ্ঠায় প্রধান শিক্ষক হিসাবে ছুটে ফিরছি। তোমার বাবা সেই সুবাদে একজন স্কুল শিক্ষকের প্রনয়কে সমীহ করলেন । দু” হাত জুরে দিলেন। তোমার হাত ধরে হাঁটার স্বপ্নে হোঁচট খেলাম । আমার দারিদ্র্যতা তোমার পায়ে কাঁঁটা ফুটল। আলগা হল আমাদের হাত। টানতে লাগলাম পরাজয়ে গ্লানী।
ছুটলাম স্কুলের পিছনে। ভাবলাম, প্রতিষ্ঠিত হতে পারলে তোমার কাঁটাক্ষত সেরে দিব। স্কুল নিয়ে যখন হাবুডুবু খাচ্ছি। একদিন ঘুরে বসলে তুমি। বাবার মৃত্যু হল। ছেলের বউ দেখতে তার হৃদয় ডুকরে কাঁদল। তোমার অভিমান ভাঙ্গল না। কখন যে খসে পড়ল জীবন থেকে দশটি বছর। আজও স্কুলের এম পি ও হল না।তোমার প্রাইমারী স্কুলে চাকুরী হল। অর্থ আভিজাত্যে মোহে আমার প্রতি তোমার ঘৃর্ণা জন্মে গেল। ভালবাসার নদীতে পড়ল ভাটা।

তবুও তোমাকে ফিরে পাওয়ার আশায় চাকুরির জন্যে হন্যে হয়ে ঘুরতে লাগলাম। ভাবলাম, চাকুরী পেলেই ফের তোমার সামনে দাঁড়াব। কিন্তু সে সুযোগটুকু তুমি দাওনি। যখন একটা কাজ পেলাম। বৈরী বাতাস জানিয়ে গেল তুমি বাবা মায়ের সিন্ধান্তে রাজি হয়েছ। অবশেষে বাধ্য হলাম জীবনের স্বপ্ন পরাজয়ের পুরাতন গর্তে কবর দিতে। তুহিন ভাল ছেলে। ওকে মন দিয়ে ভালবাস। সুখি হবে।

তাহসিন! আমি সুখি হতে চাই না। দুঃখের চাদর আমাকে বুকে জরাতে দাও। ক্ষমা করতে না পারলে, তোমার পৃথিবী হতে আমায় ছুটি দিও।”
“মুবিনা, বিশৃংখলা বাড়িও না। প্লীজ, সমযের দাবীকে খালি হাতে ফিরে দিতে নেই। “
“আমার থলেতে যে দিবার মত কিছুই নেই, তাহসিন। আমি নিসঙ্গতার নিঃস্ব পথিক। বেঁচে থাকার সব অবলম্বন হাড়িয়ে ফেলেছি। তোমার পাশে দাঁড়ানোর সৌভাগ্য সুবাদে শুধু এই টুকু মিনতী করব,
“সুখে থাক। কখনো আমাকে ক্ষমা কর না। “
বলতে বলতে মুবিনা কাঁদতে লাগল। হু হু করে সে কান্না বাতাসের বুক ভাঙ্গল।

তাহসিন গন্তব্যের পথে পা বাড়াল। সুর্য তখন রক্তিম আবীরে নতুন বেশে পৃথিবীকে রাঙিয়ে দিল। আয়োজন টা বড়ই চমৎকার। সে বেশি দুর যেতে পারল না। পা দুটো অবশ হয়ে এল।
হ্নদয়টা মুচড়ে গেল। মুবিনার হাতে একটা হাত এসে পড়ল। শামিমা একাকী হাঁটতে লাগল, আর মনে মনে মুচকি হেসে আল্লাহর প্রশংসা করে বলল-
“আলহামদুলিল্লাহ্।”